শনিবার, সেপ্টেম্বর ২১

গৌতম চৌধুরীর কবিতা – বিপরীতের মধ্যে ঐক্যের সূত্রটি যেন কী ছিল

গৌতম চৌধুরী

আকাশ গুমগুম করিতেছে, কিন্তু কোনও ধ্বনি শুনা যাইতেছে না, অন্ধকারের রঙ ঠিক সেইরকম, যখন কাক উড়িয়া গেলে দেখা যায় কিন্তু গাছের পাতার সবুজ আর ঘাসের সবুজ এ উহার গায়ে মিশিয়া যাইতেছে, ঠিক সেইরকম. যাহাতে টের পাওয়া যাইতেছে না একটু পরেই সন্ধ্যা নামিবে না কি বেলা দশটার আকাশ জুড়িয়া মেঘের গন্ধ, ফড়িং উড়িতেছে, লোকজন আসিল আসিল বলিয়া জলদ পায়ে দৌড় লাগাইতেছে, কষ্টটিকে কষ্ট বলিয়া চিনিতে দেওয়া ভালো, উড়ন্ত বাঘের মতো লাফ দিল প্রথম প্রহরী, পাথর ফাটিবার শব্দ হইল কি এইবার, পাথর না মেঘ, বাচককে অনেক দিন অপেক্ষা করিতে হইয়াছিল গলা দিয়া ঠিকঠাক আওয়াজ বাহির করিবার জন্য, পাখিদের হাজার হাজার মাইল উড়িয়া যাওয়ার মধ্যে কী সাধনা আছে কে জানে, আর অত ঢাউস একটি তিমি স্রেফ প্লাস্টিক গিলিয়া মরিয়া গেল, ইহা তো ঠাণ্ডা মাথায় খুন, অথচ কেহ কাহাকেও ফাঁসিতে লটকাইবে না, কষ্টটিকে কষ্ট বলিয়া চিনিতে গেলেও একটা ধ্যান লাগে, অত সময় কই

সময় নাই সময় নাই বলিয়া একটি গাঢ় মন্থর ট্রেন চলিয়া যায়, লম্বা বিবর্ণ এক মালগাড়ি, দুধ ও তেল লোহা ও কয়লা গরু-মহিষ – সব কিছু পেটে পুরিয়া সে চলিয়াছে মাইলের পর মাইল, যুদ্ধ চলিলে যুদ্ধবন্দিদেরও লইয়া চলিত, এইভাবেই, সময় নাই সময় নাই বলিতে বলিতে, আসলে অবশ্য মালগাড়ি কিছুই বলিতেছে না, কোনও ট্রেনই কিছু বলে না, শ্রোতা যেমন শুনিতে চায় তেমনই বলে, কিন্তু শ্রোতা কী শুনিতে চায় সে টের পায় কীভাবে? সকলই শ্রোতার কুদরতি, যাহা সে শুনিতে চাহিবে তাহাই শুনিবে, তাহা হইলে কি অন্য কিছু বলিবার কোনও সুযোগ নাই? অপর কিছু? এক লাইন হইতে আর এক লাইনে গিয়া পড়িবার সময় কর্কশ আওয়াজ তুলিতে তুলিতে ভাবে রেলগাড়ি, সিমেন্ট-বালি-পাথর লোহা-কয়লা-তেল গরু-ভেড়া-উট – ভাবিতে থাকে সকলেই, সুযোগ নাই সুযোগ নাই? যুদ্ধবন্দিরাও ভাবে, মালগাড়িতে থাকুক না-থাকুক, শত শত অন্ধকার কুঠুরিতে কুঠুরিতে বসিয়া ভাবে – অন্য কিছু? অপর কিছু?

