আঠেরো বছর মানুষটি কাটিয়েছিলেন বিমানবন্দরের লাল সোফায়, দেশহীন পরিযায়ী হয়ে

এই মানুষটিকে নিয়েই স্পিলবার্গ বানিয়েছিলেন ব্লকবাস্টার সিনেমা 'দ্য টার্মিনাল'।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    রূপাঞ্জন গোস্বামী

    ইরানের খুজেস্তান প্রদেশে আছে  ঐতিহাসিক শহর ‘মসজিদ সোলেইমান’। ইসলাম আগমনের আগে যার নাম ছিল ‘পারশুমাশ’। জাগ্রোস পর্বতশ্রেণী দিয়ে ঘেরা এলাকাটি থেকে প্রচুর মূল্যবান প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পাওয়া গিয়েছে। প্রত্নতাত্ত্বিকেরা বিশ্বাস করতেন এই ‘মসজিদ সোলেইমান’ বা ‘পারশুমাশ’ ছিল ‘এখামিনিয়ান’ সাম্রাজ্যের প্রাচীন রাজধানী। আজ শহরটি বিখ্যাত খনিজ তেলের জন্য। মধ্যপ্রাচ্যে বুকে প্রথম খনিজ তেলের সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল এখানেই। তবুও শহরটিকে অনেকে চেনেন একজন মানুষের জন্য।

    ‘মসজিদ সোলেইমান’
    তাঁর নাম মেহরান করিমি নাসেরি

    চল্লিশের দশকে ‘মসজিদ সোলেইমান’ শহর লাগোয়া মরুভূমির বুকে খনিজ তেল উৎপাদন করত একটি অ্যাংলো-পার্সি কোম্পানি। সেই কোম্পানির হাসপাতালের চিকিৎসক ছিলেন নাসেরির বাবা। মা ছিলেন ওই হাসপাতালেরই নার্স। তবে তিনি ছিলেন স্কটল্যান্ডের মহিলা। ১৯৪৬ সালে জন্ম হয়েছিল নাসেরির। সাইকোলজিতে মাস্টার্স করে ছাব্বিশ বছর বয়েসে গিয়েছিলেন ইংল্যান্ড। যুগোস্লাভ স্টাডির ওপর তিন বছরের ডিগ্রি কোর্স করেছিলেন ব্র্যাডফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে।

    ইংল্যান্ড থেকে ডিগ্রি নিয়ে ১৯৭৬ সালে ইরানে ফিরে এসেছিলেন নাসেরি। ইরান তখন গৃহযুদ্ধের মুখে। ইরানের শেষ শাহ রেজা পহলবির বিরুদ্ধে বিক্ষোভের আগুন ইরান জুড়ে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছিল। বিলেতফেরত নাসেরি জড়িয়ে পড়েছিলেন গৃহযুদ্ধে। গ্রেফতার ও অকথ্য অত্যাচার সহ্য করার পর মুক্তি পেয়েছিলেন বটে, তবে তাঁকে ইরান থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। তিরিশ বছর বয়েসে বাবা মা আত্মীয় স্বজন সব হারিয়ে ফেলেছিলেন নাসেরি।

    ইরানে শুরু হয়েছিল গৃহযুদ্ধ।

    ইরান থেকে তুরস্ক হয়ে লুকিয়ে পৌঁছে গিয়েছিলেন বেলজিয়াম

    সময় লেগেছিল প্রায় চার বছর। এই চার বছর ধরে নাসেরি বিভিন্ন দেশের কাছে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় চেয়েছিলেন। কোনও দেশ তাঁকে আশ্রয় দিতে চায়নি। অবশেষে, ১৯৮১ সালে বেলজিয়ামে অবস্থিত রাষ্ট্রসংঘের রিফিউজি সংক্রান্ত হাইকমিশন, নাসেরিকে দিয়েছিল শরণার্থীর শংসাপত্র। পাঁচ বছর বেলজিয়ামের শরণার্থী শিবিরে কাটানোর পর, ১৯৮৬ সালে তিনি ব্রিটেনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

