মঙ্গলবার, জানুয়ারি ২১
TheWall
TheWall

হরপ্পার মাঝখান দিয়ে যে নদী বইত সেটাই কি কল্পনার সরস্বতী নদী? অকাট্য প্রমাণ পেলেন গবেষকরা

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr +

দ্য ওয়াল ব্যুরো: ঘগ্গর এক সময় যে নিত্যবহা নদী ছিল, সে ব্যাপারে অকাট্য প্রমাণ পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। এই নদী বয়ে চলত হরপ্পার বুক চিরে। বিজ্ঞানীদের যুক্তি, পরবর্তীকালে এই নদীরই নাম হয় সরস্বতী, পৌরাণিক সরস্বতী নদী।

ঘগ্গর-হাকরা অববাহিকা আধুনিক ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে বিস্তৃত, এই নদীই ঋগ্বেদে উল্লেখিত সরস্বতী নদী হতে পারে বলে উনবিংশ শতাব্দী থেকেই মনে করে আসছিলেন গবেষকরা। হরপ্পা নগরীতে যখন সভ্যতার বিস্তার ঘটছিল তখন এই নদী নিত্যবহা ছিল এমন কোনও প্রমাণ না পাওয়ায় বিজ্ঞানীরা বলে আসছিলেন যে, বৃষ্টির উপরেই নির্ভরশীল ছিল হরপ্পা সভ্যতা।

আমেদাবাদের ফিজিক্যাল রিসার্চ ল্যাবরেটরি এবং বম্বে আইআইটির ডিপার্টমেন্ট অফ আর্থ সায়েন্স যৌথ ভাবে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছে ‘সায়েন্টিফিক রিপোর্ট’ জার্নালে। ২০ নভেম্বর প্রকাশিত ওই গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে – ঘগ্গর নদী যে নিত্যবহা ছিল, অববাহিকার ৩০০ কিলোমিটার অংশ জুড়ে পলির স্তর পরীক্ষা করে তার অকাট্য প্রমাণ তাঁরা পেয়েছেন। তাঁদের কথায়, ঘগ্গর এক সময় নিত্যবহা ছিল, এবং এই নদীর তীরেই হরপ্পা সভ্যতার বিকাশ ঘটেছিল। এই নদীর সঙ্গে সরস্বতী নদীর সম্পর্ক ছিল বলে তাঁরা মনে করেন। ঘগ্গর নদীতে যখন প্রচুর পরিমাণে জল ছিল, সেই সময়েই হরপ্পায় সভ্যতা গড়ে উঠতে শুরু করে। তাঁদের মতে এই সময়টি হল মোটামুটি ভাবে ন’হাজার বছর আগে থেকে সাড়ে চার হাজার বছর আগে। এটিই পরে সরস্বতী নদী বলে পরিচিত হয়। কিন্তু হরপ্পা যখন পূর্ণ ভাবে বিকশিত হয়, তখন নিত্যবহা নদীটি মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে শুরু করে।

গবেষণায় দেখা গেছে, নিত্যবহা নদীতে যখন জল টইটুম্বুর করত তখন সেখানে ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীনতম সভ্যতার বিকাশ ঘটে, পরবর্তী কালে ঘগ্গর-সরস্বতী অববাহিকায় জলপ্রবাহ অস্বাভাবিক ভাবে কমে যায়।

যুগ যুগ ধরে মানুষ দেখে আসছে যে ঘগ্গর-হরকা নদী শুধুমাত্র বর্ষার জলেই পুষ্ট হয়। তাই পঞ্চাশের দশক থেকেই পুরাতত্ত্ববিদরা মহা ধন্ধে পড়ে যান। বৃষ্টি কম হলেও বর্ষাকালে ঘগ্গর উপত্যকার মানুষকে ফসল বোনার জন্য প্রায় কোনও পরিশ্রমই করতে হত না, উল্টো দিকে সৌরাষ্ট্র ও কচ্ছের রানের মতো আধা-শুকনো এলাকার মানুষকে অনেক কষ্ট করতে হত ফসল বোনার সময়। তাই হরপ্পায় জলের উৎস নিয়ে ধাঁধায় পড়ে যান পুরাতত্ত্ববিদরা। হরপ্পা ও মহেঞ্জোদাড়োর মতো বিশাল শহর তো বটেই, এই অঞ্চলের অপেক্ষাকৃত ছোট শহরগুলিও ছিল মূলত সিন্ধু ও রাবি নদীর প্লাবনভূমিতে।

নগরায়নের সময় কয়েক শতক ধরেই স্থানীয় ভাবে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বেড়েছে, তার প্রমাণ পেয়েছিলেন গবেষকরা। কিন্তু তা সত্ত্বেও একটা প্রশ্ন তাঁদের মনে ছিল – হিমালয় থেকে নেমে আসা নিত্যবহা নদীর তীরে সভ্যতার বিকাশ না ঘটিয়ে কেন অনিত্যবহা নদীর ধারে নগরকেন্দ্রিক সভ্যতার বিকাশ ঘটিয়েছিলেন সেই সময়ের মানুষ।

৩০০ কিলোমিটার অঞ্চল থেকে পলি সংগ্রহ করে তা বিশ্লেষণ করে গবেষকরা দেখেছেন, সেই পলি হিমালয় থেকে বাহিত। তাঁরা দেখেছেন, আশি হাজার থেকে কুড়ি হাজার বছর আগে এই নদী পুষ্ট হত হিমালয়ের জলে, পরে ন’হাজার থেকে সাড়ে চার হাজার বছর আগে এই নদীতে জলের উৎস ছিল হিমালয়ের অপেক্ষাকৃত নীচের অংশ। পরের দিকে উচ্চ হিমালয়ের জলের ধারা বইতে শুরু করে শতদ্রু  নদী হয়ে। সেই সময়, মানে ন’হাজার বছর আগে ঘগ্গরের জলের নিরবচ্ছিন্ন ধারার পাশেই গড়ে ওঠে সভ্যতা। এই সময়টি ছিল হরপ্পা নগরী বিকাশের একেবারে গোড়ার দিক।

দেখা গেছে, এই সময়টাকে নদীর মধ্যগতিতে জনবসতি বেশি, উচ্চগতি ও নিম্ন গতিতে জনবসতি তুলনায় অনেক কম। এ থেকে বোঝা যায় নদীর কোন প্রবাহে জলের পরিমাণ কেমন ছিল। তখন শতদ্রু নদীর সঙ্গে যোগসূত্র থাকার জন্যই এমন হত বলে মনে করেন বিজ্ঞানীরা। হরপ্পার নগরীর যখন পূর্ণ বিকাশ ঘটে গেছে, তখনও এই নদী ছিল নিত্যবহা।

বৈদিক মন্ত্রে রয়েছে:

গঙ্গে চ যমুনে চৈব গোদাবরী সরস্বতী।
নর্মদে সিন্ধুকাবেরী জলেহস্মিন সন্নিধিং কুরু।।

Share.

Comments are closed.