সুর জাহান: কাঁটাতারের লড়াই নিয়ে নয়, গানের ডালি নিয়ে বিশ্ব এসে ধরা দেয় এ শহরে

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

এখন আমরা এমন একটা সময়ে বাস করছি, যেখানে সব কিছুর আগে যেন চোখে পরে ফারাকগুলোই। মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগসূত্র ক্ষীণ হতে হতে এমন একটা সুতোর উপরে ঝুলছে, যে সুতোর এক প্রান্তে অবিশ্বাস, অন্য প্রান্তে সন্দেহ। ভালবাসা ভয়ে ভয়ে পা রাখে সেই সুতোয়। এমন একটা সময়ে যদি বিশ্বপ্রেমের কথা বলেন কেউ, তা হলে তা কেবল বইয়ে পড়া কথা বলেই মনে হয়। কিন্তু কেউ যদি কাজে করে দেখান এমনটা? কেউ যদি সারা বিশ্বের প্রেমের পুজোকে এক ছাতার তলায় নিয়ে আসতে পারে সুরের পথ ধরে, তা-ও আবার এই শহরেরই বুকে?

এই প্রথম নয়। কয়েক বছর ধরেই শীতের শেষে বিশ্ব সুরের বন্দনার অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার সুযোগ পান শহরবাসী। অনুষ্ঠানের নাম ‘সুর জাহান’। ২০১১ সাল থেকে পথ চলা শুরু এই সুর জাহানের। আগে অবশ্য এর নাম ছিল ‘সুফি সূত্র’। এই বছরও মোহরকুঞ্জে আগামী ১ থেকে ৩ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে ‘সুর জাহান’। একটি-দু’টি নয়, ২৭টি আলাদা আলাদা দেশ থেকে সুফি শিল্পীরা আসছেন মহানগরে। সুরের মধ্যে দিয়ে বিশ্বপ্রেমের কাহিনি শোনাবেন তাঁরা। অনুষ্ঠানে কোনও প্রবেশমূল্য নেই।

আফগানিস্তান, মিশর, পোল্যান্ড, ব্রাজিল, রাশিয়া, আমেরিকা, পর্তুগালের মতো দেশ থেকে শিল্পীরা আসছেন সুরের টানে, প্রেমের টানে। ওঁদের কেউ হয়তো কারও কথা বোঝেন না, কেউ কারও মতো পোশাক পরেন না, ওঁদের খাদ্যাভ্যাস আলাদা, ধর্ম আলাদা, বেঁচে থাকার ধরনই হয়তো আলাদা। আর এই সমস্ত আলাদা সত্ত্বেও যা দিয়ে তাঁরা সকলের সঙ্গে সকলের যোগসূত্র তৈরি করতে পারেন, তা হল– ‘সুরেরই ভাষা, ছন্দেরই ভাষা’।

দুনিয়া ভরা বিভাজন আর অসহিষ্ণুতার মাঝে আফগান তরুণীর সুরে মিশে যায় আমেরিকার বৃদ্ধের আর্তি। মুগ্ধ হয়ে শোনে শহর কলকাতা। শীতের সন্ধেয় ভালবাসার ওমে ভরে ওঠে মোহরকুঞ্জ।

কিন্তু কেন এই আয়োজন? কী চায় সুর জাহান?
চায় সকলকে নিয়ে পথ চলতে। মনে করিয়ে দিতে চায়, ভালবাসা কাঁটাতারের চেয়ে অনেক বড়। ভাবাতে চায়, নিজের সন্তানের খিদে আর দূরের কোনও যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে বাস করা খুদের পেটে যে খিদে– তার মধ্যে কোনও ফারাক নেই আদতে। জানাতে চায়, এই চরম অন্ধকার ও বিষণ্ণ সময়টায় মানুষ আরও বেশি করে মানুষের হাত ধরে থাকলে, দিনবদল অসম্ভব নয়। আর সে বদলের স্বপ্নে বেজে ওঠে বিশ্বপ্রেমের সুর। সুফি গান।

দেখে নিন কয়েক ঝলক।

তাই ফেব্রুয়ারি মাসের গোড়ার ওই তিনটে দিনে প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের সুরের মেলবন্ধনে তৈরি হবে এক নয়া ফিউশন। তবে শুধু বিদেশ নয়, মানুষকে ভালোবাসার গানের পসরা নিয়ে হাজির থাকবে বাংলার বাউলও। ভাওয়াইয়া, নাটুয়া, ছৌ, রায়বেঁশের মতো বাংলার লোকশিল্পীরাও অংশ নেবেন সুরের সেই উৎসবে। সেই সঙ্গেই মধ্যপ্রাচ্যের সুফি গান নিয়ে সুর মেলাবেন মিশরের লোকসঙ্গীতের দল মৌলাইয়া। আবার সুদূর সাইপ্রাসের রাখালবালকের সুর হয়তো মিশে যাবে গ্রামবাংলার ভাটিয়ালি গানে।

এই অনুষ্ঠানের উদ্যোক্তা বাংলা নাটক ডট কম। সংস্থার ডিরেক্টর অমিতাভ ভট্টাচার্য জানালেন, শহর কলকাতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল তার বৈচিত্র্য। এ শহর এত রকম মানুষ, এত ভাষা, এত সংস্কৃতি নিজের মধ্যে ধারণ করেছে, ভাবা যায় না। তাই সে শহরের মানুষের কাছে বিশ্বের সংস্কৃতিকে এনে ফেলার এ প্রচেষ্টা দীর্ঘ দিন ধরেই চলছে। তিনি বলছেন, “এ অনুষ্ঠানে কোনও বাধা নেই, কোনও আড়াল নেই। শ্রোতাদের সামনে বিশ্ব সংগীতের দরজা অবারিত করে দিতে পারাই আমাদের আনন্দ। আর যে সব দেশের শিল্পীরা এই দরজা দিয়ে প্রতি বছর এসে পৌঁছচ্ছেন শহর কলকাতায়, আনন্দ তাঁদেরও কম নয়।”

বস্তুত, ইতিহাস বলছে, সুরের আর সংস্কৃতির বিনিময় না হলে সভ্যতাই থমকে যেত এক সময়ে। তাই বৈচিত্র্যের উদযাপন বড্ড জরুরি। বিশেষ করে, বিভাজন ও অসহিষ্ণুতার অন্ধকারে ঢেকে থাকা এই সময়ে সঙ্গীত অবশ্যই একটা অবলম্বন হয়ে উঠতে পারে। জীবনের সঙ্গে জীবনের পরিচয় না থাকলেও, সারা পৃথিবীর বিভিন্ন মানুষের মধ্যে মেলবন্ধন ঘটাতে সুরের কোনও বিকল্প নেই। কারণ কথা বলার ভাষা যা-ই হোক না কেন, গানের ভাষা সা থেকে নি, সেই সাতটা সুরেই আবদ্ধ।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More