মঙ্গলবার, অক্টোবর ২২

তীব্র গরম চলবে আরও মাস দেড়েক, বইবে ‘লু’ , নিজেকে সুস্থ রাখতে মেনে চলুন ডাক্তারবাবুর টিপস্

এক আধদিনের বৃষ্টি বাদ দিলে এই গরম চলবে জুন মাসের মাঝামাঝি অবধি।  লু ও বইছে  মাঝেমাঝেই।  অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।  তাপের কারণে দেহের তাপমাত্রা বেড়ে গিয়ে এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।  তাই গরমে তাপ থেকে নিজেদের বাঁচাতে ও নিজেদের সুস্থ রাখতে কী করবেন আর কী করবেন না, তা জানতেই কথা বললাম ফ্যামিলি মেডিসিন স্পেশালিস্ট ডঃ পার্থ পালের সঙ্গে।  কী বললেন ডাক্তারবাবু জানুন–

দ্য ওয়াল: গরম প্রায় দিনই ৪০ ডিগ্রি পেরোচ্ছে, নিজেকে আমরা সুস্থ রাখব কী করে?

ডঃ পাল
: এই গরমে খুব ছোট ছোট কিছু জিনিস মাথায় রাখলে অবশ্যই আপনি বাঁচাতে পারেন নিজেকে।

পোশাক-আশাক: হাল্কা রঙের সুতি বা অন্য হাল্কা কাপড়ের পোশাক পরুন।  মাথায় ঢাকা (ছাতা/ টুপি/ টোকা ইত্যাদি) ব্যবহার করুন।  অতিবেগুনি রশ্মি আটকায় এমন রোদচশমা, সানস্ক্রিন ব্যবহার করতে পারেন।
রোদ থেকে বাঁচুন: যতটা সম্ভব সরাসরি রোদ এড়িয়ে চলুন।  দিনের যে সময়ে বেশি রোদের ঝাঁঝ, যেমন বেলা ১১টা থেকে ৪টে বা ৫টা, ঘরের ভেতরে বা ছায়ায় থাকার চেষ্টা করুন।  বারবার স্নান করে শরীর ঠাণ্ডা রাখার চেষ্টা করুন।

দ্য ওয়াল:  কিন্তু যাঁরা খুব বেশি পরিশ্রম করতে বাধ্য হন, তাঁরা কী করবেন? সকলের পক্ষে তো সম্ভব নয় সবসময় ছায়ায় থাকা, বা ১১-৪/৫ টার মধ্যে বাড়িতে থাকা, তাঁরা তাহলে কী করবেন?

ডঃ পাল
: যাঁরা শ্রমসাধ্য কাজ করেন, এই সময়ে যতটা কম করা যায় ভাল।  যাঁরা শ্রমসাধ্য ব্যায়াম করেন, তাঁদেরও তা নিয়ন্ত্রিত রাখা উচিত।  যাঁরা ব্যায়াম বা পরিশ্রমের সময় শারীরিক অস্বস্তিবোধ করছেন (বুকে ব্যথা বা অস্বস্তি বা বুক ধড়ফড়, শ্বাসকষ্ট, দুর্বলতা, অতিরিক্ত ঘাম), সঙ্গে সঙ্গে ব্যায়াম বা পরিশ্রম বন্ধ করে বিশ্রাম নিন, রোদ থেকে ছায়ায় যান, চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।  বাইরে যাওয়ার আগে সঙ্গে অবশ্যই জল নিয়ে যাবেন।

এই সময়ে অতিরিক্ত ঘামের কারণে শরীর থেকে জল ও নুন অনেক বেশি বেরিয়ে যায়।  তেষ্টা পেলে বুঝতে হবে, শরীরে জলের ঘাটতি হতে শুরু হয়েছে।  তাই তেষ্টা পাওয়ার আগে থেকেই জল, ডাবের জল, ঘোল, ইত্যাদি যথেষ্ট পরিমাণে খেতে হবে, জলের সঙ্গে সঠিক মাত্রায় নুন যেন থাকে; স্পোর্ট্‌স ড্রিঙ্কও পান করতে পারেন।

দ্য ওয়াল: কী কী জিনিস এড়িয়ে চলতে হবে এ সময়ে?

ডঃ পাল:
 অতিরিক্ত চিনি দেওয়া পানীয়, বাজারে প্রচলিত কোল্ড ড্রিঙ্ক, চা-কফি জাতীয় ক্যাফিন সমৃদ্ধ গরম বা ঠাণ্ডা পানীয় এড়িয়ে চলাই ভালো।  যাঁরা রেগুলার মদ্যপান করেন, এসময়ে চেষ্টা করুন এড়িয়ে চলতে।  মদ্যপান যে কোনও সময়েই আমাদের ব্লাড প্রেশার বাড়িয়ে দেয়।  এই গরমে সেটা আরও মারাত্মক হতে পারে।  তাই চেষ্টা করুন সাধারণ জল যত বেশি সম্ভব খেতে।

আরও শুনুন কী বলছেন ডঃ পাল–


দ্য ওয়াল
: তাহলে কী কী সাবধানতা অবলম্বন করব আমরা?

