সোমবার, সেপ্টেম্বর ১৬

সমান অধিকার পেতে গেলে সমান দায়িত্বও পালন করতে হবে সংখ্যালঘুদের

ফারহা কাজি

গত কাল থেকে একটি চিঠি ফেসবুকে ঘুরছে। চিঠিটি লিখেছেন মুসলমান সমাজের পক্ষ থেকে কিছু মানুষ। চিঠিটি আসলে মুখ্যমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে লেখা একটি আবেদনপত্র, যেখানে তাঁরা বর্তমান পরিস্থিতিতে নিজেদের ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক কারণে বিব্রত হওয়ার কথা ব্যক্ত করেছেন এবং মুখ্যমন্ত্রীকে উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করেছেন। জানিয়েছেন, তাঁরা যে ধর্মের প্রতিনিধিত্ব করেন, সেই ধর্মের কেউ কোনও অপরাধ করলে আইন মোতাবেক তাঁর শাস্তি হোক। নইলে লজ্জায় পড়ছেন তাঁরা।

বস্তুত, কোনও মানুষ কেবল একটি ধর্মের প্রতিনিধিত্ব করার কারণে কতটা অস্বস্তি ও লজ্জায় পড়লে তবে এরকম চিঠি লেখেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে। কিন্তু বলাই বাহুল্য, এই চিঠির নেপথ্যে আছে বিগত কিছু দিন রাজধানী কলকাতার বুকে ঘটা দু’টি ঘটনা, যার কারণে রাজ্য তথা দেশ উত্তাল।

এনআরএস হাসপাতালে ঘটা ডাক্তার পেটানো এবং প্রাক্তন মিস ইন্ডিয়া ঊষসী সেনগুপ্ত নিগ্রহ কাণ্ড।

এই রকম ঘটনা সারা দেশে বহুবার ঘটেছে বা ভবিষ্যতেও হয়তো ঘটবে। কিন্তু তার পরেও এ কথা বলাই যায়, যে কলকাতার ঘটনা যে ভাবে আমাদের সবার নজর কেড়েছে, তার পিছনে শুধু সামাজিক কারণ না, রাজনৈতিক কারণও আছে। আসলে, পশ্চিমবাংলার বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে গোটা রাজ্য জুড়েই একটা অদ্ভুত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যার নেপথ্যে আছে বর্তমান শাসক দল।

তবে এ কথাও অনস্বীকার্য যে এই পরিস্থিতি তৈরির পিছনে বিরোধী দল বিজেপিরও ভূমিকা কম নয়। কিন্তু বিজেপিকে সাম্প্রদায়িকতা ছড়ানোর এই সুযোগটা করে দিয়েছেন বা বলা ভাল, হাতে অস্ত্র তুলে দিয়েছেন মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রীই। এবং এর দায় কিছুটা হলেও রাজ্যের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়েরও বটে।

আমি বরাবরই মনে করি, যে পৃথিবীর যে কোনও এলাকায় সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের দায়িত্বের পাশাপাশি সংখ্যালঘু মানুষেরও কিছু দায়িত্ব থাকা আবশ্যক। যখনই কোনও পক্ষ এই দায়িত্ব থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, সেই জায়গার পরিস্থিতি খারাপ ছাড়া ভাল হয় না, হতে পারে না।

আমাদের রাজ্য তারই জলজ্যান্ত উদাহরণ।

এ রাজ্যের অশিক্ষিত বা কম শিক্ষিত, অর্থনৈতিক ভাবে পিছিয়ে পরা সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বারবারই ব্যবহৃত হয়েছে রাজনৈতিক লুম্পেন হিসেবে। ফলে মুসলমান মানেই খারাপ– এই অদ্ভুত বাইনারি সৃষ্টি হয়েছে রাজ্য জুড়ে। যার ফল, তীব্র সাম্প্রদায়িক ঘৃণা, রাগের বহিঃপ্রকাশ এবং রাজ্যে বিজেপির উত্থান।

ডাক্তার নিগ্রহের ঘটনা তো এ দেশে নতুন না। কাগজ খুললেই ডাক্তার নিগ্রহ এবং তার উল্টো দিকে চিকিৎসায় গাফিলতির খবরও আমরা নিয়মিত পাই। কিন্তু স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন ওঠে, এই চিকিৎসায় গাফিলতির মাপকাঠিটা কে নির্ধারণ করছে?

কোনও রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতির জন্য শুধু কি চিকিৎসকের গাফিলতিই দায়ী থাকে? পেশেন্টপার্টির উদাসীনতা কিংবা স্বাস্থ্য-ব্যবস্থার অবস্থাও কি দায়ী না?

