সোমবার, এপ্রিল ২২

…’বনস্পতির ছায়া দিলেন সারা জীবন’

কুশল ভট্টাচার্য

“হেমন্তের শেষ বিকেলে, ছিপ হাতে সেই অরণ্যবেষ্টিত বিরহী নদীতে মাছ ধরতাম আমি। এই বিরহী নদীর কাছেই, যেখানে বাইজি জওহর বাই মির্জাপুর ছেড়ে চলে যাচ্ছিল সন্ধ্যের মুখে, ঝুমঝুমি বাজানো ঘোড়ায় চড়া টাঙাতে চড়ে। জওহর আমাকে ডেকে নিয়ে হাতে হাত রেখে বলেছিলো, যে আমি চলে যাচ্ছি। সখেদে বলেছিলাম, তুমি আমায় কিছু দিয়ে গেলে না ? জওহর বাই উত্তরে বলেছিলো, তোমাকে যা দিয়ে গেলাম, তা এ জীবনে আর কাউকেই দিতে পারবো না। আমি শুধিয়েছিলাম, তা কি জওহর ? আমার হাতে হাত রেখে জওহর বলেছিলো, ‘পহেলি প্যায়ার’!”

ঠিক এর পরেই তাঁর উপন্যাসে জওহর চলে গেছিলো। আর, আমি মফস্বলের ভীরু প্রেমিক ঠিক এই পাতাটা বড় আলগোছে বড় ডাঁটির গোলাপ গুঁজে বুকমার্ক করে রেখে দিয়েছিলাম, কোনো দিন আর পড়তে পারিনি। ভয় হত, সংকোচ হতো, যদি পরের কোনো অধ্যায়ে পড়তাম, জওহরের নতুন প্রেমিক জুটিয়ে দিয়েছেন লেখক। এই বুদ্ধদেব। চিরকালীন সারস্বত বুদ্ধদেব গুহ, যিনি নিজেই বলেন লেখা যদি চিরস্থায়ী না হয়, অনেক দিনের, আজীবনের চিন্তা ভাবনারা যদি তাতে পরিস্ফুট না হয়, তা হলে সে লেখা থাকে না। তিনি বলেন, আমার পাঠক হয়তো অখ্যাত শহরের অজানা গলির মধ্যে ছোট্ট দোকানের সেলসম্যান, বিশেষ লেনদেন নেই তার দোকানে, তিনি হয়তো নিবিষ্ট মনে আমার বই পড়েন হয়তো বা লাইব্রেরি থেকে ধার করে নিয়ে এসে, এখন তাকে যদি আমি বোকা ভাবি, তাহলে আমার চেয়ে অসৎ আর কেউ নেই। তাই তাঁর জন্যেই আমার কলম।

যদি বাংলা সাহিত্যে এমন একটি নাম খুঁজতে যাই, যিনি শুধু প্রেম আর প্রকৃতিকে একাত্মই করেননি, বরং সমার্থক করে তুলেছেন তাঁর আজীবনের নর্মসহচর্য্যের সাথে, তিনি একমাত্র বুদ্ধদেবই বোধ হয়। যিনি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করেন যে এক জন পুরুষ ও এক জন নারী, পৃথিবীতে শুধু ভালোবাসা দেওয়ার ও নেওয়ার জন্যেই জন্মায়। তিনি অকপটে প্রেমের মাধুকরী করেন, তাঁর “বৌদ্ধধর্মে” প্রেম এবং শুধুমাত্র প্রেমই এক ও অদ্বিতীয় প্রায়রিটি। তিনি বলেন, প্রেম ছাড়া আমরা জীবনে আর যা কিছু করি, সবই অকিঞ্চিৎকর। আমাদের সব কর্ম, সব কীর্তি, সব টাকা, প্রাসাদ, প্রোমোশন, আবিষ্কার সব বোগাস ! আসলে যা থাকে, যা বরাবর ছিল, যা চিরকাল থাকবে, তা শুধুমাত্র নীরব নরম ভালোবাসা।

