মঙ্গলবার, জানুয়ারি ২৮
TheWall
TheWall

বিশ্বের বিখ্যাত ১০টি প্রাচীর কথা, সঙ্গে প্রাচীনতম প্রাচীরের বর্তমান ছবি

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr +

দ্য ওয়াল ব্যুরো: পাঁচিল, মানে প্রাচীর বলতে প্রথমেই আমাদের মনে আসে চিনের প্রাচীরের কথা। মানুষের তৈরি এই একটিমাত্র জিনিসই নাকি দেখা যায় চাঁদ থেকেও। সে সব কথা থাক। দ্য ওয়ালে আজ পরিচয় করাব বিশ্বের নামী কয়েকটি প্রাচীরের সঙ্গে।

চিনের প্রাচীর

এশিয়া মহাদেশের মানুষের কাছে আলাদা করে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন নেই এই স্থাপত্যের। মিং রাজারা এই পাঁচিল তৈরি শুরু করেন মোঙ্গলদের আক্রমণ থেকে বাঁচতে। যে সব অংশ দিয়ে দুর্ধর্ষ মোঙ্গলরা হানা দিত, সেই সব জায়গায় এই পাঁচিল তুলে দেওয়া হয় অনেকটা দুর্গের মতো করে। তারপরে হানাদারি শুরু হয় অন্য জায়গা দিয়ে। এই ভাবে বছরের পর বছর ধরে দীর্ঘ হতে থাকে প্রাচীর। একটি অংশের সঙ্গে আরেকটি অংশ জুড়ে দেওয়া হতে থাকে। প্রতি বছর বহু পর্যটক এই প্রাচীর দেখতে যান।

চিনের প্রাচীর

চিনা ভাষা থেকে বাংলায় তর্জমা করলে এই প্রাচীরের নাম হয়, এক হাজার মাইল দীর্ঘ প্রাচীর।

২২১ খ্রিস্টপূর্বে এই প্রাচীর দেওয়া শুরু হয়েছিল সামন্ত রাজাদের হামলা থেকে রক্ষা পেতে। কারণ বদলাতে থাকে। সময়ের সঙ্গে নামও বদলাতে থাকে। খ্রিস্টীয় চতুর্দশ শতকে মিং রাজত্বের সময়ে যে প্রাচীর শুরু হয়, সেটাই এখন ইংরেজিতে দ্য গ্রেট ওয়াল অফ চায়না।

 ওয়েলিং ওয়াল, জেরুজালেম

জেরুজালেম শহরে যে বিশ্ববিখ্যাত প্রাচীরটি রয়েছে সেটির নাম ওয়েস্টার্ন ওয়াল বা পশ্চিমের প্রাচীর। জেরুজালেম নিয়ে ক্রুসেড, শার্লম্যানের কথা শিশুপাঠ্য যখন পড়ানো হয়, তখন অনেকেই এই কান্নার দেওয়ালের গল্প বলে থাকেন।

ওয়েলিং ওয়াল, জেরুজালেম

চুনাপাথরে তৈরি এই প্রাচীরের অন্য নাম ওয়েলিং ওয়াল। এটা আসলে ইহুদিদের একটি প্রাচীন মন্দিরের পশ্চিমের দেওয়ালই হল ওয়েলিং ওয়াল। এখানে মানুষ কাঁদতে যান। কেন কাঁদেন? এই মন্দিরটি ছিল ইহুদিদের জাতীয়তাবোধের প্রতীক। এটি ভেঙে ফেলায় তাদের জাতীয়তাবোধে বড় আঘাত লাগে। আঘাত লাগে তাদের আত্মচেতনা ও স্বাতন্ত্রবোধে। এই স্বাতন্ত্রবোধের সঙ্গে জড়িয়ে তাদের জাত্যাভিমান। তাই আজও এই প্রাচীর যেন কাঁদে স্বাধীনতাহীনতার জন্য। প্রাচীর কাছে গিয়ে কাঁদেন মানুষও। পবিত্র এই প্রাচীর দেখতে সারা পৃথিবীর মানুষ যান জেরুজালেমে।

বার্লিনের প্রাচীর, জার্মানি

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার মধ্যেই নাকি লুকিয়ে ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বীজ। বোহেমিয়া ও মোরাভিয়াকে রোমানিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন করে জার্মানির হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল যুদ্ধ এড়াতে। কিন্তু ড্যানজিগে জার্মান বাহিনীর আক্রমণ সূচনা করে দিল দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের। অপ্রতিরোধ্য জার্মানিকে শেষ পর্যন্ত হার মানতে হল। দেশ ভাগ হয়ে গেল। সারল্যান্ড আলাদা করে দেওয়া হল। শেষ পর্যন্ত পাঁচিল তুলে দেওয়া হল পশ্চিম জার্মানির বার্লিন শহরের মাঝখান দিয়ে।

