বুধবার, মার্চ ২০

কলিম খান নেই, তাঁর ভাবধারা আছে

হিন্দোল ভট্টাচার্য

ভাষাতাত্বিক অনেকেই আছেন। কিন্তু ভাষা নিয়ে সৃজনশীল আবিষ্কারক খুব কম। আমাদের ভাষার মধ্যেই নিহিত আছে কয়েক লক্ষ বছরের ইতিহাস। খুঁটিয়ে দেখলে ভাষার মধ্যে থেকেই আমরা খুঁজে পেতে পারি রহস্যে মোড়া অতীতের দিকদিগন্ত। কিন্তু তা তো সম্ভব নয় প্রথাগত ভাষাতাত্বিক পরিকাঠামোয় যেভাবে আমরা শব্দ-অর্থের চর্চার মধ্যে থাকি। তাহলে কীভাবে তা সম্ভব? সেই আলোই আমাদের দেখিয়েছিলেন কলিম খান এবং রবি চক্রবর্তী। তাঁদের ভাষাতত্ত্ব সম্পর্কে ভাবনা, আমাদের সময়ের থেকে কয়েকশো বছর এগিয়ে থাকা ভাবনার দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। কথ্য ভাষার গভীরে খনন করে, নগর-গ্রাম-দেশ-কালের সীমানা ছাড়িয়ে বুঝতে পারি, প্রতিটি শব্দই ইতিহাসের আকরকে বুকের মধ্যে নিয়ে আছে। প্রতিটি শব্দের মধ্যেই রয়েছে সময়ের গভীর অভিযাত্রা।

কিন্তু শুধুমাত্র ভাষাতাত্বিক বা ঐতিহাসিক ভাবনা নয়, তাঁরা এই ভাবনাকে অবলম্বন করে, ক্রিয়াভিত্তিক-বর্ণভিত্তিক দুখণ্ডের অভিধান পর্যন্ত তৈরি করে ফেললেন। বঙ্গতীর্থে মুক্তিস্নান, ভাষাই পরম আলো- এই সব গ্রন্থগুলিতে তিনি আমাদের দেখালেন কীভাবে বাংলা ভাষা থেকে সভ্যতার গতিপথে এগিয়ে যাওয়া যায়। তিনি দেখালেন যখন বাংলা ভাষা, বাংলা সংস্কৃতি এক হাইব্রিডাইজেশনের রাস্তায় ক্রমশ হাঁসজারু হয়ে প্রায় বিলুপ্তির পথে, তখন,  কীভাবে বাংলা ভাষাকে বাঁচানো যায়। কারণ, তাঁদের কথা অনুসরণ করলে, বলা যায়, বাংলা বাঁচলে সভ্যতা বাঁচবে।

কলিম খান এবং রবি চক্রবর্তীর কাজ আমাদের নিয়ে গেছে বাংলার মাঠে ঘাটে নিত্য-ব্যবহৃত শব্দগুলির, মেঠো প্রবাদগুলির, কথ্য সিন্ট্যাক্সগুলির কাছে। তথাকথিত ভাষার ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধস্রোত গড়ে না তুললে, ভাষার এলিটিজম ও এলিটিস্ট বীক্ষণে ভাষাকে পড়ার বা দেখার বা শোনার ইতিহাসের পালটা অন্য ইতিহাস না তৈরি করলে যে এই ভাষা ও সভ্যতাকে বাঁচানো যাবে না, তা তাঁদের কাজের মধ্যে আমরা পেয়েছি, তাঁদের ব্যাখ্যায় ও ভাবধারায় পুষ্ট হয়েছি। তিনি শুধু আমাদের সমৃদ্ধ করেছেন, তা-ই নয়, ঔপনিবেশিক ভাষাচর্চার স্কুলিং থেকেই আমাদের মুক্ত করেছেন। নিঃশব্দে এক বিপ্লবের সূচনা করেছেন তিনি ও শ্রী চক্রবর্তী। আর সেই বিপ্লবটি হলো ভাষাকে ধারণ করা ও পড়ার দৃষ্টিভঙ্গির বদল।

