সংসদ হামলার প্রথম শহিদ কমলেশ কুমারী, জীবন দিয়ে রুখে দিয়েছিলেন পাকিস্তানের চক্রান্ত

ভারতের একমাত্র নারী যিনি বীরত্ব, নির্ভীকতা, বিক্রম প্রদর্শন ও সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের জন্য পেয়েছিলেন 'অশোকচক্র'।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

রূপাঞ্জন গোস্বামী

উত্তর প্রদেশের সিকান্দারপুরের কমলেশ কুমারী যাদব সিআরপিএফে যোগ দিয়েছিলেন ১৯৯৪ সালে। প্রথমে ছিলেন ১০৪ নং র‍্যাপিড অ্যাকশন ফোর্সে। এর পর ২০০১ সালের ১২ জুলাই, কমলেশের পোস্টিং হয়েছিল সিআরপিএফের ৮৮ নং মহিলা ব্যাটালিয়নে। ছিলেন সংসদ ভবনের নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্বে। তখনও সংসদ ভবনের সুরক্ষায় নিয়োজিত মহিলা নিরাপত্তারক্ষীদের হাতে রাইফেল তুলে দেয়নি সিআরপিএফ। তাই কমলেশ কুমারী, কেবলমাত্র একটি ওয়াকিটকি নিয়ে সংসদের আয়রন গেট-ওয়ানে প্রহরায় থাকতেন। সঙ্গে থাকতেন অস্ত্রধারী পুরুষ জওয়ানেরা। কমলেশের কাজ ছিল সংসদ ভবনে প্রবেশরত মহিলাদের থামানো ও তল্লাসি করা।

১৩ ডিসেম্বর, ২০০১

সংসদের অধিবেশন মুলতুবি হয়ে গিয়েছিল কিছুক্ষণের জন্য। প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ী ও বিরোধী পক্ষের নেত্রী সনিয়া গান্ধী চলে গিয়েছিলেন নিজেদের বাসভবনে। বেশিরভাগ সাংসদ তখনও সংসদ ভবনেই ছিলেন। সকাল এগারোটা চল্লিশ মিনিটে, ‘পার্লামেন্ট স্ট্রিট’ গেটটি দিয়ে লালবাতি জ্বালিয়ে পার্লামেন্টের ক্যাম্পাসে ঢুকে পড়েছিল DL 3C J 1527 নাম্বার প্লেট লাগানো একটি দুধসাদা অ্যাম্বাসাডর। উইন্ডস্ক্রিনে লাগানো ছিল পার্লামেন্ট ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের স্টিকার।

ভিভিআইপির গাড়ি ভেবে ছেড়ে দিয়েছিল গেটের নিরাপত্তারক্ষীরা। কিন্তু প্রলয় ঘটানোর অপেক্ষায় গাড়ির ভেতরে বসে ছিল লস্কর-ই-তইবা এবং জইশ-ই- মহম্মদের পাঁচ জঙ্গি। এরা হলো হামজা, হায়দার, রানা, রাজা ও মহম্মদ। গাড়িতে ছিল ৩০ কেজি আরডিএক্স। জঙ্গিদের সঙ্গে ছিল একে-৪৭ অ্যাসল্ট রাইফেল, গ্রেনেড, গ্রেনেড লঞ্চার এবং পিস্তল। একজন জঙ্গি পরেছিল আরডিএক্স বোঝাই জ্যাকেট।

প্রতীকী ছবি।

জঙ্গিদের প্রথম দেখেছিলেন কমলেশ কুমারী

পার্লামেন্ট ক্যাম্পাসে ঢুকেই অ্যাম্বাসাডরটি আচমকা স্পিড বাড়িয়ে দিয়েছিল। সংসদের মূলভবনের প্রধান ফটকটি পেরিয়ে গাড়িটি যাচ্ছিল বিজয়চক-রাইসিনার দিকে থাকা আয়রন গেটের দিকে। সেই গেটে পাহারায় ছিলেন সিআরপিএফের মহিলা কনস্টেবল কমলেশ কুমারী যাদব। যিনি কয়েক মিনিট আগে থেকেই তীক্ষ্ণ নজর রাখতে শুরু করেছিলেন সাদা অ্যাম্বাসাডরটির ওপর। পার্লামেন্টের নিয়মিত আসা গাড়িগুলি একটি নির্দিষ্ট ছন্দে আসে। কিন্তু লালবাতি জ্বালানো সাদা অ্যাম্বাসাডরটি এলোমেলোভাবে ছুটে আসছিল।

