সোমবার, এপ্রিল ২২

পিয়া তোরা ক্যায়সা অভিমান

শমীক ঘোষ

ডাইনিং টেবিলের ওপর ঘষটে হাতটা এগিয়ে দেয় ছেলেটা। পরম আকুতিতে, মার দিকে। যেন শেষ একবারের জন্য আঁকড়ে ধরতে চায় মাকে। কিংবা চায় মা আরও একবার হাত রাখুন তার হাতের ওপর।

মা ফিরেও তাকান না তার দিকে। মুখ ফিরিয়ে নেন। তাঁর মুখের বলিরেখা কুঁচকে গেছে আরও। কাঁদছেন তিনি। ভেঙে পড়ছেন ছেলের ঘোষণায়।

দু’হাত দিয়ে মুখ ঢেকে ফেলেছেন ছেলেটার বাবা। তিনিও বিধ্বস্ত। দু’জনের কেউই আসলে আর ভাবছেন না সন্তানের কথা। তাঁদের সামনে তখন সমাজের বিরাট অনুশাসন।

ছেলে যে নিজেকে মেয়ে ভাবে! এবার সে অপারেশন করে হয়ে উঠতে চায় মেয়েই।

ঋতুপর্ণ ঘোষের প্রায় আত্মজৈবনিক ছবি ‘চিত্রাঙ্গদা’। যেন ব্যক্তিগত জীবনকে সেলুলয়েডের পর্দায় আবার লিখছেন তিনি।

উচ্চমধ্যবিত্ত বাঙালি ডাইনিং রুমের মধ্যে প্রথম দৃশ্যটার চিত্রায়ণে কিন্তু কোথাও কোনও নাটকীয়তা নেই। কোথাও একটি বারের জন্যও নেই ক্যামেরার অ্যাক্সিস ভাঙা। অর্থাৎ প্রথম থেকে ক্যামেরা চরিত্রদের যে দিকে ছিল, সেই দিকেই থেকে গেল। নিরুচ্চার। ধ্রুপদি ব্যাকরণ সম্মত হয়েই। খুব সন্তর্পনে তিনি এড়িয়ে গেলেন দর্শককে একবার জোরে ঝাঁকিয়ে দেবার জন্য অ্যাক্সিস ভেঙে দেওয়ার সব প্রলোভন। শুধু ক্যামেরাটা পিছিয়ে দিলেন একটু। যেন নিজের জীবন থেকে দু’পা পিছিয়ে নিজেকেই দেখছেন স্রষ্টা। দেখছেন, রূপান্তরিত হওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করার পর মা ফিরিয়ে দিচ্ছেন নিজের সন্তানকেই।

ঝাঁকুনি কি সত্যি দিতে চাইছিলেন না উনি? ধরেই নিয়েছিলেন এই দৃশ্যে বাঙালিকে ধাক্কা দেওয়ার কোনও মানেই হয় না। রূপান্তরকামীতা আসলে বাঙালি সমাজের চোখে অস্বাভাবিক, অবক্ষয়ই থেকে যাবে?

কিন্তু সেই মানুষটা? সেই মানুষটার কী হবে? যে সারাজীবন ধরে আকাঙ্ক্ষা করে তার প্রিয় পুরুষ দেখবে তার সদ্য জন্মানো দুটো স্তন – নারীত্বের চরম প্রতীক।

সেই পুরুষও চোখ ফিরিয়ে নেয়। বলে, ‘পরে ফেলো।’

তারপর সেই রূপান্তরকামী মানুষ স্বাভাবিক লয়ে হাঁটতে হাঁটতে চলে যায় দরজার কাছে। নামিয়ে দেয় একটু আগে প্রেমিকেরই তুলে দেওয়া ছিটকিনিটা। সে আসলে সে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছে প্রত্যখ্যান। ধরে নিয়েছে প্রকৃতির জোর করে চাপানো নিয়মের বিরুদ্ধে তার এই কট্টর জেহাদ আসলে মেনে নেবে না কেউই।

সমাজ-জীবনের এই রূপান্তরকামীর তীব্র প্রত্যাখ্যানই বোধহয় ঋতুপর্ণ ঘোষ। এই প্রত্যাখ্যানই বোধহয় তাঁকে ভাবতে বাধ্য করেছিল সম্পর্কের মূল ভিত্তিগুলো নিয়ে। রেনকোট ছবির অজয় দেবগন অভিনীত মনুর সেই দৃশ্যটার কথা ভাবুন। প্রচুর আসবাবে ঠাসা বাড়িটায় ভীষণ একা মনু রান্নাঘরে গিয়ে পেছনে দরজাটা বন্ধ করে দেয়। এগিয়ে যায় নোংরা গ্যাসের টেবিলটার দিকে। ব্যবহৃত বাসনগুলোর সামনে। দেরাজ খুলে দেখে না ব্যবহার করা প্লেট। কিন্তু তার ওপর ঘুরছে আরশোলা।

