গান্ধীজিকে কেন হত্যা করেছিল আরএসএস

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    সূর্যকান্ত মিশ্র

    মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর মত, পথ ও সমাজ-দর্শন নিয়ে কিছু বলার আগে শুরুতেই আরও একবার জানিয়ে রাখা ভাল, আমরা গান্ধীবাদী নই। বিশেষ করে মহাত্মা গান্ধীর রাজনৈতিক পথের সঙ্গে আমাদের অনেক বিষয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। কিন্তু তা যেমন ঠিক, তেমনই এও ঠিক, যে তাঁর ইতিবাচক অবদানগুলিকে বামপন্থীরা তথা আমাদের দল কখনও ছোট করে দেখিনি। বরং আমাদের পূর্বসূরীরা বিশদে গান্ধীজির আন্দোলন, তাঁর অবস্থান সম্পর্কে পার্টির অবস্থান স্পষ্ট করেছেন। ইএমএস নাম্বুদিরিপাদের বইতে গান্ধীজি সম্পর্কে সামগ্রিক মূল্যায়ন রয়েছে। তাঁর সম্পর্কে এটা আমাদের সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গী। তবে দুঃখ হয়, গান্ধীজির ইতিবাচক অবদানগুলিই এ দেশে এখন আঘাতপ্রাপ্ত!

    যে ভারতের স্বপ্ন মহাত্মা গান্ধী দেখেছিলেন, এখন সেই ভারতের চেহারাটাই বদলে গিয়েছে। গান্ধীজির হত্যাকারীদের উত্তরাধিকার বহন করে চলেছেন যাঁরা, তাঁরাই এখন ক্ষমতায়। দেশ চালাচ্ছেন।

    ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের একটা বড় অবদান হচ্ছে ভারত সম্পর্কে ধারণা। ‘কনসেপ্ট অফ ইন্ডিয়া’ যাকে বলা হয়। এই ধারণার মাইলফলক ১৯৩১-এ জাতীয় কংগ্রেসের করাচি অধিবেশন। সেই অধিবেশনে জওহরলাল নেহরুর তৈরি করা খসড়া গান্ধীজি আনুষ্ঠানিক ভাবে পেশ করেছিলেন। এবং এটা হয়েছিল কংগ্রেস, কংগ্রেসের ভিতরে ও বাইরে কাজ করা সোশ্যালিস্ট বা কমিউনিস্টদের সহমতের ভিত্তিতেই। একটা ভুল ধারণা বা বলা ভাল বিকৃত প্রচার রয়েছে, ভারত যে বহু ভাষাভাষি, বহু জাতির একটা দেশ হবে, এটা নাকি ব্রিটিশদের অবদান। মোটেই না। বরং এ ব্যাপারে অন্যান্য ঔপনিবেশিক শক্তিগুলির ভূমিকার থেকে ব্রিটিশদের ভূমিকা আলাদা নয়। এবং সেটা ভারতের জাতীয় স্বার্থের বিরোধী।

    সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পরে ভারতই একমাত্র দেশ যেখানে এত ভাষা, এত জাতিসত্তার বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এটা গর্ব করার মতো ব্যাপার। সংবিধানের অষ্টম তফসিলে যে ২২টি ভাষার উল্লেখ রয়েছে তা বাদ দিয়েও প্রায় বিভিন্ন জাতি-উপজাতির দেড় হাজার ভাষা রয়েছে। এই বৈচিত্র্যই ভারতের বৈশিষ্ট এবং শক্তির উৎস। এর উৎপত্তি স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে। হিন্দুত্ববাদী ও ইতিহাস বিকৃতকারীদের কথা বাদ দিলে, যাঁরা ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন নিয়ে কাজ করেছেন তাঁরা প্রত্যেকেই স্বীকার করেন এই বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের ধারণা গড়ে উঠেছিল স্বাধীনতা আন্দোলনের শেষ তিন দশকে। এবং করাচি অধিবেশন সে দিক থেকে মাইলফলক।

    স্বাধীনতা আন্দোলনের কেউই তথাকথিত দ্বিজাতি-তত্ত্বের ধারণার পক্ষে ছিলেন না। জাতি আর ধর্মকে মেলানোর কাজটা প্রথম থেকেই আরএসএস করেছিল। আর পরের দিকে মহম্মদ আলি জিন্নাহ। এদের বাদ দিলে স্বাধীনতা আন্দোলনের মধ্যে একটা সহমত ছিল যে, স্বাধীন ভারত হবে একটা অখণ্ড ভারত। দেশ ভাগ, আপসের স্বাধীনতা না হলে এই অখণ্ড ভারত গড়ে উঠতে পারত। এর পক্ষে ছিলেন গান্ধীজি।

    সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় উস্কানি দিয়েছে ব্রিটিশরা। রাস্তায় নেমে তার বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিলেন গান্ধীজি। বারবার। কলকাতায় দাঙ্গার সময়ে বেলেঘাটায় তাঁর অনশন প্রভাব ফেলেছিল। সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা প্রশমনে অনুঘটকের ভূমিকা নিয়েছিল তাঁর ভূমিকা। তেমনই ৪২-এর ভারত ছাড়ো আন্দোলনের প্রস্তাবেও গান্ধীজি ভারতের বহুত্ববাদকে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। ছোট প্রস্তাব হলেও, তাতে স্পষ্ট করে বলা ছিল যে ভাষাভিত্তিক রাজ্যগুলির স্বাধিকার থাকবে। আজকে যে জাতীয়তাবাদের কথা বলা হচ্ছে, তার মধ্যে গলদ রয়েছে। গান্ধীজি যে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের কথা বলেছিলেন, তার মূল কথাই ছিল এই বৈচিত্র্যের শক্তি।

    অনেকে আরএসএস-কে ছোট করে দেখতে চান। কিন্তু এটা ঠিক নয়। এই শক্তি আকাশ থেকে পড়েনি। ১৯২৫ সালে প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত আরএসএস এ দেশের কাছে বিপদ। তখনও হিটলারের উত্থান হয়নি। ইতালিতে গিয়ে মুসোলিনির সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং তার পর ভারতকে ফ্যাসিবাদের পরীক্ষাগার বানাতে আরএসএস ব্যবহৃত হয়েছে। এর বিরুদ্ধে গান্ধীজির অবস্থান ছিল লৌহদৃঢ়। আরএসএস-এর ফ্যাসিস্ট সুলভ হিন্দুত্ববাদ স্বাধীনতার আগেও ছিল। স্বাধীনতার পর গান্ধীজির জীবনের বিনিময়ে তা প্রমাণিত হয়েছে। এই সময়ে তাই বারবার মনে করিয়ে দিতে হবে ভারতের ধারণা কী। এবং কেন ওরা গান্ধীজিকে হত্যা করেছিল।

    ৪৭ সালের ১ থেকে ৪ অগস্ট, কাশ্মীর সফরে গিয়েছিলেন গান্ধীজি। তখনও কাশ্মীর ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়নি। শেখ আবদুল্লাহের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছিল তাঁর। আবদুল্লাহ তখন কাশ্মীরের জমি আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। পরে তিনি এসেছিলেন প্রার্থনা সভায়। গান্ধীজি আবদুল্লাহকে উদ্দেশ করে বলেছিলেন, কাশ্মীরকে মুক্তির পথ দেখাতে পারেন ইনিই। এখন এই চর্চাগুলো আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে। ওরা যে হিন্দুস্থানের কথা বলে, আর গান্ধীজি যে হিন্দুস্থানের ধারণায় বিশ্বাস করতেন—তার মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাৎ। গান্ধীজি যে হিন্দুস্তানি ভাষার কথা বলতেন, তা হল উর্দু, হিন্দি সবটা মিলিয়ে। সামগ্রিকতার নিরিখে বলতেন। আর আজকের শাসকরা আগ্রাসী ভাবে হিন্দিকে চাপিয়ে দিতে চাইছেন।

    ১৯২১ সালে কংগ্রেসের আমেদাবাদ অধিবেশনে কমিউনিস্টরা যে প্রস্তাব উত্থাপন করেছিল, ভারত সেই স্বাধীনতা পায়নি। যে ধরনের স্বাধীনতা দেশ পেয়েছে তার মধ্যে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আমরা মনে করি এটা আপসের স্বাধীনতা। কিন্তু যতটুকু রয়েছে, সেটাকে রক্ষা করাই আজকের চ্যালেঞ্জ। গান্ধীজির জন্মের সার্ধশতবর্ষে সংবিধানের মৌলিক স্তম্ভগুলি আজকে আক্রান্ত। সংবিধানের প্রস্তাবনায় যা লেখা আছে, তার মধ্যে অন্যতম ধর্মনিরপেক্ষতা। ‘ইউনিয়ন অফ স্টেট’-এর সার্বিক ধারণা আক্রমণের মুখে। একটা উগ্র দক্ষিণপন্থী হিন্দুত্ববাদী ফ্যাসিস্ট সুলভ শক্তির হাতে দেশের শাসন। এই সময়ে শক্তি ক্ষীণ হলেও সংসদের ভিতরে এবং বাইরের লড়াই সংগ্রামকে জোরদার করেই ভারতের ধারণাকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। এ দেশের ধর্মনিরপেক্ষতাকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। একই সঙ্গে বাঁচিয়ে রাখতে হবে বৈচিত্র্যের ভারতবর্ষ সম্পর্কে গান্ধীজির ধারণাগুলিকে। স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁর ইতিবাচক দিকগুলিকে।

    লেখক সিপিআই (এম) পলিটব্যুরোর সদস্য ও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সম্পাদক

    ‘দ্য ওয়াল’–এ প্রকাশিত এই পর্বের সব লেখা পড়ার জন্য ক্লিক করুন নীচের লাইনে

    সার্ধশত বছরে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More