বৃহস্পতিবার, জুন ২০

আসলে নিজেরাই জুজুবুড়ো বানিয়ে তুলেছেন অমন সহজ মানুষটাকে

সৃজা ঘোষ

রবীন্দ্রনাথ কে? এ প্রশ্ন করার জন্যে যেসব ব্যক্তি হাতে আঁশবটি নিয়ে আমায় তাড়া করবেন, আমি নিশ্চিত, তাঁরা নিজেরাও রবীন্দ্রনাথ বলতে কেবল রবীন্দ্রসঙ্গীত আর রবীন্দ্রকবিতা বলতে ‘আজি এ প্রভাতে রবির কর’-এর মত কিছু সিলেক্টিভ স্ট্যাম্প ঠোঁটে নিয়ে ঘুরে বেড়ান।

কিন্তু নাহ্, আমার ঘুমোতে যাওয়ার সময়ে মাথার কাছে গীতবিতান লাগে না। দমকা ব্রেকআপ হলেও আমার রবীন্দ্র-বিরহ-সঙ্গীত শোনাটা আবশ্যক বলে মনে হয়না। আমি কথায় কথায় রবি ঠাকুরকে না জেনে ভুলভাল টেনে আনা পছন্দ করিনা। তাই ২৫শে বৈশাখ সকালেও আমার চোখে বিশেষ কোনো জ্যোতি পড়ে না, কেননা বাস্তবে সেটা এগজিস্ট করে না।

এখন প্রশ্ন উঠতে পারে তাহলে আজ এ লেখার উদ্দেশ্য কি? উদ্দেশ্য একটাই, যাতে আগামী প্রতিটা ২৫শে বৈশাখে আমরা ঐ মানুষটিকে সহজ করে নিতে পারি এবং দিতে পারি। জোর করে তৈরি করে রাখা এক বিপুল প্রাসাদে অহেতুক উঁকিঝুঁকি না পেরে, সে প্রাসাদের গায়ে ছলছল চোখে হাত না বুলিয়ে, ঘরের জানলার পর্দাটা তুলেই তাঁকে বলতে পারি, টুকি! যেমন বন্ধু, যেমন আত্মীয়, যেমন পরিবার। তেমনই। দূরের ঋষিপুরুষ নয়।

এত অব্দি পড়েই যাঁরা জেন ওয়াইকে জাজ করতে শুরু করে দেবেন, তাঁদের জন্যে এ লেখা নয়। ইনফ্যাক্ট আমি যেটুকু রবীন্দ্রনাথ পড়েছি, তাতে করে এমন অসহিষ্ণুতা রবীন্দ্রনাথ পড়ে জন্মাতে পারে বলেও আমার মনে হয় না। অপর মত গ্রহণের পাঠও তিনিই শিখিয়েছেন গল্প-গান-ছবিতে। শিখতে না পারাটা দুর্ভাগ্য।

এবার আসা যাক আমার উপলব্ধির কথায়।

‘রবীন্দ্রনাথ’ এই শব্দটা নিজে একটা ইন্সটিটিউশন হওয়ায় রবীন্দ্র সৃষ্টির কতটা সুবিধে হয়েছে জানি না, তবে বাঙালির যে বিশেষ সুবিধা হয়েছে, তা হলফ করে বলতে পারি। এই যেমন, ‘বেঙ্গলি ইন্টেলেকচুয়াল’রা যত সহজে চশমা উঁচিয়ে মার্কস কিম্বা ফ্রয়েডের সমালোচনা করতে পারেন তত সহজে রবীন্দ্রনাথের পারেন না। এ যেন কেবল রবীন্দ্র-বিশেষজ্ঞদেরই কাজ। আসলে মুখে সবাই যা-ই বলুন না কেন, অধিকাংশই তাদের ‘সখা’কে এখনো দেবতা বানিয়েই রেখেছেন, জীবনের বন্ধু বানাতে পারেননি। গীতবিতান এবং সঞ্চয়িতাকে বই কম, শো-পিস বেশি বানিয়ে তুলেছেন।

জেনওয়াই রবীন্দ্রনাথ পড়ল না বলে যাঁদের আফশোসের শেষ নেই, তাঁরা আসলে নিজেরাই জুজুবুড়ো বানিয়ে তুলেছেন অমন সহজ মানুষটাকে।

আজকের দিনে তাই লিখতে আসার একটাই কারণ, যাতে রবীন্দ্রচর্চার সমস্ত রকমভেদকেও সাদরে গ্রহণ করতে শিখি আমরা সবাই। রাস্তায় ভালবাসা দেখে আমাদের হাত তোলার অভ্যেস বদলানো যেমন জরুরি, তেমনই রবীন্দ্রসঙ্গীতে কেন টুংটাং গিটার বাজবে—এ ধরনের নিন্দার তুফানও থামানো জরুরি।

যাঁরা অসহিষ্ণুতা নিয়ে বাঁচবেন বলে ভাবছেন, তাঁদের জন্যে আমার একটাই কথা বলার -‘অন্ধকারের উৎস হতে উৎসারিত আলো, সেই তো তোমার আলো। সকল দ্বন্দ্ব বিরোধ মাঝে জাগ্রত যে ভালো, সেই তো তোমার ভালো’।

ছবি: পৌষালী রায়

Leave A Reply