যুদ্ধ শেষে করমুক্ত ন্যাপকিন, শাপমুক্ত ঋতুস্রাব, কিন্তু লড়াইটা থামল কি?

0

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    চৈতালী চক্রবর্তী

    সফল হল লড়াই। ১২ শতাংশ করের বোঝা থেকে হাঁফ ছেড়ে বাঁচল স্যানিটারি ন্যাপকিন। শাপমুক্তি ঘটল দীর্ঘদিনের বিপ্লবের। বহু তর্ক-বিতর্ক, লজ্জা-অপমান, সমাজ থুড়ি পিতৃতন্ত্রের চোখ রাঙানিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে যে লড়াইটা পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখছিল, সেই পথে অনেকটা অগ্রসর হল দেশ। নিঃশব্দে সাধুবাদ জানাল প্রত্যন্ত এলাকায় ঘোমটার আড়ালে থাকা অনেক মুখ। আর সাহসিনীরা গর্জে উঠল ফেসবুকের দেওয়ালে, টুইটার হ্যান্ডেলে।

    জিএসটি কাউন্সিলের ঘোষণার পর দেশজুড়ে খুশির হাওয়া। প্রশংসা উপচে পড়ছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। কেনিয়া পেরেছে, ভারতের থেকে গরিব হয়েও আফ্রিকা পেরেছে বহুদিন আগেই, হালে মরিশাস পেরেছে, তাহলে মেয়েদের স্বাস্থ্য সুরক্ষিত রাখতে ভারতই বা পিছিয়ে থাকবে কেন?

    লড়াইটা শুরু হয়েছিল বহুদিন আগেই। প্রধানমন্ত্রী ‘ডিজিটাল ইন্ডিয়া’ প্রকল্পে হাতে হাতে মোবাইল। কিন্তু মহিলাদের ঋতুকালে স্যানিটারি ন্যাপকিন ব্যবহারে দেশ ছিল সেই তিমিরেই। মাত্র ৫০ শতাংশ মেয়ে স্যানিটারি ন্যাপকিন কিনতে পারেন। তা-ও দীর্ঘমেয়াদি সচেতনতা প্রসারের পরে। বাকিরা ব্যবহার করেন পরিত্যক্ত শাড়ি বা কাপড়ের টুকরো! ‘ইন্টারন্যাশনাল মেনস্ট্রুয়াল ডে’ বা আন্তর্জাতিক ঋতু দিবসে বিভিন্ন সংস্থার দেওয়া তথ্যেও ধরা পড়েছিল একই ছবি। সচেতনতা প্রচারের ফলে যে সব মেয়েরা স্যানিটারি ন্যাপকিন কিনতে শুরু করেছিলেন, জিএসটি চালু হওয়ার পরে দাম বেড়ে যাওয়ায় তাঁরা আবার সেই পুরনো ব্যবস্থাতেই ফিরে গিয়েছেন।

    আওয়াজ উঠেছিল বিভিন্ন মহলে। মহিলাদের স্বাস্থ্যবিধি সুরক্ষিত রাখতে যে কোনও জীবনদায়ী ওষুধের মতো ঋতুকালীন ব্যবহার্য স্যানিটারি ন্যাপকিনেরও একই রকম গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা রয়েছে সেই বিষয়ে জোরালো আওয়াজ তুলেছিলেন শিলচরের কংগ্রেস সাংসদ সুস্মিতা দেব।

    প্রশ্ন ছিল, ভারতের মতো দেশে যেখানে সিঁদুরের কর শূন্য, সেখানে মহিলাদের স্বাস্থ্য এবং পরিচ্ছন্নতার কথা মাথায় রেখে স্যানিটারি প্যাডে কেন ১২% কর বসানো হবে? রাজনীতির গণ্ডি পেরিয়ে বিপ্লবে সামিল হয়েছিলেন তারকারাও। কর-মুক্তির পর টুইটারে জিএসটি কাউন্সিলকে সাধুবাদ জানিয়েছেন ‘প্যাডম্যান’ অক্ষয়কুমার, টুইঙ্কেল খন্না, সুস্মিতা দেব-সহ অনেকেই।

    সবই তো হল। তবে ষোলোকলা পূর্ণ হল কি? বাণিজ্যিক দিক থেকে সাফল্য এল ঠিকই, কিন্তু সচেতনতার প্রসার এবং প্রচার এখনও অনেকটাই বাকি। সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, দেশে ১৫-২৪ বছর বয়সী মেয়েদের বেশিরভাগই ঋতুকালীন সময় স্যানিটারি প্যাড ব্যবহার করেন না। একই ছবি এ রাজ্যেও। ঋতুস্রাবের সময় আদিবাসী গরিব মেয়ে, বৌয়েদের ভরসা এক টুকরো কাপড় অথবা ছাই।

