বৃহস্পতিবার, মার্চ ২১

এই গ্রীষ্মে ভুটান দেশে

শ্রমণ গোস্বামী

পৃথিবীর একমাত্র কার্বন নেগেটিভ দেশ ভুটান। যত পরিমাণ কার্বন উৎপন্ন করে তার চেয়ে বেশি শোষণ করে ভুটান।সারা দেশটিতে প্রকৃতি উজাড় করে দিয়েছে সৌন্দর্য। ভারতের পড়শি দেশ ভুটান, পশ্চিমবাংলা থেকে ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে৷ তাই এই গরমে ঘুরে আসুন ভুটান।

ধার্মিক দেশ ভুটান, বৌদ্ধ মনাস্ট্রি ও গুম্ফার দেশ ভুটান ।  অনেক বৌদ্ধ গুম্ফা ও জং ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে সারা দেশ জুড়ে৷আছে ভুটানের প্রান চু নদী। যে যেন শাখাপ্রশাখা ছড়িয়ে সারা ভুটানকে পরম আবেগে  আলিঙ্গন করে রেখেছে। ভুটান পাহাড়ি দেশ তাই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের খনি।

ভুটান যাওয়া ঠিক হয়ে গেলে আগে চলে আসুন কলকাতার ভুটান কনস্যুলেটে।
ঠিকানা: ৫১, ট্রিভোলি কোর্ট,
১এ, বালিগঞ্জ সার্কুলার রোড,
কলকাতা- ৭০০০২৯

কারণ, ভুটান বেড়াতে গেলে ইনারলাইন  পারমিট লাগবে৷ বিনামূল্যে এই পারমিট পাবেন কলকাতার ভুটান কনসুলেট এবং ফুন্টসোলিংয়ের ভুটান গেট ও পারো বিমানবন্দরে৷ প্রতিটি  পারমিটের জন্য সঙ্গে রাখবেন ছ’কপি ছবি আর ভারতীয় নাগরিকত্বের সচিত্র প্রমাণপত্র (আধারকার্ড, ভোটার কার্ড)। ভুটানে থাকাকালীন আপনারা সর্বক্ষণের সঙ্গী হবে এই পারমিট। ভুলেও কাছ ছাড়া করবেন না।যে কদিনের ট্যুর তার চেয়ে বেশিদিনের পারমিট করিয়ে রাখবেন।  পারমিট হারালে জরিমানা তো হবেই জেলও হতে পারে।

ফুন্টসোলিং

কাঞ্চনজঙ্ঘা এক্সপ্রেসে হাসিমারা স্টেশনে নেমে অটো বা ভাড়া গাড়িতে ১৮ কিমি দূরে জয়গাঁও পৌঁছন। জয়গাঁওতে ভুটানের  প্রবেশদ্বার সুদৃশ্য ভুটান গেট পেরিয়ে ভুটানের  ফুন্টসোলিং আসুন। সম্ভব হলে দেখে নিন ১৯৬৭ সালে তৈরি আপার মনাস্ট্রি। শান্ত সমাহিত পরিবেশ আপনাকে মুগ্ধ করবে।
ফুন্টসোলিং থেকে ভাড়া গাড়িতে বা বাসে করে চলুন ১৭২ কিমি দূরে ভুটানের রাজধানী থিম্পুতে৷ থিম্পু ভুটানের রাজধানী৷ থিম্পুতে এসে মতিজং এর সংস্কৃতি দপ্তরের অফিস থেকে ভুটানের জং বা দুর্গ গুলি ও সেরা সেরা মনাস্ট্রিগুলি দেখার অনুমতি পত্র নিয়ে নেবেন।

