রাখীর জরি থেকে সেলুলয়েডের গডফাদার, রূপকথার মতো উত্থান শ্রীকান্তর 

৬৩

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

শমীক ঘোষ

চুপ সবাই। হতভম্ব বাংলা সিনেমা-সিরিয়ালের জগত।

কসবার নামকরা মলের গায়ে, আঠেরো তলায় প্রাসাদোপম অফিস থেকে শ্রীকান্ত মোহতাকে গ্রেফতার করে নিয়ে গেছে সিবিআই। সেই অফিস, বাংলা সিনেমা-সিরিয়ালে উঠতি অভিনেতা, স্ক্রিপ্টরাইটার, নির্দেশকদের কাছে যা হল আল্টিমেট ডেস্টিনেশন। সব সাফল্যের আশ্চর্য প্রদীপ পাওয়ার সন্ধান। সেখান থেকেই প্রায় টানতে টানতে শ্রীকান্তকে নিয়ে গেল সিবিআই। নামজাদা সাংবাদিকের পর এবার বাংলা সিনেমার খোদ গডফাদারকে।

বিরোধীদের মুখে ফুটে উঠল চাপা হাসি। আর বন্ধুদের মুখে কালো মেঘ। কিন্তু সবাই চলে গেলেন স্পিকটি নট মোডে।

বাংলা ফিল্মের গডফাদার

দিলওয়ালে দুলহনিয়া লে জায়েঙ্গে। হিন্দি সিনেমার অন্যতম কাল্ট ক্লাসিক। শ্রীকান্ত মোহতার বাংলা ফিল্ম প্রযোজনার ইনিংস শুরুর পেছনে রয়েছে এই ফিল্মই।

বাংলার সিনেমার ডিস্ট্রিবিউশনের জগতে তত দিনে জমিয়ে বসতে শুরু করেছেন দুই তরুণ তুর্কি। শ্রীকান্ত মোহতা–মহেন্দ্র সোনি জুটি। আদিত্য চোপড়ার এই ডাইরেক্টরিয়াল ডেব্যু-র ডিস্ট্রিবিউশন রাইট পেতে সুদূর মুম্বইতে ছুটে গিয়েছিলেন দু’জনে। কথাবার্তাও প্রায় পাকা। নিজেদের অফিসে ফিল্মের পোস্টারও লাগিয়ে ফেলেছেন দু’জনে। এমন সময়েই মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল তাঁদের। না, কথা দিয়েও কথা রাখেননি চোপড়ারা। এই ফিল্মের ডিস্ট্রিবিউরশিপ পাননি তাঁরা।

‘দিল’ যেমন ভাঙল, তেমন বাড়ল জেদ। যেমন করেই হোক জিতে নিতে হবে ফিল্ম বাজারের ‘দুলহনিয়াকে’। শুধু ডিস্ট্রিবিউটর নয় আর। হতেই হবে প্রযোজক। এমন ছবি বানাতে হবে, যা মুম্বইয়ের ছবির সঙ্গে পাল্লা দেবে। হিন্দি ছবিকে মাত করবে হল কালেকশনে। শুরু হল নতুন এক যাত্রা। শ্রী ভেঙ্কটেশ ফিল্মসই।

বাবার ছিল রাখীর ব্যবসা। সারা ভারতেই যেত তাঁদের কলকাতার কোম্পানির তৈরি রাখী। কিন্তু রাখী মানেই শুধু জমকালো জরি নয়। সে তো ভাই আর বোনের ভালোবাসার বন্ধনের প্রতীক। তাতে থাকবে না কোনও সুক্ষ্ম কাজ? তা আবার হয় নাকি? যেমন ভাবা তেমন কাজ। গোটা ভারতকে মজিয়ে ফেলল মোহতাদের শিল্পিত রাখী।

কিন্তু রাখীর ব্যবসা তো মোটে তিন মাসের। বছরের বাকি ন’মাস?

