Browsing Tag

EkramAli

দ্বিতীয়জন

একরাম আলি মির্জাপুর স্ট্রিট, আমহার্স্ট স্ট্রিট আর হ্যারিসন রোডের মাঝে একটা ত্রিকোণ। তাতে তিনটে বাড়ির একটা দোমহলা। পিছনের অংশটিতে, ট্রামলাইনের উপর, প্যারামাউন্ট বোর্ডিং হাউস। দোমহলার সামনেরটাতে, পশ্চিমে, বেঙ্গল বোর্ডিং। পুবে ইন্টারন্যাশনাল…

গোধূলিসন্ধির নৃত্য

একরাম আলি সত্তরের দশকেও মেস ছিল জবরদস্ত এক প্রতিষ্ঠান। অন্তত কলকাতায়। যেমন স্কুল, জেলখানা, হাসপাতাল বা ধর্মশালা। যে-মেস ছেড়ে যেতে হল আমাকে, সেটার বয়স মাত্র বছরচল্লিশেক। কিন্তু মেস-নামের প্রতিষ্ঠানটি কলকাতায় আরও পুরনো। ইংরেজি এই শব্দটির…

চোদ্দো মিলিমিটার

একরাম আলি এত যে হাঁটাহাঁটি করতে হয় মানুষকে, সইতে হয় পাহাড় আর খানাখন্দ পেরনোর ধকল, কত-কত সিঁড়ি ওঠানামার অপমান-- পায়ের চামড়া তো মাত্র শূন্য দশমিক চার মিলিমিটার পুরু! ওই পাতলা আবরণ সম্বল করেই অতীশ দীপংকরের পা পাড়ি দিয়েছিল হিমালয় ডিঙিয়ে…

টবিন রোড

একরাম আলি কোথাও তেমন করে যেতে চাইলে নদী পেরোতেই হয়। না-পেরোলে পৌছনো যায় না। আমি পেরোলাম বাগবাজার খাল। ঢিমে স্রোত। জল নোংরা। ঘ্যাচাং নয়, কুচ করে কেটে গেল খালের গলাটি। আর সেই ফাঁক গলে নিমেষে ট্যাক্সি ওপারে। হ্যারিসন রোড থেকে টবিন রোড। তাও…

প্রস্থানপর্ব

একরাম আলি হ্যারিসন রোড ধরে হাঁটছি। হাতে সস্তার সিগারেট। সস্তা ধোঁয়া। ফুটপাথের এখানে-ওখানে ঘুমন্ত মানুষজন। যে-ঘুম সস্তা-দরে কেনা, সে-ঘুম তো হুটহাট ভাঙবেই। ফিরছি এমন একটা মেসে, যেখানে মেদিনীপুর শ্রীরামপুর নদীয়া পুরুলিয়া বীরভূম থেকে গত কয়েক…

বাড়ি থেকে পালিয়ে

একরাম আলি ক্লাস সেভেন থেকে নাইন-- বাড়ি থেকে পালিয়ে যাওয়ার সেরা সময়। আর, এমন সুকর্মটি জীবনে একবারও যদি কেউ না-করে, মনুষ্যপদবাচ্য সে হবে কী করে! তখন নাইন। ফলে, কোত্থেকে-যে ঝাঁক-ঝাঁক কী-সব এসে মাথার ভেতর বাসা বেঁধেছে, কেন, কিসের, টের পেলাম…

কলকাতা

একরাম আলি চুয়াত্তর পঁচাত্তর ছিয়াত্তর সাতাত্তর— সে-সময় কত যে অজানা গাঁ-গঞ্জ থেকে লিটল ম্যাগাজিনের উদয়! কত তাদের নাম। বেশির ভাগ পত্রিকার অপমৃত্যু ঘটতেও সময় লাগত না। দেশের শিশুমৃত্যুর হারের সমান বলা যায়। আশ্চর্যের যে, পত্রপত্রিকার সংখ্যায় তবু…

এলিয়েন

একরাম আলি গাছে-ঢাকা আমহার্স্ট স্ট্রিট। দু-পাশে বুক-চেতানো ফুটপাথ। ফাঁকা-ফাঁকা। গাড়ি-ঘোড়াও কম। বাস মাত্র একটা-- থ্রি বি। পাইকপাড়া থেকে আলিপুর। পরে-যে আরও চলবে, তার শুরু থ্রি সি বাই ওয়ান দিয়ে। তারপর যোগ দেয় থ্রি ডি। সবই প্রাইভেট। জাতে সরকারি…