থিম্পু 

পাহাড়ের ছিমছাম শহর থিম্পুতে দেখে নিন সিমতোখা জং,  চিড়িয়াখানা,  টিভি টাওয়ার ভিউ পয়েন্ট, নরজিন ল্যম,, থিম্পু গুম্ফা, হস্তশিল্পকেন্দ্র এবং সিমডেখাং-এর এক টিলার ওপরে  সিমতোখা  জং। জং-য়ের ফ্রেসকো চিত্রগুলি অসাধারণ।  এখানে লামাতন্ত্রের মহাবিদ্যালয় রয়েছে।  সিমতোখা  জংয়ে সূর্যাস্তের সময়    লামা ও দ্রাপাদের সুরেলা মন্ত্রোচ্চারণ ও গ্রন্থপাঠ এবং বিভিন্ন তিব্বতী  বাদ্যযন্ত্রের গম্ভীর শব্দ  শিহরণ জাগাবে।  থিম্পু শহরের কেন্দ্রস্থলে রয়েছে মেমোরিয়াল চোর্তেন। এই চোর্তেনটি হলো আধুনিক ভুটানের জনক রাজা জিগমে দোরজি ওয়াংচুর স্মৃতিমন্দির ৷ ওয়াংচু নদীর ধারে রয়েছে দেশের প্রধান জং তাশি-চো জং উল্টোদিকেই রয়েছে সার্ক বিল্ডিং৷
থিম্পু শহরে এরপর দেখুন  নতুন তৈরী হাওয়া  বৌদ্ধমন্দিরটি।  পৃথিবীর সর্ববৃহৎ বুদ্ধমূর্তিটি এখানে রয়েছে। নানা জায়গা থেকে ও অনেক দূর থেকে এই নয়নাভিরাম বুদ্ধমূর্তিটি দেখা যায়।

পুনাখা

থিম্পু থেকে চলুন পুনাখা৷ পথেই পড়বে  দোচুলা পাস৷ দোচুলা পাসের ওপরে রয়েছে  শতাধিক চোর্তেন ও বৌদ্ধমন্দির৷ রোদ ঝলমলে দিনে এই দোচুলা পাসের ওপর থেকে হিমালয়ের তুষারাচ্ছাদিত শৃঙ্গগুলি চমৎকার দেখা যায়। ঝলমলে রোদ থাকলে পরিষ্কার দেখা যায় শৃঙ্গগুলি৷ এই পাসের বৌদ্ধমন্দিরটি থেকে ভুটানের পাহাড়ি প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ এক অপূর্ব অভিজ্ঞতা।  ফো-চু আর মো-চু অর্থাৎ পুরুষ ও প্রকৃতি এই দুই নদীর সঙ্গমে অবস্থিত পুনাখা । নদী দিয়ে ঘেরা কাঠ ও পাথরের তৈরী সাত তলা পুনাখা জং । থিম্পু থেকে পুনাখার দূরত্ব প্রায় ৮৬ কিমি, যেতে সময় লাগে প্রায় তিন ঘণ্টা। পুনাখা জং। ভুটানের অন্যতম পবিত্র জং৷  এখানে অবশ্যই  দেখুন  মধ্যে নামগিয়াল চোর্তেন৷

 

 

ওয়াংদি-ফোড্রন

 

পুনাখা থেকেই দেখে নিন ২৩ কিমি দূরের ওয়াংদি-ফোদ্রন। ভুটানের সুইজারল্যান্ড নামে খ্যাত এই জায়গাটি। দেখুন ওয়াংদি-ফোদ্রন জংটি। কথিত আছে ওযাংদি নামে এক কিশোর বালি, মাটি , পাথর দিয়ে একটি খেলনার জং  তৈরী করে। কিন্তু হঠাৎই সে মারা যায়। সেই মডেলেই  গড়ে ওঠে এই ওয়াংদি-ফোদ্রন জংটি। এটি কিন্তু বেশ প্রাচীন জং৷ এখানকার ফ্রেসকো গুলিও দেখার মতো। এই জংটির মধ্যে একটা গা ছমছম করা ব্যাপার আছে। কাছেই আছে রাডাক নাকসাং মন্দির। এর মধ্যে রয়েছে তারাদেবী, শাক্যমুনি ও গুরু রিম্পোচের মূর্তি।

পারো

 

