মঙ্গলবার, জুন ২৫

স্মৃতিগুলো কিছুতেই পিছু হাঁটে না…

তাঁর মৃত্যুদিন আজ। বাঙালির এভারগ্রিন আইকন উত্তমকুমারকে নিয়ে লিখলেন শমীক ঘোষ। 

টেবিলের ওপর জোরে জোরে চাপড় মারছে হাতটা। পেছনে ভারি একটা কণ্ঠস্বর। জেদ, প্রবল জেদ। ‘আই উইল গো টু দ্য টপ, দ্য টপ, দ্য টপ।’

আটের দশকের শেষ দিক। তখনও কেবল আসেনি। টিভি বলতে ঢাউস, ব্যাঁকানো স্ক্রিন একটা বাক্স। সেই বাক্সতেই সাদা কালো ছবিতে আমি দেখেছিলাম লোকটাকে। ভারি গলা। ফর্সা। সুপুরুষ। কথাটা যেন গলার একটু ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে।

সাদা কালো টিভিতে দূরদর্শনের সেই জমানায় বাংলা সিনেমা দেখানো হত মাত্র একদিন। আর আমি অবাক হয়ে দেখতাম খান দুয়েক টিভিওয়ালা আমাদের সেই মধ্যবিত্ত মহল্লায় সেই লোকটার সিনেমা দেখানো হলেই ভিড় জমে যেত আমাদের বাড়িতে। আর সেই সিনেমার নাম যদি হত ‘সপ্তপদী’, তাহলে ভিড় টিভির ঘর ছাপিয়ে, বারান্দা ছাপিয়ে উঠোন অবধি।

আমার বড় হওয়ার অনেক আগেই উত্তম-সুচিত্রা শব্দটাই গেঁথে গিয়েছিল আমার মনের মধ্যে। চাপ দাড়ি, গোঁফ, মুখে একটু কালো রঙ মাখা কোনও এক কৃষ্ণেন্দু মুখার্জি, স্টেজে ওথেলো সেজে নিজের শরীরে ছুরিটা গেঁথে নেয়। আর তারপরেই ছুটে যায় চোখ বন্ধ রিনা ব্রাউনের দিকে। বলে ওঠে, ডেসডেমোনা, আই কিসড দি, আই কিলড দি। তখন জানতাম না ওই ইংরাজি গলাটা আসলে তাঁর নয়। উৎপল দত্তর।

সেই যুবকটিই রিনা ব্রাউনকেই পিছনে বসিয়ে বেলাগাম মোটরবাইক চালিয়ে বাঁকা পথে ছুটে যেতে গান গায়, ‘এই পথ যদি না শেষ হয়, তবে কেমন হত বলো তো।’

দুষ্টু, বদমায়েশ, নাছোড়, মেটিরিয়া মেডিকার কাব্য বোঝা না-বোঝা কৃষ্ণেন্দু কখন যেন সেই ছোটবেলায় আমার কাছে যুবক হয়ে ওঠার মানে হয়ে দাঁড়ায়।

যুদ্ধক্ষেত্রে রেললাইনের ধারে আর্মির ডাক্তার সেই কৃষ্ণেন্দু যখন আবার অচৈতন্য রিনা ব্রাউনকে খুঁজে পায় আবার। খুব জোরে ট্রেন যায় পাশ দিয়ে। আর সেই ট্রেনের গতি অভিঘাতে, দরমার ঘরে লাগানো ছোট আয়না কাঁপে। তাতে আলোর ঝলকানো দেখা যায়।

বয়সন্ধির আগেই, শৈশব আর কৈশোরের সীমারেখায় দাঁড়ানো ছোট্ট সেই ছেলেটার কাছে ওইটাই প্রেমের এপিটোম হয়ে যায়। থেকে যায় আজীবন।

প্রেম মানে তো স্থিরতা নয়। দোলাচল। জেতাহারার অনেক বাইরে চলন্ত ট্রেনের আলো চলকে ওঠা একটা আয়না।

গীতা দত্তর সেই গানটা। ‘তুমি যে আমার’। প্রায় অন্ধকার কালো পর্দায় গলায় ফুলের মালা পরা সুচিত্রা। আর তাঁর কোলের কাছে শুয়ে প্রায় স্ট্যাটিক উত্তম।

কিন্তু সেই উত্তমকেই ঈর্ষা করতে শুরু করলাম যখন তাঁর পাশে দেখলাম লাস্যময়ী আরেক সুন্দরীকে। বাংলা সিনেমার সোফিয়া লোরেন তিনি। নাম সুপ্রিয়া দেবী।

