‘মিস বেলভেডিয়ার’, যে ঐতিহাসিক গাড়িকে মাটির নীচে বন্দি রাখা হয়েছিল পঞ্চাশ বছর

আমেরিকার ওকলাহোমা স্টেটের টালসা শহরে ঘটেছিল এই ঘটনাটি।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

রূপাঞ্জন গোস্বামী

আমেরিকার ওকলাহোমা স্টেটের সুবর্ণজয়ন্তী ছিল ১৯৫৭ সালে। সেই উপলক্ষ্যে ওকলাহোমার টালসা শহর আয়োজন করেছিল এক অদ্ভুত প্রতিযোগিতার। যে শহরবাসী বলতে পারবেন, পঞ্চাশ বছর পর টালসা শহরের জনসংখ্যা কত হবে, তিনি পুরস্কার পাবেন একটি নতুন প্লিমাউথ বেলভেডিয়ার সেডান গাড়ি।

তবে গাড়িটি বিজয়ী হাতে পাবেন ২০০৭ সালে

কারণ ওকলাহোমার রাজ্যের শতবর্ষপূর্তি হবে ২০০৭ সালে। গাড়িটিকে তাই আগামী পঞ্চাশ বছর রেখে দেওয়া হবে, মাটির নীচে তৈরি করা একটি কংক্রিটের ভল্টে। টালসা শহরের মেয়রের উপস্থিতিতে, ২০০৭ সালে খোলা হবে ভল্টটি। বিজয়ী যদি জীবিত থাকেন তিনিই পাবেন গাড়িটি। তিনি প্রয়াত হলে গাড়িটি দেওয়া হবে তাঁর নিকট কোনও আত্মীয়কে। এছাড়াও ব্যাঙ্কের সেভিংস অ্যাকাউন্টে রাখা হবে ১০০ ডলার। সেই টাকা পঞ্চাশ বছর পর বেড়ে যত টাকা হবে, তা দেওয়া হবে বিজয়ীকে।

প্লিমাউথ বেলভেডিয়ার সেডান।

হই হই করে শুরু হয়ে গিয়েছিল প্রতিযোগিতা। উদ্যোক্তাদের কাছে আসতে শুরু করেছিল হাজার হাজার পোস্ট কার্ড। তাতে লেখা ছিল পঞ্চাশ বছর পরে টালসা শহরের আনুমানিক জনসংখ্যা। একটি গোপন খাতায় লেখা হয়েছিল প্রতিযোগীদের নাম ঠিকানা ও তাঁদের অনুমান করা জনসংখ্যা। তারপর খাতাটিকে রাখা হয়েছিল ব্যাঙ্কের সুরক্ষিত ভল্টে। এর পর, টালসা শহরের কোর্টহাউস প্রাঙ্গণে বানানো হয়েছিল, ১২ x ২০ ফুট মাপের কংক্রিটের ভল্ট। উদ্যোক্তারা দাবী করেছিলেন, এই কংক্রিটের ভল্টটি যে কোনও প্রাকৃতিক দুর্যোগ, এমনকি পারমাণবিক বিস্ফোরণও সইতে পারবে।

১৫ জুন, ১৯৫৭  

শো-রুম থেকে চার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে, টালসা শহরের কোর্টহাউস প্রাঙ্গণে এসেছিল, সোনালি বালি রঙা একটি নতুন ‘প্লিমাউথ বেলভেডিয়ার’ সেডান। গাড়িটি দিয়েছিল প্লিমাউথ মোটর। উদ্যোক্তারা গাড়িটির নাম দিয়েছিলেন ‘মিস বেলভিডিয়ার‘। কয়েক হাজার মানুষের উপস্থিতিতে, গাড়িটিকে ক্রেনে করে নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল মাটির নীচে থাকা কংক্রিটের ভল্টে।

গাড়িটির ভেতরে বিজয়ীর জন্য রাখা হয়েছিল পাঁচ গ্যালন গ্যাসোলিন, পার্কিং লটের টিকিট, সিগারেট, দেশলাই, চিরুনি, লিপস্টিক, চ্যুইংগাম, টিসু পেপার, রেনকোট ও খুচরো পয়সা। একটি বিশেষ প্যাকেটে রাখা হয়েছিল আমেরিকার পতাকা ও বিভিন্ন শহর থেকে আসা গণ্যমান্যদের শুভেচ্ছা পত্র।