কমলেশ কুমারীর ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় তাঁকে জানিয়েছিল, ভয়ঙ্কর কোনও ঘটনা ঘটতে চলেছে। কমলেশ কুমারী ছুটে গিয়ে বন্ধ করে দিয়েছিলেন তাঁর গেট। কিন্তু অ্যাম্বাসাডরটি তাঁর গেটের দিকে না এসে, হঠাৎ রাস্তা ছেড়ে ডানদিকে বাঁক নিয়েছিল। যেদিকে আছে সংসদের মূলভবনের গেট নাম্বার এগারো এবং বারো। চিৎকার করে গাড়িটিকে থামতে বলেছিলেন কমলেশ কুমারী। গাড়ির ভেতর একে-৪৭ নিয়ে বসে থাকা পাঁচ জঙ্গিকে তিনিই প্রথম দেখেছিলেন। সঙ্গে সঙ্গে ওয়াকিটকিতে খবরটি দিয়েছিলেন উর্ধ্বতন কতৃপক্ষকে। একই সঙ্গে প্রাণপণে চিৎকার করে সচেতন করতে শুরু করেছিলেন সবাইকে। বিশেষ করে পার্লামেন্ট বিল্ডিংয়ের এগারো নাম্বার গেটের প্রহরায় থাকা জওয়ান সুখবিন্দর সিংকে। কারণ, গাড়িটি সেদিকেই যাচ্ছিল।

সংসদ ভবন, সামনে প্রধান প্রবেশদ্বার।

গাড়ি থেকে নেমে পড়েছিল এক জঙ্গি

জঙ্গিটির পরনে ছিল বিস্ফোরক বোঝাই জ্যাকেট। গুলি ছুঁড়িতে ছুঁড়তে সে এগিয়ে চলেছিল মূলভবনের প্রধান প্রবেশদ্বারের দিকে। মুখের সামনে ওয়াকিটকি ধরে কমলেশ কুমারী তখন চিৎকার করে বলে চলেছেন জঙ্গিদের প্রতিটি পদক্ষেপ। বলে চলেছেন, দলে কতজন সন্ত্রাসবাদী আছে, তারা কোনদিকে এগোচ্ছে, তাদের হাতে কী কী অস্ত্র আছে। তাঁর চিৎকার শুনে সাইরেন বাজিয়ে দিয়েছিলেন কেউ। সচেতন হয়ে উঠেছিলেন সংসদের নিরাপত্তারক্ষীরা। নিঃশব্দে সংসদভবনে প্রবেশের পরিকল্পনা বানচাল হয়ে যাওয়ায়, জঙ্গিদের সব রাগ গিয়ে পড়েছিল নিরস্ত্র কমলেশ কুমারীর ওপর।

ক্যামেরায় ধরা পড়েছিল জঙ্গিদের ছবি।

কমলেশ কুমারীর শরীর লক্ষ্য করে, ছুটে এসেছিল এক ঝাঁক উত্তপ্ত সিসা। আঘাত করেছিল কমলেশ কুমারীর পাকস্থলীতে।   লুটিয়ে পড়েছিলেন রক্তাক্ত কমলেশ কুমারী, কিন্তু হাত থেকে ওয়াকিটকি ছাড়েননি। সেই অবস্থাতেই জঙ্গিদের গতিবিধি জানানোর চেষ্টা করে চলেছিলেন। কিন্তু কয়েক মিনিটের মধ্যেই ঢলে পড়েছিলেন মৃত্যুর কোলে। সংসদ হামলার প্রথম বলি হয়েছিলেন, দুই নাবালিকা মেয়ে জ্যোতি ও শ্বেতার মা, অবধেষ কুমারের স্ত্রী কমলেশ কুমারী যাদব।

এভাবেই অমর হয়ে গিয়েছিলেন কমলেশ কুমারী।

শুরু হয়েছিল গুলির লড়াই

বিস্ফোরক বোঝাই জ্যাকেট পরা যে জঙ্গিটি সংসদ ভবনের প্রধান প্রবেশদ্বারের দিকে গিয়েছিল। তাকে থামাবার চেষ্টা করেছিলেন ওই গেটে থাকা সিকিউরিটি অফিসার জেপি যাদব। তাঁকে পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে গুলি করে হত্যা করেছিল জঙ্গিটি। মূলভবনে ঢোকার প্রধান প্রবেশদ্বার সহ সবকটি গেট, কমলেশ কুমারী সতর্ক করে দেওয়ার জন্য আগেই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। তাই জঙ্গিটি প্রবেশ করতে পারেনি সংসদের ভেতর। জঙ্গিটিকে গুলি করে ধরাশায়ী করে দিয়েছিলেন, সুখবিন্দর সিং। যাঁকে সচেতন করেছিলেন কমলেশ কুমারীই। ধরা পড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় নিজের শরীরে থাকা বিস্ফোরক বোঝাই জ্যাকেটে বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল আহত জঙ্গিটি। প্রবল বিস্ফোরণে কেঁপে উঠেছিল সংসদ ভবন। ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল আত্মঘাতী জঙ্গির দেহ।

