সোমবার, জানুয়ারি ২৭
TheWall
TheWall

রোজ পড়ছে ৩০০ পাত! চিকিৎসক নন, তবু রোগী-পরিবারের কাছে যেন ঈশ্বর এই যুবক

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr +

দ্য ওয়াল ব্যুরো: বছর তিনেক আগের কথা। হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন এক আত্মীয়, তাঁর সঙ্গেই দেখা করতে গিয়েছিলেন বছর পঁয়ত্রিশের এক যুবক। তখনই চোখে পড়েছিল, হাসপাতালের বাইরে সারি সারি বসে থাকা মানুষগুলো। সকলেইরই প্রিয়জন ভর্তি রয়েছেন হাসপাতালে, আর বাইরে উৎকণ্ঠার প্রহর গুনছেন তাঁরা। সেই সঙ্গে রোজই একটু একটু করে নিঃস্ব হচ্ছেন আর্থিক ভাবে। না আছে বিশ্রামের জায়গা, না আছে ঠিকমতো খাওয়াদাওয়া। প্রিয়জনকে সারিয়ে তুলতে গিয়ে যেন নিজেকেই পণ করেছেন কেউ কেউ। টাকা সঞ্চয় করতে গিয়ে ক্ষয়ে যাচ্ছে তাঁদের শরীর। তখনই মাথায় এক চিন্তা আসে যুবকের। এই মানুষগুলোর জন্য যদি অন্তত একবেলা পেট ভরা খাবারের ব্যবস্থা করা যায় বিনামূল্যে! তা হলে অন্তত একটু হলেও জোর পাবেন তাঁরা।

সে দিনই সৈয়দ গুলাব নামের ওই যুবকের মাথায় প্রথম অঙ্কুরিত হয় ‘রোটি চ্যারিটি ট্রাস্ট’-এর ভাবনা। তার পর  থেকে, গত দু’বছর ধরে চলছে ব্যাঙ্গালোরের নিমহ্যান্স ও আশপাশের কয়েকটি হাসপাতালের রোগীর পরিবারের ৩০০ মানুষকে প্রতি দিন দুপুরে পেট ভরে খাওয়ানোর প্রকল্প। প্রিয়জনের চিকিৎসায় সর্বস্ব উজাড় করে বিভুঁইয়ে পড়ে থাকা মানুষগুলোর কাছে যেন ঈশ্বরেরই প্রতিরূপ সৈয়দ।

সৈয়দ জানালেন, রোগীদের চিকিৎসার কথা ভাবতে গিয়ে দিনের পর দিন পেট ভরে না খেয়ে থাকেন তাঁদের পরিবারের বহু মানুষ। পয়সার বিনিময়ে থাকার জায়গাই জোগাড় করতে পারেন না যাঁরা, হাসপাতালের বাইরেই পথেঘাটে থাকেন, তাঁরা কেমন করেই বা রোজ পয়সা খরচ করবেন খাওয়ার পেছনে! হাসপাতাল তো রোগীদের খাবার দেয়। কিন্তু তাদের পরিবারের মানুষগুলোর খাওয়াও তো জরুরি! সৈয়দ বলেন, “এ সব ভেবে খুবই কষ্ট পেতাম আমি। কিছু করতে চাইতাম এঁদের ভাল রাখার জন্য। তখনই বন্ধুবান্ধবদের বলি, আর কয়েক জন মিলে এই খাওয়ানোর ব্যাপারে উদ্যোগ নিই।”

প্রথমে প্রতি রবিবার করে শুরু হয় রোগীদের পরিবারের মানুষগুলোকে ভরপেট খাওয়ানোর এই ব্যবস্থা। সৈয়দের যুক্তি, “রবিবার দুপুরে আশপাশের সব হোটেলও বন্ধ থাকে। ফলে কেউ চাইলেও একটু সস্তায় খেতে পারেন না রবিবারগুলোয়।” এই কাজ শুরু হওয়ার কিছু দিন পরেই হায়দরাবাদের আজ়হার মাকসুসির কথা জানতে পারেন সৈয়দ। আজ়হার ছ’বছর ধরে শহরের বহু গরিব মানুষের অন্ন সমস্থান করছেন বলে খবর পান। তখনই সৈয়দ ঠিক করেন, এই মানুষটার সঙ্গে দেখা করবেন। আরও বড় করবেন তাঁর স্বপ্নের প্রকল্পকে।

দেখা হয়। ব্যাঙ্গালোরেই। সৈয়দের উদ্যোগ এবং পরিকল্পনায় খুবই খুশি হন আজ়হার। উৎশাহ দেন। শুধু তাই নয়, ২৫ কেজির ৩০টি করে চালের বস্তাও তিনি পাঠাতে থাকেন সৈয়দকে। “ওঁর এই অভূতপূর্ব সাহায্যের পরেই আমরা শুধু রবিবারের বদলে প্রতিদিন খাওয়ানোর কাজ শুরু করতে পারি।”– বলেন সৈয়দ।

এখন দিব্য চলছে সৈয়দের এই সেবাযজ্ঞ। রান্নার কাঁচামাল মজুত করার জন্য হাসপাতাল চত্বরে একটি ছোট ঘর ভাড়া করেছেন তিনি। কর্মচারীও রেখেছেন বেশ কেক জন। প্রতি দিন দুপুর একটার মধ্যে তৈরি হয়ে যায় মধ্যাহ্নভোজন। ভ্যানে করে নিয়ে গিয়ে হাসপাতালের বাইরে সেই খাবার বিতরণ শুরু হয় দু’টো থেকে। মাস কয়েক হল, এর সঙ্গে যোগ হয়েছে সকালের জলখাবারও। ইডলি আর চাটনির ছিমছাম মেনুতে পেট ভরিয়ে নিতে পারেন অনেকেই।

কিন্তু কী ভাবে আয়োজন হয় এত খাবারের? পেশায় রং-শিল্পী সৈয়দ জানালেন, ভাল কাজ করতে চাইলে কখনও তা টাকার জন্য আটকায় না। বললেন, “আমি কখনওই কোনও চাঁদা তুলি না। কিন্তু মানুষ যখন জানতে পারেন এখানে একটা ভাল কাজ হচ্ছে, তখন নিজে থেকেই অনেকে পাশে দাঁড়ান। সাহায্য করেন তাঁর এই রোটি চ্যারিটি ট্রাস্টে।”

কলকাতার বাসিন্দা শরৎ কুমার কয়েক দিন আগেই নিজের ছেলেকে ভর্তি করেছিলেন ইন্দিরা গান্ধী ইনস্টিটিউট অব চাইল্ড হেল্থে। দু’মাস ধরে কিডনির অসুখ নিয়ে ভর্তি ছিল তাঁর সন্তান। এবং টাকাপয়সার অভাবে তিনি ওই দু’মাসই হাসপাতাল সংলগ্ন ফুটপাথে দিনরাত কাটিয়েছেন। তাঁর কথায়, “সৈয়দ গুলাব আমাদের আশীর্বাদ। উনি যেন মানুষের ছদ্মবেশে আসা ঈশ্বর! আমি, আমার মতো আরও অনেকে রোজ খেতে পান শুধু এই মানুষটার জন্য।”

Share.

Comments are closed.