মঙ্গলবার, এপ্রিল ২৩

ভূতে কি সত্যি ভয় পেল প্রশাসন? তাই বন্ধ হল ছবি? প্রশ্ন তুললেন পরিচালক অনীক

দ্য ওয়াল ব্যুরো: তাঁর ‘ভূতের ভবিষ্যত’ ছবির অন্তর্নিহিত বার্তা কী ছিল তা পরের কথা, সাত বছর আগে সেই ছবি দেখে হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরে গিয়েছিল বহু দর্শকের।

শুক্রবার অনীক দত্তর নতুন ছবি ‘ভবিষ্যতের ভূত’ রিলিজ করেছে। তারপর শনিবার যে ভাবে কলকাতার সমস্ত সিনেমা হলে ছবিটির প্রদর্শন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, তাতে সেই পরিচালকই মনে করছেন, এই ভূতে ভয় পেয়েছে প্রশাসন। তিনি কারও নাম করেননি। কিন্তু শনিবার দুম করে ছবির প্রদর্শন বন্ধ করে দেওয়ার পর আপাত নিরীহ প্রকৃতির এই মানুষটি যেন ঝলসে উঠেছেন। সাংবাদিক সম্মেলন করে বলেছেন, “হয়তো ছবিটার জন্য হায়ার অথরিটি ভয় পেয়েছেন! কারণ, আমাদের বলা হয়েছে, তাঁদের নির্দেশেই প্রদর্শন বন্ধ করা হয়েছে।” কিন্তু এর পরই কৌতূহলী প্রশ্ন তোলেন অনীক। বলেন, “এত ভয় কেন? এটা একটা ভালো ছবি। ছবিটাতে ভয় পাওয়ার মতো কিছু নেই। কিন্তু কেন ভয় পেয়েছেন জানি না”। পরিচালকের কথায়, কলকাতাকে সংস্কৃতির পীঠস্থান বলা হয়। সেখানে এত লজ্জা, এত হতাশা এটা আমাদের আশ্চর্য করেছে!

প্রসঙ্গত, কিছুদিন আগে কলকাতা ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে, নন্দন, রবীন্দ্রসদন চত্বর জুড়ে মুখ্যমন্ত্রী ছবি ব্যবহার করার নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিলেন অনীক দত্ত। ফেস্টিভ্যালের একটা আলোচনা সভায় তিনি বলেছিলেন, ‘সিনেমা এখন আর পরিচালক, প্রযোজকদের বিষয় নয়, নন্দন প্রাঙ্গণে যাঁর ছবি ছড়িয়ে আছে, বাস্তবে তিনিই বোধহয় সিনেমার একমাত্র ব্যক্তিত্ব।’

অনীকের এই মন্তব্য নিয়ে তখন শাসক শিবির থেকে পাল্টা কটাক্ষও করা হয়েছিল। তাতেও সে বার দমেননি তিনি। বলেছিলেন, “ভাতে মারলে, রুটি খেয়ে থাকব।”

অনীক শনিবার জানান, ‘ভবিষ্যতের ভূত’ ছবিটি প্রকাশের কিছুদিন আগে কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা দফতর থেকে তাঁকে ফোন করা হয়েছিল। সেই সময় তাঁকে বলা হয়, এই ছবির কারণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে। তবে পরিচালক জানান, কলকাতা পুলিশ এ কথা বললেও, এই ছবিটা সেন্সরের ছাড়পত্র পেয়েছিল। হলে প্রদর্শনের জন্য অন্য যা যা দরকার, সে সবও ছিল। তারপরেও কেন বন্ধ করে দেওয়া হল সেটাই বড় প্রশ্ন।

স্বাভাবিক কারণেই শনিবারের ঘটনাকে অনেকেই ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের সময় অনীকের মন্তব্যের সঙ্গে জুড়ছেন। ছবিটা যাঁরা ইতিমধ্যেই দেখে ফেলেছেন, তাঁদের অভিমত, সিস্টেম তথা শাসনযন্ত্রের বিরুদ্ধে কেউ গেলে যে কোণঠাসা হতে পারে, এমনকী ভূতে বিলীন হতে পারে, সে কথাই এই ছবিতে বলেছিলেন অনীক। ভিলেনের মাথায় অক্সিজেনের অভাব, চড়াম চড়াম, হোক কলরবের মতো এমন অনেক বিষয় এই ছবিতে উঠে এসেছিল। যাকে সহজে রাজ্যের বর্তমান রাজনীতির সঙ্গে মিলিয়ে ফেলা যায়। তাই অনেকে মনে করছেন, ভোটের বাজারে এমন ছবি শাসকের মাথাব্যথার কারণ হতে পারে। হয়তো সেই কারণেই বন্ধ করে দেওয়া হল ভবিষ্যতের ভূতের প্রদর্শন। এবং তা করে কলকাতাকে পিছিয়ে দেওয়া হল একশ বছর!