১৯৩৬ এর ২৯ জুলাই, জন্ম বুদ্ধদেবের। জন্মের সময় তাঁর মা, স্বপ্নের মধ্যে দেখেছিলেন বুদ্ধদেব এসেছেন। সেই থেকেই পুত্রসন্তানের নাম রাখা হয়েছিল বুদ্ধদেব। কিন্তু পরবর্তী জীবনে প্রকৃতিপ্রেমী হয়েও শিকারের ভালোবাসা তাকে নিয়ে গিয়েছিলো অরণ্যের গভীরে, সেই নিয়ে রসিকতা করে নিজেই বলতেন, এ বুদ্ধদেব পশুপাখি রক্ষা করেন না, তবু বুদ্ধ ! জীবনের প্রথম ভাগে, আর পাঁচটা উদ্বাস্তু পরিবারের মতোই পূর্ববঙ্গের রংপুর, বরিশাল, জয়পুরহাটে ঘুরে বেড়িয়েছেন পিতা-মাতার সাথে। জল জঙ্গল আর মানুষের আত্মিক সম্পর্কের যে পটভূমিতে আগামীতে তাঁর অগুনতি গল্পের কাদা-মাটি থেকে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে পাঠকের দরবারে। সাফল্যমণ্ডিত কেরিয়ার থেকে উচ্চ-মধ্যবিত্ত জীবনযাপনে উদ্দাম সাহসিকতার যে আখ্যান তিনি তুলে ধরেছেন বারবার, সেই সিগনেচার স্বাতন্ত্র্য তাঁকে বাংলার অন্যান্য লেখকদের থেকে সর্বার্থে আলাদা করে তুলেছে।

একটি মানুষ শুধু প্রেম, পরকীয়া ও নরনারীর সম্পর্ক নিয়ে দস্তুরমতো আধুনিক ভাবে ভাবেন এবং অকপটে লেখেন শরীর ও মনের সফল রসায়ন, এ জিনিস বাংলা সাহিত্যে তখনও স্বাভাবিক ছিল না যখন বুদ্ধদেব গুহ শুরু করেন তাঁর লেখকজীবন। শুধু লেখনীই নয়, এক জন অসম্ভব গুণী সংগীতশিল্পীও তিনি, যাঁর পুরাতনী গানের ওপর দখল ঈর্ষা উদ্রেক করে। শুধু কি সাহিত্য, পুরাতনী সঙ্গীতের ওমে যদি কখনো নিজেকে সেঁকতে ইচ্ছে করে তা হলেই কিন্তু বারবার ফিরে যাই তাঁরই কাছে। একশোটিরও বেশি নভেল, অসংখ্য ছোটগল্প, প্রিয় চরিত্র ঋভু ও ঋজুদাকে নিয়ে লেখা চল্লিশটি উপন্যাস, বুদ্ধদেবের অসংখ্য রত্নভাণ্ডার। পুরস্কৃত হয়েছেন বহু বার। তাঁর জীবনযাত্রার উন্নাসিক মানের জন্যে তিরস্কৃতও কম হননি, কিন্তু শেষ পর্যন্ত পাঠকের হৃদয়ে থেকে গেছেন চিরকালীন ছাঁদে।

“যদি আপনি বিশিষ্ট না হন, আপনার জীবনে যদি ধার না থাকে, সত্যিকারের চাওয়া পাওয়া বোধ না থাকে, সত্যিকারের বিশ্বাস অবিশ্বাস না থাকে, এবং সেই চাওয়া বা বিশ্বাসের পাশে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার সাহস না থাকে, তাহলে আপনার লেখা ঢাউস ঢাউস উপন্যাসগুলো জোলো দুধের মত স্বাদগন্ধ বর্ণহীন হতে বাধ্য।” –এই কথাগুলো যাঁর লেখায়, যে বয়সে পড়েছিলাম, সে বয়সে বুদ্ধি পাকেনি আর পাকলেও তার মধ্যে ততখানি বোধ ছিল না। তাই প্রেম, প্রকৃতি আর জীবন নিয়ে যে গভীর দর্শন বুদ্ধদেব গুহর উপন্যাসের ছত্রে ছত্রে বড় অনায়াসে লেখা থাকত, তাঁর বেশিটাই বুঝতাম না। তবুও সেই না বোঝাটুকু থেকে এক ছটাক অপূর্ব, অদেখারকম আলো আর অনেকটা আধেকলীন সুগন্ধ পেতাম। সে আলো আমায় ভবিষ্যতের আমি তৈরিতে ভারী সাহায্য করেছে।