ডঃ পাল
: যাঁদের কিডনির সমস্যার জন্য জল বা জলীয় খাবারে নিয়ন্ত্রিত আছে, তাঁরা এই গরমে অতিরিক্ত কতটা জল/তরল খেতে পারবেন, সেই বিষয়ে অবশ্যই আগে থেকে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে রাখবেন।
খাবারের ক্ষেত্রে সহজপাচ্য খাবার খাবেন।  বেশি করে ফল ও স্যালাড খাওয়া দরকার।  যে সব ফলে জলের ভাগ বেশি সেগুলি বেশি করে খান।  তরমুজ, শশা, ফুটি খান রোজ।  তৈলাক্ত খাবার, ভাজাভুজি, খুব মশলা দেওয়া খাবার এই গরমে না খাওয়াই ভাল।

দ্য ওয়ালঅনেক সময় হঠাৎ করে অসুস্থ মনে হয় এসময়ে, ভিড়ের মধ্যে মানুষ জন অজ্ঞান হয়ে পড়ে যান অনেক সময়ে, কী করা উচিত তখন?

ডঃ পাল: গরমে অসুস্থতার লক্ষণগুলি জেনে রাখুন, যাতে বাড়াবাড়ি কিছু হওয়ার আগেই প্রতিরোধ করা যায়। অতিরিক্ত ঘাম, দুর্বলতা ও দৈহিক অবসাদ, গা-মাথা ঝিমঝিম করা, গা বমি ভাব বা বমি, পেশিতে টান ধরা, মাথাব্যথা, পাল্সরেট বেড়ে যাওয়া, শরীর অতিরিক্ত গরম হয়ে যাওয়া বা হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়া, রোমগুলি খাড়া হয়ে ওঠা।  এই উপসর্গগুলি নিয়ন্ত্রণে না এলে, এর থেকে খিঁচুনি বা অজ্ঞান হয়ে যেতে পারেন অনেকে।  এটি মারাত্মক অবস্থা, প্রাণসংশয় হতে পারে! এটা হিট-স্ট্রোকের লক্ষণ, যাতে মৃত্যুহার প্রায় ৪০%।

অসুস্থতার কোনো লক্ষণ বা উপসর্গ দেখা দিলে প্রথমেই রোদ থেকে বা দমবন্ধ হওয়া কোনও ভিড় থেকে সেই মানুষটিকে বের করে আনুন, কোন ঠাণ্ডা জায়গায় চলে আসুন তাঁকে নিয়ে।  শরীরে জল দিয়ে ঠাণ্ডা করুন।  শরীরে এ সময়ে সোডিয়ামের ঘাটতি ঘটে, তাই নুন চিনি মেশানো জল খাওয়ান।  সুগারের রোগীদের ক্ষেত্রে সুগার ফল করে যায় অনেক সময়ে, তাই এই চিনিটা তাঁর জন্য সমস্যা হবে না।  চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

শরীর খুব বেশি খারাপ লাগলে দেরি না করে, সঙ্গে সঙ্গে উপযুক্ত পরিকাঠামো যুক্ত কোনও হাসপাতালে যান।

দ্য ওয়ালবেশি সমস্যা কাদের ক্ষেত্রে হতে পারে?

ডঃ পাল: শিশু, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা (৬৫ বছরের উপরে বয়স), মেদবহুল শরীর যাঁদের, তাঁদের তো অসুবিধে বটেই।  তাছাড়াও হার্টের অসুখ, উচ্চরক্তচাপ, কিডনির অসুখ, মানসিক অসুখ, বিশেষ কিছু ওষুধ যেমন, রক্তচাপ কমানোর জন্য বেশি প্রস্রাব করানোর ওষুধ (ডাইউরেটিক: বয়স্কদের রক্তচাপ কমানোর প্রথম পছন্দের ওষুধ), মানসিক রোগের ওষুধ ইত্যাদি যাঁরা ব্যবহার করেন, তাঁদের সমস্যা বেশি হয় এই গরমে।  তাই তাঁদের বেশি সচেতন থাকতে হবে।

কাজেই হঠাৎ কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে, প্রথমেই তাঁকে ছায়ায়, ঠাণ্ডা জায়গায়  নিয়ে এসে, পোশাক আলগা করে, শরীর ভেজা কাপড় বা কিছু দিয়ে বারবার মুছে দিন, হাওয়া দিন, নু্ন চিনির জল খাওয়ান, এ্যাম্বুলেন্সে খবর দিন বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যান।

সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন মধুরিমা রায়

 

 

Comments are closed.