বৃহস্পতিবার, জুন ২৭

প্রতিবন্ধকতার পাহাড় টপকে, উচ্চমাধ্যমিকে ‘স্পেশ্যাল’ জয় অদ্রীজার

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়: উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে গেল অদ্রীজা। ৬০ শতাংশ নম্বর নিয়ে। অথচ এই অদ্রীজাকেই ক্লাস সেভেনে উঠে স্কুল ছাড়তে হয়েছিল। অনেক লড়াই করে অ্যাডমিশন নিতে হয়েছিল ওপেন স্কুলে।

“এই স্কুলে ওর পক্ষে সম্ভব হবে না পড়া। ও অনেকটা পিছিয়ে পড়েছে। ওর পক্ষে সম্ভব নয় এই স্কুলের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া। আপনারা অন্য ব্যবস্থা করুক। অন্য কোনও কিছু ভাবুন। পড়াশোনা আর কত দূরই বা করবে!”– এই কথাগুলোই সে দিন অদ্রীজার বাবাকে সাফ বলেছিলেন স্কুল কর্তৃপক্ষ। শিয়ালদহের সেই অভিজাত স্কুলের তরফে গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি অদ্রীজাকে। তাঁদের মনে হয়েছিল, অদ্রীজার মতো মেয়েদের মূলধারায় পড়াশোনা করে সফল হওয়া সম্ভব নয়।

বই-খাতার জগতে অদ্রীজা

হবে না-ই বা কেন, অদ্রীজা তো ‘অ্যাবনর্ম্যাল’।

সাধারণত মানবশরীরের কোষে ২৩ জোড়া অর্থাৎ ৪৬টা ক্রোমোজ়োম থাকে। সে জায়গায় যাদের একটা বেশি, অর্থাৎ ৪৭টা ক্রোমোজ়োম থাকে, চিকিৎসার পরিভাষায় তারা ‘ডাউন সিনড্রোম’-এ আক্রান্ত হয়। এটা কোনও অসুখ নয়, অসামঞ্জস্য বলা যেতে পারে। প্রতি ৫০০ থেকে ৭০০ শিশুর মধ্যে এক জন, এমন একটি ক্রোমোজ়োম বেশি নিয়ে জন্মায়।

বস্তুত, এই একটি অতিরিক্ত ক্রোমোজ়োমই যত অসামঞ্জস্যের কারণ। প্রকৃতির খেয়ালে ঘটে যায় এই অনিয়ম, যার কারণে শারীরিক ও মানসিক ভাবে নানা ধরনের জেনেটিক ত্রুটি দেখা যায় এদের। এদের শরীরের পেশিগুলি শিথিল হয়, উচ্চতা বাড়ে না। হাঁটাচলা ধীর হয়ে যায়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মঙ্গোলিয়ান ধাঁচ চলে আসে মুখের। মানসিক বয়সও অনেকটা পিছিয়ে থাকে শরীরের বয়সের তুলনায়। কারও জিভ বার হয়ে থাকে, লালা পড়ে, কথাবার্তা স্পষ্ট হয় না। মাঝেমধ্যেই অসংলগ্ন আচরণ করে। এমনকী হিংসাত্মকও হয়ে পড়ে।

অদ্রীজাও ঠিক এমনই। বছর দেড়েক বয়স থেকেই ধরা পড়ে ওর নানা রকম সমস্যা। পরীক্ষা করে ধরা পড়ে ‘ডাউন সিনড্রোম’। আর তার পর থেকেই লড়াই শুরু অদ্রীজার বাবা-মা, রাজীব ও শ্রাবণী সেনগুপ্তের। বেশ কিছু স্কুল ঘুরে লোরেটো স্কুলে ভর্তি হতে পারে সে। আজ থেকে প্রায় দু’দশক আগে, তখন না ছিল এত সচেতনতা, না ছিল এই ধরনের শিশুদের জন্য কোনও আলাদা স্কুলের ব্যবস্থা। অনেকটা যুদ্ধের করে, বছর দুয়ের পর থেকে একটু একটু করে মানিয়ে নিতে শুরু করে অদ্রীজা। “আসলে মানিয়ে নেওয়া ছাড়া অন্য উপায়ও ছিল না। কোথায় বা পাব স্কুল, কোথায় পাব স্পেশ্যাল এডুকেটর, কোথায় পাব থেরাপিস্ট। পাগলের মতো দোরে দোরে ঘুরতাম মেয়েটাকে নিয়ে। এতটুকু দিশা পাইনি।”– বলছিলেন রাজীব বাবু, অদ্রীজার বাবা।

অদ্রীজা সেভেনে ওঠার পরে অবস্থা আরও সঙ্গীন হয়ে যায়। তখন অবশ্য স্পেশ্যাল এডুকেটরের বন্দোবস্ত করেছিলেন স্কুল কর্তৃপক্ষ। কিন্তু তখন দেখা গেল, আরও অনেক বাচ্চারই এই স্পেশ্যাল কেয়ার প্রয়োজন। ফলে বিভিন্ন বয়সের, বিভিন্ন রকম ডিসঅর্ডারের বাচ্চাকে একসঙ্গে করে ছেড়ে দেওয়া ওই এডুকেটরের কাছে। তিনি নিজেই স্বীকার করতেন, এভাবে একসঙ্গে ১৯-২০ জন বাচ্চাকে পড়াতে হলে কারও প্রতিই যথেষ্ট যত্ন নেওয়া সম্ভব হয় না।

