তোমার শরীর নাই ভারত?

0

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

রোহন ইসলাম

মানিকের ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’য় পরাণ ঘোষের স্ত্রীকে শিক্ষিত, উচ্চবর্গীয় শশী ডাক্তার বিঁধে বলেছিলেন— “শরীর! শরীর! তোমার মন নাই কুসুম?” শরীরী চাহিদা এবং তার প্রকাশ্য ঘোষণাকে মেনে নিতে পারেননি মানিকের ওই পুরুষ চরিত্রটি। অমন চাঁদনি রাতে সব ছেড়ে ছোটবাবুর সঙ্গে পালিয়ে যাওয়ার সাধও পূরণ হয়নি কুসুমের। ‘মন’ আর ‘দেহ’র অদ্ভুত এক  বাইনারিতে ঢাকা পড়ে যায় বেহায়া সেই গ্রাম্য মেয়ে। আর তাঁর শরীর।

আসলে আমরা যত ‘সভ্য’ আর ‘মার্জিত’ হয়েছি, ‘শরীর’ নিয়ে ততই ‘আড়ষ্ট’ হয়েছি। আমাদের মধ্যে কখনও জেগে উঠেছে ‘ভিক্টোরিয়ান পবিত্রতা’র বোধ, কখনও ‘ভারতীয়’ ‘ঐতিহ্য’। তাই পাকুড়ের অনামী আদিবাসী গ্রামে যুগলদের প্রকাশ্য চুম্বন প্রতিযোগিতার দৃশ্যে চোখ ছানাবড়া হয়েছে আমাদের মার্জিত সমাজ-বিবেকের। আবার মেট্রোয় আলিঙ্গনরত যুগলকে দেখে নিশপিশ করে উঠেছে আমাদের মধ্যবয়স্ক নৈরাশ্যের উচাটন মন। এই আমরাই তো সেদিন মেনে নিতে পারিনি কেরলে নীতি-পুলিশির বিরুদ্ধে ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলন ‘কিস অফ লভ’কেও। ব্যঙ্গ-বিদ্রুপে বিঁধেছি যাদবপুরের পাকা ছেলেমেয়েদের ‘হোক-চুম্বন’।

অথচ প্রেম, শরীরের জয়গানের দীর্ঘ প্রাচীন ইতিহাসে সম্বৃদ্ধ আমাদের এই দেশ। জনসমক্ষে অনুরাগের প্রদর্শনের অন্যতম আঁতুড়ঘরও। প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছরের প্রাচীন বেদে চুম্বনের অনুষঙ্গ রয়েছে। এমনকী, ঠোঁঠে-ঠোঁঠে চুম্বনের বর্ণনা রয়েছে মহাভারতেও। চুম্বনের ইতিহাস নিয়ে কাজ করা মার্কিন নৃতত্ত্ববিদ ভন ব্রায়ান্টের মতে, ভারতই চুম্বনের জন্মস্থান। আলেকজান্ডারের ভারত আক্রমণের পরে ভারত থেকেই ধীরে ধীরে এই সংস্কৃতি বিশ্বের অন্য প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে। আরও পরে একাদশ শতাব্দীতে এই ভারতবর্ষেরই এমন খুল্লামখুল্লা যৌনতার দর্শন প্রত্যক্ষ করে ধাক্কা খেয়েছিলেন মুসলিম দুনিয়া থেকে আসা পরিব্রাজকেরাও। সেই আড়ষ্টতার ছাপ রয়ে গিয়েছে তাঁদের নানা লেখায়।

এখন কথা হচ্ছে— চুম্বন থেকে কামসূত্র, কৃষ্ণলীলা থেকে খাজুরাহো— যৌনতা সচেতন এমন একটি প্রাচীন সভ্যতার বর্তমান দশা এমন কেন? ‘ভ্যালেন্টাইন ডে’-তে যুগলদের কান ধরে ওঠবোস (বিহারে যুবতীর কাপড় খুলে নিচ্ছি!) করাচ্ছি, স্কুলপড়ুয়া ছাত্রছাত্রী একে অপরকে জড়িয়ে ধরলে খড়্গহস্ত হচ্ছি, সোশ্যাল মিডিয়ায় লিসা হেডেনের সন্তানকে স্তন্যপান করানোর ছবি দেখে আঁতকে উঠছি, গাল পাড়ছি প্রধানমন্ত্রীর সামনে ছোট পোশাক পরে বসা প্রিয়ঙ্কা চোপড়াকে। এই আমরাই নিয়ন্ত্রণ করছি টেলিভিশনে কন্ডোমের বিজ্ঞাপনকে। বড্ড বেশি ‘লেডি ওরিয়েন্টেড’-এর (মহিলা-ঘেঁষা?!) মতো দুর্দান্ত অজুহাতে বেঁধে রাখছি ‘লিপস্টিক আন্ডার মাই বুরখা’। আবার কত সহজে ইলা-শিখণ্ডীর এই দেশে আমরাই বাতিল করে দিই ‘ড্যানিশ গার্ল’। এলজিবিটি অধিকার রক্ষায় লোকসভায় শশী থারুরের আনা ব্যক্তিগত বিল হাসি-মশকরায় উড়িয়ে দিই। আমরাই ইরফান পাঠান, মহম্মদ শামির স্ত্রী-দের তুলোধোনা করি আপাদমস্তক শরীর না-ঢাকা পোশাক দেখে। ধর্ষণের হুমকি দিই স্যুইমিং কস্টিউম পরে ফোটোশ্যুট করা ‘দঙ্গল’-কন্যা ফতিমা সানা শেখকে। হ্যা, আমরাই!

