‘বাচ্চাকে যখন কেড়ে নিল, মনে হচ্ছিল মরেই যাব’

0

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    দ্য ওয়াল ব্যুরো: সবে সীমান্তে পা রেখেছিলেন তাঁরা। আশঙ্কা, আতঙ্ক সবই ছিল। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি যে ঠিক কতটা খারাপ, তা নিয়ে সম্যক ধারণা ছিল না মোটেই। তাই ভাল করে কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঝড় বয়ে গেল যেন। তড়িঘড়ি বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হল কোলের শিশুদের। আর তাঁদের গায়ে চাপানো হল কয়েদীর নীল পোশাক। সেই অবস্থায় বেআইনি অনুপ্রবেশের দায়ে তাঁরা বন্দি হয়ে গেলেন ডিটেনশন শিবিরে। জানতেও পারলেন না, সঙ্গের শিশুরা কোথায় গেল! এক শরণার্থীর কথায়, “বাচ্চাকে যখন কেড়ে নিল, আমার মনে হচ্ছিল মরেই যাব।”

    ও দিকে, টেক্সাসেই আলাদা ডিটেনশন ক্যাম্পে রয়ে গেল সেই শিশুরা। বিচ্ছিন্ন, একা, সন্ত্রস্ত, ভীত। বুঝতেই পারল না, কী তাদের অপরাধ। জানতেই পারল না, আজ থেকে তাদের সঙ্গে জুড়ে গেল ‘শরণার্থী’ ট্যাগ! আর সন্তানের থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার যন্ত্রণায়, আতঙ্কে সিঁটিয়ে রইলেন তাদের মা-বাবা।

    ডিটেনশন শিবিরে শরণার্থী শিশুরা

    শেষমেশ বদল হতে চলেছে এই অমানবিক পরিস্থিতির। শরণার্থী শিশুদের আর বিচ্ছিন্ন করা হবে না মা-বাবার থেকে। অবশেষে ঘোষণা ট্রাম্প-প্রশাসনের। কয়েক দিন আগের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কাঠিন্যে স্পষ্টই নরম প্রলেপ পড়ল এই ঘোষণায়। এর কারণ শরণার্থী শিশুদের প্রতি ফার্স্ট লেডির সংবেদনশীলতা, নাকি রাজনৈতিক অবস্থানে কিছু সুবিধা পাওয়া, তা নিয়ে জল্পনাও চলছে।

    আমেরিকা শরণার্থীদের মুক্তাঞ্চল নয়। এক জন বেআইনি অনুপ্রবেশকারীকেও রেহাই দেওয়া হবে না। সম্প্রতি শরণার্থী-সমস্যার মুখে এই ‘জিরো টলারেন্স’ অভিবাসন নীতির কথাই সদম্ভে ঘোষণা করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

    শুধু তা-ই নয়, এই নীতির প্রয়োগে গ্রেফতারও হয়েছে বহু পরিবার। আর সেই সব পরিবারের শিশুদের কার্যত বন্দি করে রাখা হয়েছে টেক্সাসের কয়েকটি ডিটেনশন শিবিরে। সেখানে মেঝেতে দলা পাকিয়ে শুয়ে থাকা অসংখ্য শিশুর ছবিও ইতিমধ্যেই দেখেছে ডিজিটাল দুনিয়া।

    টেক্সাসের ম্যাকালেনে অবস্থিত তেমনই একটি শিবিরে কয়েক ঘণ্টা ছিলেন মেলানিয়া। তিনি জানান, তিনি নিজের চোখে সব দেখতে চেয়েছিলেন। পরিবারের পুনর্মিলন সমর্থন করেন তিনি। মনে করেন, শিশুদের তাদের পরিবারের সঙ্গে থাকাটা গুরুত্বপূর্ণ।

    পরিদর্শনের পরে অভিবাসী আটক কেন্দ্রের কর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে বসে এ দিন ফার্স্ট লেডি প্রশ্ন ছুড়ে দেন- এই শিশুদের যত দ্রুত সম্ভব তাদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিতে তিনি কি করতে পারেন?

    শরণার্থী শিবির পরিদর্শনে যাচ্ছেন ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প

    এই ‘অমানবিক’ নীতির বিরুদ্ধে ফার্স্ট লেডি মেলানিয়ার মতোই মুখ খুলেছেন ট্রাম্পের কন্যা, মার্কিন ফার্স্ট ডটার ইভাঙ্কাও। এই সঙ্কটে দ্রুত ইতি টানতে বলেছেন তিনি। সরব ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী টেরেসা মে এবং পোপ ফ্রান্সিস। চুপ বসে নেই তথ্যপ্রযুক্তি দুনিয়াও। সিইও সত্য নাদেলার সঙ্গে মাইক্রোসফ্টের একশো কর্মী মার্কিন সীমান্ত নজরদারি সংস্থার (বর্ডার পেট্রল) সঙ্গে কাজ করবেন না বলে সই করেছেন চিঠিতে। শরণার্থী শিশুকে বিচ্ছিন্ন করে রাখার নীতি কোনও ভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়— এ কথা লিখে মাইক্রোসফ্টের কর্মীরা জানান, অনৈতিক কাজে তাঁরা থাকতে চান না। নাদেলাও তাঁর ব্লগে লিখেছেন, “এই ঘৃণ্য নীতির প্রয়োগে আমি ব্যথিত। এক জন বাবা এবং অভিবাসী হিসেবে বলছি, এই নীতি নিষ্ঠুর, আপত্তিকর। পরিবর্তন চাই। তাই স্পষ্ট জানাচ্ছি— সীমান্তে শরণার্থী শিশুকে তার পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করতে মার্কিন সরকারের যে প্রকল্প রয়েছে, তাতে কাজ করবে না মাইক্রোসফ্‌ট।”