খাস হলিউড থেকে যেন বাংলায় নেমে এসেছেন স্যুটেড বুটেড উত্তম কুমার। পিয়ানো বাজাতে বাজাতে সুর ধরছেন বাঙালির নিজস্ব রবীন্দ্রনাথের গান, ‘আমি পথ ভোলা এক পথিক এসেছি।’ আর তাঁর সঙ্গে গলা মেলাচ্ছেন শাড়ি জড়ানো সুপ্রিয়া।

এই জুটি বাঙালি সব থেকে প্রিয় মোটেও নয়। বরং উত্তম সুচিত্রার চোখ ধাঁধানো গ্ল্যামারের কাছে কিছুটা পিছনে যেন। অথচ অনুচ্চারিত যৌনতা, গ্ল্যামারে যেন বিশ্বজনীন।

‘সন্ন্যাসী রাজা’র সব পেয়েও সব খোয়ানো ভিকটিম কিংবা ‘বাঘ বন্দী খেলা’র লোভী, নিজের ছেলেকেও প্রতিপক্ষ ভাবা ভবেশ। ততদিনে উত্তম কুমার আর আমার কাছে শুধু গ্ল্যামার নয়। তার চেয়েও বেশি, একই মুখে মানুষের নানা শেডের প্রতিফলন।

বড় হয়ে উঠছি, আর ভাবছি ‘গানে ভুবন ভরিয়ে দেব’ ভাবা এক তরুণ অন্তরালে থেকেও শুধু কম্প্র কণ্ঠস্বরের মাধ্যমেও প্রেমে পাগল করে দিতে পারেন এক তরুণীকে। এও কী সম্ভব! অদেখার আলেখ্যে থেকে মোহজাল সৃষ্টি করা।

আরও পরে দেখলাম সেই ছবিটা, যা দিয়ে শুরু করেছিলাম। ট্রেনের এক উচ্চবিত্ত সিনিক বাঙালি বলে উঠছেন, ‘কিছু মনে করবেন না মশাই, আমরা এখনও কোয়ালিটি নিয়ে মাথা ঘামাতে শিখিনি…আমাদের মোটোই হল, প্রোডিউস মোর অ্যান্ড প্রোডিউস রাবিশ!’

থমকাচ্ছে বাংলা ছবির নায়ক অরিন্দম মুখোপাধ্যায়। আর তারপরেই বলে উঠছে, ‘হ্যাঁ… ঠিক যে কারণে আমাদের এত ফ্যামিলি প্ল্যানিং-এর প্রয়োজন হয়েছে।’

সংলাপটা হয়ত লিখছেন সত্যজিৎ রায়। কিন্তু বলছেন তিনিই। অরিন্দম নয়। উত্তম কুমার।

আর এই ছবিতে তাঁর কাস্টিংই বলে দিচ্ছে যে সত্যজিৎ রায়ও জানতেন বাঙালির মহানায়ক আসলে কে।

বন্ধুকে বলা তাঁর সেই সংলাপ, এই মার্ক্স ফ্রয়েডের যুগে কেউ আর পুনর্জন্মে বিশ্বাস করে না। তাই একটাই জীবন একটাই চান্স।

স্যুট পরা সব সময়। ভারি ম্যানারিজম। গম্ভীর। উদ্ধত। সিগারেটে অনায়াসে রিং করতে পারেন। অথচ সেই লোকটারই কত শেডস। কত ব্যর্থতা। বড় হতে চাওয়ার প্রবল জঙ্গম প্রবল গতিময়তায় আসলে তাঁর ভেতরে কতটা অন্ধকার জমেছে।

এই উত্তম কুমারও অসম্ভব সেক্সুয়াল। অসম্ভব অ্যাপিলিং। অথচ কোথাও সোচ্চার নয়। ভঙ্গুর মুহূর্তগুলো শুধু তিনি মানুষ হয়ে ওঠেন। সাদা কালো মানুষ। আর বাকি সব কিছুতেই তিনি ইমেজ কনশাস। দর্শক ঠিক যা চায় তাই। ততটুকুই।

এই অসাধারণ উচ্চতার উত্তম কুমারের ঝলক দেখা যায় আর একবারই। নায়কের মাত্র দু’বছর পর তৈরি হওয়া আরেক চলচ্চিত্রে। স্যাটা বোসের চরিত্রে। চৌরঙ্গিতে। কিন্তু সেখান বড় ছোট তাঁর রোল। তিনি কেন্দ্রবিন্দুতে এলেও বিন্দুতেই থাকেন। ফোকাসের কেন্দ্রে তাঁর মুখে চাঁদের অসংখ্য কলঙ্কের মতো দাগ দেখা যায় না।

