শনিবার, মার্চ ২৩

আমি সময়ের আবিষ্কার, নইলে বিপ্লবকে কি চিনত লোকে!

শঙ্খদীপ দাস

তেতলায় উঠতে কেউ বাধা দিল না। ঘরের বাইরে নিরাপত্তাও নেই আহামরি। দরজাটা একটু ঠেলে, সম্মতি নিয়ে সটান ঢুকে পড়া গেল বৈঠকখানায়।

সোফায় হেলান দিয়ে বসে রয়েছেন। নির্মেদ সাড়ে ৬ ফুটের চেহারা। দিল্লিতে জিম ইনস্ট্রাকটর ছিলেন এক সময়ে। সেই বাজপেয়ীর সময় থেকে দিল্লির পাওয়ার করিডরে ঘোরা ফেরা। তৎকালীন মন্ত্রী রীতা বর্মার আপ্ত সহায়ক ছিলেন। সে যাক। দশ মাস হয়ে গেল, এখনও যেন মুখ্যমন্ত্রী মুখ্যমন্ত্রী ভাব আসেনি।

অথচ আপনিই তো সেই ‘বিস্ময় বালক!’তুলনায় রাজনীতিতে বটবৃক্ষ মানিক সরকারকে হারিয়েছেন! কেউ ভেবেছিল, অমন সমূলে কেউ উল্টে দিতে পারে ওঁর গদি!

বিনয়ের হাসি বিপ্লব দেবের মুখে। ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব দেব। “আমি তো সময়ের আবিষ্কার! নইলে বিপ্লবকে কি চিনত লোকে!”

পনেরো বছর দিল্লিতে থাকায়, কথায় হিন্দি শব্দের প্রভাবটা বেশি। “কোই এক সূত্র সে অমিত ভাইয়ের (পড়ুন বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ) কাছে পৌঁছে গেছিলাম। আরএসএস-এর ব্যাকগ্রাউন্ড। বললেন, পারবে তো? নেগেটিভ চিজ আমার মধ্যে নেই। বললাম চেষ্টা করে দেখি। ব্যস, ২০১৫ সালে ত্রিপুরা বিজেপির রাজ্য সভাপতি বনে গেলাম রাতারাতি।”

 

বাকিটা তো রূপকথার মতোই। নইলে ত্রিপুরায় বিজেপি-র তো কিস্যু ছিল না! না সংগঠন, না নেতা। ফ্ল্যাশ ব্যাকে যাওয়ার মতোই বিপ্লব এ বার নস্ট্যালজিক! কোনও জড়তা নেই! কৃত্রিমতাও নয়! “সত্যিই তো কিছু ছিল না। হাতে গুণে তিন চার জন লোক জনসংঘ করতেন। আমার বাবা এক জন। উদয়পুরে ওষুধের দোকান ছিল বাবার। একটা চোঙা ছিল। ওটাতেই ফুঁকে ফুঁকে জনসংঘের প্রচার করে বেড়াতেন।” কমিউনিস্ট শাসনে জনসংঘ। চাপের ব্যাপার নয়? “সে তো বটেই। টিটকিরি মারত। ক্লাস সেভেন-এইটে পড়ি। মনে আছে, রাস্তা দিয়ে হেঁটে গেলে বলত, ওই দ্যাখ, বিজেপি-র পুত যাচ্ছে! বাবাকে বলতাম, এতো সুন্দর নামটা আমার..কিন্তু পাজিগুলাকে দ্যাখো..!”

এমন একটা রাজ্যে বিজেপি-র ফুল ফোটানোই তো বিপ্লব। লোটাস রেভোলিউশন! ৯৩ সাল থেকে একটানা ক্ষমতায় সিপিএম। অতি দুর্বল কংগ্রেস। তার থেকেও কমজোরি বিজেপি! বামেরা বলেন, স্রেফ বিভাজনের বিষ ছড়িয়ে বিপ্লব জিতেছে। ধর্মীয় মেরুকরণটাই বদলের রসায়ন। “বাজে কথা।” টান টান হয়ে বসলেন বিপ্লব। বললেন, “গত দশ মাসে একটাও দাঙ্গার কথা শুনেছেন ত্রিপুরায়? কোনও মুসলিম বলতে পারবে? ভোটের আগে মুসলিম পাড়ায় গিয়ে গিয়ে সিপিএমই ক্ষেপিয়েছে মানুষকে। বলেছে, বিজেপি এলে তোমাদের তাড়িয়ে দেবে সব কটাকে। কই তেমন কিছু হয়েছে? আমি তো ওদের ঈদে-মেহ্‌ফিলেও যাই।”

রাম মাধবের সঙ্গে বিপ্লব দেব

তা হলে বদলের কেমিস্ট্রি কী ছিল? বিপ্লবের মুখে হাসি। “শুধু পজিটিভিটি দিয়ে। মাইরি। পঁয়ত্রিশ বছর ধরে খালি নেই নেই নেই শুনে মানুষ হয়রান, পরেশান ছিল। বঞ্চিত সিনড্রোমে ভোগে কমিউনিস্টরা।”

শুধু পজিটিভিটি দিয়েই জিতে গেলেন? “না, তা না। সংগঠনের কাজ তো হয়েছেই। কিন্তু মানুষের ক্ষোভ ছিল। শিল্প নেই, কাজ নেই, কারবার নেই, ভাল স্কুল নেই, হাসপাতাল নেই। দশ হাজার বর্গ কিলোমিটারের মধ্যে মানুষগুলোকে যেন বাইরের দুনিয়া থেকে কাট অফ করে রেখেছিল। ওই এক গল্প মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ..!”

