শনিবার, মার্চ ২৩

মুক্তির জেদ

মুক্তির আনন্দ। মুক্তির রোমাঞ্চ। মুক্তির উত্তেজনা। মুক্তির উৎকণ্ঠা। এই কাহিনী মুক্তি খোঁজার মরীয়া সঙ্কল্পের। এই উপাখ্যান শিকল ছিঁড়ে বেরিয়ে পড়ে অনন্ত পথের অভিযাত্রার।

মেয়ে বলেই মরতে হবে এ আবার কী আহ্লাদ! তাই পথে তো নামতেই হবে সাথী।

সব কাহিনীরই একটা প্রেক্ষাপট থাকে। এই কাহিনীরও আছে। এবং পরম পরিতাপের বিষয়, সেই প্রেক্ষাপট আমাদের অজানা নয়। কী করেই বা অজানা থাকবে? নারী স্বাধীনতার দাবিতে সেমিনারে বিশ্লেষণধর্মী বিদগ্ধ আলোচনা করেন যাঁরা, তাঁরাই টেলিভিশনের টক শোতে ভাষণ দেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় তুফান তোলেন। আমরা নিত্যই তা দেখি, শুনি। আমরা ও দেখি শুনি মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী কত প্রকল্পই না ঘোষণা করেছেন কিশোরী-তরুণী-যুবতীদের শ্রীময়ী করে তোলার জন্য।

তবে এমনতর যাবতীয় প্রচেষ্টার প্রতি যথাবিহিত সম্মান জ্ঞাপন করেও প্রশ্ন তোলা যায়, ভাইসকল, বাস্তব চিত্রটি ঠিক কী? সমাজের সব মেয়ে কি স্বাধীনতার অক্সিজেন বুক ভরে নিতে পারছে? এখানেই তো উলটপুরান! “ফিরাবে বিমল চক্ষু কোন দিকে ফিরাবে?” কোন নারীর চোখে বিষাদ নেই?

কোথাও মেয়েবেলাকে ধ্বংস করে নাবালিকাকে বলপূর্বক বিয়ের পিঁড়িতে বসিয়ে যুপকাষ্ঠে বলি দেওয়া—-যার দু দিন পরেই রক্তশূন্য শরীরে অসহায় গর্ভধারণ। কোথাও কর্মহীন স্বামীর মদ্যপানের প্রতিবাদ করে পিঠে চ্যালা কাঠের বাড়ি খাওয়া, শরীরে ‘বিউটি মার্ক’ অজস্র কালশিটে। কোথাও গর্ভধারিনী মাকে বাড়ি থেকে পদাঘাত করে তাড়িয়ে দিয়ে তার অভুক্ত দিন যাপন ও তিলে তিলে মৃত্যু তারিয়ে তারিয়ে দেখা।

এই সব টুকরো টুকরো গল্পের মালা গাঁথা এক সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত সেলুলয়েড আখ্যান  তিন বয়সের তিন মহিলার জেহাদকে কুর্নিশ জানায়। এক মেয়ের বয়স উনিশ, যে বিয়ের আসর থেকে ছুটে পালায় নিজের জেদ কে সম্বল করে। আর একজন চল্লিশ ছুঁইছুঁই, গর্ভধারণে অক্ষমতা যাকে প্রতি রাতে এক বিভীষিকার সম্মুখীন হতে বাধ্য করে। নেশাগ্রস্ত স্বামীর হাতে প্রহার ও প্রহার। তৃতীয় জন এক ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধা, ছেলে-বৌমা-নাতিদের সংসারে যে নিতান্তই এক কাজের লোক। এরা তিন জনেই পলাতক, মুক্তির খোঁজে, নিজের মতো করে বাঁচার সাহস সঞ্চয়ের অন্বেষণে। তাই চলন্ত লরির উপরে খড়ের গাদায় বসে এরা ভবিষ্যৎকে হাতের মুঠোয় নেওয়ার স্বপ্নে বিভোর। অনেক বাধা বিঘ্ন পেরিয়ে সেই  স্বপ্ন পূরণ হবে কিনা, এরা নিশ্চিত নয়। তবু অনিশ্চয়তা এদের বিন্দু মাত্র দমাতে পারে না। মুক্তির হাতছানির এমনই জোর।

ছবির শেষ লগ্নে নিঃস্বতাকে সম্বল করেও তাই এরা প্রাণখোলা হাসি হেসে ঘোষণা করে, ” আমরা উড়নচণ্ডী”।

এই গল্প শুধু মুক্তি খোঁজার গল্প নয়। প্রত্যয়ী জেহাদের কাহিনীও। রন্ধ্রে রন্ধ্রে পুরুষ-তান্ত্রিক সমাজে যা বড়ই প্রাসঙ্গিক।

 

Shares

Leave A Reply