বার্লিনের প্রাচীর, জার্মানি

বিদেশি শক্তি যখন জার্মানি ছেড়ে গেল, তখন তার অবস্থা আখের ছিবড়ের মতো। তারপর দীর্ঘ দিন কথা চলল দুই জার্মানির এক হওয়া নিয়ে। একদিন দুই জার্মানি এক হল, আনন্দের উন্মাদনায় ভেঙে ফেলা হল বার্লিন শহরের মাঝখান দিয়ে তোলা প্রাচীর। তবে তার স্মৃতিচিহ্ন রয়ে গেছে আজও। ভেঙে দেওয়া প্রাচীরও ঐতিহ্য হারায়নি। এখানেই দেশভাগের নিষ্ঠুর স্মৃতি দেখতে পায় জার্মানি, এখানেই ঐক্যের সুর বাঁধে জার্মানি।

১৯৬১ সালে পূর্ব জামার্নিকে আলাদা করে দেওয়া হয়, তখন পূর্ব জার্মানির দিকের বার্লিনকে আলাদা করতেই পাঁচিল তুলে দেওয়া হয়। ১৫ জুন তৈরি হয়েছিল পাঁচিল গাঁথা। চলেছিল ২২ মাস ধরে। ৪৩ কিলোমিটারের পাঁচিল চিরতরে অবশ্য আলাদা করে দিতে পারেনি পূর্ব জার্মানি ও পূর্ব বার্লিনকে।

১৯৮৯ সালের শেষ দিকে ভেঙে দেওয়া হয় এই প্রাচীর।

ট্রয়ের প্রাচীর

ট্রয়ের যুদ্ধের কথা কে না জানে! একটা যুদ্ধ জন্ম দিয়েছিল দুই মহাকাব্যের – ইলিয়াড ও ওডিসি। মহাকাব্য বলতে সারা বিশ্বে সাকুল্যে যে চারটি কাব্যকে ধরা হয়, তার বাকি দু’টি হল রামায়ণ ও মহাভারত।

গ্রিস দেশটা এখন যেখানে, আগে ঠিক এই জায়গায় ছিল না। দেশ না বলে গ্রিক সাম্রাজ্য বলাই অবশ্য ভালো।

সময়ের সঙ্গে সহস্রাব্দপ্রাচীন এই প্রাচীরও ঢাকা পড়ে গিয়েছিল। ১২০০ খ্রিস্টপূর্বে ট্রয়ের যে যুদ্ধ হয়েছিল সেই যুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন উৎখনন করেন ব্রিটিশ পুরাতত্ত্ববিদ ফাঙ্ক কালভার্ট। সেটা ১৮৬৫ সালের কথা। ১৯৯৮ সালে এই প্রাচীরকে বিশ্ব ঐতিহ্যের স্মারকের তকমা দেয় ইউনেস্কো।

ট্রয়ের প্রাচীর

হাড্রিয়ানস ওয়াল

স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে মন্দির যেমন তৈরি হয়, প্রাচীরও হয়। হাড্রিয়ানস ওয়াল তার উদাহরণ হতে পারে। সম্রাট হাড্রিয়ান নাকি দৈব আদেশ পেয়েছিলেন এই পাঁচিল তৈরি করার ব্যাপারে। তাই তিনি যখন এই জায়গা পরিদর্শনে যান, তখন এই প্রাচীর তৈরি শুরু হয়।

ব্রিটানিয়াকে বর্বরদের হাত থেকে রক্ষা করতে নাকি সীমান্ত নির্দিষ্ট করতে এই প্রাচীর দেওয়া হয়েছিল তা নিয়ে বিতর্ক আছে। ১২২ খ্রিস্টাব্দে গাঁথা ইংল্যান্ডের এই প্রাচীর রোমানরা গেঁথেছিল এক উপকূল থেকে আরেক উপকূল পর্যন্ত, দ্বীপের মাঝখান দিয়ে। এই প্রাচীরের কোনও কোনও অংশ ১১৮ ও ১১৯ খ্রিস্টাব্দে গাঁথা হয়েছিল বলে প্রমাণ পেয়েছেন পুরাতত্ত্ববিদরা। তবে প্রামাণ্য তথ্য অনুযায়ী, ১২২ খ্রিস্টাব্দে এই প্রাচীর গাঁথা শুরু হয় এবং শেষ হয় ৬ বছর পরে।

