শনিবার, ডিসেম্বর ১৪
TheWall
TheWall

ভেসেলের জ্বালানিতে অতিরিক্ত সালফার, লাগামছাড়া দূষণ রুখতে লিথিয়াম ব্যাটারিই ভরসা

দ্য ওয়াল ব্যুরো: সভ্যতার উন্নতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে দূষণের মাত্রাও। সম্প্রতি বায়ুদূষণের পরিসংখ্যান দেখে আঁতকে উঠেছেন বিভিন্ন মেট্রোপলিটান শহরের বাসিন্দারা। বাতাসের সঙ্গে সঙ্গে ক্রমাগত খারাপ হচ্ছে জলের গুণমানও। পানীয় জল থেকে শুরু নদী-সাগর-মহাসাগর দূষণ রয়েছে প্রায় সর্বত্রই।

এর মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হল নদীর জলের দূষণ। সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে নদীর জলে লাগামছাড়া দূষণের অন্যতম কারণ জলপথে চলাচল করা বিভিন্ন ভেসেল। কারণ এইসব ভেসেলে জ্বালানি হিসেবে যে ডিজেল ব্যবহার করা হয় তা জলের গুণমাণ নষ্ট করার জন্য একাই একশ। গবেষণা বলছে এইসব জ্বালানিতে অতিরিক্ত পরিমাণে থাকে সালফার। যা জলে মিশলে অত্যন্ত ক্ষতিকারক রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটে। ফলে দূষিত হয় জল। বিপন্ন হয় জলে বসবাসকারী সমস্ত প্রাণীকূলের জীবন। এক ধাক্কায় নষ্ট হতে শুরু করে মেরিন ইকোসিস্টেম।

কীভাবে কমানো সম্ভব এই দূষণ তাই নিয়েই একটি আলোচনা সভার আয়োজন করেছিল দ্য বেঙ্গল চেম্বার। নরওয়ে কনস্যুলেটের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে ২০ নভেম্বর আয়োজিত হয়েছিল এই আলোচনা সভা। দিনের পর দিন নদী বা সাগরের জলে মিশতে থাকা দূষিত পদার্থের পরিমাণ কমানো এবং এই বিষয়ে সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো, এটাই ছিল এই আলোচনা সভার মূল উদ্দেশ্য।

এই দূষণ কমানোর উপায় কী-

১। ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশন (আইএমও) ২০২০ সালের পয়লা জানুয়ারি থেকে চালু করতে চলেছে একটি নয়া নিয়ম। সেই নিয়ম অনুযায়ী সব ভেসেলে ব্যবহার হওয়া জ্বালানীতে ০.৫ শতাংশের কম সালফার থাকতে হবে। বর্তমানে অবশ্য এই মাপকাঠি ৩.৫ শতাংশ। তবে নতুন নিয়মে ০.৫ শতাংশের বেশি সালফার সমৃদ্ধ জ্বালানি আর ব্যবহার করা যাবে না

২। অল্প দূরত্ব যাওয়ার জন্য যেসব বার্জ ব্যবহার করা হয় সেখানে জ্বালানির পরিবর্তে লিথিয়াম ব্যাটারি ব্যবহার করার কথাও ভাবা হচ্ছে।

এই আলোচনা সভায় হাজির ছিলেন নরওয়ের কোম্পানি Sterling PBES-এর সিইও ব্রেন্ট পেরি। চিরাচরিত শক্তি ব্যবহারের বদলে প্রথা বদলে নতুন জ্বালানি শক্তির সাহায্যে ভেসেল এবং বার্জ চালানোর কথা বলেছেন তিনি। পেরি জানিয়েছেন, বেশ অনেকবছর ধরেই এই কাজ করে চলেছে তাঁর সংস্থা। চিরাচরিত শক্তির ব্যবহার যতটা সম্ভব কমানোর চেষ্টাও চলছে। তিনি এও জানিয়েছেন, ২০১২ সালে প্রথম চিরাচরিত শক্তির বদলে বার্জ এবং ভেসেলে লিথিয়াম ব্যাটারি ব্যবহার চালু করে তাঁর কোম্পানি। কিন্তু ২০১৪-২০১৫ সাল নাগাদ দেখা দেয় বেশ কিছু ত্রুটি। তবে সেইসব কাটিয়ে উঠে শেষপর্যন্ত সফল হয় ব্রেন্ট পেরির সংস্থা।

