সোমবার, এপ্রিল ২২

বয়সের সঙ্গে সঙ্গে কেমন শিশুর মত হয়ে গেছেন

সুদেব ভট্টাচার্য

ছেলেবেলায় রবীন্দ্রনাথ ছিলেন অনেক দূরের এক ঋষি। ঘরের মাঝে চাটাই পেতে হারমোনিয়ামের বেলো টেনে টেনে তার গান গাইতে হয়। অনেক অনেক গান তার। ছেলেবেলা থেকে যে গান বলিউড ক্যাসেট, টিভি বা রেডিও থেকে পাইনি, বরং ঘরের প্রতিটা মানুষের গলায় অহরহ শুনে কিম্বা হলদে হয়ে আসা বইয়ের ভাঁজে ছাপা অক্ষরে দেখে মজ্জাগত করেছি সেই গানই আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয়। মায়ের গায়ের গন্ধর মত কাছের – যেন জন্মসিদ্ধ অধিকার।

বয়সের সাথে সাথে আমি বদলেছি, বদলেছেন রবীন্দ্রনাথও আমার উপলব্ধিতে। আমার চেতনা ক্রমশ বদলেছে, তিনিও নতুন ভাবে ধরা দিয়েছেন, কিন্তু কখনও তিনি মুছে যাননি। আমি রবীন্দ্র সাহিত্য বিশেষ করে উপন্যাস খুব বেশি পড়িনি। সে কাজ একনিষ্ঠ পাঠকেরা করেছেন। তাই ওই নিয়ে আমি মূল্যায়ন করতে বসলে তা যেন প্রদীপ জ্বেলে সূর্য দেখা। আমি শুধু আমার পাওয়াটুকু বলতে পারি।

সেই অক্ষরজ্ঞান হওয়ার পর থেকেই খুঁজে পেয়েছি তাঁকে গানে, তাঁর কবিতায়, ছোটদের লেখায়, নাটকে, দর্শনে এবং জীবনে। কবি রবীন্দ্রনাথের পরে আলাপ হয়েছিল নাট্যকার রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে। দেখেছিলাম কি অসাধারণ সেই সব সংলাপ। যেখানে অবাধ স্বাধীনতা আর মুক্তির কথা প্রতিটা ছত্রে ফুটে উঠেছে। একটা জড় সংস্কার ভাঙার আহবান। এমনকি তিনি মঞ্চসজ্জাও বেঁধে দেননি, কখনও দেগে দেননি অভিনেতার অভিব্যক্তির মাপজোপ কিম্বা তাদের সাজগোজ। তাই তো মাঠে, ঘাটে, অন্ধকারে, মঞ্চে, বাজারে,ইস্কুলে সবখানেই আয়োজিত হতে পারে একটা অচলায়তন কিম্বা তাসের দেশ।

এখানেই তাঁকে আমার বারবার উওরাধুনিক বলে মনে হয়েছে। যিনি তার লেখার মাধ্যমে এবং একই সঙ্গে চিরাচরিত নিয়ম নীতি বিসর্জন দিয়ে চলেছেন নীরবে। ষাট বছর বয়সে তিনি আঁকা ধরলেন। প্রথাগত শিক্ষার বাইরে এসে এখানেও তিনি স্বতন্ত্র। তার কারণ একটাই। পুথিগত শিক্ষার চেয়েও অনেক বেশি গুরুত্ব দিতেন অনুভবকে। যিনি আসলে এতটাই গভীর অন্তরের বাণীকে উপলব্ধি করেছেন, তার কাছে বহিরঙ্গতা পল্লবগ্রাহী মনে হয়।

