দক্ষিণ কলকাতায় জনডিসের প্রকোপ, আশঙ্কা মহামারীর! আতঙ্ক সরিয়ে সচেতন হোন

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    দ্য ওয়াল ব্যুরো: দক্ষিণ কলকাতার একটি অংশে আচমকা ঘরে ঘরে জনডিস রোগ ছড়িয়ে পড়ার অভিযোগ উঠেছে। ৯৯ নম্বর ওয়ার্ডের এই ঘটনায় স্থানীয় কাউন্সিলার চিঠিও দিয়েছেন পুরসভার স্বাস্থ্য বিভাগকে। এর পরে নমুনা সংগ্রহের কাজও শুরু হয় বাড়ি বাড়ি ঘুরে। যদিও পুরকর্তাদের দাবি, তাঁরা কিছুই জানতেন না। শুক্রবার সকালে সংবাদমাধ্যমে বিষয়টি সামনে আসার পরে নাকি তাঁরা জানতে পেরেছেন। এক দিকে গোটা এলাকায় যখন মহামারীর মতো জনডিস ছড়িয়ে পড়ার উপক্রম চলছে, অন্য দিকে তেমনই শুরু হয়েছে রাজনৈতিক আকচাআকচি।

    সূত্রের খবর, ৯৯ নম্বর ওয়ার্ডের রামগড় কলোনি এলাকায় ঘটেছে এমনটা। রামগড়-৩ ও রামগড়-৪ কলোনি এলাকার পাড়ায় পাড়ায় ছড়িয়েছে জনডিস। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, একসঙ্গে প্রায় ৫০টি পরিবারের একাধিক সদস্য আক্রান্ত হয়েেন।

    প্রথমে জ্বর এবং বমি দিয়ে শুরু হচ্ছে অসুস্থতা। অনেকেই ভাবছেন, অত্যধিক গরমের কারণে হয়তো খারাপ হচ্ছে শরীর। কিন্তু কিছু দিন পরেই চোখ-গা-হাত-পা হলদে হয়ে যেতে শুরু করছে। রক্ত পরীক্ষা করালে বিলিরুবিনের মাত্রা খুব বেশি মিলছে।

    এলাকার আক্রান্তরা কেউ বাঘাযতীন হাসপাতাল, কেউ আইরিস হাসপাতাল, কেউ বা কেপিসি হাসপাতালের চিকিৎসকদের কাছে চিকিৎসাধীন। ভর্তিও হতে হয়েছে অনেককে। কেউ কেউ বাড়িতে থেকেই চিকিৎসা চালাচ্ছেন।

    ৯৯ নম্বর ওয়ার্ডের কউন্সিলার, আরএসপি-র দেবাশিস মুখার্জী বলেন, “আমি অনেক আগেই পুরসভাকে জানিয়েছি। আক্রান্তদের জনডিসের প্রমাণপত্র সংগ্রহ করে তা মুখ্য স্বাস্থ্য অধিকারিককেও পাঠিয়েছি। জানিয়েছি, দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। না হলে মহামারীর আকার নিচ্ছে।”

    দেবাশিস বাবুর চিঠির পরেই পুরসভার ডেপুটি সিএমওএইচ বৃহস্পতিবার সকালে এলাকায় এসে, বাড়ি বাড়ি ঘুরে নমুনা সংগ্রহ করেন। আজ, শুক্রবার সকালে পুরসভার কর্মীরা বাড়ি বাড়ি ঘুরে পানীয় জলের নমুনাও সংগ্রহ করেন। এলাকায় আসেন বোরো চেয়ারম্যান তপন দাশগুপ্ত-ও। তাঁর দাবি, তাঁকে কিছু জানানো হয়নি। আজ তিনি সংবাদমাধ্যমের কাছ থেকে জেনে এলাকায় এসেছেন।

    দেবাশিস বাবু এই প্রসঙ্গে বলেন “উনি এলাকার খোঁজ রাখেন না। আমি তো পুরসভার দফতরে যেখানে জানানোর সেখানেই জানিয়েছি নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে। কোন ব্যক্তিকে আলাদা করে তো জানানোর কথা নয় আমার।”

