বৃহস্পতিবার, জুন ২৭

থিয়েটারকে কেউ ডমিনেট করতে পারে না : অনির্বাণ ভট্টাচার্য্য

সিনেমা ও থিয়েটার। দুটোতেই সাড়া ফেলেছে তাঁর অভিনয়। কিন্তু দুটো আলাদা মাধ্যমের অভিনয় নিয়ে কী ভাবেন অভিনেতা অনির্বাণ ভট্টাচার্য্য? কথা বললেন কবি ও নাট্যকর্মী পম্পা দেবের সঙ্গে। তিন পর্বের এই সাক্ষাৎকারের আজ শেষ পর্ব। 

পম্পা দেব

নিজের শিল্প মাধ্যম নিয়ে কথা বলতে বলতে ক্রমশ মগ্ন হয়ে উঠছেন অনির্বাণ। আসলে যেন কথা বলছেন না আর। একজন স্রষ্টা ব্যক্ত করছেন সৃষ্টি নিয়ে তাঁর স্বকীয় বোধ।

‘প্রচুর সিনেমা করছেন। কিন্তু লোকে তো বলে সিনেমায় অনেক কিছু নির্ভর করে টেকনিশিয়ানের ওপর। সিনেমা আসলে অভিনেতার মিডিয়াম নয়।’

“প্রথমত প্রচুর নয় সাতটি সিনেমা করেছি। এবার আপনার উত্তরে আসি, নায়ক ছবিতে একটা সংলাপ আছে না। ‘পুতুল। নির্দেশকের কাছে সে পুতুল, ক্যামেরাম্যানের কাছে পুতুল।’মনে রাখতে হবে কথাটা লিখছেন সত্যজিৎ রায়, কথাটার সত্যতা আছে তো বটেই। আমিও বলব পাপেট। বাট আ ক্রিয়েটিভ ওয়ান। একটা খুব বোকা লোককে কিন্তু ওখানে পুতুলের মতো ব্যবহার করা যাবে না। পাপেট তো জড় । কিন্তু আমরা সিনেমায় দেখি একজন রক্তমাংসের মানুষকে। সে কিন্তু অ্যানিমেশনের থেকে আলাদা। অ্যানিমেশনেই ভাবুন না, চরিত্রটাকে কিন্তু কখনই আসল মানুষের মতো লাগছে না। সিনেমায় অভিনয়ের জন্যে এমন একজনকে দরকার যিনি ঠিক ভাবে ওই অভিব্যক্তিগুলো ফুটিয়ে তুলতে পারবেন।”

প্রথম পর্ব : এখানে দর্শক গ্রিনরুমে ঢুকে পড়ে, যা কোনও সভ্য দেশে হয় না : অনির্বাণ ভট্টাচার্য্য

“ সিনেমার অভিনয় থিয়েটার থেকে কতটা আলাদা?”

“দেখুন সিনেমায় ক্যামেরা বলে একটা জিনিস আছে। সেটার পজিশন বদলালে অন্যরকম লাগে। আলো বদলালে অন্যরকম লাগে। থিয়েটারের সঙ্গে তো আমি মোটামুটি অভ্যস্ত। আমি থিয়েটার করছি প্রায় ১৪ বছর। ছবি করছি দু’তিন বছর। থিয়েটারে আমি আরও ২৫ বছর কাজ করলে সেটা নিশ্চয় বেটার হবে। সিনেমাতেও আরও পাঁচ বছর পর নিশ্চয়ই আমার কাজ বেটার হবে। বেটার হবে না তখন, যখন আমি আর ভাবব না। ‘ও আমি তো সব বুঝে গেছি’ এরকম একটা ভাব করব। কিন্তু আমি যদি ক্রমাগত ওই শিল্প মাধ্যমটার পেছনে পড়ে থাকি, তাহলে নিশ্চয় ভালো হবে। যে কোনও শিল্পে, আসলে আপনাকে মাধ্যমটাকে বুঝতে হবে। আমাকে সোহাগ সেন শিখিয়েছিলেন, যে একজন অভিনেতার ক্যামেরার পজিশন জানাটা জরুরি। তারপর সেটাকে মাথা থেকে মুছে ফেলতে হবে। তখন আর কিছু নেই আমি আছি। এটা একটা খুব শক্ত প্রসেস। কিন্তু সোহাগদির এই সাজেশনটা আমার কাজে দিয়েছে। আমার সময় লাগবে কিন্তু আমি পারব। আমি খুব স্লো একজন মানুষ। আমার জীবনে কোনও তাড়া নেই।”

“আপনি সব সময়েই কি খুব প্রসেস ড্রিভেন?”

