ঠেলব ইঁদুর দৌড়ে আবার সমালোচনাও করব

0

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়: গত এক বছরের পরিশ্রম। বই-খাতা নিয়ে লড়াই। খানিক ভয়, খানিক ক্লান্তি। সব কিছু পার করে রেজাল্ট সবে হাতে এসেছে জীবনের প্রথম বড় পরীক্ষার। এই মাধ্যমিক পরীক্ষা আদতে যতটা বড়, তার চেয়ে বেশি যেন জোর করে চাপিয়ে দেওয়া গুরুত্বের ভারে একটু বেশিই জুজু হয়ে ধরা দেয় বছর ১৫-১৬র কিশোর-কিশোরীদের কাছে।

এমনিতেই জুজুভয়, তার উপরে এ সময়ের অসুখ— নেতিবাচকতা। বস্তুত, এ সময়ে মত প্রকাশের এক ধারাই যেন হয়ে দাঁড়িয়েছে, যে কোনও বিষয়কে নেতিবাচকতার কাঁটা দিয়ে খানিক খোঁচাখুঁচি করা।

কোনও কিছুতেই যেন প্রথম দেখে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে প্রশংসা উপচে ওঠার অবকাশ নেই। দেখেএকটু থমকেমুহূর্তের মধ্যে বেশ বাছাই করা কিছু খুঁত খুঁজে বার করে, সেটাকে নেতিবাচকতার গরম তেলে ছেড়ে দেওয়াই যেন স্মার্টনেস। সে যত তড়পাবেতত মুচমুচে হবে আলোচনা।

রাজ্য জুড়ে অনেকগুলো ছোট ছোট মুখ আজই জীবনের প্রথম বড় পরীক্ষার ফলাফল জানতে পেরেছে। কেউ ভালকেউ খুব খারাপকেউ চলনসই,কেউ বা আশাতীত— মানে যেমন হওয়ার কথা আর কী! আর এর পরেই শুরু ছানবিন।

কেউ হয়তো বলছে দিনে পনেরো ঘণ্টা পড়তসঙ্গে সঙ্গে সমালোচনা— খেলত কখন!
কেউ হয়তো বলছে ছঘণ্টাতা হলে পাল্টা সংশয়—ঢপ মারার জায়গা পায়নিএটুকু পড়ে এত নম্বর!
কেউ যদি সহায়িকা পড়েছে, তা হলে তাচ্ছিল্যের সুর— এখনকার বাচ্চাদের কত সুবিধা!
কেউ যদি পড়েনি, তা হলে অবিশ্বাস— শুধু টেক্সট বই পড়ে এই রেজাল্ট হতেই পারে না!
কারও রেজাল্ট খারাপ হলে, এই সিলেবাস আর এই কোয়েশ্চেন প্যাটার্ন পেয়েও এত কম নম্বর!
কারও মারকাটারি রেজাল্ট হলে, হবে না কেনএ রকম সিলেবাস আর কোয়েশ্চেন প্যাটার্ন পেলে সবাই পারত।

আর এ সবের সঙ্গেই ভবিষ্যদ্বাণীআজকের ভাল নম্বর পেয়ে হাসিমুখে টেলিভিশন স্টুডিওয় এসে সাক্ষাৎকার দেওয়া ছেলেমেয়েগুলো দুবছর পরে নাকি হারিয়ে যাবেই! যেতেই হবে! শিক্ষাব্যবস্থায় গলদ আছে। আগেও ছিল। কিন্তু দিনের শেষে, আমরা কেউ সেই গলদের মেরামতি নিয়ে চিন্তিত নই,যতটা ব্যস্ত কচিমুখগুলোর সমালোচনা করতে। রেজাল্ট বেরোনোর প্রায় সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন প্রকাশনী আর সফল পরীক্ষার্থীদের নিয়ে অসংখ্য জোক, মিম, ট্রোল চলে এল সোশ্যাল মিডিয়ায়।

আচ্ছা, এত না ভেবে, এত না খেটে তো সিম্পলি হেসে পিঠ চাপড়ানো যেত ছেলে-মেয়েগুলোর, যেত না?

প্রশ্ন উঠবে, তা হলে কি সমালোচনা করা যাবে না?

আচ্ছাআমরা এমন একটা ব্যবস্থা তাদের এনে দিতে পেরেছি কিযেখানে তারা বাণিজ্যিক প্রকাশনী সংস্থার বিজ্ঞাপনী মুখ না হয়ে রুশ উপকথার মুখ হয়ে উঠবেআমরা কি পেরেছিশিক্ষার নামে রাজ্য জুড়ে চলা কোচিং-ব্যবসার কোনও বিকল্প তাদের এনে দিতে? আমরা পেরেছি কি, ইঁদুর দৌড়ে সামিল ছেলেমেয়েগুলোকে ডেকে একটু বিশ্রাম দিতে?

পারিনি।

তার পরেও আমরা সারা দিন সংবাদমাধ্যমে ওদের কথা শুনে, সেই কথা থেকে একটু করে খোরাক খুঁজে নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় সমালোচনা করলাম। আমরা কিন্তু পারিনিছবিশিকারিদের হাত থেকে ওদের বাঁচিয়ে বাবা-মা-শিক্ষকদের সঙ্গে ঘরোয়া মুহূর্ত উপহার দিতে। আমরা শুনতেই চেয়েছি ওদের কথা। আর শোনার পরে আক্ষেপ করেছি, কেন সবাই ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হবে! কেন চেনা পথের বাইরে হাঁটবে না!

কী করে হাঁটবেআমরা তো সেই কবে থেকে ওদের দুচোখে ডাক্তারি আর ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের দুটো ঠুলি পরিয়ে রেখেছি। শিখিয়েছিটাকা রোজগার করা আর বড় হওয়া সমার্থক।

আমরা আসলে একটা গতানুগতিক অন্ধকার টানেলে ওদের ছেড়ে দিয়েছি, যেখানে দৌড়োনো ছাড়া উপায় নেই। তার পরে আক্ষেপ করে বলেছি, ‘সবুজ মাঠে ছোটার মজাটা তোরা পেলি না।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

Leave A Reply

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More