জীবনে প্রথম বার তাঁর লেখা পড়া ইস্তক মনে মনে প্রকৃতি বুঝতে গিয়ে আপাদমস্তক একটি নারীকে বুঝেছে অনেকেই ! মাধ্যমিক পরীক্ষার পরে লুকিয়ে লুকিয়ে পড়ে ফেলেছিলাম, ‘কোয়েলের কাছে’, ‘একটু উষ্ণতার জন্যে’, ‘সুখের কাছে ‘…… একে বয়ঃসন্ধি, তার ওপর অরণ্য, নদী, চাঁদের আলো, প্রেম আর পরকীয়া, কিশোর থেকে পুরুষ হতে পাঠকের বেশি দেরি লাগেনি। মনে পরে, এক সুতীব্র আবেগ খেলা করতো, ওঁর উপন্যাস পড়ে। তাঁর অগুনতি পাঠকেরা এমনকি ডায়েরির পাতায় পাতায় লিখে রাখতেন গল্পের প্রিয় অংশ, এ আমার চোখে দেখা। আজও যখন অবকাশে কোনো জঙ্গলপাহাড়ের পটভূমিতে গিয়ে চন্দ্রাতপের নিচে তারার আলোয় দাঁড়াই, অনাদিকাল হতে শোনা সংগীতের মতন কানে বাজে বুদ্ধদেব গুহর কথা, শব্দ, অনুভব, সবই। যেতেই হয় যে, তিনি যদি বুদ্ধদেব হন মাধুকরীই যে তাঁর একমাত্র ফকিরি ভিক্ষে। সে ভিক্ষের কাছে ঝুলি উপুড় করে “বৌদ্ধ” না হয়ে আমাদের আর উপায় কি ? জীবনকেও যেমন অকপটে ভোগ করেছেন, মৃত্যুকেও ঠিক একই ভাবে।

পড়ে নেব, সেই নগ্ন নির্জন স্বীকারোক্তি ! যেখানে তিনি বলছেন, ”আমার ভারী ইচ্ছে করে, আমার কোনো ভীষণ সুখের মুহূর্তে এমন সুন্দর কোনো পথে হাঁটতে হাঁটতে কোনো দিন আমি জাস্ট ফেড আউট করে যাব, তার পর আমাকে কেউ ডাকলেও আমি ফিরব না, আমি নিজে ডাকলেও আমি আর সাড়া দেব না। অথচ আমি আমার চার পাশ অন্ধকারেই ছড়িয়ে থাকব, ঝিঁঝির ডাক হয়ে থাকব, জোনাকি হয়ে থাকব, তারার আলোয় দ্যুতিমান শিশিরবিন্দু হয়ে থাকব, ঝরাপাতা হয়ে থাকব।“ ……

সত্যিই আমাদের সে ক্ষমতা নেই, জলে, জঙ্গলে, জোনাকি ভরা হেমন্তের অরণ্যে মুঠো মুঠো ঘাসে, উজ্জ্বল হীরকদ্যুতির মতো তাঁর এই বিন্দু বিন্দু ভালোবাসাকে আমরা মিথ্যে করে দিতে পারি ! বরং শুধু পরকীয়াটুকু নয়, প্রেমটুকু শিখে নিই এইবেলা ?

আজ ২৯ জুন। আজ তাঁর জন্মদিন। জন্মদিনে এটুকু দেব না ?

Shares

Leave A Reply