বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ১৪

মহাভারতের এক উপেক্ষিত মহানায়ক যুযুৎসু, ধৃতরাষ্ট্রের পুত্র হয়েও লড়েছিলেন পাণ্ডবপক্ষে

রূপাঞ্জন গোস্বামী

ধৃতরাষ্ট্রের সন্তানলাভের ইচ্ছা অদৃষ্টের খেয়ালে বার বার বিঘ্নিত হচ্ছিল। তখন হস্তিনাপুরে এসেছিলেন বশিষ্ঠ মুনির প্রপৌত্র ও পরাশর মুনির পুত্র জ্ঞানান্বেষী ঋষি ব্যাসদেব। ধৃতরাষ্ট্রজায়া গান্ধারী ব্যাসদেবের যথাসম্ভব সেবা করেছিলেন এবং তার পুত্রলাভের ইচ্ছা ব্যাসদেবকে জানিয়েছিলেন। গান্ধারীর আতিথ্যে খুশি হয়ে ব্যাসদেব তাঁকে শতপুত্রের বর দিয়েছিলেন।

অন্যদিকে ধৃতরাষ্ট্রও সন্তানলাভের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন। কারণ গান্ধারীর গর্ভধারণের সকল চেষ্টা ব্যর্থ হচ্ছিল। বংশরক্ষার তাগিদে ধৃতরাষ্ট্র বৈশ্য দাসী সুগধার (মতান্তরে সৌবলী) সঙ্গে মিলিত হন। তখনকার সময় রাজবংশে এই প্রথা প্রচলিত ছিল।

যথাসময়ে গান্ধারী ও সুগধা নামের দাসীটি গর্ভবতী হলেন। গান্ধারীর উদর এতই বড় হয়েছিল স্বর্গের দেবতারাও আশঙ্কিত হয়েছিলেন গান্ধারী ও গর্ভের সন্তানদের জীবন নিয়ে। সবার আশঙ্কাকে সত্যি করে গর্ভপাত হয়ে গিয়েছিল গান্ধারীর। কিন্তু ব্যাসদেবের মতো মহাঋষি বর বিফলে যেতে পারে না।

গান্ধারীর গর্ভপাত হওয়ার পর, গর্ভ থেকে বেরিয়ে আসা মাংসপিণ্ড থেকে ব্যাসদেব ১০১টি ভ্রূণ আলাদা করে ১০১টি ঘিয়ের কলসিতে রাখলেন। প্রথম কলসি থেকে জন্ম নিয়েছিলেন দুর্যোধন। ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর তাঁর কান্নার আওয়াজ শুনে পৃথিবীর সবকটি জঙ্গলের ভয়ঙ্কর পশুরা একযোগে চিৎকার করে উঠেছিল। যা ছিল অত্যন্ত অশুভ লক্ষণ।

দুর্যোধনের জন্মের এক মাস পরে বাকি ১০০টি কলসি থেকে জন্ম নিয়েছিলেন ধৃতরাষ্ট্রের এক কন্যা এবং আরও নিরানব্বই জন পুত্র। কন্যার নাম ছিল দুঃশলা। একই সময় দাসী মা সুগধার গর্ভে জন্ম নিয়েছিলেন মহাভারতের এক উপেক্ষিত বীর যুযুৎসু। যিনি কৌরব হওয়া সত্ত্বেও ধৃতরাষ্ট্রের পুত্র হওয়ার কৌলীন্য পাননি কোনও দিন। হস্তিনাপুর দাপিয়ে বেড়াতেন দুর্যোধন ও তাঁর ৯৯জন ভাই। যুযুৎসুর জীবন কেটেছে একা, দাসীপুত্র হওয়ার অপরাধে।

তৃতীয় কৌরব বিকর্ণ দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণের সময় প্রতিবাদ করলেও কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে কৌরবপক্ষে ছিলেন। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে ভীমের সঙ্গে তাঁর যুদ্ধ হয়। সেই সময় ভীম দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণকালে বিকর্ণর ভূমিকার কথা মনে করিয়ে দিলে বিকর্ণ বলেছিলেন, ‘তখন তা আমার ন্যায় মনে হয়েছিল, এখন যুদ্ধ আমার কাছে ন্যায় মনে হচ্ছে। এসো ভীম যুদ্ধ করো।” বিকর্ণও ন্যায়ের পথ থেকে সরে গিয়ে দুর্যোধনের সঙ্গেই ছিলেন। যুযুৎসু ছিলেন একমাত্র কৌরব, যিনি স্রোতের বিপক্ষে হেঁটে ধর্মের পথে গিয়েছিলেন।