পরের কয়েক মিনিট ত্রিপুরার তরুণ সিএম কোনও পজ্ দিলেন না। বলেই চললেন, “সরকারি চাকরি মানেই কমিউনিস্টরা পাবে। সিপিএম করলে তবেই চাকরি। অথচ কাজই নেই। অফিসে এসে ঘুমোতো।”

প্রশাসনে সেই কমিউনিস্টরা তো এখনও রয়েছেন। তাতে কি অসুবিধা হচ্ছে কাজের? “তা তো হচ্ছিলই। নেগেটিভিটি মজ্জায় ঢুকিয়ে দিয়েছে। বিশ্বাস করবেন না, মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর সচিবালয়ের যাঁরা বক্তৃতা লিখে দিতেন। দেখি ওই সব কমিউনিস্ট শব্দ। লাঞ্ছিত, বঞ্চিত, শোষিত…আমি ডেকে বললাম, এ সব বাদ দিন। আমার বক্তৃতায় এ সব শব্দই থাকবে না। ত্রিপুরার ইতিহাস রয়েছে। ঐতিহ্য রয়েছে। ত্রিপুরার রাজা ছিলেন প্রজাবৎসল, রাজ্যের মানুষ এমনকি আদিবাসীরা তাঁকে ভগবান বলে মানতেন। শোষণের প্রশ্নই ওঠে না।”

ওঁরা কথা শুনছেন তা হলে? “শুনছেন। আগের থেকে চেঞ্জ তো হয়েছেই। আমি তো সচিবালয়ের পিওন থেকে মুখ্য সচিব পর্যন্ত সবাইকে এক সঙ্গে মিটিংয়ে ডেকে বলে দিয়েছি, কাজের কালচার ফিরিয়ে আনতে হবে। কাউকে এক গ্লাস জল দিলেও যেন প্রপারলি দেওয়া হয়।”

কিন্তু ত্রিপুরার সরকারি কর্মচারীরা তো সত্যিই বঞ্চিত ছিলেন। বহুদিন ঠিক মতো ডিএ পাননি। বাংলার মতোই। ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী বললেন, “বামেদের এই লিগ্যাসি শ’পারসেন্ট খতম করে দিতে পেরেছি বলব না। কিছুটা তো পেরেছি। সেভেন্থ পে কমিশন হয়েছে। কেন্দ্রের স্কেলে মাইনে পাচ্ছেন কর্মীরা। ডিএ এখনও কিছুটা বাকি রয়েছে। বাংলায় তো শুনেছি ফিফথ পে কমিশনের পর আর এগোয়নি।”

নরেন্দ্র মোদী ও অমিত শাহের সঙ্গে বিপ্লব দেব

তা ভাল। পজিটিভ। কিন্তু রাজনৈতিক বদলটাই আসল বদল নয়! ত্রিপুরার বদল কিছু হচ্ছে?

নতুন মুখ্যমন্ত্রী যেন এতক্ষণ এই প্রশ্নের অপেক্ষাতেই ছিলেন। ওঁর চোখে মুখে বদলের রোম্যান্টিসিজম। বলেন, “শুনুন, এক দিনে তো বদল হবে না। যাদু কাঠি নেই কোনও। কিন্তু এই দশ মাসে ছোট ইন্ড্রাস্ট্রির জন্য সাড়ে আটশ অ্যাপলিকেশন এসেছে। সেলফ হেল্প গ্রুপ তৈরি হচ্ছে গ্রামে গ্রামে। বাংলাদেশের সঙ্গে বন্দরের রুট খুলে যাবে কদিনের মধ্যে। তার পর উত্তর-পূর্বের গেটওয়ে হয়ে যাবে ত্রিপুরা। লজিস্টিক হাব হবে। তাতে কাজ পাবে ছেলেপুলেরা।” আর? “ত্রিপুরা স্মার্ট সিটি হচ্ছে। স্যাটেলাইট টাউনশিপ, আইটি হাব করছি। বিশ মঞ্জিলা একটা বিল্ডিংয়ে বিপিও, কল সেন্টার, আইটি আর আইটি এনাবেলড সার্ভিস সেক্টরের লোকজনকে ডাকছি। সরকারি হাসপাতালে পিপিপি মডেলে ইনভেস্টমেন্ট আনছি ই টেন্ডার করে। ডিপিএস স্কুলের সঙ্গেও কথা চলছে।”