সিনেমায় কিছু টাকা খাটিয়েছিলেন শ্রীকান্তর বাবা। সেই টাকার খোঁজ নিতেই চাঁদনি চকের এক ডিসট্রিবিউটরের অফিসে গিয়েছিলেন কলেজের ফার্স্ট ইয়ারে পড়া শ্রীকান্ত। সঙ্গে সেকেন্ড ইয়ারে পড়া ভাই-বন্ধু মহেন্দ্র। সেই অফিসই মাথা ঘুরিয়ে দিল দু’জনের। ছবির ডিস্ট্রিবিউশনে নামতে হবে।

নেমেও পড়লেন। তবে বাংলা নয়। হিন্দি ছবি ‘দোস্তি কা সৌগন্ধ’ আর ‘ইক্কে পে ইক্কা’। কিন্তু সব হিসেব বদলে দিল মণিরত্নমের ‘বম্বে’। সবাই তত দিনে ‘রোজা’ ছবিতে এ আর রহমানের সুরে মুগ্ধ। মুগ্ধ শ্রীকান্ত-মহেন্দ্রও। তা হলে ‘বম্বে’ ছবির ডিস্ট্রিবিউটরশিপ নিলে কেমন হয়?

দক্ষিণ ভারতীয় ছবি হিন্দিতে ডাব করা। হিরো হিসেবে কে চেনে অরবিন্দ স্বামীকে? মণিরত্নম, তিনিই বা আবার কে? এ ছবি বাংলায় কেউ দেখবে না। প্রায় সবাই এমনটাই ধরে নিয়েছিল।

কিন্তু সে কথা শুনতে রাজি নয় এঁরা। চলে গেলেন মুম্বইতে। কথা বললেন ঝামু সুগন্ধের সঙ্গে। সুযোগ বুঝে চড়া দর হেঁকে বসলেন ঝামু। অত টাকা ডাব করা ছবির জন্য কেউ দেয় না। কিন্তু দু’জনে নাছোড়বান্দা। দেখাই যাক না কী হয়।

নাছোড়বান্দা সেই জেদই ফল দিয়েছিল। অসামান্য কালেকশন দু’জনের। এর পরেই এল সঞ্জয় লীলা বনশালির ‘খামোশি’। এবারও এই ছবিতে বাজি রেখে বসলেন। কিন্তু না, এবার হল ‘বম্বে’-র ঠিক উল্টোটা। পুরোটাই লস।

কিন্তু শুধু হিন্দি ছবির ডিস্ট্রিবিউটরশিপ করেই যে হবে না, এই রাজ্যে ব্যবসা করতে হলে যে বাংলা ছবিও করতে হবে, তা স্পষ্ট বুঝতে পারছিলেন দু’জনেই। কিন্তু উত্তমকুমার পরবর্তী সেই জমানায় বাংলা ছবি কই? সামান্য ব্যবসা দিত অঞ্জন চৌধুরীর ছবি।

এমন সময়েই এল দিলওয়ালে দুলহনিয়া লে জায়েঙ্গের সেই চোট। তাঁরা নেমে পড়লেন বাংলা সিনেমা করতে। রিস্ক কমাতে নেওয়া হল, বাংলা ফিল্মের সেই সময়ের সব থেকে জনপ্রিয় ত্রয়ীকে। চিরঞ্জিত, প্রসেনজিৎ এবং অভিষেক। ছবির নাম ‘ভাই আমার ভাই’। সুপারহিট হল সেই ছবি।

চড়া অভিনয়, চড়া পোশাকের, চড়া দাগের বাংলা ফিল্ম থেকে দর্শককে মুক্তি দিতে, দক্ষিণ ভারত থেকে ফাইট মাস্টার কোরিওগ্রাফার নিয়ে আসা হল এবার। তৈরি হল ‘শ্বশুরবাড়ি জিন্দাবাদ’। আবার সুপারহিট। তৈরি হল বাংলা সিনেমার নতুন জুটি প্রসেনজিৎ-ঋতুপর্ণা।

২০০৩ সালে মাল্টিপ্লেক্স এল কলকাতায়। যোগাযোগ করলেন ঋতুপর্ণ ঘোষ। তাঁর ছবি এর আগে ডিস্ট্রিবিউট করেছেন এই দু’জন। ঋতুপর্ণ প্রস্তাব দিলেন একদম অন্য রকম একটা ছবি করার। এই ছবি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ভাবছেন তিনি। তবে, এই ছবি চলবে কি না সন্দেহ! দুই ভাই প্রথমে এড়িয়ে চলতে লাগলেন তাঁকে।

হঠাৎই ঋতুপর্ণ একটা কথা বলে বসলেন। এক দিন তো রাখীর ব্যবসাতেও শিল্পের ছোঁয়া আনতে চেয়েছিলেন শ্রীকান্ত। সিনেমাও তাঁরই ব্যবসা। কিন্তু তাতে শিল্পের ছোঁয়া থাকবে না?

