সোমবার, এপ্রিল ২২

কাবুলের পাহাড়চূড়ায় জ্বলছে হিন্দুদেবী আশামাঈয়ের প্রদীপ, নেভাতে পারেনি তালিবানও

রূপাঞ্জন গোস্বামী

কাবুল শহরের  কেন্দ্রস্থলে পাহাড় কোহ-ই-আশামাই। এই পর্বতের চূড়ায় হিন্দু দেবী আশামাঈয়ের মন্দির। এই মন্দিরেই  চার হাজার বছর ধরে ধিকিধিকি জ্বলে চলেছে এক পবিত্র বহ্নিশিখা’ নাম  ‘অখণ্ড-জ্যোতি’। গুলবুদ্দিন হেকমতিয়ার কিংবা তালিবান স্রষ্টা মোল্লা ওমরের  রক্তস্নাত আফগানিস্তানে একদিনের জন্যও নেভেনি দেবী আশামাঈয়ের  এই পবিত্র দিয়া বা  প্রদীপ।

কাবুলের কোহ-ই আশমাঈ পর্বত

প্রদীপ নেভেনি কারণ, স্থানীয় মুসলিম ও হিন্দু জনগণ  বিশ্বাস করেন, কাবুলের  মানুষের চিরন্তন আশা ভরসার প্রতীক  দেবীদুর্গা  ‘আশামাঈ’ রূপে কাবুলের  ওই পর্বতশিখরে অবস্থান করেন। কাবুলকে বিপন্মুক্ত  ও সম্পদশালী করে তোলেন। এবং তাঁকে তাঁর অবস্থান থেকে  টলানো কোনভাবেই  সম্ভব নয়। পাহাড়ের নামটিও যে আশা  দেবীরই নামে। মৌলবাদীরাও কি তাই-ই বিশ্বাস করতো!

তালিবানরা  ডিনামাইট দিয়ে ও কামান ছুড়ে বামিয়ানের বিশ্ববিখ্যাত বৌদ্ধ মূর্তি ধ্বংস করলেও কোনও অজানা ভয়েই কি আশমাঈ মন্দিরের দিকে কামান তো দূরের কথা, চোখ তুলে তাকাতে সাহস পায়নি! কাছাকাছি গুলি চলেছে, চলেছে গণহত্যা। কিন্তু মন্দিরের কোনো ক্ষতি হয়নি। বরং পশ্চিমী জোটের বিমানহানায় আশামাঈয়ের পুরোনো মন্দির ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল বলে শোনা যায়, কিন্তু তখনও নেভেনি প্রদীপ। কারণ, বিমানহানার আগেই বের করে আনা হয়েছিল প্রদীপটি। স্থানীয় কিছু মুসলিমদের সহায়তায় কোনো গোপন স্থানে প্রজ্জ্বলিত প্রদীপকে নিরাপদে রাখা হয়েছিল। সময়মতো ঘি ঢালা হয়েছিল প্রদীপে। মুষ্টিমেয় স্থানীয় হিন্দুরা তখন তালিবানের আদেশে গৃহবন্দী প্রায়। তখনও জ্বলেছিল প্রদীপ। ঘিয়ের জোগান দিয়েছিলেন স্থানীয় মুসলিমরাই।

মন্দিরে প্রার্থনারত ভক্তরা

সীমান্ত গান্ধী খান আব্দুর গফফর খানের সময়ে যে সম্প্রীতি আফগানিস্তান দেখতো, সেই সম্প্রীতিতে আঘাত এসেছে। আফগানিস্তান প্রায় হিন্দুশূন্য হতে চলেছে। কিন্তু  দশকের পর দশক ধরে চলা আফগানিস্তানের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ধর্মীয় মৌলবাদ লেশমাত্র স্পর্শ করতে পারেনি আশামাঈয়ের প্রজ্জ্বলিত অগ্নিশিখাকে।

 

 