তথ্য বলছে, এ দেশে প্রতি মানুষের চিকিৎসার পিছনে দৈনিক তিন টাকা করে খরচ হয়। তা হলে সেই দেশের স্বাস্থ্য-ব্যবস্থার বেহাল দশার জন্য সরকারকে কেন জবাবদিহি করতে হবে না? কেন সব দায় একা চিকিৎসকের

মেডিক্যাল কলেজগুলোয় যা হয়েছে গত ক’দিনে, তাতে ‘দু’ট্রাক মুসলমান’-এর কথা বারবার সামনে এলেও, সমগ্র ঘটনার পিছনে কেবল ওই মানুষগুলোর ধর্মকেই আমি সর্বতো ভাবে দায়ী করি না। তার চেয়ে ঢের বেশি দায়ী করি শাসকদলকে। এবং সঙ্গে অবশ্যই আপামর মুসলমান সম্প্রদায়কেও দায়ী করি। কেন তারা শাসকদলকে ইসলামের নামে রাজনীতি করার মওকা দিচ্ছে বারবার? ঠিক কী কারণে? কোন স্বার্থে?

আমি ব্যক্তিগত ভাবে মনে করি, তৃণমূল হল মিত্রবেশে মুসলমানের শত্রু। যে শত্রু মুসলমান লুম্পেনদের অত্যাচার করার অবাধ প্রশ্রয় দিয়েছে, রাজনীতির দাবাখেলায় মুসলমান লুম্পেনদের বোড়ে হিসেবে ব্যবহার করেছে। রাজ্য জুড়ে আজ যে অরাজকতার পরিস্থিতি, তার একমাত্র দায় শাসক গোষ্ঠীরই। বিজেপি শুধু সেই সুযোগটাকে কাজে লাগিয়েছে।

অন্য দিকে এই ঘটনা রাজ্যের প্রশাসনিক ব্যর্থতাকেও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে।

এনআরএস-এ রোগী মৃত্যুকে কেন্দ্র করে রোগীপক্ষ এবং ডাক্তারদের মধ্যে ধুন্ধুমার হওয়ার সময়ে পুলিশের ভূমিকা নিষ্ক্রিয় কেন ছিল? প্রয়োজনীয় প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও, ঠিক কোন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে দোষীদের গ্রেফতার করতে পুলিশ এত সময় নিল? কেনই বা বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এই ঘটনার ফায়দা তোলার চেষ্টা করল?

আজ যারা এই বিষয়টাকে সাম্প্রদায়িকতার রূপ দিচ্ছে তারাও জানে এতে ধর্ম নেই। কিন্তু তবু তারা ধর্মের রাজনীতি করছে, কারণ তাদের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। আর এই সুযোগটা দিয়েছে শাসকদল এবং রাজ্যের সংখ্যালঘু মুসলমানেরাই।

আমার নিজের ভাই ডাক্তার। আমার প্রচুর বন্ধু ডাক্তার। যে ছেলেটি বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজে মার খেয়েছে সে আমার ভাইয়ের পরিচিত। তাকে আমি ছোটো থেকে চিনি… সে-ও আমার ভাই। আজ যে ডাক্তারকে মারা হয়েছে সে ঘটনাক্রমে হিন্দু… আমার ভাইও ঐ জায়গায় থাকতেই পারত। কিংবা থাকতে পারত রামিজ, জুলফিকার-সহ আমার ভাইয়ের ক্লাসেরই অসংখ্য ছেলে যাদের ধর্মটা দোষীদের সঙ্গে মিলে যায়।

তখন অবশ্যই বিষয়টা হিন্দু-মুসলমান রূপ পেত না, সেটা আমরা সবাই ভাল করেই জানি।

অন্য দিকে ঊষসী সেনগুপ্তের ঘটনাতেও অভিযুক্তেরা প্রত্যেকেই মুসলমান। আর একটু বিশদে বলতে গেলে অবাঙালি মুসলমান। সত্যি কথা বলতে, আমি ব্যক্তিগত ভাবে মনে করি, অবাঙালি পশ্চিমবঙ্গবাসী এবং বাঙালিদের মধ্যে সংস্কৃতিগত পার্থক্য অনেকটাই বেশি। ঊষসী সেনগুপ্তের সঙ্গে যে ঘটনা ঘটেছে, ওই ধরনের ঘটনা আমরা এত দিন হিন্দিবলয়ের ঘটনা হিসেবেই জেনেছি। এখন দিদির রাজত্বে পশ্চিমবঙ্গেও তা দেখছি।

কিন্তু এতে অবাঙালিদের দোষের থেকেও তো বেশি দায় প্রশাসনের। কেন অভিনেত্রী বারবার অভিযোগ করা সত্ত্বেও পুলিশ অভিযোগ নথিভুক্ত করতে চায়নি? কেন ঊষসীদেবীর পোস্ট এবং ভিডিও ফেসবুকে ভাইরাল হওয়ার পরেই প্রশাসনের টনক নড়ল? কেন পরিষ্কার ভিডিও ফুটেজ থাকা সত্ত্বেও বিচারব্যবস্থা এতটা সময় নিল? আজ যদি ঊষসীর জায়গায় কোনও সাধারণ মানুষ থাকতেন, তা হলে কি তিনি বিচার পেতেনই না?