    তবে ওই এলাকায় ঠিক কী কারণ এমন ভাবে জনডিস ছড়াচ্ছে, তা এখনও বোঝা যাচ্ছে না। সম্ভবত পানীয় জলের কোনও সমস্যা বা সংক্রমণের কারণেই এমনটা হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, গত বছরের গোড়ার দিকে এই এলাকা এবং সংলগ্ন অঞ্চলেই প্রায় মহামারীর আকার ধারণ করেছিল আন্ত্রিক। পরে জানা গিয়েছিল পানীয় জলের পাইপ লাইনে একটি ফাটল ধরায় দূষিত হচ্ছিল জল। এ বছরেও কি তেমনই কিছু হতে চলেছে!

    এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা মালবিকা মজুমদার জানালেন, পানীয় জল নিয়ে নানা রকম ছোট-বড় সমস্যা লেগেই থাকে এলাকায়। বহু দিন ধরেই এর কোনও সুরাহা নেই। “ঘরে খুব ছোটো বাচ্চা রয়েছে, সব সময় ভয়ে ভয়ে থাকি। সব সময়ে জল কিনে খেতে হয়। আশপাশে খবর পাচ্ছি অনেকেরই আচমকা জনডিস হয়েছে। জানি না, গত বছরের মতোই বড় মহামারী হয়ে দাঁড়াবে কি না।”

    কী কী কারণে সাধারণত জনডিস হয়ে থাকে? কী বলছেন চিকিৎসকেরা?

    রক্তে বিলিরুবিনের মাত্রা বেড়ে গেলে জনডিস দেখা দেয়। আমাদের রক্তের লোহিত কণিকাগুলো একটা সময়ে স্বাভাবিক নিয়মেই ভেঙে গিয়ে বিশেষ রঞ্জক তৈরি করে, যার নাম বিলিরুবিন। এই বিলিরুবিন পরবর্তীতে লিভারে প্রক্রিয়াজাত হয়ে পিত্তরসের সঙ্গে পিত্তনালীর মাধ্যমে পরিপাকতন্ত্রে প্রবেশ করে। তার পরে অন্ত্র হয়ে মলের মাধ্যমে শরীর থেকে আপনাআপনিই বেরিয়ে যায় এই বিলিরুবিন। এখন বিলিরুবিনের এই দীর্ঘ যাত্রাপথে কোনও রকম অসঙ্গতি দেখা দিলেই রক্তে বিলিরুবিন বেড়ে যায় আর দেখা দেয় জনডিস।

    কেন হয় জনডিস:

    • আমাদের দেশের মানুষের জনডিস হওয়ার শতকরা ৭০ ভাগ কারণ হচ্ছে ভাইরাল হেপাটাইটিস।
    • হেপাটাইটিস এ এবং হেপাটাইটিস ই ভাইরাস ছড়ায় দূষিত জল ও খাবারের মাধ্যমে।
    • হেপাটাইটিস বি, সি এবং ডি ছড়ায় এই ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত বা রক্ত উপাদান গ্রহণের মাধ্যমে।
    • বাইরের আঢাকা, অপরিচ্ছন্ন খাবার, অপরিস্রুত জলের মাধ্যমে শরীরে বাসা বাঁধে এই ভাইরাসগুলি।
    • খুব বেশি রোদে ঘোরাঘুরি করলেও পরিপাকের সমস্যা দেখা দেয়, ফলে বাড়তে পারে বিলিরুবিন।

    কী করবেন:

    • এলাকায় অনেকের জনডিস হয়েছে জানতে পারলে জল ফুটিয়ে খাবেন।
    • বাইরে বেরোতে হলে জলের বোতল সঙ্গে রাখবেন। না থাকলে প্যাকেজড ড্রিঙ্কিং ওয়াটার কিনে খাবেন।
    • রাস্তার ধারের আঢাকা খাবার এড়িয়ে চলুন।
    • হজমে অসুবিধা হতে পারে এমন তেল-মশলাদার খাবার না খাওয়াই ভাল।
    • রোদে বেরোলে ছাতা, রোদচশমা, স্কার্ফ ব্যবহার করুন। প্রচুর জল খান।
    • ভুলেও অন্য কারও ব্যবহার করা সিরিঞ্জ, ক্ষুর, ব্লেড ব্যবহার করবে না।
    • বাড়িতে কারও জনডিস হলে তাঁকে আলাদা, পরিচ্ছন্ন ঘরে রাখুন।

