বিজ্ঞান/ কলা দ্বন্দ্ব সমাস

0

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

Humanities teachers are like personal trainers in the gym of the mind 

 – Gayatri Chakravorty Spivak, Can There Be A Feminist World?

যশোধরা রায়চৌধুরী

আমি বিরাশি সালে মাধ্যমিক পাশ করি। তখন তো স্টার পাওয়া লেটার পাওয়া ইত্যাদি নিয়ে খুব লাফালাফি হত। এখন যেমন প্রচুর নব্বই অতিক্রান্ত নম্বর ওঠে তখন সেটা কল্পনার ও বাইরে ছিল। আশি পেলেই তুমি দারুণ হিরো সেই বিষয়ে। আর স্টার ছিল বোধ হয় সর্বমোট নম্বরে পঁচাত্তর অতিক্রম করা।

তা আমি স্টার পেয়েছিলাম আর দু তিনটে বিষয়ে লেটার। এখন আর মনে নেই। তুচ্ছ অনেক জিনিসের মতো কালের গহবরে হারিয়ে গেছে। মাধ্যমিকের আগে পরে মাধ্যমিকের নম্বর, উচ্চমাধ্যমিকের আগে পরে উচ্চমাধ্যমিকের নম্বর ঠিক যতটাই গুরুত্বপূর্ণ থাকে ছেলেমেয়েদের কাছে, পরবর্তী জীবনে ততটাই অর্থহীন হয়। এটাই শিক্ষা নম্বর এক।

আমার রেজাল্টে চারপাশের লোকেরা বলেছিল, বাহ বেশ বেশ, তাহলে সায়েন্স তো পড়বেই। যারা বলেছিল তারা কেউই খুব কাছের লোক না। তবুও তাদের কথা আমাদের জীবনে ম্যাটার করে। এই সব লোকেরাই হঠাৎ উদয় হয়ে বলে যায় কোন স্কুলে পড়া উচিত বা কবে বিয়ে করা উচিত। মামার শ্যালক বা ন’মাসির ভাশুরপো।

আমার ক্ষেত্রে সায়েন্স না আর্টস, প্রশ্নটা এক বিশেষ তীব্রতার সঙ্গে অবশ্য উদয় হয়েছিল। বলা যায় জীবন মরণ সমস্যার মতো। কারণ বাড়িতেই মজুত বিজ্ঞানে ইতিমধ্যেই চূড়ান্ত ভাল ফল করা আমার দিদিটি। উচ্চমাধ্যমিকে বিজ্ঞানে ও তারপরে অঙ্কে,  আমার দিদি এক ব্রিলিয়ান্ট রেজাল্ট ধারী। আমার থেকে অ্যাকাডেমিকালি ছ’বছরের বড়। মানে আমি যখন মাধ্যমিক সে তখন এমএসসি । প্রবল পরাক্রান্ত অ্যাপ্লায়েড ম্যাথসশাস্ত্রে । সারাদিন অঙ্ক গুলে খায়, আমাকে মাঝে মাঝে বোঝানোর চেষ্টাও করে সেই তত্ত্বকথা।  গুচ্ছ গুচ্ছ থান ইঁটের মতো বই ছড়িয়ে পড়াশুনো করে। মাঝে মাঝে বই মাথায় দিয়ে ঘুমিয়েও পড়ে। ও বলে বইগুলোর ভেতর দিয়ে ওর মাথার মধ্যে অঙ্ক চলে যাচ্ছে।

আমার মা তাড়া তাড়া খাতা জোগান দিতে দিতে ক্লান্ত, রেশনে তখন বঙ্গলিপি খাতা দিত, তাতেও কুলোয় না। সুতরাং মা সূর্য সেন স্ট্রিটের ছাপাই বাঁধাই ওয়ালাদের থেকে সস্তায় রিম রিম কাগজ কিনে আনতেন এবং আমরা গুণসূচ আর মোটা সুতলির সুতো দিয়ে সেলাই করে এইয়া এইয়া এক এক তাড়া খাতা বানাতাম।  মূলত দিদির অঙ্ক কষার জন্যই খাতা লাগে। দিদির এক স্যার স্লেটে অঙ্ক করতেন। কাগজের অপচয় এড়াতে। তো, দিদি অতটুকু স্লেটে মুছে মুছে অঙ্ক করার চেষ্টা কিছুদিন করে ক্লান্ত। বিশেষত প্রতিবার স্লেট মোছা কাপড়টা শুকিয়ে গেলে আমাকে ভিজিয়ে আনতে বলত বলে আরো বেশি ক্লান্ত আমি। একদিন হিন্দি ছবির স্টাইলে ইনকার করে দিলাম এসব কাজ।

আরও পড়ুন : আর্টস পড়লে এত জবাবদিহি করতে হবে কেন?

