শুক্রবার, নভেম্বর ১৫

বাচ্চার চোখের যত্ন নিচ্ছেন তো? নইলে বিপদ কেন জানুন

পৃথিবীর এত রূপ, রঙ, আলো–এসবই আমরা দেখতে পাই যে ইন্দ্রিয়ের জন্য, তার জন্য তো ছোট থেকেই যত্ন নেওয়ার কথা।  কিন্তু আজকাল প্রচুর বাচ্চাকে চশমা পরতে দেখে অনেকেই প্রশ্ন করে বসেন, কেন এত ছোটবেলায় চশমা পরতে হচ্ছে? অনেকেরই জন্ম থেকে চোখের সমস্যা থাকে।  সেই সমস্যা যত আগে থেকে সম্ভব সারিয়ে ফেলার চেষ্টা করাই তো ভালো।  প্রয়োজনে যদি চশমাও পরতে হয়, ক্ষতি তো নেই।  বাচ্চার চোখ কী ভাবে ভালো রাখতে হবে, কী ভাবে যত্ন নিতে হবে, তা জানতেই ‘দ্য ওয়াল’ মুখোমুখি হল শিশুদের চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ ডঃ ঈপ্সিতা বসুর।

দ্য ওয়াল: খুব ছোট ছোট বাচ্চাদের আজকাল চশমা পরতে দেখা যায়, এমনকী আড়াই-তিন বছরের বাচ্চাদের চোখেও চশমা দেখা যায়।  বাচ্চাদের এভাবে চোখ খারাপ হতে আগে দেখা যেত কি? এই সমস্যা কি ইদানিং বাড়ছে?
ডঃ বসু: এখন সমস্যা বাড়ছে, এটা ঠিক নয়।  আসলে এখন সমস্যাগুলো সামনে আসছে।  তাই চোখে পড়ছে।  আগে এতটা সচেতন ছিলেন না লোকজন।  বিদেশে ৩-৪ বছরের বাচ্চাদের চোখের রুটিন চেক আপ হয়।  উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতে কোথাও আবার জন্মানোর সময়েই তাদের রুটিন চেকআপ হয় চোখেরও।  তাই সমস্যা থাকলে এখন সহজেই সেটা সনাক্ত করা হচ্ছে এবং চিকিৎসা শুরু হচ্ছে।  যেটা খুবই সদর্থক একদিক থেকে।

দ্য ওয়াল:
 কিছু বাচ্চা সবসময় সমস্যার কথা বলতে পারে না, সেক্ষেত্রে দেরি হলে কী কী সমস্যা হতে পারে?
ডঃ বসু:
 হ্যাঁ, সে জন্যই রুটিন চেক আপ করাটা জরুরি।  বাচ্চারা কতটা দেখতে পায়, সেটা অনুমান করাটা কঠিন।  তারা দু চোখে সমানভাবে দেখতে পায় কি না, সেটাও জানা যায় না।  তাই চোখের পাওয়ার দেখেই বলতে হয় তারা ফোকাস করতে পারছে কি না।  তার তখন চশমা লাগবে কি না , বোঝা যায়।  দেরি করে চশমা পরলে ‘লেজি আই’-এর সম্ভাবনা থাকে।  ধরে নেওয়া যায় যদি, কেউ কথা বলতে পারে না, সে কী করে বোঝাবে যে সে কতটা দেখতে পায় বা পায় না।  তাই রুটিন চেক আপ করাটা এতটাই জরুরি।  তাই ‘রেটিনোস্কপি’ করাটা জরুরি।  এই পরীক্ষাটা করলেই আমরা চোখের পাওয়ারের সঠিক সংখ্যাটা জানতে পাই।  এই মাপ বা পাওয়ার এদিক ওদিক হলেই চশমার দরকার হয়।  নইলে হয় না।

দ্য ওয়াল
: লেজি আই কী?
ডঃ বসু: সঠিক সময়ে চশমা না পরলে শিশুদের দেখার ক্ষমতা কমতে থাকে।  কারণ মস্তিষ্কের যে অংশ চোখের বিকাশে সাহায্য করে, সেটা সাময়িকভাবে অকেজো হয়ে যায়।  শেষে (১৪-১৭বছর বয়সে) চশমা পরেও পরিষ্কার দেখতে পায় না।  সেটাকেই ডাক্তারি পরিভাষায় বলা হয় ‘লেজি আই’।  কারণ ক্ষমতা থাকলেও , চোখ আর কাজ করতে চায় না।

দ্য ওয়াল: শোনা যায় বাচ্চাদের খুব রিফ্র্যাকটিভ এরর হয়, বিষয়টা আসলে কী?
ডঃ বসু: আসলে প্রতিটা চোখের একটা মাপ আছে।  সেটা সাধারণ থাকলে চশমা লাগে না।  সেটা এদিক, ওদিক হলেই চশমা লাগে।  চোখের পাওয়ারের পরিমাপটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ এক্ষেত্রে।  পরিমাপের পর প্রতিটা চোখেই একটা করে সংখ্যাগত মান পাওয়া যায়।  এই মান সাধারণ না হলেই কারওক্ষেত্রে পাওয়ার মাইনাস, প্লাস বা সিলিণ্ড্রিকাল হয়।

