ভারতের অর্থনীতি ও নরেন্দ্র মোদীর উজ্জ্বল মুখের রহস্য

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    অবশেষে বোঝা গেল, প্রধানমন্ত্রীর মুখ এত চকচক করে কেন। অনেকে এই ব্যাপারটা নিয়ে ধন্ধে ছিল। ব্যাপার কী? জিডিপি বৃদ্ধির হার তলানিতে, বেকারত্ব ৪৫ বছরের রেকর্ড করেছে, ঘরে ঘরে অন্নকষ্ট, তাও মোদীর মুখ অমন উজ্জ্বল দেখায় কেন? তিনি কি ভাবছেন, দেশে আচ্ছে দিন এসে গিয়েছে? কিন্তু ব্যাপারটা তা নয়।

    ব্যাপারটা আসলে কী, ফাঁস করেছেন প্রধানমন্ত্রী নিজে। প্রজাতন্ত্র দিবসের প্রাক্কালে তিনি কয়েকজন কোমলমতি বালক-বালিকার হাতে সাহসিকতার পুরস্কার তুলে দিয়েছিলেন। সেই সময় যে ভাষণ দিয়েছেন, তার মর্মবস্তু এইরকম— তিনি রাতদিন কঠোর পরিশ্রম করেন। সেজন্য খুব ঘাম হয়। তাতে রোমকূপে জমে থাকা ময়লা বেরিয়ে যায়। তাই মুখটা দেখতে লাগে চকচকে, তাজা।

    মোদী কী এত কাজ করেন?

    তিনি বড়লোকদের কর ছাড় দেন।

    অবশ্য বর্তমান প্রধানমন্ত্রী একা নন, গত কয়েক দশক ধরে রাষ্ট্রপ্রধানরা টাকার কুমিরদের ছাড় দিয়েই চলেছেন। কিন্তু মোদীর অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমন যে হারে ছাড় দিয়েছেন, আগে কেউ কখনও দেখেনি। গত সেপ্টেম্বরে এক ধাক্কায় কর্পোরেট ট্যাক্স কমেছে ১০ শতাংশ। মোদী নিজেই বলেছেন, এই পরিমাণ ছাড় ঐতিহাসিক।

    এত ছাড় দেওয়ার পিছনে যুক্তি কী?

    ১৯৯১ সালে ভারত খোলা বাজার অর্থনীতির পথে যাত্রা শুরু করে। তার মূল কথা, বড়লোকদের কর মকুব করতে হবে। আরও নানাভাবে তোয়াজ করতে হবে। তবে তারা খুশি হয়ে বিনিয়োগ করবে পুঁজি। তাতে সৃষ্টি হবে চাকরি। তার ফল, মানুষের অন্নকষ্টের অবসান। ভোগ্যপণ্যের বাজারের চাঙ্গা হওয়া। দেশের সমৃদ্ধি।

    ‘৯১-এর বাজেটের পরে নব্য উদার অর্থনীতির কারবারিরা আহ্লাদে আটখানা হয়ে বলেছিলেন, এতদিনে লাইসেন্স রাজের অবসান হল। এইবার ধনধান্যপুষ্পে ভরে উঠবে দেশ। কেউ কেউ বুক বাজিয়ে বলেছিলেন, পাঁচ বছরের মধ্যে দেশে আর গরিব থাকবে না।

    তার পরে একে একে কেটে গিয়েছে প্রায় তিনটি দশক। দেশে গরিবদের কতদূর উন্নতি হয়েছে, ধনীরাই বা কেমন রোজগারপাতি করছে, সেসব নিয়ে রিপোর্ট প্রকাশ করেছে অক্সফ্যাম নামে এক সংস্থা। তার তথ্যগুলো পিলে চমকে দেওয়ার মতো।