গোলদিঘি

একরাম আলি রাত অনেক। বারান্দায় দাঁড়ালে ড্রিল ক্লাসের মতো সারবন্দি রাস্তার আলো। মাঝেমধ্যে গাড়ির হেডলাইট। মিত্র স্কুলের গলতায় শান্তিপুর-নামাঙ্কিত বন্ধ শালঘরের আলো নিভে গেলেও, দরজার মাথায় সাইনবোর্ড পড়া যায়। আশপাশের স্বল্প আলোয় একটু যা ঝাপসা।…

কলকাতার কিহোতে

একরাম আলি যে-ভূখণ্ডে আমি থাকতে চাইতাম, সেটি কেমন? তার পায়ের কাছে থাকবে সমুদ্র। উচ্ছল তীরভূমি। শিয়রে পাহাড়, পর্বত। চারপাশে বনাঞ্চল ঝরনা নদী। দেখবার মতো দু-একটা পুরাকীর্তি-অঞ্চল, যাতে অতীত গৌরবের অন্তত ইঙ্গিত ফুটে ওঠে। মাঝে মাঝে বসবাসযোগ্য…

দেশ

একরাম আলি মানুষের সেরা আবিষ্কার হয়তো-বা ঈশ্বর। এবং আত্মা। ঈশ্বর এবং আত্মার সম্পর্ক যে অবিচ্ছেদ্য নয়, মানুষই সেই গূঢ় কথাটি সামনে এনে খুঁটিয়ে দেখতে চেয়েছে। আত্মা ঈশ্বর-নিরপেক্ষ নাকি সংশয়মধুর সম্পর্কে তার ‘চলার বেগে পায়ের তলায় রাস্তা জেগেছে’…

দুই তারা

একরাম আলি যদি সুদর্শন বলতে হয়, কফি হাউসের দু-জন অতিথির নাম উঠে আসবেই— ভাস্কর চক্রবর্তী, শামশের আনোয়ার। প্রায় সমান লম্বা। ছয় তো বাঙালির কাছে আকাশ! ছুঁতে মন চায়। কিছুটা নীচেই ছিলেন তাঁরা। পাঁচ আট-দশই-বা কম কি! প্রথমজন তুর্কি ফর্সা।…

লেটার প্রেস

একরাম আলি এককালে ছিল গৃহস্থবাড়ি। তারই এক বা একাধিক ঘরের দেওয়াল কালিতে ভর্তি। স্যাঁতসেঁতে তার মেঝে। কালি-ভর্তি। যাঁরা সেখানে ব্যস্ত, তাঁদের দু-হাত কালিতে রঙিন। এমনকী বিকেলের মুড়ির ঠোঙাও। সেখানে ঢুকলে, কালির জগতেই ঢুকতে হয়। তবু, কালিমালিপ্ত…

অযোধ্যা

একরাম আলি তেতাল্লিশ বছর আগের ছবি। বুনো চড়াই পেরিয়ে পাঁচ আগন্তুক দাঁড়িয়ে আছি। বনদপ্তরের চেষ্টাকৃত পাইনবনে। পিছনে বনবাংলো, যেখানে আমাদের ঢোকার অনুমতিপত্র নেই। তারও পিছনে পাহাড়ের ওদিকে সূর্য তলিয়ে যাচ্ছে। সামনে উঁচুনীচু প্রান্তর, যেটি আসলে…

পুরুল্যা পুরুলিয়া

একরাম আলি বন্ধুরা জানে— আমি পুরুলিয়ায়। অথচ সিঁড়ি ভাঙছি। রবিবারের কফি হাউস। ফাঁকা যতটা, চোখে লাগে তারও বেশি। ইনফিউশন আসে অবশ্য। কিন্তু কালো কফিকে ঘিরে অস্থির চারপাশ। পালাই-পালাই ভাব। যখন মাথা চাড়া দিয়ে উঠল অস্থিরতা, কাউন্টারের পিছনে ঘড়ির…

বিজনের কলকাতা

একরাম আলি কথিত আছে— নবির অন্তিমশয্যায় শিষ্যরা সব জড়ো হয়েছেন। শেষ বাণী শোনার জন্যে সবার কান খাড়া। ধীরে উচ্চারিত হল— পরনের এই শেষ খেরকাটি পাবেন ওয়াইস আল-কারনি। সবাই চুপ। চোখে প্রশ্ন— কে তিনি! ফের উচ্চারিত হল-- ইয়েমেনি। মা অন্ধ। উট চরানো তার…