তালিবান শাসনের পর যখন আফগানিস্তানে নির্বাচিত সরকার ফিরে আসে, নতুন ভাবে আফগানিস্তানের মুসলিমরা এগিয়ে আসেন হিন্দুদেবীর মন্দির পুনরুদ্ধারে। শুরু হয় সম্মিলিত করসেবা।

মন্দির উদ্বোধন করছেন বায়াত ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা এহসান  বায়াত

২০০৬ সালে হাজার হাজার মুসলিম ও হিন্দু  জনগণ সমবেত হন কাবুল শহরের সর্বোচ্চ স্থানে নির্মিত আশামাঈয়ের নতুন মন্দিরের দ্বার উদঘাটন অনুষ্ঠানে। শুনলে অবাক হবেন ‘বায়াত’ ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা জনাব এহসান বায়াত যিনি ধর্মে সুন্নি মুসলিম, তিনি পাহাড় চূড়ায় আশামাঈয়ের নতুন মন্দিরটির  নির্মাণ খরচ একাই বহন করেছেন।  আফগানিস্তানের সংখ্যালঘু  হিন্দু, শিখ, খ্রিস্টানদের সাথে সংখ্যাগুরু  মুসলিমরাও  মন্দির গড়ে তুলতে করসেবায় হাত লাগিয়েছিলেন।
মন্দির প্রাঙ্গণে দেখতে পাবেন  ‘পাঞ্জশির কা যোগী’ নামের এক পবিত্র পাথর। পাথরটি এক প্রাচীন  হিন্দুযোগীর নামে নামাঙ্কিত। যিনি নৈসর্গিক সৌন্দর্যের জন্য ভুবন বিখ্যাত পাঞ্জশির ভ্যালিতে তপস্যা করতেন। কিন্তু স্থানীয় উপজাতীয় কিছু মানুষ তাঁর তপস্যা ভঙ্গ করার চেষ্টা করলে তিনি  নিজেকে প্রস্তরে পরিণত করে নেন। তখন স্থানীয় মানুষেরা দৈবকোপের   ভয় পেয়ে স্থানীয় হিন্দু ও শিখদের শরণাপন্ন হন। হিন্দু ও শিখের দল প্রস্তরখণ্ডটিকে অতিকষ্টে  আশমাঈ মন্দিরে নিয়ে আসেন। রোজ বিভিন্ন ধর্মের মানুষ ‘পাঞ্জশির কা যোগী’ নামের পাথরে ধূপ দেন, চাদর চড়ান। প্রত্যেক দিন প্রচুর ভক্ত আসেন আশমাঈয়ের  মন্দিরে।

আরও পড়ুন: বালুচ-বুকে কালাটেশ্বরী কালী, মাথা ঝোঁকায় পাকিস্তানও

বড় উৎসব হয় হোলি ও  দিওয়ালিতে। প্রতি বছর নবরাত্রির নয়দিন তো  সারা কাবুল শহরের মুখ ঘুরে যায় আশামাঈ মন্দিরের দিকে। বিভিন্ন ধর্ম ও বর্ণের প্রচুর মানুষ আসেন তাঁদের আশা ভরসার দেবী ‘আশামাঈয়ের কাছে মানত করতে। লোকগান, লোকগাথায়, আলোর মালায়  জমজমাট ও মুখর হয়ে ওঠে মন্দির প্রাঙ্গণ তথা  কোহ-ই-আশামাঈ পর্বত।
কাবুলে আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে তালিবান। আফগানিস্তানের একটা বড় অংশ অলিখিত ভাবে আজ তালিবানের নিয়ন্ত্রণাধীন। যে কোনও মুহূর্তে কাবুল দখল করার জন্য হামলা হতে পারে। কিন্তু হলফ করে বলা যায়, নিভবে না আশামাঈয়ের প্রদীপ। কারণ চার হাজার বছর ধরে পার্থিব কোনও শক্তিই এই প্রদীপ নেভাতে পারেনি। তালিবান তো কোন ছার!

আরও পড়ুনঃঅবিশ্বাস্য! কমিউনিস্ট চিনের একটি গ্রাম বুকে আগলে রেখেছে এক হিন্দুদেবীকে

 

Shares

Leave A Reply