বুধবার, আগস্ট ২১

পৃথিবী দিবস উদযাপনের মাঝে, নিজেই ভবিষ্যতের পৃথিবী সেজে ঘুরে বেড়াচ্ছেন যে মানুষটি

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

মানুষটির শরীর জুড়ে বাঁধা হাজারো প্লাস্টিক, কাগজ, ঠোঙা, ব্যাগ– আরও কত কী। সেই সবটাই মোড়া রয়েছে একটা স্বচ্ছ প্লাস্টিকে। এভাবেই ঘুরে বেড়াচ্ছেন তিনি। এক ঝলক দেখলে মনে হবে, পাগল নাকি! মানে যেমন রাস্তার ভবঘুরে পাগলরা হন আর কী, না আছে ভাল-খারাপের জ্ঞান না আছে পরিষ্কার-নোংরার বোধ। কিন্তু মানুষটিকে অনুসরণ করলে দেখা যাবে, বাড়ি থেকে বেরিয়ে কাজে যাচ্ছেন তিনি। আবার ফিরছেন ঠিক জায়গায়। কথাবার্তাও একদম ঠিকঠাক, শুধু শরীরে রোজ বেড়ে যাচ্ছে একটু করে আবর্জনার পরিমাণ!

কেন?

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আপাত দৃষ্টিতে ‘পাগল’ বলে মনে হওয়া মানুষটি আদতে আমাদের চেয়ে অনেক বেশি সুস্থ। এবং তিনি তার চেয়েও বেশি চিন্তিত অন্যের সুস্থতা নিয়ে, সারা পৃথিবীর সুস্থতা নিয়ে। সারা গায়ে ‘নোংরা’ জমানো মানুষটি যে আদতেই সব চেয়ে বেশি চিন্তিত পরিচ্ছন্নতা নিয়েই, তা বোঝা যায় একটু খোঁজ নিলেই।

তাঁর নাম রব গ্রিনফিল্ড। থাকেন নিউ ইয়র্কে। মানুষটি মনে করিয়ে দিচ্ছেন, প্রতি দিন এক জন আমেরিকান মানুষ গড়ে ৪.৫ পাউন্ড আবর্জনা তৈরি করেন, যা প্রকৃতির সঙ্গে মিশে যায় না। সেই হিসেবে এক মাসে অর্থাৎ ৩০ দিনে তৈরি হয় ১৩৫ পাউন্ড আবর্জনা! প্রত্যেক মাসে আমেরিকার এক এক জন মানুষ পৃথিবীকে উপহার দিচ্ছেন এই এতটা পরিমাণ নন বায়োডিগ্রেডেবেল আবর্জনা!

এটা মনে করানোর জন্যই, বা বলা ভাল চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়ার জন্যই রব ঠিক করেছেন, এক মাসে অর্থাত্‍ ৩০ দিনে যে আবর্জনা জমবে, তা শরীরে বয়ে বেড়াবেন তিনি। গোটা নিউ ইয়র্ক জুড়ে এভাবেই ঘুরবেন। মানুষকে জানাবেন, এই পৃথিবীকে নষ্ট করার পেছনে কতটা করে অবদান রাখছে তারা!

অবাক লাগছে তো খুব? অবাক লাগার মতোই। আপনি ভাবুন তো, গত এক মাসে ঘরে বা অফিসে বা পথে, যা খেয়েছেন, যা পরেছেন, যা কিনেছেন, সেই সব থেকে যত আবর্জনা তৈরি করেছেন, তা বয়ে বেড়াচ্ছেন নিজের শরীরে! হ্যাঁ, বিষয়টি যথেষ্ট বিব্রতকর হলেও, এমনটাই ঘটিয়েছেন রব।

রব বলছিলেন, “বেশির ভাগ মানুষই একটা বর্জ্য ফেলে দেওয়ার পরে আর এক বারও ভাবেন না, তাঁরা প্রতিদিন কী পরিমাণ আবর্জনা তৈরি করছেন পৃথিবীর বুকে। ময়লার ঝুড়িতে ওই সব আবর্জনা ফেলে দেওয়ার পরে তা চলে যায় সকলের নজর ও চিন্তার বাইরে। কিন্তু সেই আবর্জনাই যে জমে জমে পৃথিবীকে ঠিক কোন জায়গায় ঠেলে দিচ্ছে, তা তাঁরা আন্দাজও করতে পারছেন না।”

রব আরও বলেন, “যদিও এখন প্রায় সকলেই জানেন, প্রতিদিন আমেরিকানরা গড়ে সাড়ে চার পাউন্ড আবর্জনা তৈরি করছেন। তবে তা কেবল জানা, তা কেবল একটা সংখ্যা। এর ফলাফলটা নিয়ে কোনও খবরও হচ্ছে না, বা তেমন কোনও সচেতনতামূলক প্রচারও করা হচ্ছে না। বর্জ্য বেড়েই চলেছে। যে পৃথিবী আমাদের ধারণ করছে, লালন করছে, তাকে আমরা প্রত্যেক দিন শেষ করেই ফেলছি প্লাস্টিক-সহ নানা রকম নন বায়োডিগ্রেডেবেল আবর্জনার বোঝা বাড়িয়ে।”

এই বোঝার পরিমাণ সম্পর্কে মানুষকে সম্যক ধারণা দেওয়ার জন্য এবং সচেতন করার জন্যই শরীরে আবর্জনা বেঁধে ঘুরে বেড়ানোর এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছেন রব। তিনি বলছেন, “এই সমস্ত বর্জ্যে পৃথিবীর শ্বাস আটকে যাচ্ছে। সে কথা ভেবে যদি মানুষ সচেতন হন, তবেই বাঁচতে পারে পৃথিবী।”

শুধু তা-ই নয়। রব ঠিক করেছেন, দূষণ কমাতে এবং বর্জ্য কমাতে, তিনি নিজের প্রয়োজনীয় সমস্ত জিনিস নিজেই উৎপাদন করেন। যা উৎপাদন করেন, তা-ই খান। তার বাইরে কোনও খাবার খান না। নষ্টও করেন না কিছু। নিজে তৈরি করেন না কোনও বর্জ্য। এই কাজেও মানুষকে উৎসাহিত করেন তিনি। তাঁর বার্তা, ‘ডোনেট, নট ডাম্প।’

আজ, ২২ এপ্রিল, পৃথিবী দিবস। আমাদের বসবাসকারী এই গ্রহটার উদ্দেশে একটা দিবস উৎসর্গ করেছে মানব সভ্যতা। এই দিনটা সারা বিশ্ব জুড়ে পালিত হবে নানা রকমের ইতিবাচক প্রতিশ্রুতি ও সচেতনতার প্রচার করে।

আর এ সবের মাঝখানেই রব গ্রিনফিল্ড ঘুরে বেড়াচ্ছেন, নিজেকে ভবিষ্যতের পৃথিবীর মতো করে সাজিয়ে।

হ্যাঁ, এমনটাই বলছেন তিনি। তাঁর কথায়, “এ ভাবে চললে আর কয়েক দিন পরে পৃথিবী বলে কিছু থাকবে না, একটা আবর্জনার গ্রহে পরিণত হবে এটি। তার ধ্বংস হওয়া কেবল সময়ের অপেক্ষা।”

আরও পড়ুন…

হিমালয়ে আলোর অভিযান! রশ্মি ছড়ায় প্রত্যন্ত পাহাড়ি গাঁয়ে, খোঁজ রাখে না গুগল ম্যাপও

Comments are closed.