শনিবার, মে ২৫

সময়যান: নির্মাণ সংক্রান্ত

নাটক ‘সময়যান’ নিয়ে নিজের কথা লিখলেন নাট্যনির্দেশক  

অভি চক্রবর্তী

ছেলেটি বানিয়ে ফেলেছে একটা মেশিন৷ যে ছেলে সায়েন্সে ক্লাসে রেগুলার ফেল মারে, বাবা তার উপরে একেবারেই তিতিবিরক্ত অসহ্য সেই ছেলে চুপিচুপি চিলেকোঠার ঘরে বসে ঘুটুর ঘুটুর করতে করতে একটি মেশিন বানিয়ে ফেলেছে। এতে অতীত দেখা যাবে৷ সবার নয়৷ শুধু এই ছেলেটির বংশানুক্রমিক ইতিহাসের ভূত নেমে আসবে এই মেশিন ছুঁয়ে ছুঁয়ে। আমার মনে পড়ে যায় আমার ছেলেবেলার বন্ধু তন্ময় এর কথা। তন্ময় কি একটা বানিয়েছিল যাতে বৃষ্টি এলে সুইচ দিলে জামাকাপড় তার বেয়ে বারান্দায় এসে উঠতো! তন্ময় আমাদের রোজই প্রায় এমন উদ্ভট অথচ সৃজনশীল আবিস্কারের কথা শোনাতো। ব্রাত্য বসু রচিত এই নাটকটি আমি প্রথম পড়ি ২০১০ নাগাদ। ব্রাত্য দার কাছে অনুরোধ করি যখন নাটকটা করতে চেয়ে তখন শুনলাম আমাদেরই এক বন্ধু দল সেটি করছে। আমি নিরাশ বদনে বাড়ি ফিরি বটে কিন্তু মনে রাখি এবং দাঁতে দাঁত চেপে অপেক্ষা করতে থাকি নাটকটা আবার করবার মতো উপযুক্ত সময়ের জন্য ।

যাহোক এই নাটকের ছোকরা বৈজ্ঞানিকের ঘরে এসেছে মেয়েটি। এসেছে তার প্রেমিকের ঘরে৷ যার সঙ্গে গতো কয়েকদিনের যাবতীয় যোগাযোগহীনতা নিয়ে খুনসুটি করে ছেলেটির হাতে হাতে এটা সেটা এগিয়ে দিয়ে মেশিনে চেপে পরে মেয়েটি। ছেলেটির সটান সংলাপ ‘ বাবার ইতিহাস তো প্রেমিকাকে নিয়েই দ্যাখা উচিত’ ।
যাহোক যন্ত্রের পাটাতন কেঁপে ওঠে যন্ত্রের চলমানতার তীব্রতায়৷ মেয়েটি ভয়ে গুটিয়ে যায়৷ তারপর যন্ত্র ছবি দেখাতে শুরু করে৷ একের পর এক বাবার জীবনের অধ্যায়।