জন বার্গার তাঁর বিখ্যাত ‘Ways of Seeing’ গ্রন্থে দেখিয়েছিলেন, সমাজে পুরুষের উপস্থিতি একেবারেই তার ‘শক্তি’ কেন্দ্রিক। এই দুনিয়ায় পুরুষ কী করতে পারে, তার পরাক্রমতা ও দক্ষতার উপর ব্যাপারটি দাঁড়িয়ে আছে। উল্টো দিকে, সমাজে মেয়েদের অবস্থান, বিশ্বের সঙ্গে নয়, কেবলমাত্র তার সঙ্গেই জুড়ে থাকে। যেখানে তার দক্ষতা দিয়ে নয়, তাকে দিয়ে সব কিছু মাপা হয়। কোন অর্থে? না, মেয়েটি কী করতে পারবে, তা দিয়ে নয়। মেয়েটির সঙ্গে কী করা যাবে বা যাবে না, তা দিয়ে। মেয়েদের এই চোখে দেখার নেপথ্যে সেই বস্তাপচা ধারণাকেই চিহ্নিত করেছেন জন। যে ধারণা ছোট থেকেই ছেলেমেয়ে, সবার মনেই পুরে দেয় এই বীজ— একমাত্র পুরুষের দেখভালের জন্যই জন্ম নিয়েছে মেয়েরা। এ দেশ দীর্ঘকাল ধরেই ‘পুত্রার্থে ক্রিয়তে ভার্যা’র দর্শনে বিশ্বাসী। সেই কোন প্রাচীন এক সময়ে মনু তার মস্তিষ্কে ঢুকিয়ে দিয়েছে— সে-ই ভার্যা, যে পতিপ্রাণা। সে-ই ভার্যা, যে সন্তানবতী। ফলে এ দেশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ‘নীতি-পুলিশি’। আর এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এই নীতি-পুলিশি যত না ‘জনসমক্ষে ‘রুচি’ রক্ষা’র অজুহাতে, তার চেয়ে ঢের বেশি মেয়েদের উপরে পিতৃতন্ত্রের নিয়ন্ত্রণকে রক্ষা করার স্বার্থে।

এই পিতৃতন্ত্রের নেশায় আমরা মনে করি, সমাজে মেয়েরা নিজেদের রক্ষা করতে জানে না, ভাল-মন্দ বিচার করার ক্ষমতাও তাদের নেই। তাই এই নীতি-পুলিশি। তাই এই ‘নিয়ন্ত্রণ’। তাই নিয়ন্ত্রিত হয়, মেয়েদের যৌনতা। তাই নিয়ন্ত্রিত হন হাদিয়ারা। তাই নিয়ন্ত্রিত হয় হিজাবে ঢাকা মুখ সরিয়ে জনপথে ‘ফ্ল্যাশ মব’ নৃত্যে মাতা মুসলিম মেয়েরা। এমনকী, রাষ্ট্রের হাতে নিয়ন্ত্রিত হয় জন্মনিরোধকও। এই নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নেই ‘ট্রোলড্‌’ হন বিদেশে শ্যুটিংয়ের ফাঁকে রণবীর কপূরের পাশে দাঁড়িয়ে প্রকাশ্যে ধূমপান করা মাহিরা খানও। সব ক’টি ক্ষেত্রে এই নিয়ন্ত্রণের দড়িটা থাকছে কিন্তু পিতৃতন্ত্রের হাতেই। যার সব থেকে বেশি শিকার মেয়েরাই। তখন মেয়েরাই হয়ে ওঠে ‘দেশীয় ঐতিহ্য’ ‘রক্ষা’ করার অন্যতম উপকরণ। আর তখনই শুরু হয় ‘মাতৃত্ব’, ‘পবিত্রতা’র ‘স্ত্রীজনোচিত’ জয়গান। মেয়েরা হন কেবলই যৌনতা-নিয়ন্ত্রিত ‘অবজেক্ট’। যদিও যৌনতা-সজাগ নারী এর বিপদটাকে চিনতে পারেন। তাঁদের পাল্লায় পিতৃতন্ত্রের এই স্বৈরাচারী দর্শন ধসে যেতে পারে। আর তা-ই এ দেশের পিতৃতান্ত্রিক মন, আকিলাদের কখনও হাদিয়া হতে দেয় না। ধর্ম ও যৌনসঙ্গী স্বেচ্ছায় বেছে নেওয়া মেয়েরা যে আরও বিপজ্জনক।