ব্রেন্ট পেরির কথায়,

১। বিশ্বজুড়ে ক্রমাগত বাড়ছে জনসংখ্যা। এখন যা অবস্থা তাতে এখনই হ্রাস না টানলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য চিরাচরিত শক্তির আর কিছুই সম্ভবত পড়ে থাকবে না। কারণ এইসব চিরাচরিত শক্তি পুনরায় নতুন করে তৈরি হবে না। আর বিশ্ব জুড়ে খনিজ তেলের সংকটের কথা তো প্রায় সকলেরই জানা।

২। সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে স্থলভাগের যানবাহনের তুলনায় অনেক বেশি সালফার-ডাই-অক্সাইড উৎপাদন করে জলপথে চলা যানবাহন। এমনকি বিশ্বের ৪০ শতাংশ দূষণের কারণ হল সমুদ্রের বুকে চলা জাহাজ। বন্দর শহরে নানারকম রোগের প্রকোপও বেশি। বিশ্বের বিভিন্ন স্বাস্থ্যজনিত সমস্যার প্রায় ২০ শতাংশ আসে এই বন্দর পরিবেষ্টির শহর থেকেই।

৩। চিরাচরিত শক্তির ব্যবহার অবিলম্বে যততা সম্ভব কম করতে হবে। বদলে পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি অর্থাৎ যা বারবার তৈরি করা সম্ভব সেইসবের ব্যবহার বাড়াতে হবে। বর্তমান যুগের জল দূষণ কমানো এটাই সবচেয়ে ভালো রাস্তা।

৪। ডিজেলের পরিবর্তে এই লিথিয়াম ব্যাটারি ব্যবহার করলে প্রায় ২০ শতাংশ কমে যায় খরচের পরিমাণও। এইসব ব্যাটারি চার্জ হতে সময় লাগে সর্বোচ্চ ১৫ মিনিট। অল্প দূরত্বে যাওয়ার বার্জ বা ভেসেলের ক্ষেত্রে এই লিথিয়াম ব্যাটারি সবদিক থেকেই লাভজনক। ডেনমার্ক, নেদারল্যান্ডস, সুইডেনের প্রায় সর্বত্রই এখন ব্যবহৃত হচ্ছে এই লিথিয়াম ব্যাটারি। কম খরচে মিলছে উন্নত পরিষেবা। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া বিশেষ করে ভারতবর্ষের ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তির ব্যবহার ভবিষ্যতের জন্য খুবই প্রয়োজন।

সামুদ্রিক দূষণ কমাতে বহুদিন ধরেই এমন প্রযুক্তির খোঁজে ছিল পশ্চিমবঙ্গ সরকার। আর ব্রেন্ট পেরির কোম্পানি তাদের কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য খুঁজছে সুযোগ্য পার্টনার।

এদিনের আলোচনায় হাজির ছিলেন সঞ্জয় যাদব ( চিফ এগজিকিউটিভ অফিসার, Sterling & Wilson), এডওয়ার্ড কার্নি (গ্লোবাল ডিরেক্টর-বিজনেস সলিউশন, Sterling PBES)এবং আরও অনেকে। এছাড়াও ছিলেন ক্যাপ্টেন এস বি মজুমদার (চায়ারপার্সন, শিপিং কমিটি, দ্য বেঙ্গল চেম্বার), অমিতাভ সেনগুপ্ত (ডব্লুবিসিএস এগজিকিউটিভ, জয়েন্ট সেক্রেটারি, ডিপার্টমেন্ট অফ ট্রান্সপোর্ট ডিরেক্টর, ইনল্যান্ড ওয়াটারওয়েজ ট্রান্সপোর্ট অ্যাডিশনাল ডিরেক্টর, কলকাতা জোন ডিরেক্টরেট অফ ট্রান্সপোর্ট, পশ্চিমবঙ্গ সরকার)।

২০১৮ সালের অক্টোবর মাসে জলপথে বাণিজ্য এবং যোগাযোগ সম্প্রসারের জন্য বেশ কিছু চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। তারপর থেকেই বাংলাদেশ লিথিয়াম ব্যাটারি চালিত ভেসেল ব্যবহার শুরু করেছে। পড়শি দেশের এই পদক্ষেপ ভারতেও কবে চালু হয় সেটাই এখন দেখার।

Comments are closed.