    সব কিছু গুছিয়ে নিয়ে ইংল্যান্ডগামী বিমানের টিকিট কেটে ফেলেছিলেন ১৯৮৮ সালে। বেলজিয়াম থেকে প্যারিস হয়ে লন্ডনের হিথরো বিমানবন্দরে নামবেন।  ব্রাসেলস থেকে বিমানে করে পৌঁছে গিয়েছিলেন প্যারিস। ভাগ্যবিপর্যয়ের শুরু হয়েছিল প্যারিসেই। সেখানে নাসেরি হারিয়ে ফেলেছিলেন একটি ব্রিফকেস। যেটির ভেতরে ছিল তাঁর জীবনের সমস্ত সার্টিফিকেট ও রাষ্ট্রসংঘের দেওয়া শরণার্থীর শংসাপত্র।

    নাসেরি ভেবেছিলেন লন্ডনে পৌঁছে তাঁর সুটকেস হারানোর কথা বললে বিমানবন্দর কতৃপক্ষ বুঝবেন ও তাঁকে শহরে প্রবেশের অনুমতি দেবেন। কিন্তু তা হয়নি। লন্ডন পৌঁছানোর পর, কাগজপত্র না থাকা নাসেরিকে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল প্যারিসে।

    প্যারিসের চার্লস ডি গল বিমানবন্দর।

    প্যারিসের চার্লস ডি গল বিমানবন্দর কতৃপক্ষ পড়েছিলেন সমস্যায়

    বেলজিয়াম থেকে বৈধভাবেই ফ্রান্সে প্রবেশ করেছিলেন নাসেরি। তখন সঙ্গে কাগজপত্র ছিল। কিন্তু এখন নেই। তাঁকে কোথায় ফেরত পাঠাবে ফ্রান্স! বেলজিয়াম সরকার ফ্রান্সকে বলেছিল নাসেরিকে তারা আর ফেরত নেবে না। কারণ যে শরণার্থী একবার বেলজিয়াম ত্যাগ করেছেন, তিনি আর প্রবেশ করতে পারবেন না। অন্যদিকে কাগজপত্র না থাকায় ফ্রান্সের পক্ষেও নাসেরিকে সে দেশে আশ্রয় দেওয়া সম্ভব নয়।

    পরিচয়পত্রহীন, দেশহীন নাসেরির ঠিকানা হয়েছিল, প্যারিসের চার্লস ডি গল বিমানবন্দরের ডিপারচার লাউঞ্জের একটি লাল সোফা। তাঁকে বলা হয়েছিল যতদিন না সমস্যাটির সমাধান হয়, তিনি লাউঞ্জের বাইরে যেতে পারবেন না। বিমানবন্দরের লাউঞ্জেই  কেটে গিয়েছিল চার বছর। ১৯৯২ সালে নাসেরিকে গ্রেফতার করে জেলে পাঠিয়েছিল পুলিশ।

    প্যারিসের বিমানবন্দরে আটক নাসেরি।

    গ্রেফতারের খবর পেয়েছিলেন ফ্রান্সের মানবাধিকার কর্মী ও আইনজীবী ক্রিসচিয়ান বারগেট। নাসেরির হয়ে মামলা করেছিলেন। প্যারিসের কোর্ট রায় দিয়েছিল,বিমানবন্দর কতৃপক্ষের কোনও অধিকার নেই নাসেরিকে বিমানবন্দর থেকে বের করে দেওয়ার। কারণ বেলজিয়াম থেকে নাসেরি বৈধভাবে ঢুকেছিলেন প্যারিসের বিমানবন্দরে। নাসেরি আবার ফিরে  গিয়েছিলেন বিমানবন্দরে।

    বন্দি থাকতে হয়েছিল ট্রানজিট এরিয়ার মধ্যে

    ভোর থেকে রাত অবধি লাল সোফাটিতেই বসে থাকতেন। রাতে ঘুমাতেন সোফাতেই। ব্যবহার করতেন পাবলিক টয়লেট। খুব কম কথা বলতেন নাসেরি। দিনের বেশিরভাগ সময় নাসেরি কাটাতেন বই পড়ে, ডাইরি বা প্রবন্ধ লিখে। লুফতহানসার পিচবোর্ডের বাক্সে জমা হতো লেখাগুলি।