নীচের ঘরে ছেলেটির বাবা আর মা৷ তাঁরাও কোনো এক অদৃশ্য নিয়তির অঙ্গুলিহেলনে ডুব দেয় স্মৃতিচারণায়৷ এরপর এক অদ্ভুত অভিসারী ঘটনাস্রোত মিলিয়ে দেয় দুই অতীতচারিতাকে৷ এক ভয়ংকর অতীতের প্রকাশ নেমেসিস হয়ে ওঠে তাদের দুই জীবনে,দুই অন্য স্পেসেও। তাদের শান্তিময় বর্তমানে, তাদের স্বপ্ন দেখা ভবিষ্যতে৷ সময় এক অলঙ্ঘ্য সত্য৷ নাটক এগোতে বোঝা যায় এই প্রেমিক-প্রেমিকা আসলে ভাই বোন। নৈঃশব্দ গ্রাস করে আমাদের। জীবন এই এক অদ্ভুদ যান যাতে উঠে পড়লে অনেক সময় স্টিয়ারিং এর কন্ট্রোল আর নিজের হাতে থাকেনা। ছিটকে ছিটকে যায়। বিভ্রম ঘটে গতির। আর ব্রাত্য বসুর নাটক মানেই জীবনের এইসব অমসৃণ, এবড়োখেবড়ো থ্যাতলানো ঘটমান ছেঁড়া টুকরোর উপর আলো পড়া। আলো পড়া এই গতির দিকে বা গতিহীনতার দিকে। ঘটনাক্রমকে নিজস্ব যুক্তিমতো এগিয়ে যাবার জন্য খোলা স্পেস দেয়া ব্রাত্য দার প্রায় সব নাটকেরই চরিত্র। সে কারনেই ব্রাত্য দার নাটক করা, চাতকের মতো অপেক্ষা করা। কখনোই আগের করা কোনো নির্দেশকের নাটককে করতে আমার অসুবিধে হয়না। আমার কাছে ব্রাত্য দার নাটক মানেই নতুন নাটক। কারণ একজন নির্দেশকের কাছে চ্যালেন্জ এবং নিজেকে পরবর্তী আরেকটি কাজের জন্য তৈরি হবার মহান সুযোগ করে দেয় এইসব নাটক। আসলে ব্রাত্য বসুর নাটক করতে যাওয়া মানে এক অনভ্যস্ত, অচেনা টানেলে ঢুকে পড়া। সুজন থেকে বহিত্র, নীলাঞ্জন থেকে বাবু আবার সব্যসাচী থেকে ইন্দ্র কিংবা প্রবীর থেকে হৃদয় লোধা সকলেই এই পরিখার ওপারে থাকা তীব্র চিতাবাঘ এর সন্ধান করে। আবার স্পেস নিয়েও একাধিক নাটকে পাজল তৈরি করেন ব্রাত্য দা। কে থেকে হেমলাট আবার অরন্যদেব থেকে হৃদিপাস সবই যেনো এক সময়যানে উঠে বসা । সেখানে সামনে কখনো ভেসে ওঠে দেবব্রত বিশ্বাসকে আঁধার করে শিল্পী, প্রতিস্ঠান বা রেজিমেন্টেশানের কথা আবার কখনো বা অরন্যদেবের আড়ালে তৈরি হয় নগর সভ্যতার আগাম ভবিতব্য। গুলি গোলা বন্দুকের চিহ্ন দিয়ে ধরে ফেলেন বঙ্গ সংস্কৃতির পেজ ফোর কে। ফলত আমাদের অবস্থা হয়ে পরে প্রথম ইম্প্রেশানিস্টদের ছবি দ্যাখবার পর বেচারী ভিনসেন্ট এর মতো। তাও তাকে স্বান্তনা দেবার জন্য থিও ছিলো আমাদের কি থাকে? ? ? থাকে এই অভূতপূর্ব নাটক লেখার গড়নশৈলী যা একইসঙ্গে একজন নির্দেশককে তৈরি করছে আবার মোকাবিলা করবার সাহস দিচ্ছে। দুই মিলেই তৈরি হয় বোবা টানেল। একের পর এক সাদা পাতা। সাফোকেশান। সঙ্গে সঙ্গেই গাঁটছড়া বাঁধে খসড়া, স্কেচ, চরিত্রায়ন।

