নষ্ট জলে ভাসছে গেরস্থালি, ভাঙা বাঁধের বাঁকে বাঁকে ঘুরে দাঁড়ানোর জরুরি অভ্যেস

ঘুরে দাঁড়ানোই যেন এক জরুরি অভ্যেস সুন্দরবনের। বারবার প্রকৃতির মারে শেষ হয়ে গিয়েও ফের বেঁচে থাকার সহজাত লড়াইয়ে জান লড়িয়ে দেওয়া শুরু। তবে এবারের লড়াই যেন বহুমুখী, বলছেন সুন্দরবনের বাসিন্দারাই।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    তিয়াষ মুখোপাধ্যায়, সুন্দরবন

    ঝড়ের তাণ্ডবে সুন্দরবনে যে কয়েক ঘণ্টার বিস্রস্ত, বিভ্রান্ত আন্দোলন ঘটে গেছে, তা যেন খানিকটা স্তিমিত হয়েছে এখন। উমফানে পাগলের মতো দুলে ওঠা গাছেরা মৃতপ্রায়। চাল উড়ে যাওয়ার পরে, দেওয়াল ভেঙে যাওয়ার পরে ঘরগুলির কাঠামো জলের উপর দাঁড়িয়ে আছে নিথর। ইতিউতি ভাসছে গেরস্থালির টুকরো। আর মানুষগুলোর চোখের আশঙ্কার মেঘ বদলেছে অনিশ্চয়তায়। রাশিরাশি লবণ-জলের মাঝে বসে তারা সকলের মনেই প্রশ্ন একটাই। এবার? এবার কী হবে।

    গোসাবা ব্লকে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে রাঙ্গাবেলিয়ার উত্তর অংশটি। বিদ্যাধরী নদীর উপরে বাঁধ, সে বাঁধের পাড়েই রাঙ্গাবেলিয়া উত্তর। বাঁধের ওপর চলাচল করেই পৌঁছনো যায় গোসাবার অন্য সব প্রান্তে। এ বাঁধের একটি অংশে বিদ্যাধরীর একটি বাঁক রয়েছে। সে বাঁকের মুখে থাকা বাঁধের অংশটি প্রায়ই ভাঙে ঝড়ঝাপটায়। আয়লায় তো বটেই, সাম্প্রতিক বুলবুল ঝড়েও ভেঙেছিল এই বাঁধ। স্থানীয়দের মুখে, বাঁধের এ অংশটির নামই হয়েছে “ভাঙ্গা”।

    আরও পড়ুন

    ভাঙা কোমরটা ফের ভেঙে গেছে, উমফানের ক্ষত বুকে নিয়ে নিকষ অন্ধকারে গোঙাচ্ছে সুন্দরবন

    সেই ভাঙ্গা এবার শুধু ভাঙেনি, একেবারে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে ভেঙে। নদীর বুকে যেন মিলিয়ে গেছে বাঁধটি। আর হু হু করে লোকালয়ে ঢুকছে নোনাজল। চোখের সামনে দেখা ছাড়া উপায় নেই তাঁদের। এই জলই ভরিয়ে দিচ্ছে জমি, নষ্ট করে দিচ্ছে পুকুর। ডুবিয়ে দিচ্ছে ঘর, গাছ, মানুষ। অথচ কী আশ্চর্য, এত জলের জন্যই শেষ হয়ে গেছে মানুষের তৃষ্ণার জলটুকুর সংস্থান।

    “কোথায় কোন পুকুরটা ভাল আছে, জল ঢোকেনি, সেই খোঁজ নিতে হচ্ছে রোজ। তার পর নৌকো বেয়ে, পায়ে হেঁটে সেখানে পৌঁছনো। জল আনা। তার পর সে জল ফুটিয়ে তবে গরু খায়, আমরা খাই।”– ঘরের উঁচু ধাপিতে বসে বলছিলেন সুভাষ মান্না। নীচটায় পুরো জল। ওপরেও ছিল, নেমেছে সদ্য। তার পরেই ‘ফ্লাড সেন্টার’ থেকে বাড়ি ফিরেছেন তাঁরা। দেখতে এসেছেন, কী অবস্থা ঘরের।