এ হেন অঙ্ক কষা দিদি বাড়িতে থাকলে ফিজিক্স অঙ্ক ইত্যাদি তোমার বইতে পড়তে যত ভালই লাগুক না কেন, যদি তুমিও বিজ্ঞান শাখাটি অবলম্বন কর, হে নরশাবক, ভবিষ্যৎ জীবনের পথরেখা হিসেবে দিদির মতো উদাহরণের সঙ্গে পদে পদে তুলনা করা হবে তোমাকে, জেনেই রাখ।

তুলনা প্রতিতুলনা ইত্যাদি এড়াতে চাইলে, শাখামৃগ হিসেবে কোন কোন শাখায় তুমি বিচরণ করবে, ক্লাস টেনের পর সেইটা তোমাকে খুব মন দিয়ে ভেবে নিতে হবে। ওপরের ওপরের শাখায় বিখ্যাত পড়ুয়া মামাতো পিসতুতো দাদা ও দিদির, এবং বাঘের ঘরে ঘোগের বাসার মতো এক এক দিদির বিচরণ, এগুলো জীবনের পক্ষে মোটেই আনন্দজনক না। সুতরাং আমার বিজ্ঞান শাখাতেও ইনকার!!!

তাছাড়া আমার কাছে বারান্দায় দাঁড়িয়ে রাস্তা দেখা, ফুচকা খাওয়া, গপ্পো বই পড়া,  রেডিওতে গান শোনা, এবং গোপন খাতায় কবিতা লেখা ইত্যাদি শখের আলাদা আদর আছে। সবচেয়ে বড় আদর আমার “ফাঁকি দেওয়া” নামক হবিটির। যার অন্য নাম ডে ড্রিমিং অথবা আকাশ কুসুম রচনা করা। মানে সোজা বাংলায় হাঁ করে ছাতের দিকে তাকিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা কাটানো। ডায়েরি লেখা ভাল লাগে। ভাল লাগে একটা কালো পড়ে পাওয়া ডায়েরির খাতায় একের পর এক পড়া প্রিয় কবিতা বা গানের লিরিক টুকে রাখা।

অবধারিত ভাবে মাধ্যমিকের পর, দিদির থেকে শতহস্ত দূরে থাকতে চেয়ে, এবং নিজের এই কল্পনাপ্রবণ উড়ু উড়ু অন্তরাত্মা কা আওয়াজ শ্রবণে,  আমার শাখাবদল। আমি আর্টস পড়ব। গোঁ ধরলাম। মা নিম পাতা খাওয়া মুখ করলেও মেনে নিলেন। শুধু আমাকে অঙ্ক রাখতে বললেন, পরে যাতে অর্থনীতি বা রাশিতত্ত্ব বা অন্য আরো কোন কোন তা-বড় তা-বড়  বিষয়ের দরজা বন্ধ না হয়। আমি সেইটুকু ছাড় দিলাম। যদিও মাথা গরম হয়ে গেছিল যখন শুনেছি মা কালো কোলাব্যাঙ টাইপ দেখতে ফোনটা নিয়ে বসে একে একে আত্মীয় আত্মীয়াদের বলছেন, ও তো সায়েন্স পড়ার মতোই রেজাল্ট করেছিল, তবু আর্টস পড়বে বলছে। আসলে নিজের পছন্দের ব্যাপার, আমি আর কিছু বলছি না।

এইভাবে আমি ইলেভেন টুয়েলভে দর্শন ভূগোল সংস্কৃত ও অঙ্ক নিয়ে ভর্তি হলাম। অঙ্ক নিয়ে আমার বিশেষ আপত্তি ছিল না কারণ অঙ্ক কষতে তখন আমার ভাল লাগে। মূলত অ্যালজেব্রা্র ওই কাল্পনিক ‘এক্স’টি আমার প্রিয় বিষয়। ইলেভেন টুয়েল্ভে যখন ক্যালকুলাসের আমদানি হল আমার আরো বেশি বেশি করে ভাল লেগে গেল অঙ্ক। কো অর্ডিনেট জিওমেট্রিতে আবার এক্স ওয়াই দুজনে নাচানাচি করে। ট্রিগনোমেট্রি , সরল দোলগতি ইত্যাদিও দিব্য। কাজেই নিজের আনন্দ এবং বাড়িতে সবার “অন্তত অঙ্কটা রেখেছে” বলে হাঁফ ছাড়া… আর মনের মধ্যে এক তুমুল বিজয়োল্লাস, ব্যাস আর দুবছর তারপরই দিদির পাল্লা থেকে অনেক দূরে আমি। আর আমাকে পায় কে।