    রিপোর্টে বলছে, ২০১৮ সালে ভারতে ১০০ কোটি টাকার বেশি সম্পদের মালিক হয়েছেন ১৭ জন। এই মহূর্তে দেশে বিলিওনেয়ার, অর্থাৎ ১০০ কোটি টাকা বা তার বেশি পরিমাণ সম্পদের মালিকের সংখ্যা ১০১ জন। মাত্র ৬৩ জন ধনীতম ব্যক্তির হাতে যে পরিমাণ সম্পত্তি আছে, তার পরিমাণ ২০১৮-১৯ সালের বাজেটের চেয়ে বেশি। সেই বাজেটের পরিমাণ ছিল ২৪ লক্ষ ৪২ হাজার কোটি টাকা।

    সবচেয়ে সাংঘাতিক কথাটা হল, দেশের মাত্র এক শতাংশ ধনীতম ব্যক্তির হাতে যে সম্পত্তি আছে, তা ৯৫ কোটি ৩০ লক্ষ গরিবের মোট সম্পত্তি যোগ করলে যত হয়, তার চেয়েও বেশি।

    অর্থাৎ ওই এক শতাংশ দেশের সম্পদের বেশিরভাগ খেয়ে ফেলছে।

    এই অবস্থায় অর্থনীতি নিয়ে একটা গুরুতর বিতর্ক দানা বেঁধে উঠতে পারত। নাগরিকরা প্রশ্ন তুলতে পারত, ধনীদের আরও ছাড় দেওয়া কি উচিত? রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি বেচে দিলেই কি দেশের ভাল হয়? সেনসেক্সের ওঠানামার সঙ্গে গরিব ও মধ্যবিত্তের জীবনের কোনও যোগ আছে কি?

    কিন্তু এইসব প্রশ্ন কেউ তুলছে না। তার বদলে তোলপাড় হচ্ছে নাগরিকত্ব আইন নিয়ে। দেশজোড়া বিতর্কের কেন্দ্রে এখন অনুপ্রবেশ, এনআরসি, এনপিআর, সর্বোপরি হিন্দু-মুসলমান বিরোধ।

    একসময় জার্মানিতেও এমন হয়েছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর সেদেশের হাল যখন খুব শোচনীয়, একদল লোক জার্মানদের বোঝাল, যত নষ্টের গোড়া ইহুদিরা। তার পরিণাম কী হয়েছিল সকলের জানা। এখানেও তেমনি শাসকরা বোঝাতে চাইছেন, ‘ঘুসপৈঠিয়াদের’ দূর করে দিলেই কোনও সমস্যা থাকবে না। সেই লক্ষ্যে সংশোধিত হয়েছে নাগরিকত্ব আইন। তাতেই লেগেছে ধুন্ধুমার। একদল খুব জোর দিয়ে বলছে, সংশোধিত আইন মানি না। দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে যাচ্ছে শাহিনবাগ। বিজেপি নেতারা তাদের গাল দিয়ে বলছেন দেশদ্রোহী, টুকরে টুকরে গ্যাং, আরও কত খারাপ খারাপ কথা।

    এদেশে যা ঘটছে, তার দিকে নজর পড়েছে বিদেশিদের। ইকনমিস্ট পত্রিকার সমীক্ষা বলছে, গণতান্ত্রিক পরিসর কমছে ভারতে। আমেরিকা একটু রেখেঢেকে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। সেদেশের কূটনীতিকরা বলছেন, আমরা খতিয়ে দেখছি ভারতের নতুন আইনটা কী। তুলনায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন অনেক খোলামেলা। তারা স্পষ্ট বলেছে, সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন কার্যকরী হলে ভারতে বড় সংখ্যক মানুষ রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়বেন।

    এককথায় বলতে গেলে, দেশে অসাম্য বাড়ছে। কমছে গণতন্ত্র। সমালোচনায় মুখ খুলেছে আন্তর্জাতিক মহল। অন্য কোনও প্রধানমন্ত্রী হলে মুখ কালো করে ঘুরতেন। কিন্তু মোদীর বেলায় তা হবে না। তিনি কাজপাগল মানুষ। কাজ করলেই ঘাম হবে। রোমকূপ থেকে ময়লা বেরিয়ে যাবে। তাঁর মুখ আগের মতোই উজ্জ্বল দেখাবে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More