    সেই লাল সোফায় নাসেরি।

    মার্জিত স্বভাবের নাসেরির সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল বিমানবন্দরের কর্মীদের। তাঁরা নাসেরিকে ডাকতেন অ্যালবার্ট বা স্যার অ্যালবার্ট বলে। কারণ নাসেরি তাঁদের বলেছিলেন তাঁর নাম ‘স্যার অ্যালবার্ট মেহরাম’। নাসেরিকে যথাসাধ্য সাহায্য করতেন বিমানবন্দরের কর্মীরা। প্রথম দিকে রোজ নিজেদের খাবার কুপন ও খবরের কাগজ তুলে দিতেন নাসেরির হাতে। কুপন নিয়ে নাসেরি যেতেন লাউঞ্জের ভেতরে থাকা ম্যাকডোনাল্ডের ফুডকোর্টে। খাবার ও জল নিয়ে ফিরতেন সোফায়।

    সবসময় পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকতেন নাসেরি। তাঁকে এক ঝলক দেখলে মনে হত কোনও বিমানযাত্রী লাগেজ নিয়ে বিমানের জন্য অপেক্ষা করছেন। জামাকাপড়ের সংখ্যা কম হলেও, সেগুলি নিয়মিত লাউঞ্জের লন্ড্রিতে পাঠাতেন। কেউ যদি তাঁকে টাকা বা জামাকাপড় দিতে চাইতেন, নাসেরি বই দিতে অনুরোধ করতেন।

    এভাবেই একদিন নাসেরি পড়ে গিয়েছিলেন সাংবাদিকদের নজরে

    তাঁকে নিয়ে লেখা শুরু হয়েছিল ইউরোপের বিভিন্ন কাগজে। নামী পত্রপত্রিকার সাংবাদিককেরা চার্লস ডি গল বিমানবন্দরে নামলেই নাসেরির সাক্ষাৎকার নিতেন। কাগজে নাসেরির কথা বের হওয়ার পর আসত সাহায্য করেছিল ছোটখাটো আর্থিক সাহায্য। তাঁর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ছিল না। টাকা জমা পড়ত তাঁর আইনজীবী ক্রিসচিয়ান বারগেটের কাছে বা বিমানবন্দরের চিফ মেডিক্যাল অফিসার ডঃ বারগেনের কাছে। তাঁরা নাসেরিকে ব্যাঙ্কের পাসবই দেখাতে চাইলে, নাসেরি এগিয়ে দিতেন বই। বলতেন, বই পড়ুন, অর্থ-যুদ্ধ-সন্ত্রাসবাদের চেয়ে বইপড়া ভালো।

    আইনজীবী বারগেট চেষ্টা করছিলেন নাসেরির রাষ্ট্রসংঘের দেওয়া ‘শরণার্থী’ শংসাপত্রটি আবার যোগাড় করার। রাষ্ট্রসংঘের বেলজিয়ামের হাইকমিশন জানিয়েছিল, নাসেরিকে স্বশরীরে বেলজিয়ামে গিয়ে শংসাপত্র নিয়ে আসতে হবে। কিন্তু বেলজিয়ামের যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় নথি নাসেরির কাছে ছিল না।

    লাউঞ্জের টয়েলেটে

    শংসাপত্র পাঠাতে সম্মত হয়েছিল বেলজিয়াম

    ১৯৯৫ সালে বেলজিয়াম নাসেরিকে সে দেশে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছিল। শর্ত ছিল নাসেরিকে বেলজিয়ামে থাকতে হবে সমাজসেবী সংস্থা্র নজরবন্দি হয়ে। প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন নাসেরি, কারণ তিনি নজরবন্দি হয়ে থাকতে চাননি। এছাড়া তাঁর স্বপ্ন ছিল ব্রিটেনে যাওয়ার। প্রচণ্ড হতাশ হয়েছিলেন নাসেরির আইনজীবী। বাধ্য হয়ে তিনি বেলজিয়াম থেকে  শংসাপত্রটি আনার চেষ্টা করেছিলেন। যাতে ফ্রান্সে আশ্রয় মিলতে পারে। বেলজিয়াম সরকার ১৯৯৯ সালে রাজি হয়েছিল নাসেরির নথিপত্র পাঠাতে।

    বেলজিয়াম থেকে নথিগুলি এসেছিল প্যারিসে। নথিপত্রে সই করে বেলজিয়াম পাঠালেই চলে আসবে শরণার্থীর শংসাপত্র। কিন্তু রাষ্ট্রসংঘের পাঠানো নথিতে সই করতে চাননি নাসেরি। কারণ আগের শংসাপত্রে নাসেরির নাম লেখাছিল স্যার আলফ্রেড মেহরাম। নতুন নথিতে নামের জায়গায় লেখা ছিল মেহরাম করিমি নাসেরি এবং তিনি ইরানীয় শরণার্থী।