টুয়েলভের পরীক্ষার পর অন্য লড়াই শুরু হল। মা বললেন সংস্কৃত পড়তে। আমি বললাম দর্শন পড়ব। তা নিয়েও কম টেনশন হয়নি বাড়িতে। শেষমেশ আমার মতো জয়ী হল। প্রেসিডেন্সিতে দর্শন পড়লাম।  তারপর একদিন সব পড়াশুনো, পরীক্ষা দেওয়ার শেষে, যখন মনে হল মুক্তি, তখনই দেখলাম আসলে পড়ার শেষ নেই, আর পরীক্ষারও না। একের পর এক পরীক্ষা আমরা দিয়েই চলছি… আজীবন। চাকরির পরীক্ষাতেও আবার রাশিবিজ্ঞান অর্থনীতি ইতিহাস ভূগোল রাষ্ট্রবিজ্ঞান এসে ঘাড়ে চেপেছে “জেনেরাল স্টাডিজ” এর নাম করে… পড়তে হয়েছে , হয় কত না হিসেব, কত না ফরমুলা খতিয়ে দেখতে হয়। জটিল অঙ্কের জালে ডুবে যেতে হয়। সব শাখা ঘেঁটেঘুঁটে যায় ক্রমাগত। একটা বয়সের পর বোঝা যায়, এই শাখা বিষয়টাই কেমন যেন এক পেশে।

তাহলে কেন এই শাখা বাছার খেলা?  প্রত্যেকের এই একটা বয়সে এসে বিভ্রান্ত হওয়া। যখন ১৬-১৭ বছর বয়স এমনিতেই ভীষণ বিভ্রান্তিকর, কারণ শরীরের ভেতরেও তখন শুরু হয়েছে নানা হরমোনের খেলাধুলো, মন অনেকের উড়ু উড়ু, অনেকেই নিজের সব কামনা বাসনা চেপে শুধু বিদ্যাদেবীর আরাধনা করতে হবে ভেবে শহিদ হয়ে যাচ্ছে ক্রমাগত, ভাল ছেলে বা ভাল মেয়ের খোলস চেপে বসেছে মনে শরীরে, দাঁতে দাঁত চেপে কটা বছর উতরে দিতে কেউ না কেউ বদ্ধপরিকর, আবার কেউ কেউ তারই ভেতর অসম্ভব আনন্দ পেয়ে গেছে লাবডুব, অলিন্দ নিলয়, লাল রক্ত নীল রক্তের ছবি দেওয়া হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া অধ্যয়নে, কেউ বা চূড়ান্ত উত্তেজিত হচ্ছে জৈব রসায়নের কার্বন শৃংখলের দুই চার ছয়ের অঙ্ক খেলায়। কেউ বা পদার্থবিদ্যার ধাতু অধাতুর টেবিলে মাতোয়ারা। এইসব বিদ্যেপাগলামির ফাঁকে ফাঁকেও অন্য কেউ কেউ মাতোয়ারা হতেই পারে কোন আরো বিমূর্ত, অধরা, অদ্ভুত বিষয়ে, সাইকোলজি ভাবলেই উৎসুক হয়ে পড়তে পারে মানুষ কেন পাগল হয় জানতে, অথবা অর্থনীতির কোন সরলীকৃত তত্ত্ব, চাহিদার স্থিতিস্থাপকতার কথা,  কাগজে পড়ে ভাবতেই পারে, চাহিদা কমে গেলে মূল্য কমে যায়, এই একই তত্ত্ব তো অ্যাপ্লাই করাই যায় জীবনের যে কোন ক্ষেত্রে, এই যেমন মেয়েদের কেন ছেলেদের ভাল লাগে, ওরা অন্যরকম বলে আর ওদের সঙ্গে বেশি বেশি মেশা যায় না বলে, কিন্তু যদি রোজ দেখা হত, রোজ উঠতে বসতে হত মেয়েদের সঙ্গে তাহলে কি এতটাই …

কেউ ভাবতে পারে গান নিয়ে, কেউ গানের লিরিক নিয়ে বেগানা হতে পারে, কারুর বৃষ্টি পড়লে শেক্সপিয়ার পেতে পারে, আর কারুর জীবনানন্দ পায় আঁধার রাতে একলা থাকলে…।

কিন্তু তাও, এ কথা তো ঠিক, যে আমরা ভুল করি, করেই থাকি। সবসময়ে বুঝতে পারি কি, নিজে কোন বিষয়টা সবচেয়ে ভালবাসি? অথবা কোনো একটা বিষয় সম্বন্ধে আমার অ্যাপটিচিউড, বা স্বাভাবিক প্রবণতা জনিত দক্ষতা, কতটা, তা অবলীলাক্রমে বলে দেবে এমন কোন পরীক্ষা বা কোন যন্ত্র আদৌ আছে কি?