এত বুঝাইয়া বলিবার কী আছে, বকা লাগায় ফকির, তাহার ধুনি হইতে সুগন্ধী ধোঁয়া বাহির হইতেছে, শান্ত মসৃণ ধোঁয়াগুলি এ উহার গায়ে পড়িয়া কুণ্ডলী পাকাইয়া ক্রমেই ঢাকিয়া দিতেছে মনোহর দাড়ি শাহি গোঁফ, অস্পষ্ট হইয়া উঠিতেছে তাহার ধমক তাহার মুখ, বুঝাইবার কিছু নাই, সকলই স্পষ্ট, বাংলায় যাহাকে স্বচ্ছ বলে, ডুবসাঁতার দিয়া গভীরে তলাইয়া গেলেও সকলই দৃশ্যমান, আড়াল বলিয়া কিছু নাই, যে যেখানেই যাহা করুক সকলই দৃশ্যমান, যে বলিতে অবশ্য এখানে প্রকৃতিপুঞ্জের কথা, যাহারা প্রাকৃত ভাষায় কথা বলে, রাজারাজড়াদের আড়াল ভাঙিবে কে, সমস্ত গোপনীয়তা তাঁহাদের, সকল স্বাধীনতা তাঁহাদের, স্বাধীনতাহীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে, কেহই চায় না, যাহারা বাঁচিয়া নাই তাহাদের আবার আজাদির কথা উঠিতেছে কেন, তাহাদের লইয়া ঘনঘোর ভৌতিক কাহিনি ফাঁদিবার কথা ভাবিয়া দেখা যাইতে পারে, ধুনির ধোঁয়ায় মাথা ভরিয়া উঠিলে কাহিনি জমিবে ভালো

আকাশে কত না মেঘ ভাসিয়া বেড়াইতেছে, সবার সাথে কি সবার মোলাকাত হয়, মোলাকাত হইলেও হয়তো আড়ে আড়ে তাকাইয়া পাশ কাটাইয়া চলিয়া যায়, কদাচিৎ এ উহাকে স্পর্শ করে, জড়াইয়া ধরে, এ উহার গায়ে বৃষ্টি হইয়া ঝরিয়া যায়, মনেরই মতো, মনের মতো দুর্বোধ্য আর কী আছে, যে নিজেই নিজের দিশা পায় না, অন্য মন তাহার ভিতর নিজের প্রতিধ্বনি শুনিবে কীভাবে, শত শত মনকে ঘিরিয়া আছে শত শত মন, কে কাঁহাতক কাহার হদিশ রাখিবে, কী যে ক্লান্তিকর কাজ এই গোয়েন্দাগিরি, তবু কী যে এক অপ্রতিরোধ্য আকর্ষণে এক মনকে পড়িতে বসে আরেক মন, তাহাকে বিশ্লেষণ করে, তন্ন তন্ন করিয়া রপ্ত করে, কোনও মন এইসব কিছুই করে না, আপ্লুত হয়, সে বুঝি আর নিজেকেও বুঝিতে চাহে না, একটি সমর্পণের ভিতর দিয়া কেবলই নির্ভার হইতে চায়, বৃষ্টি চায়, বৃষ্টি হইতে চায় মন

পাহাড়ি পথে চলাফিরা করিবার হাজার ঝক্কি, কখন কোথায় ধ্বস নামিবে কে বলিতে পারে, পাথর গড়াইয়া ঘাড়ের উপর পড়িলে তো দফা রফা, নহিলে নির্ঘাত রাস্তা বন্ধ, তখন ধুত্তোর বলিয়া ফিরিয়া আসিতে গিয়া দেখা গেল সেদিকেও ধ্বস, রাস্তা সাফ হওয়া ইস্তক আটকাইয়া থাকা বিনা আর উপায় কী! আটকাইয়াই যখন পড়িতে হইল, সামনের দিকে চলাই ভালো, সামনের দিক বলিয়া অবশ্য কিছু নাই, ঘুরিয়া ঘুরিয়া পাক খাইয়া খাইয়া আগাইয়া যাওয়া, পথকে সঙ্গ দিতেছে থাকে থাকে নামিয়া-উঠিয়া-যাওয়া অনেক গাছ, অনেক ফুল ও প্রজাপতি, বাঁকে বাঁকে গর্জন করিয়া বহিয়া যাওয়া নদী, পাথরে পাথরে সাঁটিয়া-থাকা শ্যাওলা মশ ফার্ন আর আড়াল আবডালের পাখি, সামনের গাছের ডালে জবুথবু হইয়া বসিয়া থাকা ওই পাখিটির কথা শুনিয়া লওয়া যাক এই ফাঁকে, বৃষ্টিতে তুমুল ভিজিয়া তাহার মনে হইতেছে উড়িবার শক্তি নাই আর, গাছের কোটরে বসিয়া ডানা ঝাড়িয়া ঝাড়িয়া শরীর একটু শুকাইয়াছে বটে, কিন্তু আবার যদি বৃষ্টি নামে, তাই আর উড়িয়া কাজ নাই, পাখির কথা শুনিতে শুনিতে রাস্তার মেরামতি এদিকে প্রায় শেষ, মনে হয় এইবার  আবার যানবাহন চলিতে শুরু করিবে, আগানো যাক