“থিয়েটারের কিছু প্রসেসের সঙ্গে আমি পরিচিত। ঠিক একইভাবে সিনেমাতেও, কোন টেকনিশিয়ান কোন কাজটা করছেন, কেন করছেন সেটা আমাকে বুঝতে হবে। এইগুলো না জানলে কি ভালো অভিনেতা হওয়া যায় না? নিশ্চয়ই যায়। কিন্তু আমার যা ধরণ তাতে সবটা বুঝলে আমারই সুবিধা হবে।

অনেকে থাকেন জিনিয়াস। তাঁরা সব কিছুই পারেন। আমি অত পারি না। আমাকে সব কিছু সময় নিয়ে জেনে বুঝে করতে হবে। এক মগ চিন্তা নিয়ে স্নান করতে হবে। একটু আয়োজন করে নিতে হবে।”

দ্বিতীয় পর্ব: আমার শিল্পবোধটা একান্তই আমার, সেটা আমাকেই গড়ে তুলতে হবে: অনির্বাণ ভট্টাচার্য্য

“থিয়েটারে এবং সিনেমায় আপনি প্রচুর সাহিত্য-নির্ভর কাজ করেছেন। সব সময় মূল টেক্সট পড়ে নেন?”

“সাহিত্যটা সব সময়েই পড়ে নিই। কিন্তু নাট্যকার তো অনেক সময়েই মূল সাহিত্য থেকে সরে যায়। ‘অদ্য শেষ রজনীতে’ই যেমন মূল উপন্যাস থেকে প্রযোজনার পাণ্ডুলিপি একদমই আলাদা। । আমি শুধু একটা উপন্যাস পড়িনি। আমি ‘ঈগলের চোখ’ বলে একটা সিনেমা করেছিলাম। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের একটা উপন্যাস থেকে।  সেটা আমাকে পরিচালক পড়তে বারণ করেছিলেন বলেই পড়িনি। সৃজিত মুখার্জির একটা ছবিতে কাজ করেছি, ‘এক যে ছিল রাজা’ বলে। ভাওয়াল সন্ন্যাসীকে নিয়ে। ওটা পার্থ চ্যাটার্জির একটা বিরাট মোটা ইংরাজি বই থেকে নেওয়া। ‘প্রিন্সলি ইম্পোস্টার’ ওটা আমি পড়তে শুরু করেছিলাম। কিন্তু ইংরাজি পড়তে আমার প্রচুর সময় লাগে। তাই আমি শেষ করতে পারিনি। তবে একটা কথা বলি…”

“কী?”

“থিয়েটার একটা সর্বগ্রাসী ফর্ম। থিয়েটারকে কেউ ডমিনেট করতে পারে না। না অভিনেতা, না পরিচালক, না মিউজিক, না কস্টিউম, না কোনও সাহিত্য। যখনই দেখবেন কোনও অভিনেতা থিয়েটারকে ছাপিয়ে চলে যেতে চাইছেন, তখন আপনার দেখতে অস্বস্তি হবে। সিনেমার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।”

“এতরকম রোল করছেন সিনেমায়। কী বলবেন?

“আমি খুব ফরচুনেট একজন অভিনেতা। আমাকে এত ভালো ভালো রোল দেওয়া হয়েছে। আমি অভিনয় করতে এসেই খুব ইন্টারেস্টিং সব রোল পেয়েছি। এই ধনঞ্জয় করছি আবার ব্যোমকেশও করছি। নিজের বোরডমটা কাটে। মানে এই যে অন্য অন্য লোক হচ্ছি, কতটা হতে পারছি, কতটা হতে পারছি না। থিয়েটারে তো দেখা যায় না। সিনেমাটা দেখা যায়। ফলে খুব ইন্টারেস্টিং লাগে।”

“সিনেমার অভিনয়ের শুধু সেটাই আকর্ষণ?”