নানাভাবে পড়াশুনোর সঙ্গে সম্পর্কিত হতেই পারে ছেলেমেয়েরা। ইস্কুলের, লাইব্রেরির, দাদাদিদি, শিক্ষক শিক্ষিকার কাজ এই ভালবাসার সুতোটা ধরিয়ে দেওয়া শুধু। অথচ, সেই সম্পর্ক তৈরি করতে সাহায্য না করে, বাবা মা মাসি পিসি উঠে পড়ে লাগেন নিদান দিতে। ভালবেসে নাটক, অথব সিনেমা বুঝিয়ে না দিয়ে, বলেন পড়ো পড়ো পড়ো। সায়ন্স পড়ো।  মায়ের কোন এক দিদির কোন এক দেওরের তোয়াক্কা বেশি করা হয় বাড়ির ছেলেটি বা মেয়েটির চেয়ে। তোমার মতের মূল্যর থেকে বেশি মূল্য দেওয়া হয় অমুক স্যার বা তমুক জ্যাঠামশাইকে। তোমার ভালবাসার বিষয়এর থেকে বেশি জরুরি ভাবা হয় চাকরির বাজারে এখন অমুক সাবজেক্টটা ভাল যাচ্ছে-র থিওরি। এই সব মিলিয়ে যেটা হয় সেটা হল জোর জবরদস্তি। নিজের মন বুঝতে না পেরে অন্যের কথায় কোনও একটা সাবজেক্টে নাম লেখানো। অনেক সময় নিজের পছন্দের বিষয় পছন্দের কলেজে না পাওয়ার ফলে অপছন্দের বিষয় নিয়ে নামকরা কলেজে পড়তে বাধ্য হয় অনেকে। সিট নিয়ে কাড়াকাড়ি যেখানে এতটাই, চয়েস কমে যায়। এও এক বিরাট বিপদের দিক।

অনেকটা ছড়িয়ে যাচ্ছি। ছাড়িয়ে যাচ্ছি যা নিয়ে লিখতে শুরু করেছিলাম সেই কথা। মজার ঢঙে বললেও, আসলে আমি বলতে চাই এই কথাটাই, যে, ভাল নম্বর পেয়েছ মাধ্যমিকে, তাই তুমি সায়েন্স পড়বে, এটা যুক্তিহীন কথা তো বটেই, আর চাপিয়ে দেওয়া কথাও। এর পেছনে আসলে আছে সমাজের সেই অযৌক্তিক অর্থগৃধ্নু মানসিকতা। সায়েন্স পড়, তারপর ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ারিং পড়, তারপর রাশি রাশি টাকা কামাও। তবেই তুমি সফল । সফল ইজ ইকুয়াল টু টাকাপয়সা, এটাই সমাজের প্রথম ও শেষ কথা।

এইবার এই কথাটা ভাঙতে গেলে যে যুক্তি দরকার সেটা হল, হাতে গুণে দেখিয়ে দেওয়া, যে ওই ডাক্তারি বা ইঞ্জিনিয়ারিং পড়লে ভাল চাকরি হয়, এটা ভারতের অর্থনীতির একটা পর্বের সত্য, এখন আরো অসংখ্য এইরকম টেকনিকাল ডিগ্রি বা কোর্স হয়েছে যা পড়লে ভাল চাকরি হয়, যথা আইন (পেশাগত ভাবে আইনজীবীর বহুযুগ আগে কদর ছিল, আবার নতুন করে প্রচুর কদর হয়েছে), যথা ফার্মাসি, যথা ট্রাভেল টুরিজম, ফ্যাশন টেকনোলজি ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি। ফর্দটা লম্বা করা নিষ্প্রয়োজন।