    ২০০৫ সালে নাসেরি।

    ভেঙে পড়েছিলেন নাসেরির হয়ে প্রায় এগারো বছর ধরে লড়াই করা আইনজীবী ক্রিশ্চিয়ান বারগেট। সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, বছরের পর বছর বিমানবন্দরে একা কাটিয়ে হয় নাসেরির মানসিক সমস্যা দেখা দিয়েছে, নয়তো তিনি এভাবেই স্বেচ্ছানির্বাসনে থাকতে চাইছেন।

    বিমানবন্দরের লাউঞ্জে কেটে গিয়েছিল ১৫ বছর

    নাসেরির জীবন নিয়ে তৈরি হয়েছিল ফরাসী ছবি ‘লস্ট ইন ট্রানজিট’। আলেক্সি কুরোস, গ্লেন ল্যানফোর্ড, হামিদ রহমানিয়ানরা নাসেরিকে নিয়ে বানিয়েছিলেন তথ্যচিত্র। মিচেল পানেত্তি লিখেছিলেন উপন্যাস। অন্যদিকে, বিমানবন্দরের লাল সোফাটিতে বসে নাসেরি লিখে ফেলেছিলেন তাঁর আত্মজীবনী ‘দ্য টার্মিনাল ম্যান’। যা বই হিসেবে প্রকাশিত হয়েছিল ২০০৪ সালে।

    বইটি প্রকাশের আগেই নাসেরির কাহিনি নজরে এসেছিল বিশ্বখ্যাত চিত্র পরিচালক স্টিভেন স্পিলবার্গের। নাসেরির আত্মজীবনী নিয়ে সিনেমা করার জন্য নাসেরিকে দিয়েছিলেন আড়াই লক্ষ ডলার। ২০০৪ সালেই মুক্তি পেয়েছিল স্পিলবার্গের ব্লকবাস্টার সিনেমা ‘দ্য টার্মিনাল’। নাসেরির চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন টম হ্যাঙ্কস। চরিত্রটির নাম ছিল ভিক্টর নাভরস্কি। বিমানবন্দরটি ছিল আমেরিকার জেএফকে বিমানবন্দর। তাঁর জীবন নিয়ে তৈরি হওয়া সিনেমা দেখা হয়নি নাসেরির।

    দ্য টার্মিনাল ছবির পোস্টার।

    হারিয়েছিলেন লাল সোফা

    ২০০৬ সালের জুলাই মাসে অসুস্থ্য হয়ে পড়েছিলেন নাসেরি। নিয়ে যাওয়া হয়েছিল হাসপাতালে। তিনি লাল সোফা ছেড়ে যাওয়ার মাত্রই তাঁর জিনিসপত্র সমেত লাল সোফাটি সরিয়ে ফেলা হয়েছিল লাউঞ্জ থেকে। হাসপাতাল থেকে নাসেরি ছাড়া পেয়েছিলেন ২০০৭ সালের জানুয়ারি মাসে।

    আর ফিরতে পারেননি বিমানবন্দরে। নাসেরির দায়িত্ব নিয়েছিল বিমানবন্দরের পাশে থাকা রেডক্রসের শাখা। নাসেরিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল প্যারিসের ‘এমাস চ্যারিটি রিসেপশন’ সেন্টারে। আজও সেখানেই আছেন চুয়াত্তর বছরের মেহরাম করিমি নাসেরি। কিন্তু মানসিক দিক থেকে ভালো অবস্থায় নেই।

    মনে প্রশ্ন জাগে, কোন আতঙ্ক নিয়ে সারাজীবন কাটালেন মেহরাম নাসেরি! কেন তিনি নিজের ইরানি পরিচয় ত্যাগ করে ‘স্যার আলফ্রেড মেহরাম’ নামের আড়ালে লুকাতে চাইতেন! কেন তিনি বার বার বলতেন, ফ্রান্স থেকে বের করে দেওয়া হলে তাঁকে সৈন্যরা মেরে ফেলবে! কেন তিনি ব্রিটেনেই যেতে চেয়েছিলেন! কেন কেউ তাঁকে কোনওদিন হাসতে দেখেননি! মেলেনি উত্তর। আসলে সাইকোলজি নিয়ে পড়াশুনা করা মানুষটির সাইকোলজিই কেউই বোঝেননি বা বোঝবার চেষ্টা করেননি।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More