ভাঙা কোমরটা ফের ভেঙে গেছে, উমফানের ক্ষত বুকে নিয়ে নিকষ অন্ধকারে গোঙাচ্ছে সুন্দরবন

ঘন অন্ধকারে ডুবে আছে গোসাবা। ইতস্তত আলো জানান দিচ্ছে, সোলার ল্যাম্প জ্বলছে কোথাও কোথাও। ফোনের নেটওয়ার্ক নেই প্রায়। ইন্টারনেটের সংযোগ যৎসামান্য। যতক্ষণ না ফোন এবং বিদ্যুৎ পরিষেবা সচল হচ্ছে, ততক্ষণ সুন্দরবনের পক্ষে নতুন করে কিছু ভাবতে পারাই মুশকিল। তাই আপাতত সে দিকেই তাকিয়ে বিধ্বস্ত মানুষগুলি।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    তিয়াষ মুখোপাধ্যায়, গোসাবা

    সুন্দরবনের যে কোনও এলাকায় যদি কেউ স্বাভাবিক সময়ে কখনও যান, একটা শব্দবন্ধ মুখে মুখে ঘোরে। “ওই যে বছর আয়লা হল…” আয়লা যেন এই জল-জঙ্গলের মানুষদের ক্যালেন্ডার। ওই দুঃস্বপ্নের বছরটা দিয়েই অনেকে অনেক কিছু মনে রাখেন। “ওই যে বছর আয়লা হল, আমার বড় নাতি সে বছরেই মাধ্যমিক দিল।” “ওই যে বছর আয়লা হল, আমাদের গরুটা সেবারই বাছুর দিল।”

    সেই সুন্দরবনই বলছে, এবার হয়তো আয়লার পরের ক্যালেন্ডারে মনে রাখার মতো দিন হবে ২০ মে ২০২০। সৌজন্যে সুপারসাইক্লোন উমফান।

    ১১ বছর আগের সেই দুর্যোগ আয়লা কার্যত কোমর ভেঙে দিয়েছিল সুন্দরবনের। উমফানও তাই ভাঙল, তবে আরও মর্মান্তিক ভাবে। কারণ এক তো এর তীব্রতা ছিল অনেক বেশি, আর দুই, আয়লার পরে এখনও উঠে দাঁড়ানো শেষ হয়নি সুন্দরবনের। মাঝে বুলবুলও একটা ধাক্কা দিয়েছে ছোটখাটো।

    গদখালি পৌঁছে স্থানীয় এক ছোট্ট দোকানদারের কাছে এই কথাগুলো শোনার পরে লঞ্চঘাট অবধি পৌঁছে অপেক্ষা করতে হল অনেকটাই। দু’টি বাসে করে ফিরেছেন এক দল পরিযায়ী শ্রমিক। পাঞ্জাব থেকে ফিরেছেন তাঁরা। সকলকে লাইন করে নির্দিষ্ট দূরত্বে দাঁড় করিয়ে, থার্মাল স্ক্রিনিং করিয়ে, লঞ্চে করে পার করানো হচ্ছে তাঁদের।

    আরও পড়ুন

    দিদিমণি ভেবেছিলেন একাই সামলে দেবেন, ভয়ের চোটে এখন সেনা ডেকেছেন: দিলীপ

    জেটির দিকে তাকালে বোঝা যায়, কতটা ধকল সহ্য করেছে প্রাচীন এই ঘাট। শেড ভেঙে গেছে, ভেঙে গেছে নোঙর করার কয়েকটি স্ট্যান্ডও। অনেকগুলি নৌকা ও লঞ্চ ভেঙেচুরে ক্ষতিগ্রস্ত। যেগুলি ভাল আছে, সেগুলি নিয়েই ফের চলাচল শুরু করেছেন মাঝিরা।

    সুন্দরবনের সঙ্গে যোগাযোগের লাইফলাইন এই বিদ্যাধরী নদী, বলছিলেন শেখ রাজু, আমাদের নৌকোর মাঝি। গোসাবাতেই থাকেন তিনি। পরিবারের বাকি সদস্যরা থাকেন বালি। ঘরের একটি অংশ ভেঙে গেছে। তবে রাজুর পরিবারের সদস্যরা আগে থেকেই স্কুলবাড়িতে চলে গিয়েছিলেন সরকারি নির্দেশে। তাই কারও ক্ষতি হয়নি।

    অনেকেই বলছেন, আয়লার সময় যে আশঙ্কা বা প্রস্তুতি আগে থেকে ছিল না, তা কয়েক গুণ বেশি ছিল এই বার। আগে থেকে বহু মানুষকে সরানো হয়েছে ত্রাণ শিবিরে। সে কারণেই প্রাণহানি অনেক কম। এ কথা বলছেন স্থানীয় বাসিন্দারাই। কিন্তু এই ত্রাণ শিবিরে যাওয়া নিয়েও খানিক সমস্যা ও অসন্তোষ রয়েছে মানুষের। কারণ, করোনা আতঙ্ক। অনেকেই রাজি হননি, একসঙ্গে এক জায়গায় গিয়ে থাকতে। কিন্তু উমফান আছড়ে পড়ার পরে করোনার ভয়ই যেন উবে গেছে সুন্দরবন থেকে।

    তবে এ ক্ষতি সামাল দেওয়ার কোনও আশা দেখছেন না সুন্দরবনের একটা বড় অংশের মানুষ। লকডাউনে এমনিতেই বেশ ক্ষতি হয়েছিল চাষবাসের। হয়নি মাছ চাষ বা মধু সংগ্রহও। ঘরবন্দি জীবনে ফুরিয়ে আসছিল রসদ। তার মধ্যেও যেটুকু করা গেছিল, সেটুকুও তছনছ করে দিল উমফান। আগামী দিনগুলোয় সরকারি ও বেসরকারি ত্রাণের দিকেই তাকিয়ে প্রতিটি মানুষ।

    গোসাবার আর এক বাসিন্দা পরিতোষ গিরি এর মধ্যেও শোনালেন অন্য এক আশার কথা। তবে সে আশায় আশঙ্কাও মিশে আছে। তাঁর কথায়, “এমন ঝঞ্ঝা সহ্য করেও সুন্দরবন আজ বেঁচে আছে, ম্যানগ্রোভের জন্য। আয়লার পরেও আমরা শিক্ষা নিইনি বলেই অরণ্য ধ্বংস করেছি আরও বহু। এবারের উমফান বোধহয় ‘লাস্ট ওয়ার্নিং’ ছিল। সুন্দরবনকে বাঁচাতে হলে ম্যানগ্রোভ বাঁচাতে হবে। নইলে বারবার সুযোগ নাও পেতে পারি আমরা।”

    ঘন অন্ধকারে ডুবে আছে গোসাবা। ইতস্তত আলো জানান দিচ্ছে, সোলার ল্যাম্প জ্বলছে কোথাও কোথাও। ফোনের নেটওয়ার্ক নেই প্রায়। ইন্টারনেটের সংযোগ যৎসামান্য। যতক্ষণ না ফোন এবং বিদ্যুৎ পরিষেবা সচল হচ্ছে, ততক্ষণ সুন্দরবনের পক্ষে নতুন করে কিছু ভাবতে পারাই মুশকিল। তাই আপাতত সে দিকেই তাকিয়ে বিধ্বস্ত মানুষগুলি।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More