দ্বিতীয় যুক্তি, দেখিয়ে দেওয়া যে, নিজের পছন্দের বিষয়, পিওর আর্টস, লিবারাল আর্টস, ইতিহাস, সাহিত্য পড়েও কত কত সফল, অর্থনৈতিকভাবে সফল, ব্যক্তি আছেন পৃথিবীতে। আমার নিজের উদাহরণ হিসেবে বলি, সর্ব ভারতীয় সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় প্রচুর ডাক্তার ইঞ্জিনিয়াররা আসছে যেমন, আমি বা আমার অনেক বন্ধুবান্ধব তো বিশুদ্ধ কলাবিভাগের ছাত্রছাত্রী হয়েই এই পরীক্ষায় বসেছি এবং কোয়ালিফাই করে চাকরি পেয়েছি। পশ্চিমবঙ্গ সিভিল সার্ভিস (ডব্লিউবিসিএস) থেকে শুরু করে আরো অনেক কম্পিটিটিভ পরীক্ষায় আর্টসের স্নাতকেরা হৈ হৈ করে ঝাঁপাচ্ছে। ঝাঁপায়। শুধু সেদিকে আলো ফেলার অভ্যাস নেই আমাদের। প্রতিষ্ঠিত হতে হয়ত সময় লাগে, ইঞ্জিনিয়ারিং এর মতো ক্যাম্পাস থেকে চাকরি মেলে না। নিজের বিশ্বাসে অটল থেকে , নিজের মতো করে পড়াশুনোগুলো চালিয়ে গেলে, এবং সাফল্যকে পাখির চোখ না করে, বিষয়ে “এক্সেলেন্স” বা উৎকর্ষকে পাখির চোখ করলে, অধৈর্য না হলে, আর ভেতর থেকে বিষয়টাকে (এ ক্ষেত্রে কলা/ হিউম্যানিটিজ) ভালবাসলে, কেউ রুখতে পারবে না।

আর হ্যাঁ, নিজেকে ভাল প্রমাণ করতে হলে, অন্য কে ছোট করতে হয়না। আমি হিউম্যানিটিজ ভালবাসি তাই যারা সায়েন্স পড়ে তারা সবাই শুধুই পড়ছে, কেউ ভাবছে না, অথবা যারা ইঞ্জিনিয়ারিং এর প্রস্তুতি নিচ্ছে তারা কেউ গান বাজনা কবিতা বুঝবে না এমন ভাবার কারণ নেই। আসলে অন্যকে নিরেট ভাবা নিজেরই নিরেট, বোকা বুদ্ধির পরিচায়ক। যেভাবে যারা সায়েন্স পড়ে তারা খিল্লি করছে আর্টসের ৯৯৯ পাওয়া ছাত্রছাত্রীদের : আমরা মোটা মোটা বই পড়ে কুলিয়ে উঠতে পারিনা, আর আর্টসের বইগুলোর ত সরু সরু চেহারা।  মাত্র কয়েক পাতা পড়েই তোমরা নব্বই পেলে, আমরা কোথায় যাই?

ইদানীং হিউম্যানিটিসে যে পরিমাণ নম্বর উঠতে শুরু করেছে, সত্যিই সেটা আগে ছিল না। আর মাত্র দুশো পাতার বইয়ের বিষয়  ঠিকমতো বুঝে উঠতেও ত মাথার ভেতরে অনেক মাইল পথ হাঁটতে হতেই পারে। অনেক ব্যায়াম, অনেক কসরত জরুরি হতেই পারে।

এই বিশ্বাসটা থাকা দরকার আগে নিজের, যে হিউম্যানিটিজেও মানসিক কসরত কম হয় না। তারপর সে কথাটা অন্যদের সেই বিশ্বাসের জায়গা থেকেই বলতে পারতে হবে। তবেই কেল্লাফতে।

[যশোধরা রায়চৌধুরী বাংলা ভাষার একজন উল্লেখযোগ্য কবি। দর্শন বিষয়ে স্নাতকোত্তর  প্রেসিডেন্সি / কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। কেন্দ্রীয় সরকারে অডিট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টস সার্ভিসে কর্মরত। কর্মসূত্রে সারা ভারতের বিভিন্ন অংশে বসবাস। কবিতার পাশাপাশি প্রবন্ধ নিবন্ধ ও গল্প উপন্যাস ছাপা হয়েছে কৃত্তিবাস, দেশ , কালপ্রতিমা, প্রমা , আজকাল প্রভৃতি পত্রপত্রিকায়। পেয়েছেন কৃত্তিবাস পুরস্কার, বাংলা আকাদেমির অনিতা-সুনীলকুমার বসু পুরস্কার এবং সাহিত্য সেতু পুরস্কার , তা ছাড়া বর্ণপরিচয় সাহিত্য সম্মান । প্রকাশিত কবিতার বই চোদ্দটি, গল্পগ্রন্থ চারটি, নভেলা একটি। অনুবাদ করেন মূল ফরাসি ভাষা থেকে, অনূদিত বই লিওনার্দো দাভিঞ্চি (আনন্দ)।] 

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Leave A Reply

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More