লবণপানির ভিতর দিয়া তড়িৎপ্রবাহ চালাইলে, বারবার একই অম্ল আর ক্ষার উদ্গত হয়, তাই বলিয়া জীবনে অমন বারংবারতা ফিরিয়া ফিরিয়া আসে নাকি থোড়াই? রাস্তা প্রতিদিন লোপাট হইয়া যায়, আদৌ কোনও রাস্তা যে কোনওদিনও ছিল, কে হদিশ দিবে তাহার, প্রতিদিনই নতুন করিয়া দিকনির্ণয়, ঝোপঝাড় খানাখন্দ ভেদিয়া অন্ধ হামাগুড়ি, সে কি এক ধ্যান, সে কি শুধু নির্মাণশ্রমিকতা, হা হা, শব্দের ভিতর কত ইতর বিশেষ, কত একতলা দোতলা, যেন কূর্ম বহন করিতেছে পৃথিবী, অভ্যাসে আনন্দ নাই, আনন্দেরও অভ্যাস হয় নাকি! বিপরীতের মধ্যে ঐক্যের সূত্রটি যেন কী ছিল

কষ্টের প্রদর্শনী দিয়া সহানুভূতি আদায়ের চেষ্টা এক স্থূল ব্যাপার, কিন্তু কষ্টকে লাগে, তাই তাহাকে চিনিতেও লাগে, তবে বন্ধ কামরার ভিতর নয়, তাহাকে লইয়া বাহির হইতে হয় ভোরের আলো ফুটিবার ঠিক আগে খুব চুপি চুপি, মানুষের শব্দ শুরু হয় নাই বলিয়া পাখিরা সরব, তাহারা পৌঁছাইয়া দিতেছে জন্মান্তরের সংগীত, বাতাসে মেঘের ঘ্রাণ, ইহা একটি সমাপ্তিরও বিন্দু হইতে পারে, বা শুশ্রূষার…

গৌতম চৌধুরী’র জন্ম উত্তর প্রদেশের কানপুরে। তিনি বাংলা ভাষার একজন উল্লেখযোগ্য কবি।   প্রকাশিত কবিতার বই —
কলম্বাসের জাহাজ,হননমেরু্, পৌত্তলিক ,অমর সার্কাস ,চক্রব্যূহ ,নদীকথা, আমি আলো অন্ধকার,সাঁঝের আটচালা
আধপোড়া ইতিহাস,অক্ষর শরীরে মহামাত্রা পাব বলে ,নির্বাচিত কবিতা,আখেরি তামাশা ,ঐতরেয় ,উজানি কবিতা,ধ্যানী ও রঙ্গিলা,কলম্বাসের জাহাজ,বনপর্ব ,কে বলে ঈশ্বর গুপ্ত?বাক্যের সামান্য মায়া,রাক্ষসের গান,কবিতাসংগ্রহ, ইতস্তত কয়েক কদম,বাজিকর আর চাঁদবেণে। গদ্যর বই -গরুররচনা খেয়া:,এক রহস্যময় বিপরীতবিহারের ঝটিকালিপি্,বহুবচন, একবচন,সময়পরিধি ছুঁয়ে।নাটক—হননমেরু ।  অনুবাদ করেছেন – মোহন রাকেশের হিন্দি নাটক আষাঢ়ের এক দিন।
বিভিন্ন সময়ে সম্পাদনা করেছেন – অভিমান, যুক্তাক্ষর , কীর্তিনাশা  পত্রিকা ।

Leave A Reply