দ্য ওয়ালরিফ্র্যাকটিভ এরর এর চিকিৎসা কি শুধুই চশমা? ছোট বাচ্চারা কি ঠিকমতো চশমা রাখতে পারবে?
ডঃ বসু: আসলে চশমার যখন প্রয়োজন হয়, তখন সেটা কোনওভাবেই ওষুধে সারানো যায় না।  রিফ্র্যাকটিভ এরর-এর জন্য অবশ্যই চশমা লাগবেই।  চশমা ছাড়া বাচ্চারা কোনওভাবেই ফোকাস করতে পারে না।  তাই সমস্যা তো থাকেই।  আর বাচ্চারা এখন এক বছর বয়সেও চশমা পরে থাকে সহজেই।  তাই সেটা আজ আর চিন্তার বিষয় নয়।

দ্য ওয়ালছোট থেকেই ঠিক করে চশমা পরলে কি আর বড় বয়সে চোখে পাওয়ারের সমস্যা হবে না?
ডঃ বসু: সেটা এভাবে দেখলে চলবে না।  চশমা পরলে লেজি আই হবে না, এটা বলা যায়।  তবে অনেকেরই চশমা আর পরতে হয় না।  আবার অনেকক্ষেত্রে সারাজীবনই চশমা পরে যেতে হয়।  তাই কেস অনুযায়ী আলাদা আলাদা হয়।

দ্য ওয়াল
ট্যারা চোখও কি চশমা পরলে ঠিক হয়ে যেতে পারে?
ডঃ বসু: রিফ্র্যাকশন দেখে নেওয়া খুবই জরুরি।  পাওয়ার ঠিক হলে, সেটা অনেকদিন ধরে পরে থাকলে অনেক সময়ে ট্যারা চোখও ঠিক হয়ে যায়।  তাই চশমা পরতে হবে বারবার মনে রেখে।

দ্য ওয়ালসার্জারি করতে হলে, কত বয়সে করলে ভালো হয়?
ডঃ বসু: পাওয়ারের স্থিতাবস্থা দেখে নিতে হবে আগে।  সার্জারি করতে হলে কুড়ি বছরের পরে করাই ভালো।  তাতে বুঝে নেওয়া যায়, কতটা দৃষ্টিশক্তি ঠিক করা যায়।  আর বছর কুড়ির মধ্যে যদি চোখ ঠিক হয়ে যায়, তহলে অবশ্যই আর সার্জারির প্রয়োজন হবে না।

জানুন ডাক্তারবাবু কী বলছেন এ বিষয়ে —

দ্য ওয়ালঅপারেশনের ফলে কোনওরকম জটিলতা তৈরি হয় কি?
ডঃ বসু: যে কোনও জিনিসেরই ভালো এবং মন্দ থাকে।  তাই শিশুর চোখ অনুযায়ী যখন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তখন ঝুঁকির কথা অবশ্যই মাথায় রেখে ডাক্তাররা সিদ্ধান্ত নেন।

দ্য ওয়াল
এক্ষেত্রে খাওয়া দাওয়ার বিষয়টা কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
ডঃ বসু: সার্বিকভাবেই খাওয় দাওয়া বাচ্চার জন্য জরুরি।  সুষম আহার না হলে, বাচ্চার বিকাশ ঠিকমতো হয় না।  তবে, রিফ্র্যাকটিভ এরর আইয়ের জন্য আলাদা করে কোনও খাবারের বিষয় নেই।

দ্য ওয়াল
মা বাবা কী করে সতর্ক হবেন?
ডঃ বসু: নিয়মিত চেক আপ করতেই হবে।  বাচ্চার প্রথম চেক আপ ৪-৫ বছরের মধ্যে করতে হবে।  যদি ডাক্তার সাজেস্ট করেন চশমা পরাতে, তাহলে অবশ্যই পারতে হবে।  ভালো দেখুক বাচ্চা, সেই অভ্যাস তো গড়ে তুলতেই হবে।  বাচ্চাদের পুরোটাই অভ্যাসের ব্যাপার।  তাই তাদের খারাপ দেখার অভ্যাসটাকে বাড়তে দেবেন না একেবারেই।  ওদের সেই অভ্যাসটা থেকে বের করতে হবে যত দ্রুত সম্ভব।

অতএব মাথায় রাখবেন, বাচ্চার যদি চশমার প্রয়োজন হয়, অবশ্যই তাকে সেটা দেবেন।  নইলে তার দৃষ্টি স্বচ্ছ হবে না।

সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন মধুরিমা রায়

Comments are closed.