আর আমার মনে হয় একজন নির্দেশকের সবচেয়ে প্রিয় জায়গা এইসব টানেল। অন্ধকার, নির্জন এবং অবশ্যই বেরোবার নির্দিস্ট পথ না থাকা টানেল। যেখানে একের পর এক গুহা চিত্র এঁকে চলা যায়। সময়যান- ও ঠিক তেমনি একটি আস্ত টানেল। আরো বিপন্ন টানেল। নাটকটিতে কোনো চরিত্রের কোনো নাম নেই। তার ফলে বোঝা যায় এরা আদম ইভ অথবা আমি তুমি। যে কেউ। কোনো নির্দিস্ট নামের মধ্যে দিয়ে একটা চরিত্র বাড়তে পারে একরকম স্রোতের মধ্যে দিয়েই। নামহীন চরিত্র কে নানান টেবিলে ফ্যালা যায়। নাট্যকারের দেয়া এই স্বাধীনতা আমি নিয়েছি। শ্রেনীগত অবস্থান ছাড়া চরিত্র যখন যা বলছে এবং সময়যান যা দ্যাখাচ্ছে দুটোকে মিলিয়েছি কিছু সুরিয়াল ভিডিওগ্রাফি দিয়ে। একটা উদাহারন দেয়া যেতে পারে। ধরা যাক ছেলেটি বলছে, ‘ দেখো ঐ যে আমার মা…বাবা মা কে গান গাইতে বলছেন…গাইছে তো মা! ‘ প্রোজেক্টরে একটি হারমোনিয়াম আর একটি ব্লো-করা হাত আসে মানে এই মা যে কারোর হতে পারে অর্থাৎ নাটকের ঘটনা বা অঘটন যে কারোর জীবনেই ঘটতে পারে। এবং এই সেই টানেল। যার একদিক থেকে ঢুকলে গুলিয়ে যেতে পারে সমস্ত সম্পর্ক সময় এবং বেঁচে থাকার যাবতীয় অভ্যস্ত চেনা ছক, হিশেব নিকেশ । এক অমোঘ অথচ অনির্দিস্ট ভবিষ্যৎ এর দিকে নিয়ে যায় এই নাটক…সর্ষের দানা পায়ের তলায় দিয়ে রাখে যেনো দর্শক ও অভিনেতাদের। তারা চলতেই থাকে…এইরকম একটি অভূতপূর্ব, ঘেটে যাওয়া অতীত ও বর্তমান কেন্দ্রিক এই নাটকের সময়সীমা আবার মাত্র পঞ্চাশ মিনিট। এর মধ্যেই আমাকে তৈরি করতে হবে সম্পর্কের অনিশ্চয় নিয়ে মানব জীবনের এই অলঙ্ঘ্য নিয়তিকে। সময়ের গতিকে ধরতে আমি সাহায্য নিয়েছি স্কেটিং এর,প্রিয়া সাহা রায় কে মঞ্চে এনেছি এক চলমান হিউম্যান টাইম ট্রাভেলর হিশেবে। সে আজকের দিনে রোবট এর মতোই নির্লিপ্ত রঙীন মুখে নাটকের দুই লাইনের মাঝের সারবস্তুকে দৃশ্যমান করে যায়। অনলাইন রাখে। ব্যালেন্স করে দুই স্পেসের অভিনয় জোনের মাঝের ধূসর অঞ্চলকে। তার মুভমেন্টের ছন্দ সক্রিয় রাখে দর্শক এবং মঞ্চাভিনেতাদের। মঞ্চে এসেছে এক বৃহৎ ঘড়ি যা গ্রাস করে নেয় বর্তমানকে…টিকটিক করে নাটক এগিয়ে যায় এক হিংস্র ভবিষ্যৎ এর দিকে…আবার বৃষ্টি পরে মঞ্চে…ভালোবাসে ভাইবোন নাকি প্রেমিক-প্রেমিকা ? ? ? তুষার যুগ নেমে আসে। ঘড়িতে তৈরি হয় টেক্সট এর এক চলমান চিত্রলিপি।এই ঘড়ি তথা কালচক্র আসলে মঞ্চের যাবতীয় সিমেট্রিকে ভেঙ্গে একটা অ্যাসিমেট্রির ধরন তৈরি করে এবং এই তৈরি করা আমার ইচ্ছাকৃত। নাটকের গল্প বলতে বলতে যখনই ঘড়ির উপর আলো বা প্র্জেক্টার পরে তখনই গোটা সিনের এম্ফ্যাসীস সেদিকে চলে যায়। সময়ই যে আসল বিধাতা তাকেই বড় করে তুলতে চেয়েছি। অন্যদিকের ফটোফ্রেম নিঃসংগ। তাকে ছুঁয়ে নেমে আসে ঝুলন্ত শহর বা পেন্ডুলাম। শুধু নাটকের বিপজ্জনক বাঁকে এসে তা দপদপ করে ওঠে। দুলে দুলে যায়। একদিকে ঘড়ি অন্যদিকে পেন্ডুলাম তৈরি করে ডিজাইনের প্রাথমিক ইউনিটি আবার ঠিক রাখে মঞ্চের প্রপার প্রোপোরশানকেও। চারটি কাপড় খন্ড দিয়ে সম্পূর্ন প্রপসের কাজ সারেন অভিনেতারা।

