সোমবার, মে ২৭

গড়ছেন আরও একটা স্কুল, থামতে জানেন না জালালউদ্দিন

মধুরিমা রায়

সাধ আর সাধ্য শব্দে লিখলে মাত্র একটা “য”ফলার তফাত।  আসলে তফাত অনেকটা।  তবে এই তফাত ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়েছেন যিনি, তিনি বহুবার খবরে এসেছেন। ৭০ বছরের গাজি জালালউদ্দিন।  আবারও তিনি খবরে,আগামী ৫ই জানুয়ারি আরও একটা স্কুল খুলছেন তিনি।  যাঁরা জালালউদ্দিনের খবর জানেন না এখনও,তাঁদের জন্য জানাই জালালউদ্দিন পেশায় ট্যাক্সিচালক, তবে আজকাল আর নিজে চালান না, বড় ছেলে এসমাইল গাজিকে দায়িত্ব দিয়েছেন।  তাঁর ট্যাক্সি সারা কলকাতা জুড়েই চলে।  আজকাল অনেক ট্যাক্সিতেই লেখা থাকে “নো রিফিউজাল”।  অভিযোগ, এইসব লিখেও ট্যাক্সিচালকদের একাংশ মিটারের চেয়ে ২০-৩০ টাকা বেশি চান ট্যাক্সিতে চাপলে।  জালালউদ্দিনের ট্যাক্সিতে অবশ্য অন্য কথা লেখা, এবং কোনও রকম ছলচাতুরির মধ্যে না গিয়ে ট্যাক্সির গায়ে রয়েছে স্পষ্ট আবেদন—পুলিশকে ঘুষ না দিয়ে সেই টাকা দুঃস্থ ছাত্রছাত্রীদের জন্য দান করুন।

জালালউদ্দিনের ছোটবেলাটা গল্পের মত সুন্দর ছিল না কখনওই।  ক্লাস টু থেকে থ্রিতে ওঠার পর মেধাবী জালাল আর লেখাপড়া করতে পারেননি অভাবের সংসারে।  তারপর থেকে কেয়ার অফ ফুটপাথ।  মা বাবা ভাইবোনকে নিয়ে বড় হয়ে ওঠার জীবনযুদ্ধ।  তাতে কী? থেমে যাননি জালাল, নিজে পারেননি কিন্তু সাধটা মরতে দেননি।  ১৯৭৭-এ ১৯ বছর বয়স থেকে তিনি ট্যাক্সি চালান,তার আগে সংসার টানতে চালিয়েছেন রিকশাও।  প্রায় দশ বছর ট্যাক্সি চালিয়ে যে টাকা রোজগার করেছিলেন তা দিয়ে ১৯৮৭ নাগাদ শুরু করেন ‘ড্রাইভিং সমিতি’।  তাঁর যে ভাবে অভাবে দিন কেটেছে এক সময়ে, তিনি চাননি বাকিদেরও সেভাবে কাটুক।  তাই তাঁর জয়নগরের বাড়ির কাছাকাছি ১০ জন বেকারকে নিয়ে এই সমিতি শুরু করেন।
যেখানে দুটো শর্ত দিয়েছিলেন তাঁদের।  বিনামূল্যে তাঁদের শেখানো হত ড্রাইভিং, বদলে তাঁদের মাসে ৫ টাকা করে জমা রাখতে হত এলাকার অনাথ- দুঃস্থ শিশুদের জন্য।  আর ট্রেনিং শেষ হলে বিনা খরচে আরও দুজনকে ড্রাইভিং শেখাতে হত।  সেই সংস্থা থেকেই বহু বেকারত্ব ঘুচেছে।  সারা কলকাতা জুড়ে ওই সংস্থার অনেক ড্রাইভার এখনো কাজ করে চলেছেন।  কিন্তু পরবর্তীতে নানা ঝামেলায় সেই সমিতি বন্ধ হয়ে যায়। তবে জালালতো দমে যাওয়ার পাত্র নন।  তিনি শৈশবে যা করতে পারেননি, তা যাতে বাকিদের ক্ষেত্রে না হয়, তা নিশ্চিত করতে বাবার দেওয়া জমিতেই জয়নগরের ২ নম্বর ব্লকের উত্তর পূর্ব ঠাকুরচকে খুলে ফেলেন একটি স্কুল, নাম দেন আই আই টি প্রাইমারি অবৈতনিক স্কুল।

নব্বইয়ের দশকের গোড়ায় প্রথম ভাবনা আসে স্কুলের, ৯৬-৯৭ ঘর বাঁধেন স্কুলের জন্য।  ১৯৯৮এ শুরু হওয়া স্কুলটির প্রথম ছাত্র সংখ্যা ছিল ২২, আর শিক্ষকের সংখ্যা ২! ছোটদের সেই স্কুল ধীরেধীরে বাড়তে থাকলে দ্বিতীয় স্কুলের ভাবনাও মাথাচাড়া দেয় তাঁর।  প্রথম স্কুলের থেকে ২ কিমি দূরে ২০০৯ সালে তৈরি করেন সুন্দরবন অবৈতনিক স্কুল।  এই স্কুলগুলোতে বাড়তে থাকে কচিকাঁচাদের ভিড়।  এর পরে ২০১১-এ ট্রাস্ট গড়ে তোলেন জালালউদ্দিন।  বহু মানুষের সাহায্য পান তিনি, ২০১৫ এর জানুয়ারিতে করে ফেললেন ‘সুন্দরবন অরফ্যান মিশন’। সকাল ৬টা থেকে ৯টা অবধি  সেখানে লেখাপড়া।  প্রথমে ৮ জন থাকলেও পরে হয় ২০ জন।  পরে ছাত্রসংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৮৬তে! মাত্র ২-৩ জন শিক্ষক নিয়ে এই সাফল্য যখন বাড়ছে, আবারও জালালউদ্দিন কাজে নামলেন।  আগামী ৫ই জানুয়ারি জয়নগরের বাঁদড়া গ্রামে আরও একটি প্রি প্রাইমারি স্কুল খুলছেন।  উদ্বোধন করছেন রোটারিয়ান অনিরুদ্ধ রায়চৌধুরি।

গাজি জালালউদ্দিনের এই সৃষ্টি জাতীয় স্তরেও খ্যাত।  তাঁর কথা জানেন অনেকেই।  গত নভেম্বরেই তাঁকে বিগ বি-র সামনে দেখা গেছে কেবিসির হটসিটে।  অভিনেতা আমির খানের সাহায্যেই তিনি একের পর এক উত্তর দিয়েছেন আর পেয়েছেন ২৫ লাখ টাকা।  সেই টাকার কিছুটা তিনি তাঁর এই নতুন আশ্রমে কাজেও লাগাচ্ছেন।  অতএব ইচ্ছে থাকলেই যে উপায় হয়, তা করে দেখালেন জালালউদ্দিন। প্রথম প্রথম জালালের এই কর্মযজ্ঞে বহু যাত্রী সাহায্যও করেছেন।  তাঁদের সহায়তায় সাহসও বেড়েছে জালালের।  তাঁর ট্যক্সিতে এখনও সেই স্লোগানই আছে।  পুলিশকে ঘুষ নয়, সাহায্য করুন অনাথ-দুঃস্থদের।  তাঁর এই প্রচেষ্টায় পাশে পেয়েছেন পরিবারকেও, তাই এগিয়ে চলেছে জালালের স্লোগান ট্যাক্সি।

Shares

Comments are closed.