অথচ পিতৃতন্ত্রের এই গোটা গল্পটাকেই বাইরে থেকে দাঁড় করানোই হচ্ছে, কখনও হিন্দু মূল্যবোধ কখনওবা ইসলামি সংস্কৃতির বিপ্রতীপে। নরেন্দ্র মোদীর ‘নিউ ইন্ডিয়া’য় অবশ্য এই ‘হিন্দু’  (আদতে হিন্দুত্ব) মূল্যবোধ আর ভারতীয় পরিচিতিকে এক করে দেওয়া হচ্ছে। তাই হিন্দুত্ববাদীদের চোখে তাঁদের ‘এই’ ‘সংস্কৃতি’=ভারত। যা কিছু অ্যান্টি-‘হিন্দু’, তা-ই ‘অ্যান্টি-ইন্ডিয়া’। নির্দিষ্ট একটি সংস্কৃতিই নির্দিষ্ট একটি ধর্মের (ইসলাম) চিহ্ন বহন করা এবং নির্দিষ্ট একটি সংস্কৃতিই (হিন্দুত্ববাদীদের ঠিক করে দেওয়া) নির্দিষ্ট একটি দেশের (ভারত) পরিচয় বহন করার দাবির মধ্যে কোনটি বেশি বিপজ্জনক, তা নিশ্চয় সচেতন, সংবেদনশীল মানুষের বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।

বিজেপি, সঙ্ঘ পরিবার এবং সংবাদমাধ্যমের একাংশের পৃষ্ঠপোষকতায় এ দেশে পিতৃতন্ত্র বর্তমানে একটি জঙ্গি, সংখ্যাগুরু আধিপাত্য ভিত্তিক ভেক ধর্মীয় ‘ন্যাশনালিজম’-এ পরিণত। এই জাতীয়তাবাদ গুজরাত ভোটের আগে হার্দিক পটেলের ‘সেক্স সিডি’ বানিয়ে খবরের চ্যানেলে সম্প্রচার করে। এই জাতীয়তাবাদ পরিবেশ দূষণের প্রশ্নে দেশের শীর্ষ আদালতের দীপাবলীতে শব্দবাজি নিষেধে ‘হিন্দু খতরে মে হ্যায়’ দেখে। এই জাতীয়তাবাদের বাজার টলমল করে জাভেদ হাবিবের দুর্গাপুজোর বিজ্ঞাপনে। এই জাতীয়তাবাদে দুর্গা ‘সেক্সি’ হতে পারে না। হতে পারে না রাম-সীতার বিবাহবিচ্ছেদও। এই জাতীয়তাবাদেরই আইটি সেলের প্রধানের চোখে ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী একজন ‘সেকুলার ছেনাল’।

পোস্ট-ট্রুথের যুগে এখন ‘হিন্দু’ (?) হওয়া, প্রধানমন্ত্রীর দ্বারা সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘ফলো’ হওয়াটাই একমাত্র ‘গর্বে’র বিষয়। আর ‘সেকুলার’ কিংবা ‘লিবারাল’? একটি গালি। ‘পদ্মাবতী’র ‘ইতিহাস’ বাঁচানোর এই জঙ্গি পিতৃতান্ত্রিক একমাত্রিক ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের ‘হেজিমনি’ই এখন সত্য। যে জাতীয়তাবাদের জয় অপরকে খাটো ও ঘৃণা করে। এই জাতীয়তাবাদ কখনই আপনার পেটে ভাত জোটাবে না। রামমন্দির নামক ‘খুড়োর কল’ দিয়ে আপনাকে কেবল ভুলিয়ে রাখবে। সেই কল অচল হলেই এই জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক কারবার বন্ধ। তত দিন ভারতের নানা ধর্ম, বর্ণ, সংস্কৃতি আর যৌনতার এই বেহায়া শরীরটাকে চেপেচুপে রেখে শম্ভুলালদের নীতি-পুলিসি সর্বস্ব জাতীয়তাবাদ ‘মেয়েদের হয়ে লড়বে’, ‘পুজো’ করবে। আবার তাদের পোশাকের মাপও ঠিক করবে। জীবনেরও। আজ আফরাজুলের। কাল আপনারও। তার জ্বলজ্যান্ত সাক্ষী আমার আপনার প্রিয় শহর কলকাতা আর মেট্রো।

মতামত লেখকের ব্যক্তিগত

 (ফলতা সাধনচন্দ্র মহাবিদ্যালয়ে বাংলার শিক্ষক)

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Leave A Reply

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More