বাকি চারজন জঙ্গিকে নিয়ে ছুটে চলা গাড়িটি, তাড়াহুড়োতে ধাক্কা মেরেছিল উপরাষ্ট্রপতি কৃষ্ণকান্তের কনভয়ের একটি গাড়িতে। গাড়িটিতে কৃষ্ণকান্ত ছিলেন না। উপায় না দেখে, গাড়ি থেকে নেমে পড়েছিল চার জঙ্গি। দশ ও এগারো নাম্বার গেটের মাঝে থাকা পাঁচিল টপকে জঙ্গিরা চলে গিয়েছিল নয় নাম্বার গেটের দিকে। সেদিকেই ছিল বাজপেয়ী আর আদবানীর অফিস। দিল্লি পুলিশ ও সিআরপিএফ জওয়ানদের সাথে জঙ্গিদের গুলির লড়াই শুরু হয়েছিল আট ও নয় নাম্বার গেটের সামনে।

জঙ্গিদের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছিলেন দিল্লি পুলিশের চার জওয়ান ও সংসদের এক মালি। নিরাপত্তারক্ষীদের গুলিতে ওখানেই প্রাণ হারিয়েছিল তিন জঙ্গি। চতুর্থ জঙ্গিটি এরপরও মূলভবনের ভেতরে ঢোকার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল। সাত ও ছ’নাম্বার গেট পেরিয়ে জঙ্গিটি পৌঁছে গিয়েছিল পাঁচ নাম্বার গেটের সামনে। ওই গেট দিয়েই কিছুক্ষণ পরে সংসদভবনে ঢোকার কথা ছিল প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ীর। জঙ্গিটি টিভির তার ধরে সংসদভবনের দোতলায় ওঠার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু সফল হওয়ার আগেই প্রাণ হারিয়েছিল সিআরপিএফের গুলিতে। থেমেছিল রক্তাক্ত লড়াই, নিকেশ হয়েছিল পাঁচ পাকিস্তানি জঙ্গি। সংসদকে বাঁচাতে প্রাণ দিয়েছিলেন ন’জন অকুতোভয় ভারতীয়।

কমলেশ কুমারী সতর্ক না করলে ভয়ঙ্কর বিপদের মুখে পড়তো ভারত

সংসদের মূলভবনের বাইরে যখন চলছিল গুলির লড়াই, তখন আট নাম্বার গেটের ভেতরে, মূলভবনে ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লালকৃষ্ণ আদবানি, ভেঙ্কাইয়া নাইডু, অরুণ জেটলি এবং ভি কে মালহোত্রা। এগারো নাম্বার গেটের ভেতরে, নিজের কক্ষে ছিলেন উপরাষ্ট্রপতি কৃষ্ণকান্ত। সাথে ছিলেন মহেশ চন্দ্র শর্মা। পাঁচ নাম্বার গেটে ছিলেন, প্রতিরক্ষামন্ত্রী জর্জ ফার্নান্ডেজ। সংসদের সেন্ট্রাল হলে ছিলেন প্রায় ২৫০ জন সাংসদ।

সংসদ ভবনে জঙ্গিরা একবার ঢুকে পড়তে পারলে কী ঘটতো, তা ভাবলেই শিউরে উঠতে হয়। জঙ্গিরা চেয়েছিল ভারতের সমস্ত প্রথমসারির রাজনৈতিক নেতাদের শেষ করে দিয়ে ভারতকে টুকরো টুকরো করে দিতে। বড় বড় নেতাদের পণবন্দি করে রাখারও উদ্দেশ্য ছিল তাদের। পার্লামেন্টে বহুদিন থাকার পরিকল্পনা নিয়ে তারা ব্যাকপ্যাকে রেখেছিল প্রচুর শুকনো ফল। এছাড়াও সংসদের বাইরে সুবিধামতো জায়গায় গাড়িটিতে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে প্রচুর প্রাণহানি ঘটানোর উদ্দেশ্য ছিল জঙ্গিদের।

 জঙ্গিদের সব পরিকল্পনা ব্যর্থ করে দিয়েছিলেন কমলেশ যাদব

সবার আগে কমলেশ সতর্ক করেছিলেন বলেই, মূলভবনের সবকটি প্রবেশদ্বার বন্ধ করা সম্ভব হয়েছিল। মূলভবনের বাইরে থাকতে বাধ্য হয়েছিল সন্ত্রাসবাদীরা। গুলির লড়াই থামার পর, খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল বত্রিশ বছরের কমলেশ কুমারীকে। তখনও নিজের পোস্ট আগলে পড়েছিলেন প্রাণহীন কমলেশ কুমারী। যাঁর কাছে চিরকালের জন্য ঋণী হয়ে গিয়েছিল বিশ্বের সর্ববৃহৎ গনতন্ত্র।

যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে, দেশের জন্য বীরত্ব, নির্ভীকতা, বিক্রম প্রদর্শন এবং সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের কারণে, ভারতের প্রথম মহিলা হিসেবে কমলেশ কুমারী যাদব পেয়েছিলেন সর্বোচ্চ জাতীয় সম্মান ‘অশোকচক্র'( মরণোত্তর)। সেই কমলেশ কুমারী, যিনি নিজের জীবনের বিনিময়ে একাই বানচাল করে দিয়েছিলেন পাকিস্তানের ঘৃণ্য চক্রান্ত।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More