রাখা হয়েছিল সেভিংস অ্যাক্যাউন্টের নথিপত্র, যে অ্যাক্যাউন্টে ছিল ১০০ ডলার। এছাড়াও রাখা হয়েছিল, প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারীদের পাঠানো পোস্টকার্ডগুলি। তারপর প্লাস্টিকের চাদরে মুড়ে ফেলা হয়েছিল গাড়িটিকে। কংক্রিট দিয়ে ঢালাই করে দেওয়া হয়েছিল ভল্টের ছাদ। কালকুঠরিতে  বন্দি হয়ে গিয়েছিল মিস বেলভেডিয়ার। পঞ্চাশ বছরের জন্য।

ভল্টের ওপরে লাগানো হয়েছিল এই ফলকটি।

 ১৪ জুন,২০০৭ 

ওকলাহোমা স্টেটের শতবর্ষপূর্তি উপলক্ষ্যে খোলা হয়েছিল ভল্টটি। প্রচুর মানুষ ভিড় করেছিলেন ঐতিহাসিক ঘটনাটির সাক্ষী হওয়ার জন্য। পঞ্চাশ বছর ধরে মাটির তলায় কী অবস্থায় আছে মিস বেলভিডিয়ার, তা জানতে আগ্রহী ছিলেন তাঁরা। ভল্টের ওপরের মাটি সরিয়ে, কংক্রিটের ছাদ ভাঙার পর দেখা গিয়েছিল, ভল্টটি চৌবাচ্ছায় পরিণত হয়ে গিয়েছে। প্রায় দু’হাজার গ্যালন জলের নীচে ডুবে আছে মিস বেলভেডিয়ার।

ছেঁচে ফেলা হয়েছিল ভল্টে জমা জল। মিস বেলভেডিয়ারকে ঢেকে রাখা প্লাস্টিকের চাদরের ওপর, কাদামাটি জমে পাথরের মতো শক্ত হয়ে গিয়েছিল। ক্রেনে করে তোলা হয়েছিল গাড়িটিকে। ট্রাকে চাপিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল টাউন হলে। জাঁকজমক সহকারে মিস বেলভেডিয়ারের শরীর থেকে তুলে নেওয়া হয়েছিল প্লাস্টিকের চাদর। মনখারাপ হয়ে গিয়েছিল শহরবাসীর।

শহরবাসীরা দেখেছিলেন, ঝাঁ চকচকে মিস বেলভেডিয়ারের করুণ অবস্থা। দীর্ঘদিন ধরে জলে ডুবে থাকার কারণে, সারা শরীর জুড়ে বাসা বেঁধেছিল মরচে। গাড়ির ইঞ্জিন থেকে টায়ার, সবই নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। নষ্ট হয়ে গিয়েছিল গাড়ির ভেতরে বিজয়ীর জন্য রাখা সব পুরস্কার।

প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হয়েছিলেন রেমন্ড হাম্বার্টসন

আটশো একুশ জন প্রতিযোগীর মধ্যে বিজয়ী হয়েছিলেন রেমন্ড হাম্বার্টসন। তাঁর অনুমান প্রায় মিলে গিয়েছিল। তিনি অনুমান করেছিলেন, ২০০৭ সালে টালসা শহরের জনসংখ্যা হবে ৩,৮৪,৭৪৩। প্রকৃত জনসংখ্যা ছিল ৩,৮২,৪৫৭। বিজয়ী হাম্বার্টসনের খোঁজ করতে গিয়ে জানা গিয়েছিল, রেমন্ড হাম্বার্টসন প্রয়াত হয়েছেন ১৯৭৯ সালে এবং তাঁর স্ত্রী ১৯৮৮ সালে।

তাঁদের কোনও সন্তান ছিল না। তাই তাঁর নিকট আত্মীয়দের খোঁজ করা শুরু হয়েছিল। খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল হাম্বার্টসনের বোন ও বোনের ছেলেকে। তাঁদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল জং ধরা মিস বেলভেডিয়ারকে। দেওয়া হয়েছিল ৬৬৬.৮৫ ডলার। সেভিংস অ্যাকাউন্টে রাখা ১০০ ডলার বেড়ে এই টাকা হয়েছিল।

নতুন জীবন কি পাবে মিস বেলভেডিয়ার!