ছবির স্ক্রিপ্টরাইটার উৎসব মুখোপাধ্যায় বলেছেন, ‘ছবিতে সমসাময়িক রাজনীতিও ছিল। সমসাময়িক ভূতেরাও ছিল। হয়ত তাই বন্ধ করে দেওয়া হল।’

এর আগে সুমন মুখোপাধ্যায়ের ছবি ‘কাঙাল মালসাট’-এর প্রদর্শনীও বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সেই সময়েও অভিযোগ উঠেছিল, রাজ্য সরকারের সমালোচনা থাকাতেই বন্ধ হয়ে গিয়েছে ওই ছবিটির প্রদর্শন। হঠাৎ করে ‘ভবিষ্যতের ভূত’-এর প্রদর্শন বন্ধ করে দেওয়া নিয়ে শনিবার প্রশ্ন তুলছেন টালিগঞ্জের একাংশও। তাঁরা বলছেন, ব্যক্তি স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে বলে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তথা বিজেপির প্রবল সমালোচনা করেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর রাজ্যেই এইভাবে একটা ছবি হলে দেখানো বন্ধ করে দেওয়াও তো সেই স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপেরই নামান্তর। অনীক দত্তদের পাশে থাকার বার্তা দিয়েছেন পরিচালক সৃজিত মুখোপাধ্যায়ও। নোয়াম চমস্কিকে উদ্ধৃত করে সৃজিত বলেন, “যাদের সঙ্গে তোমার মতান্তর তাদের বাক স্বাধীনতায় যদি তুমি বিশ্বাস করো না, তা হলে বুঝতে হবে বাক স্বাধীনতাতেই তোমার বিশ্বাস নেই।”

টুইট করেছেন অভিনেতা, পরিচালক পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়ও। তাঁর বক্তব্য, “যদি রাজনৈতিক কারণে এই ছবি হল থেকে তুলে নেওয়া হয়, তাহলে সেটা খুবই জঘন্য কাজ। সমালোচনা, প্রতিবাদ হতেই পারে। কিন্তু বন্ধ ( পড়ুন ছবির প্রদর্শন ) করে দেওয়া ঠিক নয়। সব চিন্তাকে স্বাগত। মানুষ সঠিক পথকেই বেছে নেবেন।”

তবে পরিচালক অনীক দত্তর বক্তব্য, তাঁর কাজ শুধুই ছবি বানানো। তাই জোর করে প্রদর্শন বন্ধ করা নিয়ে প্রযোজকরা শেষ অবধি আদালতে যাবেন কিনা, তা তাঁরাই ঠিক করবেন।

ছবি বন্ধ করে দেওয়া নিয়ে এ দিন তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান এই ছবির সঙ্গীত পরিচালক দেবজ্যোতি মিশ্রও। তিনি বলেন, “এই শহরে, এই রাজ্যেও যে এমনটা হতে পারে, তা মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে। আসলে অনীকের এই ছবির জন্য খুব মন দিয়ে কাজ করেছিলাম। মানুষ ছবিটা দেখবেন, না দেখবেন না, সেটা তাঁদের উপরেই ছেড়ে দিতে পারত!” ছবি দেখানো বন্ধ নিয়ে তীব্র প্রতিবাদ করেন এই ছবিতে অভিনয় করা কৌশিক সেনও। তিনি বলেন, “এত শিল্পের কথা বলা হচ্ছে রাজ্যে। এই টলিউড ইন্ডাস্ট্রিও তো একটা ইন্ডাস্ট্রি। তাঁরা কোন মুখে এ বার বলবেন যে এই রাজ্য শিল্পের?”

Shares

Comments are closed.