যিনি কখনও নিজের বিবেকের সঙ্গে তঞ্চকতা করেননি। আমৃত্যু ছিলেন ন্যায়ের পথে। কারণ কৌরব হওয়া সত্ত্বেও ধর্ম ও অধর্ম বিষয়ে তাঁর ছিল জ্ঞান ছিল গভীর। তবুও মহাভারতের রথী মহারথীদের ভিড়ে চাপা পড়ে গেছিল এই অসামান্য ব্যক্তিত্বটির অবদান।

মাত্র কয়েকজন কৌরব জানতেন অশুভ শক্তি মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে তাঁদের কুলে। তাঁরা তাঁদের বিবেকের আহ্বানকে উপেক্ষা করেছিলেন। কিন্তু যুযুৎসু ছিলেন ব্যতিক্রম। বাল্যকাল থেকেই পাণ্ডবদের সাহায্য করে গিয়েছিলেন। দুর্যোধনের তঞ্চক প্রবৃত্তি থেকে জন্ম নেওয়া নানা হীন ষড়যন্ত্রের পরিকল্পনা আগাম পাণ্ডবদের জানিয়ে দিয়েছিলেন। একবার মধ্যমপাণ্ডব ভীমকে পানীয় জলে বিষ প্রয়োগে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করেছিলেন দুর্যোধন। কিন্তু যুযুৎসু আগেই সতর্ক করায় ভীম নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে যান।

মহাভারতের যুদ্ধকে বলা হয় ধর্মযুদ্ধ। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের প্রাক্কালে যুযুধান দু’পক্ষের সমস্ত কুশীলবকে যে কোনও একটি পক্ষ অবলম্বনের সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছিল। নিঃসঙ্কোচে ও দ্বিধাহীনভাবে যে কেউ যে কোনও পক্ষে তাঁদের ইচ্ছা অনুযায়ী যোগদান করতে পারতেন। যুযুৎসু বিবেকের টানে  চলে গিয়েছিলেন পাণ্ডব শিবিরে। দুর্যোধনের আর এক ভাই বিকর্ণ, যাঁর সঙ্গে যুযুৎসুর ছিল সখ্যতা, অত্যন্ত সৎ হয়েও তিনি রয়ে গিয়েছিলেন অধর্মের শিবিরে।

অনেকে ভাবেন, যুযুৎসু’র পাণ্ডব শিবিরে যাওয়া কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের ওপর প্রভাব ফেলার মতো কোনও ঘটনাই ছিল না। কিন্তু সত্যিই কি তাই! যুদ্ধবিদ্যায় যুযুৎসুর সঙ্গে দুর্যোধন বাদে অন্য কোনও ধৃতরাষ্ট্রপুত্রের তুলনাই হয় না। তিনি ছিলেন কৌরবকুলে থাকা সেই বিরল শ্রেণির যোদ্ধাদের একজন, যাঁদের বলা হত অতিরথী। যিনি একা একইসঙ্গে ৬০০০০ সেনার সঙ্গে লড়তে পারতেন। যুযুৎসু কৌরবপক্ষে থাকলে পাণ্ডবদের যুদ্ধজয় সম্ভবত আরও বিলম্বিত হত।

কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ চলাকালীন যুযুৎসু দেখেছিলেন, তাঁর পিতার ঔরসজাত সন্তানরা একে একে ধরাশায়ী হচ্ছেন। প্রিয় গুরুজন ও আচার্যরা প্রাণ হারাচ্ছেন। তবুও ন্যায়ের পথে অবিচল হয়ে রক্তের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছিলেন যুযুৎসু। মহাভারতের যুদ্ধের শেষে জীবিত ছিলেন ১১জন এবং যুযুৎসু ছিলেন যুদ্ধশেষে জীবিত থাকা একমাত্র ধৃতরাষ্ট্রপুত্র।

যুদ্ধের পর অশান্ত হয়ে উঠেছিল হস্তিনাপুর। যুযুৎসু এর কারণ জানতে হস্তিনাপুরে গেলে নগরবাসীরা তাঁর সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন। তাঁকে কৌরবদের হত্যাকারী ও প্রতারক বলেন। যুযুৎসু জানতেন সত্যের পথ কোনও দিন মসৃণ হয় না, তাই সামান্যতম প্রতিবাদও করেননি। সমস্ত অপমান সহ্য করেছিলেন, সময়ের হাতে সত্যকে সঁপে দিয়ে।মহাপ্রস্থানে যাওয়ার আগে পাণ্ডবরা হস্তিনাপুরের তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্ব দিয়ে গিয়েছিলেন যুযুৎসুকে। কিন্তু রাজা হিসেবে অভিষিক্ত করে গিয়েছিলেন অর্জুনের পৌত্র পরীক্ষিৎকে। আপাতশান্ত, ধীরস্থির অথচ মহাপরাক্রমশালী মহানায়ক যুযুৎসু তাই মহাভারতের শেষ পর্বেও রয়ে গিয়েছিলেন উপেক্ষিত। 

Comments are closed.