    নীতির বিরুদ্ধে সরব গুগলের সিইও এবং আর এক ভারতীয় বংশোদ্ভুত সুন্দর পিচাইও। তিনি টুইট করেছেন, ‘‘সীমান্তে পরিবারগুলোর বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার ছবি এবং খবর দেখে বিপর্যস্ত লাগছে। সরকারকে অনুরোধ, আরও মানবিক ও উন্নততর সমাধান খুঁজে বার করা হোক।’’ অ্যাপল কর্ণধার টিম কুক বলেছেন, ‘‘ছবিগুলো মর্মান্তিক। বাচ্চারা সব চেয়ে স্পর্শকাতর। যা হচ্ছে, সেটা অমানবিক। এটা বন্ধ হওয়া দরকার।’’ ফেসবুক প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জ়ুকারবার্গের মন্তব্য, “এই মুহূর্তে এই নীতি বন্ধ করা উচিত।” আপত্তি জানিয়ে পোপ ফ্রান্সিস বলেন, “বাচ্চাদের বাবা-মায়ের থেকে আলাদা করে দেওয়া অনৈতিক। সস্তা জনপ্রিয়তা এর সমাধান নয়।”

    এর পরেই ট্রাম্প জানিয়ে দিলেন, আর কোনও শরণার্থী শিশুকে তাদের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করা হবে না। কিন্তু ট্রাম্পের এই ‘মানবিক’ সিদ্ধান্তের পরেও প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে একটাই। যারা ইতিমধ্যেই বিচ্ছিন্ন হয়ে শিবিরে আটকে রয়েছে, তারা কী ভাবে ফিরবে? দেশের বিভিন্ন ফেডেরাল এজেন্সিকে এই বিষয়ে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

    তবে, এখনও স্পষ্ট নয়, কত দিনের মধ্যে টেক্সাস সীমান্তের ওই বিচ্ছিন্ন শিশুদের ফিরিয়ে দেওয়া হবে তাদের মা, বাবাদের কাছে। আর যেহেতু অনুপ্রবেশের দায়ে তাদের মা, বাবাদের গ্রেফতার করেছে ট্রাম্প প্রশাসন, তাই কী ভাবেই বা ওই শিশুদের তাদের পরিবারে ফিরিয়ে দেওয়া হবে, হোয়াইট হাউসের তরফে তা-ও খোলসা করা হয়নি।

    টাইম ম্যাগাজ়িনের প্রচ্ছদ

    এর মধ্যেই দেশ জুড়ে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে সমালোচনায় আগুন জুগিয়েছে বিখ্যাত মার্কিন ম্যাগাজ়িন ‘টাইম’-এর সাম্প্রতিক সংখ্যার প্রচ্ছদ।

    সেখানে দেখা যায়, একটি খুদে শিশু কাঁদছে। মাকে খুঁজছে সে। তার সামনে দাঁড়ানো বিশাল অবয়বের এক লম্বা-চওড়া ব্যক্তি। স্যুট-টাই পরা কেতাদুরস্ত ব্যক্তিটির অনেক ক্ষমতা, তাঁর নাম ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি অবশ্য ছোট্ট হুন্ডুরান শিশুটির দিকে নির্বিকার ভাবে তাকিয়ে আছেন। তার মুখে কোনও অভিব্যক্তি নেই। ছবিটির ক্যাপশনে লেখা, আমেরিকায় স্বাগত।

    আলোকচিত্রী জন মুরের এই ছবি প্রকাশিত হওয়ার পরেই হন্ডুরাসের ডেনিস জেভিয়ার ভ্যারেলা হারনানডেজ় নামের এক ব্যক্তি চিনতে পারেন নিজের মেয়ে, দু’বছরের ইয়ানেলাকে। তাঁর স্ত্রী কয়েক দিন আগেই মেয়েকে নিয়ে আমেরিকা গিয়েছিলেন। আশঙ্কা করেন তাঁর মেয়েকেও আলাদা করে দেওয়া হয়েছে মায়ের থেকে। কিন্তু ডেনিস খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, এমনটা হয়নি। ছোট্ট ইয়ানেলাকে সঙ্গে নিয়েই টেক্সাসের শিবিরে আটক করা হয়েছে তাঁর স্ত্রী, ৩২ বছরের স্যান্ড্রা সানচেজ়কে।

    আলোকচিত্রী জন মুরের তোলা আসল ছবিটি

    টাইম ম্যাগাজ়িনের তরফে জানানো হয়েছে, যে আলোকচিত্রী জন মুরও জানিয়েছেন, টেক্সাস সীমান্তের উপকূলে একা দাঁড়িয়ে কাঁদতে থাকা ওই শিশুর ছবি তোলার পরেই তিনি দেখেন, তার মা এসে তাকে কোলে তুলেছেন।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Leave A Reply

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More