ফলে বাধ্যে হয়ে ওকে স্কুল ছাড়ালেন রাজীববাবুরা। “অথচ ও তখন পাগলের মতো ভালবাসে পড়াশোনা। হাজার অসুবিধা, সামলাতে না-পারা আচরণের মধ্যেও, হাতে বইখাতা পেলে সব শান্ত। পেন নিয়ে নিজের মতো লিখত, সেই তখন থেকেই। মুক্তোর মতো হাতের লেখা ওর। এই অবস্থায় কী করে বন্ধ করতাম ওর পড়াশোনা!”– বললেন রাজীববাবু।

বাবা রাজীব সেনগুপ্তের সঙ্গে খুনসুটি

তখনই ওকে ভর্তি করেন ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ওপেন স্কুলিং-এ। বাড়িতে বসেই নিজের মতো করে পড়তে থাকে অদ্রীজা, একটু একটু করে এগোতে থাকে একটা একটা ক্লাস। এভাবেই ২০১৬ সালে পার করে ফেলে মাধ্যমিকের গণ্ডি। তার পরে নিজেই বেছে নেয় পছন্দের বিষয়, হোম সায়েন্স আর কম্পিউটার। রাজীববাবু বললেন, “ও নিজের মতোই থাকত, পড়ত। ও যে পড়তে ভালবাসছে, আমাদের ওটাই ভাল লাগা ছিল। আলাদা কোনও উচ্চাশা থাকার প্রশ্নই নেই।” কিন্তু এভাবেই যে ফার্স্ট ডিভিশনের সমান নম্বর নিয়ে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করবে অদ্রীজা, তাঁদের আদরের সোনাই, তা ভাবতেও পারেননি রাজীববাবুরা।

নাচের সাজে

পড়াশোনার পাশাপাশি নাচতেও খুব ভালবাসে অদ্রীজা। বেশ কয়েক বছর মণিপুরী নাচের তালিমও নিয়েছে। বাড়িতে ওর জন্য দু’তিন জন গৃহশিক্ষকও ছিলেন। যদিও এখনও মাঝেমাঝেই হাইপার হয়ে যায় সে। নিজের সঙ্গে মতের মিল না হলে, উল্টো দিকে যে-ই থাকুক, গায়ে হাত তুলে দেয়। এই সব রকম শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডি টপকে যাওয়াটা যে তার জন্য এক বড়সড় সাফল্য, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

মনোস্তত্ত্ববিদ প্রশান্ত রায় মনে করাচ্ছেন, এই জন্যই ছোটবেলায় ডাউন সিনড্রোম চিহ্নিত হওয়া এবং তার সঠিক যত্ন ও পরিচর্যা জরুরি। সেটুকু পেলে যে এরাও আর কোনও অংশেই পিছিয়ে থাকা নয়, তার বড় প্রমাণ অদ্রীজা। “আচরণগত সমস্যা থাকতে পারে। অনেক ‘স্বাভাবিক’ বাচ্চারও থাকে। ডাউন সিনড়্রোম থাকলে হয়তো সেই সমস্যা তুলনায় খানিকটা বেশি হবে। কিন্তু সেটা যথেষ্ট যত্ন ও ধৈর্য্য দিয়ে মোকাবিলা করতে পারলে, অসুবিধাগুলো সামলে ওঠা অসম্ভব নয়।”- বললেন তিনি। বস্তুত আমাদের দেশে সেই বিশেষ প্রশিক্ষণের সুযোগ খুবই কম। কম সচেতনতাও। সমাজের তৈরি করে দেওয়া কিছু সীমাবদ্ধ কাঠামো রয়েছে এদের জন্য। কিন্তু সে কাঠামো যে ভাঙা যায়, এরাও যে আর পাঁচ জন বাচ্চার মতোই সবটুকু জয় করতে পারে, তা শিখিয়ে দিল অদ্রীজা।

অদ্রীজার বাবা রাজীব সেনগুপ্ত দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন এই ধরনের শিশুদের নিয়ে। মেয়ের সাফল্যে উচ্ছ্বসিত পিতা এবং গর্বিত এক কর্মী হিসেবে বললেন, “একটু অতিরিক্ত যত্ন চাই, বিচ্ছিন্নতা নয়। ওরা একটু অন্য রকম, কিন্তু আমাদের যত্নে আর পাঁচ জনের মতোই হয়ে উঠতে পারে। ওদের জন্য আলাদা স্কুলের চেয়েও প্রয়োজন, একই স্কুলে স্পেশ্যাল এডুকেটর নিয়োগ করা। তা হলেই তাকে সমান অধিকার বলা যাবে।”

Leave A Reply