হাম্বারটনের আত্মীয়রা, ২০০৭ সালের নভেম্বর মাসে, মিস বেলভেডিয়ারকে নিয়ে গিয়েছিলেন নিউ জার্সিতে। কারণ গাড়িটির সঙ্গে জড়িয়ে ছিল ইতিহাস। তাই তাঁরা চাইছিলেন মিস বেলভেডিয়ারকে তার আগের সৌন্দর্য ফিরিয়ে দিতে।  গাড়িটি তাঁরা দান করেছিলেন ‘আল্ট্রা-ওয়ান’ নামে একটি সংস্থাকে। সংস্থাটি জানিয়েছিল মিস বেলভেডিয়ারের শরীর থেকে মরচে তুলতে সময় লাগবে।

আল্ট্রা-ওয়ানের মালিক ডুইট ফস্টার, ২০০৯ সালের মে মাসে, জনসমক্ষে এনেছিলেন মিস বেলভেডিয়ারের কয়েকটি ছবি। দেখা গিয়েছিল, মিস বেলভেডিয়ারের শরীরে শক্ত হয়ে জমে থাকা কাদা ও মরচে, পুরোটাই উঠিয়ে ফেলা হয়েছে।

ফস্টার জানিয়েছিলেন, তিনি ১৯৫৭ সালে তৈরি হওয়া, একটি ‘প্লিমাউথ স্যাভয়’ গাড়ি কিনেছেন। যে গাড়িটি তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দান করবে মিস বেলভেডিয়ারকে। সবাই ভেবেছিলেন এটা ফস্টারের ব্যবসায়িক চাল। আদৌ কোনও দিন হারানো সৌন্দর্য ফিরে পাবে না, মিস বেলভেডিয়ার। কিন্তু ফস্টার ছিলেন নাছোড়বান্দা। মিস বেলভেডিয়ারের সৌন্দর্য ফেরাতে গিয়ে খরচ করে ফেলেছিলেন ১৫০০০ হাজার ডলার।

ঠিকানার খোঁজে

মিস বেলভেডিয়ারের জন্য একটি মিউজিয়াম খুঁজছিলেন ফস্টার। যে মিউজিয়ামে মিস বেলভেডিয়ারকে তার প্রাপ্য সম্মান দিয়ে রাখা হবে। তিনি টালসা শহরের প্রশাসনিক কর্তাদের অনুরোধ করেছিলেন শহরের কোনও মিউজিয়ামে গাড়িটিকে স্থায়ীভাবে রাখার জন্য। কিন্তু  প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিল টালসা শহর। কারণ মিস বেলভেডিয়ারের দুর্দশার জন্য তারাই দায়ী ছিল। তাই শহরের গাফিলতির নিদর্শনকে স্থায়ীভাবে জনসমক্ষে রেখে দিতে চায়নি তারা।

হাল ছাড়েননি ফস্টার। আমেরিকার বিভিন্ন মিউজিয়ামকে অনুরোধ করে চলেছিলেন ঐতিহাসিক গাড়িটিকে স্থান দেওয়ার জন্য। অবশেষে সফল হয়েছিলেন তিনি। ২০১৫ সালে ফস্টার ঘোষণা করেছিলেন, ইলিনয়ের ‘হিস্টোরিক অটো অ্যাট্রাকশন’ মিউজিয়ামে ঠাঁই পেতে চলেছে মিস বেলভেডিয়ার। পঞ্চাশ বছর ধরে কালকুঠরিতে বন্দি থাকার পর, গ্যারেজেও দশ বছর কাটিয়ে ফেলেছিল মিস বেলভেডিয়ার। তার পর জুটেছিল স্থায়ী ঠিকানা।

প্রাণ ফিরে পাওয়া মিস বেলভেডিয়ার।

২০১৭ সালের জুন মাসে, দুরু দুরু বক্ষে রওনা হয়েছিল মিস বেলভেডিয়ার, নতুন ঠিকানার উদ্দেশ্যে। বিশ্ব অবাক হয়ে দেখেছিল, হারানো যৌবন ফিরে এসেছে ষাট বছর বয়সী মিস বেলভেডিয়ারের শরীরে। মৃত্যুর শিকল ছিঁড়ে ফিনিক্স পাখির মতো জেগে উঠেছে মিস বেলভেডিয়ার, ডুইট ফস্টারের জাদুকাঠির ছোঁয়ায়।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More