অথচ ফিল্মনির্মাতা হওয়ার আগে, বিজ্ঞাপনের অসম্ভব সফল কপিরাইটার এই ঋতুপর্ণ ঘোষই লিখেছিলেন ট্যাগলাইন, ‘জীবনের ওঠা পড়া যেন গায়ে না লাগে।’

কিন্তু তাঁর সিনেমায় উঠে এল জীবনের অসংখ্য ওঠা পড়া গায়ে লাগার দৃশ্যই। একরৈখিক ভাবে সম্পর্কের ভিত্তি নিয়ে।

বার্গম্যানের ‘অটাম সোনাটা’র ছায়ায় বানানো ‘উনিশে এপ্রিল’ থেকে ‘বাড়িওয়ালি’, ‘চোখের বালি’, ‘দোসর’ ঘুরে বারংবার খুঁড়তে লাগলেন সম্পর্কেরই সেই ইতিবৃত্ত।

শেষের দিকে সম্পর্কের মানসিক জায়গা থেকে ক্রমশ যেন একটু একটু করে বেশি শরীরী হয়ে উঠতে চাইলেন তিনি। বলে যেতে চাইলেন একা মানুষের ঠোক্কর খাওয়ার আখ্যানগুলোই। আরও বেশি করে যৌনতা নিয়েও।

বাঙালির নির্মম ভয়াবহ পুরুষতান্ত্রিক জোকগুলোকে অবহেলায় সরিয়ে দিয়ে আরও বেশি করে উচ্চারণ করতে লাগলেন নিজের যৌন পরিচয়। অ্যাওয়ার্ড সেরিমনির চোখ ধাঁধানো ঔজ্জ্বলে কালো ধুতি আর পাঞ্জাবীর সঙ্গে দাঁড়ালেন ‘মেয়েলি’ বটুয়া হাতে। কখনও বা আরো ‘উদ্ধত’ হয়ে একদম শাড়ি পরেই।

কিন্তু এত উচ্চারিত যৌনতার পরেও নিজের ছবির কনটেন্টে এই সমাজ-অবহেলিত, সমাজ-অবদমিত যৌনতার কথা বললেও আসলে কিন্তু কোনওদিন সাহস দেখালেন না ফর্ম ভাঙবার। আসলে ছবিগুলো বানালেন গোদা বাঙালি দর্শকের কপালের থেকে একটু বেশি উচ্চতায়। যাতে চোখের নাগালে খুব সহজে না এনে ফেলা যায়, আবার পায়ের আঙুলে ভর দিয়ে একটু উঠে দাঁড়ালেই খুব সহজে নিয়ে আসা যায় মাথার নাগালে।

হয়ত সেটাই তাঁর কাম্য ছিল। কারণ ‘জনপ্রিয়’ এবং ‘মেধাবী’ দুই তকমার একটা হারালেও রক্ষণশীল ছুৎমার্গী বাঙালী তাঁর রূপান্তরকামী সত্ত্বাকে খুব সহজেই ব্যাকস্টেজের কালো অন্ধকারে ঢুকিয়ে দিত। ঠেলে দিত আরও অবহেলার আলোহীনতায়।

বাড়িওয়ালার ‘বনলতা’র প্রত্যাখ্যাত হয়ে আলমারির দরজা খুলে, নারীত্বের, সাজের চোখে আঙুল দেওয়া প্রতীক অসংখ্য শাড়ির সামনে অঝোরে কেঁদে ফেলেছিল। আর কাঁদতে কাঁদতে সে শরীর দিয়ে ঢেকে দিয়েছিল আলমারিতে আলগোছে ফেলে রাখা জমকালো লাল শাড়িটাকে। লাল ওই শাড়িটা তাঁর জীবনে এখন অপ্রয়োজনীয় হয়ে গিয়েছে।

এত আলোর পরও, এত সদম্ভে নিজের যৌনতাকে জানানোর সাহস রাখার পরও ঋতুপর্ণ আসলে অমনই একা ছিলেন। এক পাটি স্ট্র্যাপ ছেঁড়া হাওয়াই চটির মতোই একলা।

তাঁর মৃত্যুদিনে, তাঁকে নিয়ে অসংখ্য চিৎকৃত ফেসবুক পোস্টের ভিড়ে রূপান্তরিত সেই শিল্পীর, নিজের সৃষ্টির ভেতর দিয়ে বারবার মানবিক সম্পর্ককে চিনতে চাওয়া ভীষণ ‘অভিমান’ বোধহয় শেষপর্যন্ত থেকে যাবে একা। কেউ বুঝবে না দোসর খুঁজে নেওয়ার সেই অসম্ভব আকুতি – ‘তোমার ঠোঁট আমার ঠোঁট ছুঁল/ আর বাকি যা কিছু অকিঞ্চিৎকর।’

Shares

Leave A Reply