অতিথি

একরাম আলি সাড়ে ন-বছর বয়স থেকে একাধিক হোস্টেলে। হলে কী হবে, বাড়ি ছোট্ট একটা গাঁয়ে। হাঁটু-অবধি কাদা। বিদ্যুতের কল্পনাও করা যেত না। দু-মাইল হাঁটলে পাকা রাস্তার লেজ পাকড়ানো সম্ভব যদিও, কিন্তু ক-জনই-বা যাচ্ছে! এ-হেন গাঁয়ের এক চাষি-পরিবারে জন্ম,…

বকুলবাগান

একরাম আলি জানালা সব খোলা। শীতকালের সিউড়ি। কিন্তু প্রতিটি জানালা দিয়ে একেকটা বড় সাইজের রোদ। তার সঙ্গে আশপাশের মাঠঘাট আর আকাশ ঢুকে পড়ছিল একেবারে ঘরের মধ্যে। উত্তরে যতদূর চোখ যায়-- ন্যাড়া মাঠ, মাঝে মাঝে গমখেত, শাক-সবজি, ফের ন্যাড়া মাঠ তিলপাড়া…

শুভ নববর্ষ

একরাম আলি পয়লা বৈশাখ। শুভেচ্ছার স্রোতে ফেসবুক ভেসে যাওয়ার দিন। মেসেঞ্জার ঠেসে প্রীতি আর শুভকামনা। কত রকমের শব্দ কত যে অভিনব ভাবে ব্যবহার হয় নতুন বছরের প্রথম দিনটাতে, গবেষণার বিষয়। সারা পৃথিবীতে ছড়ানো আজ বাঙালি। বাংলা সাল বা মাস আমাদের কাজে…

হার-জিত

একরাম আলি সেটা সাতাত্তর। সাতাশ মার্চ জরুরি অবস্থা উঠে গেল। এল নির্বাচন। ফল-- রাজ্যে কংগ্রেসের রাজ্যপাট চুরমার করে বামফ্রন্টের মারকাটারি জয়। মাসটা সম্ভবত ছিল জুন। দিনটা ছিল শনিবার। জরুরি অবস্থার দমচাপা মাসগুলো পেরিয়ে এসে মুক্তির আশ্বাস ছিল…

রাতের শিয়ালদা

একরাম আলি প্রকৃতিতে যা-কিছু চলে বা সরে-সরে যায়, সেইসব যাওয়া আর যেতে-যেতে অদৃশ্য হওয়ার পিছু-পিছু মানুষের দৃষ্টিও অদৃশ্য জগতে ঢুকে যেতে চায়। তার গতিকে থামাতে পারে না বলেই হয়তো। চায়ও কি? চাঁদের অস্থিরতাকে সম্বোধন করে বড় জোর তার আর্তি— চোখের…

হাসপাতাল ভ্রমণ

একরাম আলি টাকা ফুরিয়ে যায়। এর শুরু কবে থেকে? মনে পড়ে না। সেই যখন হাফ প্যান্ট, যখন ক্লাস ফাইভ, তখন থেকেই তো হস্টেলে। নিজের খরচটা নিজেকেই বুঝে নিতে হত। গোল তামার একপয়সা থেকে শুরু। কত-কত পয়সা। টাকা, মানে কাগজের নোট— নীলচে এক টাকা, হলদে…

প্রেসিডেন্সি থেকে কলাবাগান

একরাম আলি রাস্তা চকচক করছে। পাশাপাশি দুটো ট্রামলাইনের পা ডাইনে গ্লোব নার্শারি আর বাঁয়ে ডাকব্যাক ছাড়িয়ে লম্বা হয়ে শুয়ে থাকার জন্যে চকচকে-ভাবটি আরও ধারালো। বাস-ট্রাম-ঠেলাগাড়ি-রিকশা-বাইক-অ্যাম্ব্যাসাডরের পিছনে অ্যাম্ব্যাসাডর আর সে সবের বিকট…

রবিবার

একরাম আলি পাশেই পূরবী। উনিশশো একষট্টির জানুয়ারিতে কলকাতা বেড়াতে যখন নিয়ে আসা হয়, ওই হলেই দেখানো হয়েছিল ‘মানিক’। শম্ভু মিত্রকে সেই প্রথম দেখি। ফিল্মে। তখন কি জানতাম, যুগান্তর পেরিয়ে ওই সিনেমাহলের পাশে এক মেসজীবী হয়ে আমি আশ্রয় পাব কলকাতার?…