    সুভাষের স্ত্রী গৌরী মান্না জানালেন, তাঁদের ছাগল আর মুর্গিগুলো মারা গেছে। বাঁচানো যায়নি। গরুগুলো সরাতে পেরেছিলেন কোনও ভাবে। ঘরে এসে দেখেন, মূল থাকার ঘরটা বেঁচে গেলেও ভেঙে পড়েছে রান্নাঘর আর গোয়াল। ১০০ টাকা দিয়ে নতুন একটা মাটির উনুন জোগাড় করেছেন। ভেজা কাঠ জ্বালিয়েই কোনও রকমে ত্রাণে পাওয়া চাল-ডাল ফোটাচ্ছেন একবেলা।

    রাঙ্গাবেলিয়া থেকে ঘণ্টা খানেক দূরে, নৌকো পেরিয়ে পৌঁছনো গেল মন্মথনগর মৌজায়। বিদ্যাধরীর বুকেই আর একটি দ্বীপ। সেখানেও পুরোপুরি ভেঙে গেছে নদীবাঁধ। একের পর এক বস্তায় মাটি ভরে, পরপর সাজিয়ে, দড়ি দিয়ে বেঁধে গ্রামবাসীরা তৈরি করেছেন অস্থায়ী বাঁধ। কিন্তু তাতে কি আর জল আটকায়!

    গোটা গ্রামজুড়ে খেতের পর খেত নষ্ট হয়ে গেছে আনাজের ফলন। বেগুন, কুমড়ো, ঢ্যাঁড়শের অসংখ্য খেত এখন শুধুই নোনা জলের আধার। ফলন্ত আমগাছ উপড়ে পড়ে আছে মুখ থুবড়ে। প্রায় ২০০টি পরিবার ভুগছে পানীয় জলের সঙ্কটে। বিদ্যুৎ বা টেলিযোগাযোগ ছেড়েই দেওয়া যাক। অনেকটাই প্রত্যন্ত এলাকা

    মন্মথনগরের বাসিন্দা বিশ্বজিৎ গিরি বলছিলেন, “আয়লা এসেছিল কিছু না বলে। মিনিট দশেকে সব শেষ সেবার। আর এবার সাত-আট দিন ধরে সতর্ক করা হয়েছে আমাদের। ফসলও তুলে নিয়েছিলাম আগেভাগে। কিন্তু উমফান বলে কয়ে এসে যেন ১০-১২ ঘণ্টা ধরে প্রলয় দেখাল। হঠাৎ করে জমি ভেসে যাওয়া একরকম, আর চোখের সামনে তুলে রাখা ফসলের একের পর এক বস্তা ভেসে যাওয়া যে ঠিক কতটা যন্ত্রণার… জানি না কবে ঘুরে দাঁড়াতে পারব আবার!”

    ঘুরে দাঁড়ানোই যেন এক জরুরি অভ্যেস সুন্দরবনের। বারবার প্রকৃতির মারে শেষ হয়ে গিয়েও ফের বেঁচে থাকার সহজাত লড়াইয়ে জান লড়িয়ে দেওয়া শুরু। তবে এবারের লড়াই যেন বহুমুখী, বলছেন সুন্দরবনের বাসিন্দারাই। শুধু ত্রাণ ও পুনর্বাসনেই শেষ হওয়ার নয় এই সংকট। কারণ, এর পরে ফের নতুন করে শুরু করা খুব সহজ হবে না নোনা জলের সাম্রাজ্যে। ঘর হয়তো হবে, উনুন হয়তো জ্বলবে। জীবন ফিরবে নিজের খাতে। কিন্তু বিধ্বস্ত জঙ্গলে আর নষ্ট জলে জীবিকা ফিরবে কি?

    এই আশঙ্কা নিয়েই আপাতত শূন্য দৃষ্টিতে চেয়ে রয়েছে সুন্দরবন।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More