    কী করে বুঝবেন, জনডিস হতে পারে:

    • শরীর দুর্বল ঠেকবে। হজমের সমস্যা। প্রথমে জ্বর আসবে অল্পবিস্তর।
    • চোখের সাদা অংশ ও প্রস্রাবের রং হলদে হয়ে যাবে।
    • সমস্যা বাড়লে পুরো শরীরই হলুদ হয়ে যেতে পারে।
    • অনেক সময় মলের রং সাদা হয়ে যায়।
    • পেটে ব্যথা হবে, লিভারের জায়গায় পেটের ওপর থেকে হাত দিলে শক্ত ঠেকবে।
    • খিদে কমে যাবে অস্বাভাবিক রকমের।

    চিকিৎসা কী:

    • ভাইরাল হেপাটাইটিসের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া চিকিৎসার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
    • বাড়াবাড়ি হলে রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করারও প্রয়োজন হতে পারে।
    • এ সময়ে কোনও ব্যথার ওষুধ যেমন, প্যারাসিটামল, অ্যাসপিরিন, ঘুমের ওষুধ-সহ অন্য কোনও অপ্রয়োজনীয় ও কবিরাজী ওষুধ খাওয়া উচিৎ নয়।
    • প্রাণিজ প্রোটিন অর্থাৎ মাছ-মাংস খেতে হবে, তবে যতটা সম্ভব কম তেলে রান্না হওয়া বাঞ্ছনীয়।
    • হেপাটাইটিস বি ও সি ভাইরাস দু’টি কিছু কিছু ক্ষেত্রে জনডিস সেরে যাবার পরেও লিভারের দীর্ঘমেয়াদী প্রদাহের সৃষ্টি করতে পারে, যা পরে সিরোসিস অফ লিভারের মতো জটিল রোগও তৈরি করতে পারে।
    • তাই এই দু’টি ভাইরাসে আক্রান্ত হলে দীর্ঘ মেয়াদে লিভার বিশেষজ্ঞের ফলো-আপে থাকতে হবে এবং প্রয়োজনে অ্যান্টি-ভাইরাল চিকিৎসা নিতে হবে।
    • ৭ থেকে ২৮ দিনের মধ্যে রক্তে বিলিরুবিনের পরিমাণ স্বাভাবিক হয়ে গেলে জন্ডিস এমনিই সেরে যায়।

    নতুন মায়েরা মনে রাখবেন:

    • জনডিসে আক্রান্ত মা নিশ্চিন্তে তাঁর সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়াতে পারেন।
    • গর্ভাবস্থায় মায়ের যদি হেপাটাইটিস বি ভাইরাসজনিত জনডিস হয়ে থাকে, তবে শিশুর জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই হেপাটাইটিস বি ভাইরাসের টিকা এবং ইমিউনোগ্লোবুলিন ইনজেকশন দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
    • মায়ের দুধের মাধ্যমে না ছড়ালেও, মায়ের ঘনিষ্ঠ সাহচর্যে শিশুর হেপাটাইটিস বি ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

    জনডিস কিন্তু কোনও অসুখ নয়। লিভারে প্রদাহ কিংবা গলব্লাডার বা প্যাংক্রিয়াসের বিভিন্ন সমস্যার কারণে রক্তে বিলিরুবিনের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার উপসর্গই হল জন্ডিস। এর কোনও নির্দিষ্ট ওষুধ হয় না, রাতারাতি সারে না এই সমস্যা। পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং নিয়মানুবর্তিতাই এই উপসর্গের ওষুধ। অযথা আতঙ্কিত হবেন না, সচেতন হোন। 

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More