কথাটা ফেলতে পারলেন না শ্রীকান্ত। তৈরি হল ‘চোখের বালি’। খোদ ঐশ্বর্য রাই পারিশ্রমিকের কথা না তুলেই কাজ করতে রাজি হলেন তাতে। শ্রীকান্ত বুঝিয়ে দিলেন মুম্বই-চেন্নাইয়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ভাল ছবি করতে পারে বাংলাও।

শ্রীকান্ত-মহেন্দ্রর হাত ধরেই উঠে এল নতুন এক প্রজন্ম। পরিচালক সৃজিত মুখোপাধ্যায় যেমন, তেমনই নতুন নায়ক দেবও। লেক গার্ডেন্সের ছোট অফিস থেকে কসবার নাম করা শপিং মলের লাগোয়া আঠেরো তলার প্রাসাদোপম অফিস হয়ে উঠল বাংলা ফিল্মের সব থেকে হ্যাপেনিং ডেস্টিনেশন।

গডফাদার না মাফিয়া?

সাফল্য থাকলে তাঁর পেছনে অন্ধকারও থাকে। শ্রীকান্ত মোহতারও আছে।

কিছুদিন আগেই শ্রী ভেঙ্কটেশ ফিল্মসের বিরুদ্ধে একদম টেলিভিশনে বসে মুখ খুলে ফেললেন দেব। সেই দেব, যাঁকে বাংলা ফিল্মের সুপারস্টার বানিয়েছে এই শ্রী ভেঙ্কটেশ ফিল্মসের ছবিই। শ্রীকান্ত যাঁকে ভাই বলে ডাকেন।

সোজাসাপটা অভিযোগ করে দেব বললেন, মোহতাদের জন্যই নাকি আগেভাগে হল থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে তাঁর হাউজফুল ছবিকে।

শাসক দলের সাংসদ, বাংলা ফিল্মের জনপ্রিয় তরুণ অভিনেতার মতো সোজাসাপ্টা না বললেও, চুপি চুপি এই অভিযোগ করেন অনেকেই।

তাঁদের বক্তব্য হল, ‘গডফাদার নয় মাফিয়া মোহতা’র দাপটেই নাকি হল পান না অন্য কেউ। চালু ছবিকেও প্রায় জোর করেই সরিয়ে দেন তিনি। ইন্ডাস্ট্রিতে কান পাতলেই এই অভিযোগ শোনা যায় ভূরি ভূরি। কখনও ভেঙ্কটেশ ক্যাম্পের বাইরে থাকা নির্দেশক, কখনও বা পাল্লা না দিতে পারা প্রযোজক, এই অভিযোগ আসলে অনেকেরই।

ফিল্ম মহলের বক্তব্য, বহু হল কিনে নিয়েছেন মোহতারা। সেগুলোকে নতুন করে সাজিয়ে ব্যবসা চালাচ্ছেন তাঁরা। তাঁদের কাছেই টিকি বাঁধা বাকি অন্য হল মালিকদেরও। তাঁদের অঙ্গুলিহেলনেই তাই ভাগ্য নির্ধারণ হয় বাংলা ছবির। তাঁরা চাইলে চলে। নইলে উঠে যায়।

তবে শ্রীকান্ত-মহেন্দ্রর ঘনিষ্ঠ বৃত্তের দাবি অন্য। তাঁদের কথায়, সব থেকে বেশি ছবির প্রযোজনা করেন এঁরাই। ফলে হল মালিকরা যে অন্যদের থেকে এদেরই বেশি পাত্তা দেবেন, সেটাই তো স্বাভাবিক। তা ছাড়া প্রোমোটারদের থাবার কবল থেকে বেঁচে আজও যে টিকে রয়েছে বাংলার হলগুলো, তার কৃতিত্বও তো শ্রীকান্তরই। তিনিই তো কিনে নিয়ে আধুনিক করে তুলেছেন অনেক হলকেই।

শুধু হল মালিকরা কেন? অভিনেতা, স্ক্রিপ্টরাইটার, পরিচালক, টেকনিশিয়ান-– সকলেরই কাজের জন্য মোহতাদের গুডবুকে থাকতে হবে। তাই তাঁদের চটাতে চান না কেউই। অবস্থা এমন, যে শ্রী ভেঙ্কটেশ ফিল্মসের অনুমতি ছাড়া নাকি সাক্ষাৎকারও দিতে রাজি হন না অনেকে। নতুন ছবি সাইন করা তো দূর অস্ত।