অথচ ভবানিপুরের মধ্যবিত্ত অরুণ চ্যাটার্জি ছিলেন পোর্ট ট্রাস্টের ক্লার্ক। আর অভিনয়ের নেশায় তিনি নেমে পড়েছিলেন সিনেমায়। প্রথম ছবি মায়াডোর অসমাপ্ত ছিল। নীতিন বোসের ‘দৃষ্টিদান’ ছিল এক অর্থে তাঁর ডেবিউ। কিন্তু তারপরেই একের পর এক ফ্লপ। কোনও ছবি দাঁড়ায় না।

স্টুডিও পাড়ায় নাম হয়ে গেল ‘ফ্লপ মাস্টার জেনারেল।’ লোকে আওয়াজ দিত, ‘ওই এসে গিয়েছে বাংলা ছবির নতুন দুর্গাদাস, নতুন ছবি বিশ্বাস।’

ভেবেছিলেন সিনেমা আর করবেন না। পোর্ট ট্রাস্টের কেরানি হওয়াই তাঁর ভাগ্য। কিন্তু থেমে থাকেননি মোটেই। ‘বসু পরিবার’ করার পর তাঁকে চিনল সবাই। কিন্তু সব বাঙালির রোম্যান্টিক হিরো হয়ে উঠলে ১৯৫৪ সালে সুচিত্রা সেনের সঙ্গে ‘অগ্নিপরীক্ষা’ ছবিতে। তার আগের বছরই ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ ছবিতে প্রথম দেখা গিয়েছে তাঁদের দু’জনকে।

একটাই লাইফ, একটাই চান্সের সেই জীবনে উত্তম হয়ে উঠলেন মহানায়ক। বাঙালির একমাত্র মহানায়ক। ব্যর্থতা থেকে সাফল্যের চূড়ায় ওঠা মহাকাব্যের হিরো।

অসম্ভব আর্বান, অসম্ভব ক্যারিশমার এমন এক আইকন যাঁকে একবাক্যে বাঙালি বসিয়ে নিল নিজের হৃদয়ের সিংহাসনে।

পার্টিশান পরবর্তী ভঙ্গুর বাঙালি নগর জীবনের নতুন উত্থানের প্রতীক হয়ে উঠলেন উত্তম আর সুচিত্রা।

কিছুদিন আগে বাংলা এক টেলিভিশন চ্যানেল তাঁর জীবন নিয়ে এক সিরিয়াল বানাতে গেল। প্রবল হৈ চৈ হল। প্রবল হট্টগোল। কিন্তু নির্মাতাদের গল্পে কোথাও উত্তমের সেই স্ট্রাগল নেই। সেই ঘুরে দাঁড়ানো নেই। নেই গ্ল্যামারের বৈভবের পেছনে মানুষ উত্তমকুমারের জীবনের অন্ধকার।

বহু নায়িকার সঙ্গে নায়কের সম্পর্কের কেচ্ছাকেই টিআরপি’র মাধ্যম ভেবে নিলেন তাঁরা। আর তার ফল? সেই সিরিয়াল মুছে গেল অন্যতম ফ্লপ শো হয়ে।

নির্মাতারা বোঝেননি, উত্তমকুমারের ক্যারিশমা, স্টাইল স্টেটমেন্ট, প্রবল ঔজ্জ্বল্যের পেছনে লুকিয়ে ছিল লাগাতার লড়াইয়ের এক ইতিহাস। যে ইতিহাসের সঙ্গে মিল আছে পাঁচ-ছয়-সাতের দশকের পার্টিশানে বিধ্বস্ত বাঙালির কৌম জীবনের সঙ্গে।

আর তাই তো তিনি আসলে একজন আর্বান লিজেন্ড। মিথ।

সেই মিথের এতটাই দাপট যে তাঁর মধ্যগগনে থাকা জীবনের দীর্ঘ দু’দশক পরে জন্মানো, সাদা কালো টিভি থেকে ইন্টারনেট ওয়েব সিরিজ দেখে ফেলা এক বাঙালির কাছে তিনি থেকে যান অদ্ভুত এক নস্টালজিয়া হয়ে।

প্রেমের চূড়ান্ত প্রতীক হয়ে। বাঙালির সিলভার স্ক্রিনের লার্জার দ্যান লাইফ মহানায়ক আসলে একজনই। সেটা তিনিই। আর কেউ নয়।

মাল্টিপ্লেক্সের পপকর্ন, এয়ারকন্ডিশনড হল, বাংলা বিমুখ বাঙালি মধ্যবিত্ত আর মরে গিয়ে ফ্ল্যাটবাড়ি, শপিং মল হয়ে যাওয়া সিঙ্গলস্ক্রিন হলগুলোর মাঝে তিনি থেকে যান একটুকরো নস্টালজিয়া হয়ে। হেরো বাঙালি উত্তম পুরুষ হওয়ার স্মৃতিটুকু হয়ে। সেই স্মৃতিগুলো কিছুতেই পিছু হাঁটেনা।

Leave A Reply