এইট-বি

একরাম আলি একটা সময় ছিল, যখন বাঙালি পরিবারে ‘যথাকালে, অর্থাৎ যথাকালের অনেক পূর্বেই’ বিয়ের কাজটি সেরে ফেলা যেত। কেমন একটা ফুল ছিল না বিয়ের? সেটা যে কেমন দেখতে, গন্ধই বা কেমন, কেউ-কেউ জানত। বাকিরা থাকত ফোটার অপেক্ষায়। অবশ্য তারপরও পৃথিবী যেমন…

বকখালিতে চারজন

একরাম আলি দুপুরের নির্জনতা কেমন? যখন বাতাস ছিল পরিষ্কার, ছিল না ধোঁয়াধার দূষণ, চোত-বোশেখে বীরভূম-বাঁকুড়া-পুরুলিয়ায় খাঁ-খাঁ মাঠে দেখা যেত মরুভূমির ঝিলিমিলি। আর, মানুষের নির্জনতা? তার রূপ যেমনই হোক, মেসে এই দুই-ই দুর্লভ। হয়েছে কী, তিনতলায়…

কমলবাবু

একরাম আলি হয় না, আনকোরা চোখে অচেনা কোনও তারা খুঁজতে গেলে আকাশের অনেকটা অন্ধকার ঘেঁটে তবে পাওয়া যায় রোহিণী বা পূষার টিমটিমে আলো? মেসে স্থায়ী একটা বেড পেতেও আমাকে খানিকটা ঘাঁটাঘাঁটি করতে হয়েছিল। দোতলা থেকে কয়েক মাসের জন্যে উঠতে হয়েছিল…

দ্য আউটসাইডার

একরাম আলি মানুষ যে-মাটিতে জন্মায়, বেড়ে ওঠে, আছাড় খেয়ে-খেয়ে তার স্মৃতির সুতোগুলো ঝড়ঝাপটায় উড়তে উড়তে ক্রমশ দূরে সরে যায়, ফিরেও আসে কোনও-কোনও নাছোড়বান্দা সুতো; সেই সব স্মৃতি জীবনে আর সঞ্চিত হয় না। কারণ সেই সব ক্ষণস্মৃতিকে পূর্ণতা দিতে সঙ্গে…

একতলা, দোতলা, তিনতলা

একরাম আলি ট্রামরাস্তার উপর দু'দিকে সারিসারি দোকান। মাঝে সরু গলির মতো ঢোকার রাস্তা, যেটাকে বাংলা লব্জে দেউড়ি বলাই উচিত। ঢুকে ডাইনে সিঁড়ি, বাঁহাতে চাতাল। চাতালে বড়োসড়ো চৌবাচ্চা, যাতে বাচ্চারা দিব্যি হাত-পা ছুড়ে সাঁতার কাটতে পারে। কিন্তু মেস…

ব্লগ: হ্যারিসন রোড ৩/ ইয়ামাশিরো

একরাম আলি সত্তরের দশকের ডামাডোলে মেস-মালিকদের তৎপরতা বেড়ে যায়। ততদিনে তাঁদের কানে সেই ধুরন্ধর মৌমাছিগুলো গুনগুন করতে শুরু করেছে, আগেভাগে যারা বাজার বুঝতে পারে। ব্যবসাটির মোড় তাঁরা ঘোরাতে উঠে পড়ে লাগেন। মেসগুলোকে হোটেলে উন্নীত করার…

ব্লগ: হ্যারিসন রোড ২/ ম্যানেজারবাবু

একরাম আলি কলকাতার পুরোনো মেস-অঞ্চলের সীমানা ছিল মোটের ওপর দক্ষিণে ধর্মতলা স্ট্রিট, উত্তরে বিবেকানন্দ রোড, পুবে আপার সার্কুলার রোড, পশ্চিমে সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ—এই আয়তক্ষেত্রটিতে। অঞ্চলটায় দু’দুটো মেডিকেল কলেজ, দেশের ডাকসাইটে ইউনিভার্সিটির…

ব্লগ: হ্যারিসন রোড/ চুয়াল্লিশের তিন

একরাম আলি বিশাল জংশন স্টেশন। ট্রেনগুলো ধুঁকতে ধুঁকতে আসে আর থেমে যেতে বাধ্য হয়। সামনে যাওয়ার রাস্তা নেই যে! সামনে যাওয়ার আর দরকারও নেই অবশ্য। গাঁ-গঞ্জ ঝেঁটিয়ে-আসা ধুলোমলিন ট্রেনটাকে তখন ঘিরে ধরে কুলির দল, রকমারি হকার, দোকান, হাজারো যাত্রী,…

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More