হাড্রিয়ানস ওয়াল

পাঁচিল গাঁথা শুরু হয় পূর্ব দিক থেকে এবং শেষ হয় পশ্চিমে। ১১৭.৫ কিলোমিটার দীর্ঘ ছিল এই পাঁচিল। রোমানদের হিসাবে প্রতি পাঁচ মাইল অন্তর একটি করে দুর্গ ছিল এই দেওয়ালের গা ঘেঁষে।

অ্যান্টনি ওয়াল, স্কটল্যান্ড

অ্যান্টনি ওয়ালকে চোখ বুজে হাড্রিয়ানস ওয়ালের ছোট ভাই বলা যায়। ব্রিটানিয়া রাজ্যের দক্ষিণে ছিল হাড্রিয়ানস ওয়াল আর উত্তরে অ্যান্টনি ওয়াল। দৈর্ঘ্যে ৬৩ কিলোমটার। তৈরিও হয়েছিল পরে, মানে ১৪২ খ্রিস্টাব্দে। মাপে ছোট হলেও তৈরি করতে সময় লেগেছিল ১২ বছর। রোম সম্রাট অ্যান্টনিও পায়াস নিজে অবশ্য এই রাজ্যে কখনও আসেননি তাঁর পূর্বসূরী হাড্রিয়ানের মতো।

১৯৭ খ্রিস্টাব্দে বারবার আক্রমণে এই প্রাচীর ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাই ২০৮ খ্রিস্টাব্দে তা মেরামত করতে হয়। প্রকৃতপক্ষে এই প্রাচীরটি অধুনা স্কটল্যান্ডে। ২০০৩ সালে ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের তকমা পায় এই প্রাচীর।

অ্যান্টনি ওয়াল, স্কটল্যান্ড

অনেক ঐতিহাসিক আগে এই প্রাচীরকে হাড্রিয়ানস ওয়ালের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলতেন।

ওয়ালস অফ স্টন, ক্রোয়েশিয়া

আদপে সাত কিলোমিটার দীর্ঘ ছিল ডালমেশিয়ার এই প্রাচীর, এখন তা নেই, তবু যা আছে সেটাই কম নয় – সাড়ে পাঁচ কিলোমিটার। বর্তমানে ক্রোয়েশিয়ার দক্ষিণে অবস্থান এই প্রাচীরের। ১২৫৮ সালে তৈরি এই প্রাচীর এখন বিশ্বের সবচেয়ে ভাল ভাবে সংরক্ষিত দীর্ঘতম দুর্গ। একে ইউরোপের ‘চিনের প্রাচীর’ বলা হয়। এটি চুনাপাথরে তৈরি।

ওয়ালস অফ স্টন, ক্রোয়েশিয়া

সেই সময় এখানে ছিল রাগুসা প্রজাতন্ত্র। স্টন ও মালি স্টনের মধ্যে ছিল এই প্রাচীর। প্রাচীর তৈরি করেছিলেন স্টন ও ডুব্রোভনিকরা।

এখনও ৪০টি মিনারের মধ্যে ২০টি রয়েছে, গেলে দেখতে পাবেন পাঁচটি দুর্গও। এখানে নুন-সম্পদকে রক্ষা করা ছিল এই প্রাচীর তৈরির অন্যতম উদ্দেশ্য। আজও পর্যন্ত এর একাংশে কাজকর্ম চলে আগের মতোই।

প্রজাতন্ত্র ভেঙে পড়ার পরে বিশাল প্রাচীরের অনেকটাই ধ্বংস করে ফেলা হয়। তখন এই প্রজাতন্ত্রও অস্ট্রিয়ার সঙ্গে জুড়ে যায়।

ব্যাবিলনের প্রাচীর, ইরাক

বিশ্বের সবচেয়ে পুরনো প্রাচীরগুলির মধ্যে এখনও যা অবশিষ্ট রয়েছে, তার অন্যতম হল ব্যাবিলনের প্রাচীর। মেসোপটেমিয়ার মধ্যে ব্যাবিলন ছিল সবচেয়ে গুরুপূর্ণ। রাজা দ্বিতীয় নেবুচাঁদনেজার ৬০ ফুট উঁচু ,তিনটি প্রাচীর তৈরি করেছিলেন শহরকে রক্ষা করার জন্য। তাঁর রাজত্বকাল ছিল ৬০৫-৫৬২ খ্রিস্টপূর্ব। ব্যাবিলনকে এখনও প্রাচীন বিশ্বের অন্যতম আশ্চর্য হিসাবে ধরা হয়। গ্রিক ইতিহাসবেত্তা হেরোডোটাসও লিখেছিলেন, সেই সময় সারা বিশ্বের মানুষ ব্যাবিলনের নাম জানত।