বিগত কয়েক দিনের ঘটনার পরে আমি একটি অদ্ভুত ঘটনা লক্ষ্য করেছি। সেটা হল, বেশ কিছু সংখ্যক সংখ্যালঘু মানুষের অদ্ভুত প্রতিক্রিয়া। মোটামুটি যেটুকু মনে হচ্ছে, অধিকাংশ সংখ্যালঘুই এই মুহূর্তে শাসকদলের পক্ষে। এই পক্ষ দেখাতে গিয়ে নিজেদের অজান্তেই হয়তো তারা অপরাধীর পক্ষ নিয়ে ফেলছে। যার ফলে, রাজ্য জুড়ে পোলারাইজ়েশনে আরওই সুবিধা হচ্ছে।

আমি বুঝি, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তাহীনতার ভয় থেকেই হয়তো শাসকদলকে আঁকড়ে ধরার এই প্রচেষ্টা রয়েছে। তৃণমূলই হয়তো বিজেপির হাত থেকে তাদের বাঁচাবে, এই চিন্তাভাবনাই এই আচরণের পিছনে থাকতে পারে। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাবলি প্রমাণ করছে, এই চিন্তা-ভাবনা আরওই বিজেপিকথিত ‘মোল্লা তোষণ’-এর দাবিকে প্রতিষ্ঠিত করছে।

যেমন, বহু দিন ধরেই শোনা যায়, কলকাতার পার্ক সার্কাসে নাকি হেলমেটের বদলে ফেজটুপি পরে ঘুরলে পুলিশ কিছু বলে না। অদ্ভুত ভাবে এর দায়ও এসে পড়ছে সমস্ত মুসলিমের উপরে। অথচ গোটা ভারতের প্রেক্ষাপটে দেখলে দেখা যায়, হেলমেট পরা বা না-পরার সঙ্গে ধর্মের কোনওই যোগাযোগ নেই। এটি একটি সর্বভারতীয় ট্রেন্ড এবং এটা প্রশাসনিক অদক্ষতাকেই প্রকারান্তরে মান্যতা দেয়।

প্রসঙ্গত মনে করাই, কিছু দিন আগে পুণে শহরে হেলমেট না-পরার দাবিতে একটি আন্দোলন হয়, যার নেপথ্যে ছিলেন সংখ্যাগুরু মানুষেরাই। পার্ক সার্কাসের হেলমেট না পরার পিছনেও প্রধান কারণ প্রশাসনিক অদক্ষতা। তবে এই অদক্ষতার যথেষ্ট সমালোচনা শিক্ষিত মুসলমান সমাজ করেনি কোনও এক অজানা কারণে। করলে, কোনও কোনও অপরাধের গায়ে হয়তো এভাবে ধর্মীয় ট্যাগ পড়ত না। এবং তার জেরে সেই ধর্মের মানুষদের চিঠিও লিখতে হতো না মন্ত্রীকে।

আগেই বলেছি, যে কোনও দেশে সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের দায়িত্ব বেশি। কিন্তু সংখ্যালঘুরও অবশ্যই দায়িত্ব আছে। এ দেশে সেই দায়িত্ব পালন না করার জন্যই মুসলমান লুম্পেনদের ব্যবহার করার সাহস পেয়েছে শাসকদল। কোনও দেশে সংখ্যাগুরুর সমান সমানাধিকার পাওয়ার অর্থ এই নয়, যে লুম্পেনগিরি করা কিংবা তা হতে দেখেও চুপ থাকা।

এই দেশটা আমাদের সকলের। এই দেশটা ধর্মনিরপেক্ষ। এই দেশে সকলের সমান অধিকারের কথা বহু চর্চিত। তাই সেই সম-অধিকার লাভের অন্যতম শর্ত সম-দায়িত্ববোধও। ফলে কোনও ক্ষেত্রে সংখ্যাগুরু মানুষেরা যদি নিরাপত্তা পেতে ও দিতে ব্যর্থ হন, তবে তার দায় এসে পরে সংখ্যালঘুর উপরেও।

এটুকু বুঝলেই তো সমস্যা অনেকখানি কমে যায়!

মতামত লেখিকার নিজস্ব

(লেখিকা জার্মানিতে বসবাসরত ইঞ্জিনিয়ার।)

আরও পড়ুন…

‘আমাদের কেউ দোষ করলে শাস্তি দিন, নইলে লজ্জায় পড়ছি,’ মমতাকে চিঠি মুসলিমদের

Comments are closed.