আমার জীবন জুড়েও তাই তিনি ছিলেন কবি, নাট্যকার হিসেবেই। একটা জিনিস লক্ষ্য করেছি, মার্কেজ থেকে রবীন্দ্রনাথ সবাই বয়সের সঙ্গে সঙ্গে কেমন শিশুর মত হয়ে গেছেন। শেষ বয়সের লেখাগুলি যেমন সরল, সাবলীল তেমনই গভীর অর্থবহ। একটা দুটো সরল তুলির টানেই যেমন একটি ছবি ফুটে ওঠে, তেমনই কয়েকটি শব্দেই বুঝিয়ে দেওয়া যায় ভেতরের কথা। তাই রবিঠাকুরের শিশু ভোলানাথ, শিশুর কবিতা গুলি আজও আমার স্মৃতিতে সব থেকে বেশি উজ্জ্বল। সহজ পাঠ,অচলায়তন, ডাকঘর, পোস্টমাস্টার, কাবুলিওয়ালা প্রভৃতি আমার চিরকাল খুব কাছের। আমার কাছে তাই রবীন্দ্রনাথ কখনও মায়ের প্রতিরূপ হয়ে ধরা দিয়েছেন শিশুমনের কাছে আবার কখনও মন খারাপের এক চিলতে একমাত্র আশ্রয়। এ সবের মধ্যে দিয়ে সাহিত্যের পথে হাঁটতে হাঁটতে আজকাল আর ভারী শব্দ ভালো লাগে না আমার। এর কারণ আমিও বদলেছি অনেক।

 

ইদানীং সবথেকে বেশি করে রবীন্দ্রনাথের যে দিকটির সঙ্গে মানসিক সংযোগ ঘটে, তা হল তাঁর দর্শন, আধ্যাত্মক চেতনা। দার্শনিক রবীন্দ্রনাথকে আমি সব থেকে উপরে রাখব। বেদান্ত, উপনিষদের মন্ত্র যে ভাবে উনি গানে গানে, কবিতায় ছড়িয়ে রেখেছেন, তাতে আমার কাছে অন্যান্য সমস্ত আচার বিচার, ধর্মীয় আয়োজন ম্লান হয়ে আসে। তিনি নিজে এক জন গভীর বিশ্বাসী মানুষ ছিলেন, কিন্তু তাঁর ঈশ্বর বাইরে কোথাও নেই। আছেন আমাদের ভেতরে আর এই প্রকৃতির মাঝে। তিনি বিশ্বাস রাখতে বলেন, কিন্তু তার জন্য কোনও আচার বিচার সংস্কারের বাঁধন নেই। অঞ্জলি শুধু অন্তরের অনুভূতিটুকুই।

চিকিৎসক রবির পরিচয়ও আমি পেয়েছি কারণ আমি বহুবার মৃত্যুভয় এবং একাকীত্ব অতিক্রম করেছি তার কবিতায় ও গানে। রবীন্দ্রনাথের চোখে মৃত্যুও সব কিছুর শেষ নয়। সে এক নতুন দেশে যাওয়ার আয়োজন মাত্র। অমোঘ কিন্তু প্রশান্তিময় সহজ একটি সত্য। কিছুই কোনোদিন ফুরায় না – “ হে পূর্ণ তব চরণের কাছে, যাহা কিছু সব আছে আছে আছে , নাই নাই ভয়… “

তাই আজকাল দুমিনিট চোখ বুজলে রবীন্দ্রনাথের যে রূপটি মনের মধ্যে ভেসে ওঠে তা কোনো কবির নয়, নোবেলবিজয়ী সাহিত্যিকেরও নয়। আমি দেখি এই অনন্ত বিশাল ব্রহ্মাণ্ডের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা নানা ঘাত-প্রতিঘাতে দীর্ণ একটি বৃদ্ধ মানুষ যিনি অসীম আকাশের দিকে উদ্বাহু হয়ে গাইছেন – এই তো তোমার প্রেম ওগো হৃদয়হরণ। তিনি অশোক, তিনি মৃত্যুঞ্জয়ী এক প্রাণ। তাঁকে আমার অন্তরের প্রণাম।

ছবি: স্মিতা দাশগুপ্ত

Shares

Leave A Reply