ব্যাবিলনের প্রাচীর

ইতিহাসবিদরা মনে করেন, পাঁচিল দেওয়া প্রথমে শুরু করেছিল মেসোপটেমিয়ার মানুষই। যখন এখানে নগরায়ন শুরু হল, খ্রিস্টজন্মের ৪৫০০ বছর আগে, তখন থেকেই সুরক্ষার জন্য প্রাচীর দেওয়া শুরু হয়।

জাদুঘরে রক্ষিত প্রাচীনতম দেওয়ালের অংশ

তবে খ্রিস্ট জন্মের দশ হাজার বছর আগে সুমেরের রাজা গিলগমেশ নাকি উরুক শহর ঘিরে পাঁচিল তুলেছিলেন। তার আর তেমন কিছু অবশিষ্ট নেই এখন। বিশ্বের প্রথম শহরের তকমা দেওয়া হয় উরুক শহরকেই। ইরাকের রাজধানী বাগদাদ থেকে ২৫০ কিলোমিটার দক্ষিণে এই শহরের অবস্থান।

গ্রেট ওয়াল অফ জিম্বাবোয়ে

বান্টু ভাষাভাষীদের পূর্বপুরুষরা খ্রিস্টীয় একাদশ শতকে জিম্বাবোয়েতে দেশীয় পদ্ধতিতে যে প্রাচীর তৈরি করেন, সেটাই আফ্রিকা মহাদেশের সবচেয়ে বিখ্যাত প্রাচীর। ৩০০ বছর ধরে এই প্রাচীর পাহারা দিয়েছে জিম্বাবোয়েকে। দেশটির শোনায় এই প্রাচীরের অবশেষ আজও রয়েছে। বান্টু ভাষায় ‘শোনা’ শব্দের অর্থ হল পাথুরে বাড়ি।

গ্রেট ওয়াল অফ জিম্বাবোয়ে

যে সময় এই প্রাচীর গাঁথা হয়, সেই সময় জিম্বাবোয়ে ছিল বিশ্বের মধ্যে বেশ নামী বাণিজ্যকেন্দ্র।

জিম্বাবোয়ে তখন সমৃদ্ধ এক সাম্রাজ্যের নাম। পশুপালন ও কৃষিতে সেই সাম্রাজ্যের নাম জগৎজোড়া। তবে সারা বিশ্বের বণিকরা এই দেশে আসতেন সোনার জন্য। আফ্রিকার এই দেশ থেকে তাঁরা সোনা কিনতেন। পঞ্চদশ শতক পর্যন্ত সেই গরিমা ছিল তাদের।

সাক্সেহুয়াম্যান প্রাচীর, পেরু

শেষ করা যাক আমেরিকা দিয়ে। দুই আমেরিকার মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত প্রাচীরটি রয়েছে দক্ষিণ আমেরিকার পেরুতে। যে দেশের নাম করলে প্রথমেই মনে পড়ে ইনকাদের কথা। নানা নাম রয়েছে এই প্রাচীরের। সবচেয়ে পরিচিত নামটিই আমরা লিখছি।

সাক্সেহুয়াম্যান প্রাচীর

নামটি সম্ভবত এসেছে কেচুয়া ভাষায় ‘সাক্সাক ওয়ামান’ শব্দ থেকে। যার অর্থ নানা ধরনের বাজপাখি।

নবম শতক থেকে দখলে রাখলেও একাদশ শতকে এই প্রাচীর তৈরি করা শুরু হয়। ধীরে ধীরে প্রাচীর গাথা শেষ হয় ত্রয়োদশ শতকে। মূলত কাসকো শহরের সুরক্ষার জন্যই এই প্রাচীর গাঁথা হয়েছিল। তবে ১৫৩২ সালে কাজামারকার যুদ্ধের পরে এই দেওয়ালের ‘পতন’ হয়।

বিদেশিরা ইনকাদের পরাজিত করলেও তারা ঠিক কী দেখেছিল, তার বিবরণ লিখে রেখেছিল। দেওয়ালের উপরে শক্তপোক্ত দুর্গ থাকার কথা তারা উল্লেখ করেছে। প্রাচীরের একবারে নিচের অংশে বিশাল বিশাল পাথর ছিল বলেও সেই বিবরণীতে উল্লেখ করা হয়েছে।

১৯৮৩ সালে এই প্রাচীর বিশ্ব ঐতিহ্যের তকমা পায়। তবে এখনও এখানে উৎখনন হচ্ছে এবং নতুন নতুন তথ্যও আবিষ্কৃত হচ্ছে।

Share.

Comments are closed.