আর? বিপ্লব দেবের ক্লান্তি নেই। ঘন্টার পর ঘন্টা বলে যেতে পারেন তাঁর ভাবনার কথা। মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর মধুচন্দ্রিমা পর্ব এখনও কাটেনি..হেসে বললেন, “ত্রিপুরায় বসে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে করতে কমিউনিস্টরা বুঝতেই পারেনি, এ যুগের ছেলেমেয়েরা কী চায়! আগরতলায় এন্টারটেনমেন্ট বলতে কী আছে? বাচ্চারা শুধু টিভিতেই দেখেছে, কেএফসি, ম্যাকডোনাল্ডস, ডমিনোজ…ওরা সবাই এখন আসছে আগরতলায়।”

সে সব তো না হয় হল? ইদানীং বিপ্লব দেবের নাম বারবার শিরোনামে এসেছে বেফাঁস কথার জন্য! রামায়ণ, মহাভারত.. ইত্যাদি। “দেখুন, বিশ্বাসে মিলায়ে বস্তু। ত্রিপুরার রাজ পরিবারের কাছে মহাভারতের যুগের একটা ছোট শ্বেত পাথরের সিংহাসন রয়েছে। এতো বাস্তব। সরযূ নদী, চিত্রকূট পাহাড় এ সব তো প্রকৃতির অঙ্গ। কিন্তু মহাভারতের যুগের পার্থিব বস্তু কোথাও রয়েছে? এখন কেউ যদি না বিশ্বাস করে, তা হলে উপায় কী?”

বৈঠকখানায় তখন ইংরেজি সংবাদমাধ্যমের এক সাংবাদিকও ঢুকে পড়েছেন। আলাপচারিতায় তিনিও অংশ নিলেন। এবং এ কথা সে কথা-র পর জানতে চাইলেন, এই যে প্রিয়ঙ্কা গান্ধী রাজনীতিতে যোগ দিয়েছেন, এ ব্যাপারে আপনি কী বলবেন? “কী আর বলব! এ সব মরশুমি।” বিপ্লবকে তিনি আরও কিছুটা খোঁচানোর চেষ্টা করলেন, এটা নিয়ে আপনাকে কোট করতে পারি? মানে আপনি কী বলতে চাইছেন, মরশুমি ফল না ফুল? তরুণ মুখ্যমন্ত্রী এড়িয়ে গেলেন, বললেন, “না না, ওসব না। মরশুমি রাজনীতিক। এই যেমন বাংলায় তো আমি রাজনীতি করি না। কিন্তু ভোটের প্রচারে এসেছি। আমাকেও বাংলায় মরশুমি বলতে পারেন।” বোঝা গেল, বিপ্লবও ক্রমশ পরিণত হতে শুরু করেছেন। দশ মাস হয়ে গেল। আগামী দিনে হয়তো আরও হবেন। ঠেকে বা দেখে। দিল্লিতে জীবনযুদ্ধও তো সহজ ছিল না। ঝান্ডেওয়ালায় সঙ্ঘের দফতরে কাটিয়েছেন অনেক দিন। রীতা বর্মার আপ্ত সহায়ক হওয়ার পর একদিন হঠাৎই বসন্ত আসে জীবনে। রেল ভবনের স্টেট ব্যাঙ্কের ব্রাঞ্চে চাকরি করতেন নীতি। রীতা বর্মার ওখানে অ্যাকাউন্ট ছিল। টাকা জমা দিতে গিয়েই চোখে-চোখ। তার পর প্রেম ও বিয়ে। ইদানীং পরিবারকে সময়ও দিতে পারেন না ঠিক মতো!

স্ত্রীয়ের সঙ্গে বিপ্লব দেব

কিন্তু এ হেন পজিটিভ মানুষটার জীবনেও তো কোনও আফসোস রয়েছে নিশ্চয়ই। কথাটা শুনে বিপ্লব হাতড়াতে শুরু করলেন। যেন খুঁজছেন, সত্যিই আফসোস রয়েছে কিনা কোনও! তার পর ভেবেচিন্তে বললেন, “একটা আফসোস রয়েছে। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে চেয়েছিলাম। বাবা স্বাভিমানী মানুষ ছিলেন। ছেলের পড়ার খরচ যোগাতে কারও কাছে হাত পাতবেন না। আমিও জেদ ধরে এক বছর কলেজ গেলাম না। শুধু চুটিয়ে সঙ্ঘের কাজ করে গেলাম।” এতটুকু বলেই বিপ্লব হেসে ফেললেন। তার পর বললেন, “দেখুন ইঞ্জিনিয়ার হতে পারিনি, কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী হয়ে গেলাম। কী বলবেন একে? আমি তো সময়েরই আবিষ্কার।”

Shares

Comments are closed.