    ২০০৪ সালে তামিলনাড়ুর কোয়ম্বত্তূরে প্রথম স্যানিটারি প্যা়ড তৈরির যন্ত্রটি আবিষ্কার করেন অরুণাচলম মুরুগনন্তম, যা খুব কম খরচে পরিস্রুত, স্বাস্থ্যকর প্যাড তৈরি করতে পারে। এ নিয়ে তাঁকে কম ছিছিক্কার শুনতে হয়নি। এখন অবধি ২৩টি রাজ্যে তাঁর এই মেশিন বসানো হয়েছে। তাঁর অনুপ্রেরণায় উৎসাহী হয়ে আরও অনেক ছোট ব্যবসায়ী এই ব্যবসায় এসেছেন। তাঁর জীবনী নিয়েই রমরম করে চলেছে ‘প্যাডম্যান’। হাতে প্যাড নিয়ে খোলামেলা সচেতনতার প্রচারের ডাক দিয়েছেন অভিনেতা অক্ষয় কুমার থেকে বলিউডের অনেক তারকাই।

    মুশকিল হল, কুসংস্কার যে দেশের শিরায়-উপশিরায় বিদ্যমান, সেখানে সচেতনতা শুধুই একটা শব্দ মাত্র। ঋতুস্রাব নিয়ে খোলামেলা আলোচনা এখনও সমাজের অনেক স্তরেই গর্হিত অপরাধ। ঋতুমতী নারী মানেই সে অচ্ছুত। সচেতনতার প্রচারকে সেখানে বাঁকা চোখে দেখা হয়। শান্ত-সুশীলা, শত চড়েও রা না কাটা, গাভীর ন্যায় আজ্ঞাপালনকারী মেয়ে-বউ ছিলেন যাঁরা, তাঁরা নাকি নেবে ঋতুস্রাব নিয়ে সচেতনতার পাঠ? নৈব নৈব চ। তবে থেমে থাকলে তো চলবে না। তা থেমে থাকেননি সমাজের অধিকাংশ মানুষ। এত দিন যে এনজিও, স্বাস্থ্যকর্মীরা গুনগুন করে ঋতুস্রাবকালীন স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতার পাঠ পড়াচ্ছিলেন, ‘প্যাডম্যান’ মুক্তি পাওয়ার পর ছাইচাপা আগুনে যেন ঘৃতাহুতি হয়।

    এই সিনেমা ঋতুস্রাব নিয়ে কুসংস্কারের ভুল ধারণাটা ভাঙতে পেরেছে কি না, সেটা বড় কথা নয়। অন্তত মেয়েদের নিয়মিত ঋতুস্রাব হয় এবং সেটা লুকিয়ে রাখার নয়, তার জন্য লজ্জার কিছু নেই— এই সরল কথাটা কোটি কোটি মানুষের সামনে নির্দ্বিধায় তুলে ধরতে পেরেছে। একটা ধাক্কা দিতে পেরেছে জনমানসে। বাঁধ ভাঙা জলের মতোই শহর থেকে গ্রামে-গঞ্জে ছড়িয়ে পড়েছে। পিতৃতন্ত্রের দরজা ভেঙেই হোক কিংবা তিরতিরিয়েই হোক, কোথাও একটা সাহস ধীরে ধীরে দানা বেধেছে মানুষের মনে।

    এখন কেউ কেউ হয়তো প্রশ্ন করবেন কর তো উঠল, কিন্তু সত্যিকারের পরিবর্তন কতটুকু হবে? বিরাট পরিবর্তন যে এখনই আসবে না, তা হলফ করে বলা যায়। কিন্তু ছোট ছোট পরিবর্তন যে একেবারেই আসবে না, এটা বলা যায় না। একটা নারী দিবসে নারীর অবস্থান বদলায় না। কিন্তু, দিনটাকে মনে রেখে লড়াইটা চালিয়ে যেতে হয়। তেমনি একটা পদক্ষেপ গোটা সমাজকে একদিনে বদলে দিতে পারে না। তবে আলোচনার একটা দিগন্ত খুলে দেয়। সেটাকে আঁকড়ে ধরেই লড়াইটা চালিয়ে যেতে হয়। আশা রাখা যেতেই পারে, যেটা আগে সম্ভব ছিল না। এখন হয়তো বা সম্ভব হবে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Leave A Reply

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More