আসলে শুধু সু-অভিনয় আর নিটোল গল্প বলবার মধ্যে থেকেও এক অন্যরকম থিয়েটারের চর্চা যে হতে পারে সেই খাদের কিনারের দিকে যাওয়া আমাদের নাট্য তৈরির নিয়তি হয়তো। সে কারনেই দিবারাত্রির গদ্য, মুক্তধারা, মৃত্যু ঈশ্বর যৌনতা, নেমেসিস, সময়যান আমার গন্তব্যের হাইওয়ে। আমি বা আমাদের নাট্যদল সেখানে এক পথভোলা পথিক মাত্র…

যাহোক বাইরের মোড়কে এই নাটকের সময়যান থাকলেও,এই নাটক আদপে এক সম্পর্কের নাটক। যেখানে এক নিবিড় সম্পর্ক একটি কল্পের মধ্যে ঢুকে পরে বদলে যায়। সেই কল্পকে ধরবার চেষ্টাই এ নাটকের নাট্যভাষা তৈরি করতে সাহায্য করেছে…আমাকে…আমাদেরকে…সেখানে অভূতপূর্ব অভিনয় করেন সংগীতা চক্রবর্তী, অনুপম চন্দ, প্রসেনজিৎ বর্ধন এবং গুলশানারা খাতুন। একদিকের অভিনয় তৈরি হয়েছে দ্রুত গতিতে আরেকদিকের অভিনয়ে নৈঃশব্দের ধীর লয়। মঞ্চ ভাবনা ও সজ্জায় আমাকে আগের অনেকগুলি নাটকের মতো সাহায্য করেছেন অদ্রিশ কুমার রায় আর আলোয় সাহায্য করেছেন দলেরই শিক্ষানবীশ জানা। আপাতত এই নাটক আঠেরোটি অভিনয় সম্পন্ন করেছে। বেঙ্গালুরু থেকে এই বাংলায় চলছে আমাদের সময়যান।

ব্রাত্য দা কে ধন্যবাদ। আমাদের এই নাটকটি করতে দেবার জন্য।

(অভি চক্রবর্তী পশ্চিমবঙ্গ নাট্য আকাদেমির সদস্য। নাট্যনির্দেশণার জন্য পেয়েছেন বাংলা রাইসিং স্টার অ্যাওয়ার্ড, ধরণী ঘোষ স্মৃতি পুরস্কার এবং মিনিস্ট্রি অব কালচার থেকে জুনিয়ার ফেলোশিপ অ্যাওয়ার্ড সহ বিভিন্ন সম্মান পেয়েছেন।  উল্লেখ্য কাজ অপারেশান ২০১০, মুক্তধারা, কন্যা তোর , নেমেসিস, মরাচাঁদ, মৃত্যু ঈশ্বর যৌনতা,  রাতবিরেতের রক্তপিশাচ ইত্যাদি। নাটক লেখা ও নির্দেশনার পাশাপাশি নাট্যমুখ নাট্যপত্রের সম্পাদনা করেন নিয়মিত। তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত জেলা থিয়েটারের ওপর বই ‘ পঞ্চাশে একশো।’)

Shares

Leave A Reply