দ্বিতীয় পর্যায়ে থিম্পু থেকে চলুন সোনালীরঙা পারো উপত্যকায়৷ থিম্পু থেকে দূরত্ব ৫১ কিলোমিটার, সময় লাগে  ঘণ্টা দেড়েক।  যাবার পথেই পড়বে  পারো বিমানবন্দর৷ পারো উপত্যকাটি যেন   জলরঙে আঁকা  শিল্পীর কোনও ক্যানভাস। পাহাড়ের গায়েই রয়েছে সিটি ভিউ পয়েন্ট, এখান থেকে পারোর সান্ধ্যকালীন অবিস্মরনীয় রূপ উপভোগ করুন।   পাহাড়ে ঘেরা পারো  উপত্যকার প্রধান জং হলো রিনপুং জং৷রিন পুং জং৷ জংয়ের গঠনশৈলী অনবদ্য।  জংয়ের দেওয়ালের  চিত্রকলা ও ভিতরের বৌদ্ধমন্দিরটির সৌন্দর্যে মোহিত হবেন৷ রিংপুং জংয়ের  পিছন দিক থেকে  পাহাড়ি উপত্যকা ও নদীর দৃশ্য আপনাকে পাগল করে দেবে।
যদি ট্রেকিং করার ইচ্ছে ও শারীরিক ক্ষমতা থাকে। তাহলে  পারো থেকে সারাদিন ট্রেক করে দেখে নিন উঁচু এবং  খাড়া পাহাড়ের গায়ে আশ্চর্যজনক ভাবে অবস্থিত ও নির্মিত তাকসাং মনাস্ট্রি । যাকে বিশ্ব চেনে টাইগার নেস্ট নামে।    সাত কিলোমিটার তিন-চার ঘণ্টায় ট্রেক করে পারো থেকে টাইগার নেস্ট পৌঁছে যান। এই গুম্ফা থেকে উপত্যকার সৌন্দর্য আমৃত্যু মনে থাকবে।

চেলে-লা

পারো থেকে পাহাড় পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে ওঠা পথ ঘণ্টা দুয়েকে পেরিয়ে উঠে আসুন চেলে-লা (পাস)ভুটানের সবচেয়ে সুন্দর অথচ সবচেয়ে কম বিখ্যাত জায়গা। এটি প্রায় ৪৫০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত এবং এটি ভুটানের সর্বোচ্চ রোড-পাস। এর অবস্থান পারো উপত্যকা ও হা উপত্যকার ঠিক মাঝখানে। প্রচণ্ড ঠান্ডা, প্রচণ্ড হাওয়া। খাবার কিছুই পাবেন না।পুরু জ্যাকেট নিয়ে যাবেন। তবে পৌঁছতে পারলে নবকুমার হয়ে যাবেন,’যা দেখিলাম, জন্মজন্মান্তরেও ভুলিবনা’

ভুটানে থাকবেন কোথায়?

প্রচুর হোটেল ভুটানে। সব ট্যুরিস্ট স্পটেই। প্রথমেই বলে দিই,  ভুটান কিন্তু দার্জিলিং বা সিকিমের মতো সস্তা নয়। অত্যন্ত পরিস্কার পরিচ্ছন্ন দেশ ভুটানের বিভিন্ন হোটেল, রেস্তোরাঁ, দোকান, গাড়ি ঝাঁ চকচকে। কারণ বিদেশীরাই বেশি আসেন পর্যটক হিসেবে। তাই পরিচ্ছন্নতাও যেমন দামও তেমন।
থিম্পু, পারো,  ফুন্টসোলিং-সহ সব জায়গার হোটেল ভাড়া ভারতীয় টাকায় ১৫০০ – ২০০০ টাকা থেকে শুরু। ভুটানের সর্বত্র ভারতীয় টাকা চলে। হোটেল আগে থেকে বুক করে নেবেন অনলাইনে। সব হোটেলে এখন ফ্রি ওয়াইফাই আছে। পরিষেবা ভালোই। খাওয়া থাকা গাড়ী ভাড়া বাবদ দিনপ্রতি কম বেশী ২০০০ টাকায় ভুটান ঘুরে আসা যায়। ভুটানের টাকা হলো ন্যুলট্রাম। বর্তমানে ভুটানের ৫০০ ন্যুলট্রাম সমান আমাদের ভারতীয় টাকায় ৪৯৯ টাকা ২০ পয়সা।
সারাদিনের গাড়িভাড়া ৩০০০-৫০০০টাকা  (দিনপ্রতি) সিজন অনুযায়ী ওঠানামা করে।
এই গরমে তাহলে ঘুরেই আসুন ভুটান। ঘুরে এসে THE WALL-এর ফোটো গ্যালারিতে সেরা কয়েকটা ছবিও পাঠিয়ে দিন। আমরাও দেখি মানসচক্ষে আপনার ভুটান ভ্রমণ

Shares

Leave A Reply