ক’দিন আগে দেবও অভিযোগ করেছিলেন, তাঁর প্রযোজিত ছবিতে নাকি সাইন করার পরেও না বলেছিলেন দুই নায়িকা।

ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে যাঁর এমন একচ্ছত্র দাপট, তিনি যে রাজনীতির ঘনিষ্ঠ বৃত্তেও উঠে আসবেন, এমনটাই স্বাভাবিক। শ্রীকান্তও এর ব্যতিক্রম নন। ক্ষমতার একদম ঘনিষ্ঠ বৃত্তেই তাঁর অবস্থান।

২০১৬ সালে, নির্বাচন কমিশনের কাছে দলের স্টার ক্যাম্পেনার হিসেবে শ্রীকান্ত মোহতার নাম দিয়েছিল বাংলার শাসক দল। শোনা যায়, দেবের সাংসদ হওয়ার পেছনেও নাকি আছে মোহতারই হাত। এমনকী সিনেমার তারকাদের শাসকদলের কাছাকাছি নিয়ে আসার পেছনেও নাকি আসলে তিনিই।

তাঁকে সুবিধা দিতে দক্ষিণ কলকাতার একটা শপিং মলের জন্য নাকি নিয়মও ভাঙা হয়েছে, এমন অভিযোগও শোনা গিয়েছে।

শোনা যায়, কিছু দিন আগেই নাকি এক অভিনেত্রীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিলেন শ্রীকান্ত মোহতা। সেই জন্যই নাকি ডিভোর্স ফাইল করেছেন তাঁর স্ত্রী। তবে সংবাদমাধ্যমের জোর গুজব, সেই অভিনেত্রীও নাকি এখন অন্য এক জনকে বিয়ে করতে চলেছেন।

সিবিআই নাকি রাজনীতি?

রাজনৈতিক মহলের অবশ্য নানা ব্যাখ্যা।

কেউ বলছেন ভারতের মতো দেশে এক জন সফল ব্যবসাদার যে রাজনীতির বৃত্তে ঢুকে পড়বেন, এটাই স্বাভাবিক। তার পরে তিনি যদি মোহতার মতো শো বিজ়ের কুশীলব হন, তা হলে তো কথাই নেই।

নিজের ব্যবসার স্বার্থেই তিনি চাইবেন ক্ষমতার ঘনিষ্ঠ হতে। আর ক্ষমতাও চাইবে তাঁকে কাছে রেখে বিনোদন ইন্ডাস্ট্রির পুরো গ্ল্যামারটাকে হাতে রাখতে।

আর এর মাঝেই ক্রমশ বাংলা ফিল্মে একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েম করেছে শ্রী ভেঙ্কটেশ ফিল্মস।

কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের বিরোধীরা বহু দিন ধরেই অভিযোগ করে আসছে, যে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা হচ্ছে সিবিআইকে। অভিযোগ উঠছে, দীর্ঘদিন ধরে চুপ করে বসে থাকার পরে এখন লোকসভা ভোট কলিং বেল বাজাতে শুরু করায়, ফের চেগে উঠেছে সিবিআই।

তাই বাংলা সংবাদমাধ্যমের নামজাদা এক সাংবাদিককে গ্রেফতার করার পর, এখন তাঁদের নেক্সট টার্গেট বাংলা বিনোদন ইন্ডাস্ট্রির খাস কেন্দ্রবিন্দু শ্রীকান্ত মোহতা।

রোজ়ভ্যালি কাণ্ডে তিনি সত্যিই জড়িত কি না সে কথা বলবে আদালত। তবে বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির সাম্প্রতিক ইতিহাসে যে তিনি অন্যতম একটা নাম, এই নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। আর  সাফল্যের খ্যাতি থাকলে, তার পেছনে অন্ধকারের অভিযোগও যে থাকবেই, সে নিয়েও কারও কোনও দ্বিমত নেই।

আরও পড়ুন:  চিটফান্ডের টাকা ঘুরিয়ে ‘আঁকা ছবি’ কিনেছিলেন শ্রীকান্ত: সিবিআই

চিটফান্ডের টাকা ঘুরিয়ে ‘আঁকা ছবি’ কিনেছিলেন শ্রীকান্ত: সিবিআই

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More