ব্যক্তিগত ভাবে আমি কলিমদার ছাত্র-ই বলা যায়। আজ থেকে না, সেই অপর পত্রিকার সময় থেকে, যখন কলিমদা তাঁর ভাবনাগুলো নব্বই দশকে লিখছেন। মনে হতো এক সম্পূর্ণ নতুন ভাবধারা। এই ভিন্ন ‘ভাবধারা’-র জন্যই হয়তো তিনি প্রতিষ্ঠিত বহু সংস্থা, মানুষ এবং একাডেমিক চর্চার প্রতিষ্ঠানের সহায়তা পাননি। কিন্তু তাঁর এই ভাবধারা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে গেছে বিভিন্ন মানুষের মনে। বিভিন্ন শব্দের দূরের ও কাছের  অর্থ থাকে যেমন, তেমন ক্রিয়াভিত্তিক মানেও তার সম্পদ। এই সম্পদের ধারণা আমাদের কাছে এর আগে নানা ভাবে এলেও, অনেকে  বললেও, কলিমদা এবং রবি চক্রবর্তী সেগুলিকে প্রতিষ্ঠিত করলেন যুক্তি, প্রমাণ, উদাহরণ ও কাজ দিয়ে । এই ভাবধারা ও পাঠ, শব্দের এই সব ইতিহাস, ভাবনা ও আবিষ্কার যখন আমাদের জীবনে-সাহিত্যে- কবিতায় ঢুকে পড়বে সচেতন ভাবে, একমাত্র তখনই ভাষা তার আপাত বদ্ধতা থেকে বেরিয়ে পেয়ে যেতে পারে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার প্রতিরক্ষা।        সারাজীবন ধরে কলিম খান এই মহান কাজে ও ভাবনায় নিজেকে যুক্ত রেখেছিলেন। শরীর খুব খারাপ ছিল। কিন্তু নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে তিনি ছিলেন সচেতন। এমনকী আমি বহুদিন পর্যন্ত জানতাম না তাঁর দুরারোগ্য ব্যাধির কথা। ফোনেই কথা হতো বেশি। বিভিন্ন শব্দ এবং তাদের বিভিন্ন  প্রচলিত- অপ্রচলিত মানে নিয়ে। আগ্রহী মানুষজন টাকা দিয়েছেন, অভিধান ও অন্যান্য বই কিনে নিয়ে গেছেন। এগিয়ে এসেছেন ছোট পত্রিকার লোকজন। ছোটখাটো আলোচনা সভা হয়েছে।  কিন্তু কোনও বড় প্রকাশক এগিয়ে আসেননি। আলোচনা করেননি। বা, আলোচনা হয়নি বিশ্ববিদ্যালয়ে। অথচ তাঁর ভাবনা নিয়ে তো আলোচনা হওয়ার কথা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে। অন্য দেশ ও অন্য ভাষা হলে তারা হয়তো কলিম খানকে মাথায় তুলে রাখতো, যেমন নোম চমস্কি সম্মান পান বিদেশে। কিন্তু, ভাষার জন্য এমন কাজ করেও  কলিমদা আমাদের  বাংলা ভাষার জন্য শহীদ বলা যায়। হয়তো সমসময় এমনভাবেই গুরুত্বপূর্ণ ও প্রকৃত ছাপ রেখে যাওয়া কাজ নিয়ে নীরব থাকে। পরে, বোঝা যায়, কী এক দুষ্প্রাপ্য ভাবনা ও যুগান্তকারী  ভাবধারা তিনি আমাদের দিয়ে গেছেন।

২ জানুয়ারি ১৯৫০, জন্ম পাঁশকুড়ার কাছে মামুদাবাদ গ্রামে। শুনেছি খুব কষ্ট করে কলিম খান নিজেকে এই জায়গায় নিয়ে এসেছিলেন। তাই এতো কাজ করলেও তিনি ছিলেন প্রকৃত মাটির কাছাকাছি থাকা মানুষ। এক অদ্ভুত সুর ছিল তাঁর গলায়, যেন কোনও গভীর করুণা ঝরে পড়ছে। নিজের ভাবনার জন্য লড়াই যেমন করেছেন, তেমন লড়াই করেছেন এই ভাবনাকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য-ও। এই দুই রকম স্ট্রাগল করে গেছেন তিনি। পাশে পেয়েছেন অল্প কয়েকজনকেই। ভাবি, আমাদের প্রকাশকরা, আমাদের বড় বড় অধ্যাপকরা, আমাদের সব সাহিত্য-ক্ষমতার প্রকোষ্ঠে থাকা লোকজন কি শুনতে পায়নি কলিমদার এই ভাবধারা? দেখেননি, তাঁর বা তাঁদের এই কাজ? ভাষার জন্য কি পাশে দাঁড়ানো উচিত ছিল না এই মহান ভাষাপ্রেমিকের?

১১ জুন, ২০১৮ সন্ধ্যায় ব্রহ্মপুর থেকে তিনি চলে গেলেন, সন্ধ্যায়।

রবি চক্রবর্তী অশীতিপর। কলিম খান নেই। এখন তাঁর এই সব ভাবনা এবং বইগুলি যাতে ধাক্কা দেয় আমাদের পরিচিত ভাষাবোধের অবোধ জগতে, তার দায়িত্ব নেওয়ার সময়। এলিয়ট মারা যেতে এজরা পাউন্ড বলেছিলেন শুধু এইটুকুই- ‘Read him’।

বাংলার পাঠকদের কাছে এই মনোযোগ দাবী করে তাঁদের কাজ। কারণ “পথ আমাদের সামনে খোলা হয়েই গিয়েছে। বাংলাভাষার প্রত্যেক শব্দের পশ্চাতপটের রহস্য উন্মোচন করতে হাত লাগান। জ্ঞানের নব নব দিগন্ত উন্মোচিত হোক প্রত্যেক বাংলাভাষীর সামনে। আর, জ্ঞানচক্ষু খুলে গেলে বাকি কাজটি বঙ্গভাষীগণ নিজেরাই করে নিতে পারবেন”।   (বঙ্গতীর্থে মুক্তিস্নান, কলিম খান ও রবি চক্রবর্তী)

কাঁসাই নদীর তীরে এখন ঘুমিয়ে আছেন তিনি।

(হিন্দোল ভট্টাচার্য। নব্বই দশকের কবি। ‘তুমি, অরক্ষিত,’ ‘তারামণির হার’, ‘জগৎগৌরী কাব্য’, ‘মেডুসার চোখ’, ‘তালপাতার পুথি’, ‘যে গান রাতের’, ‘তৃতীয় নয়নে জাগো’ প্রভৃতি কাব্যগ্রন্থের প্রণেতা। পেশায় বিজ্ঞাপনের কপিরাইটার এই কবি পেয়েছেন ‘জগৎগৌরী কাব্য’-র জন্য বীরেন্দ্র পুরস্কার।)

Shares

Leave A Reply