“দেখুন সিনেমায় আসলে নিজের অভিনয় বারবার রিইভ্যালুয়েট করতে হয়। লোকে একটা কথা খুব বলে ‘ন্যাচারাল অ্যাক্টিং’। কিন্তু অ্যাক্টিং জিনিসটা তো মোটেও খুব ন্যাচারাল নয়। যেটা আপনার পর্দায় দেখে ন্যাচারাল মনে হচ্ছে সেটা আসলে লেস দ্যান ন্যাচারাল।

ক্যামেরাটা কতটা কাছে সেটা আসলে বুঝতে হবে। একটা ক্লোজ শটে আমি এত আস্তে কথা বলি যে আপনারা আমার সামনে বসে শুনতে পাবেন না। আসলে পর্দায় তো ওই মুখটাই বিরাট বড় লাগবে। ফলে আপনার নিজের অভিনয় ক্ষমতার পুনর্মূল্যায়ন করা জরুরি হয়ে পড়ে। যদিও সিনেমায় আমার ক্ষেত্রে এখনও বাড়াবাড়ি অভিনয় বা থিয়েটারি অভিনয়ের তকমা ঘোচেনি। কিন্তু এই যে নতুন একটা জার্নি, সিনেমায় অভিনয় করার, এটা আমি খুব এনজয় করছি।”

অনির্বাণের মুখে একটা তৃপ্তির হাসি।

আরও পড়ুন : ইনটারভিউ – আমি প্রথম থেকেই অন্যরকম কিছু করতে চেয়েছিলামঃ অনুপম রায়

“তবে সিনেমায় আরও একটা জিনিস খুব জরুরি। সেটা হল স্টাইলাইজেশন। অনেক সময় সাধারণ মানুষ, যাঁরা অভিনয় করেন না, তাঁরা বলেন এটা হয়নি, ওটা হয়নি। স্টাইলাইজেশনটা একদম ভালো লাগছে না। ওই যে একদম শুরুতে বলেছিলাম আমাদের এইখানে অভিনেতারা অভিনেতাদের কাজ মূল্যায়ন করেন না। বেশির ভাগ সময়েই করেন একজন অন্য মানুষ, যিনি অভিনেতা নন। তাঁর নাম ক্রিটিক। সেই ক্রিটিকের ক্রিটিসিজম এতটাই ক্রিটিকাল যে কখনও কখনও দুর্বোধ্য হয়ে দাঁড়ায়।”

“এখন যখন নিজেকে দেখেন, কী মনে হয়?”

“আমি আর কিছু করিনি বুঝেছেন। আমার সঙ্গে যারা পড়াশুনো করত তাদের অন্য প্রায়োরিটি ছিল। প্রেম করতাম। কিন্তু কোনদিন প্রায়োরিটাইজ করিনি। কেউ ভালোবাসাকে প্রায়োরিটি করেছে, প্রেমকে প্রায়োরিটি করেছে। সেটা অপরাধ নয়। আমি অভিনয়টাকেই প্রায়োরিটি করেছি।  জীবনে মাল্টিপল প্রায়োরিটি থাকলে সেরকমই রেজাল্ট পেতাম। অন্য কোন দিকে তাকাইনি। আরাম চাইনি। পাইওনি, কিছু যায় আসেনি। একটা বাড়ির শখ ছিল, আগে টাকা ছিল না, এখন সিনেমা করে সামান্য টাকা হয়েছে তাই বাড়ি কিনেছি।  জায়গাটাও বেশ পছন্দের। চিৎকৃত কলকাতার থেকে দূরে। যেখান গাছ পুকুর পাখির ডাক এসব আছে।  আমি অন্য কোনদিকে তাকাইনি। এই কারণেই রেজাল্ট পেয়েছি হয়তো। বেশ কয়েকবার রিহার্সালে বা সিনেমার শ্যুটিং-এর পৌঁছাতে দেরি হয়েছে। কিন্তু কোনদিন দেখবেন না, পৌঁছনো ও বেরোনোর মাঝে ‘আরে ঠিক আছে’ বলে বসে পড়তে। এবং যতদিন এটা করতে পারব ততদিনই অভিনয় করব। আমি যেদিন বুঝবো আমার ইন্টিগ্রিটি লুজ হয়ে যাচ্ছে সেদিন অন্য কিছু করব, চা-এর দোকান বা ক্যাফে জাতীয় কিছু।

“সত্যি পারবেন সেটা করতে?”

“হ্যাঁ পারব। কারণ ইন্টিগ্রিটি লুজ হয়ে যাবার পর থিয়েটার করলে তার চেহারা যে কী মর্মান্তিক হয়, সেটা আমি চতুর্দিকে দেখছি, বাইরের দলগুলোতে অভিনয় করতে গিয়ে দেখছি।”

উঠে আসছি। অনির্বাণ বেরিয়ে এলেন আমাদের সঙ্গে। দরজাটা বন্ধ করতে করতে বললেন, “বাড়িটার কাজ শেষ হয়নি। আপনাদের সঙ্গে তেমন আতিথেয়তা করতে পারলাম না। পরে আরেকবার আসবেন।’

ছবি  সৌজন্য – তথাগত ঘোষ

Leave A Reply