কেন আত্মঘাতী হয় সুশান্ত সিং রাজপুতের মতো তরুণরা

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    ভারতের কোটি কোটি দারিদ্র ও হতাশাপীড়িত মানুষের কাছে বলিউডি ছবি মানে স্বপ্নের জগৎ। সুশান্ত সিং রাজপুত ছিলেন সেই জগতের একজন নায়ক। তাঁর বয়স বেশি হয়নি। মাত্র ৩৪। রূপবান ছিলেন। চোখেমুখে একপ্রকার সারল্য ছিল। দর্শককে মুগ্ধ করার জন্য ওই ছিল তাঁর ইউএসপি। ২০০৯ সালে তাঁর অভিনয় জগতে পা রাখা। প্রথমে টিভি সিরিয়ালে অভিনয়। বলিউডি ছবিতে ডেবিউ ২০১৩ সালে। অনেকগুলি হিট ছবি ছিল তাঁর ঝুলিতে। এম এস ধোনি, কেদারনাথ ইত্যাদি। রোজগারও নিশ্চয় মন্দ করতেন না। আপাতদৃষ্টিতে সবকিছু ঠিকই ছিল অভিনেতার জীবনে। তবু তাঁর মনের মধ্যে কোথাও ঘনিয়ে উঠেছিল অন্ধকার।

    পুলিশ বলছে, তিনি আত্মহত্যা করেছেন। অন্য কিছু সন্দেহ করার অবকাশ নেই। কিন্তু কেন আত্মঘাতী হতে যাবেন একজন সফল নায়ক? এই প্রশ্নের জবাব এখনও অন্ধকারে। নানারকম জল্পনা চলছে। কয়েকজন নায়িকার নাম উঠে আসছে। আত্মহত্যার কারণটা সম্ভবত অন্ধকারেই থেকে যাবে। কখনও নিশ্চিতভাবে জানা যাবে না।

    আপাতত একটা কথাই নিশ্চিতভাবে বলা যায়। দেশে কমবয়সীদের মধ্যে আত্মঘাতী হওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। সুশান্ত সিং রাজপুত জীবনের প্রতি বিশ্বাস হারিয়ে ফেলা সেই তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধি।

    এসম্পর্কে যা তথ্য হাতের কাছে আছে, তা চমকে ওঠার মতো। এই দেশে যত মানুষ বাস করে, তাদের প্রায় অর্ধেকের বয়স ২৬-এর আশপাশে। আজকের দুনিয়ায় সবচেয়ে বেশি সংখ্যক তরুণ-তরুণীর ঠিকানা সম্ভবত ভারত। কিন্তু এর পাশাপাশি আর একটি উদ্বেগজনক তথ্য হল, বিশ্বে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক তরুণ-তরুণী আত্মঘাতী হয় ভারতেই। প্রতি বছর প্রায় এক লক্ষ কমবয়সী নিজের হাতে জীবন শেষ করে দেয়।

    আত্মঘাতীদের এক বড় সংখ্যক ছাত্র। ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরোর দেওয়া তথ্য বলছে, ২০১৮ সালে আত্মহত্যা করেছিল ১০ হাজার ১৫৯ জন ছাত্রছাত্রী। ২০১৭ সালে সংখ্যাটা ছিল ৯৯০৫। ২০১৬ সালে ৯৪৭৮। প্রতি ঘণ্টায় দেশের কোথাও না কোথাও একজন ছাত্র আত্মহত্যা করে। গড়ে প্রতিদিন আত্মঘাতী হয় ২৮ জন ছাত্র। পরীক্ষায় খারাপ রেজাল্ট হলে অনেক ছেলেমেয়ে আত্মহত্যা করে। অনেকে আবার রেজাল্ট খারাপ হতে পারে ভেবে চরম পথ বেছে নেয়।

    আত্মহননের কারণ হয়ে উঠতে পারে আরও অনেক কিছু। দারিদ্র, অফিসের পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে না পারা কিংবা প্রেমে ব্যর্থতা। কেউ সুশান্ত সিং রাজপুতের মতো গলায় দড়ি দেয়, কেউ বিষ খায়, কেউ নিজের মাথা লক্ষ্য করে গুলি চালায়, জলে ঝাঁপ দেয় অথবা নিজেকে ছুড়ে ফেলে চলন্ত ট্রেনের সামনে। অনেকের ক্ষেত্রেই আত্মঘাতী হওয়ার প্রকৃত কারণ জানা যায় না।

    একটা জরুরি কথা হল, দ্রুত নগরায়ন এবং শিল্পায়নের সঙ্গে সঙ্গে মনের ওপরে চাপ বাড়বেই। জীবনের দৌড়ে পিছিয়ে পড়ার, হেরে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেবে। তা থেকেই মনের ওপরে চাপ। আগেকার দিনে কৃষিভিত্তিক জীবনযাত্রায় অনেক শান্তি ছিল। কিন্তু চাইলেই তো সেই জীবনে ফিরে যাওয়া যাবে না। তাহলে উপায়?

    উপায় আছে মনোবিদের কাছে। তিনি জানেন, অবুঝ মনকে কীভাবে বশে আনতে হয়। আত্মহত্যাপ্রবণ মানুষকে কীভাবে বিশ্বাস করানো যায়, গাঢ় অন্ধকারেও একটা রূপোলি রেখা থাকে।

    আগে মনের রোগকে রোগ বলেই ধরত না লোকে। রোগ হয় শরীরে। জ্বর, সর্দিকাশি কিংবা পেটখারাপ। মনে আবার রোগ হয় নাকি? এই ছিল সাধারণ মানুষের মনোভাব। মনের রোগকে অনেকসময় পাগলামির সঙ্গে সমার্থক বলে ধরা হত।

    বাস্তবে, শরীরের যেমন রোগ হয়, মনেরও হয়। সকলেরই জীবনে নানা ওঠাপড়া আছে। মনকে প্রায়ই নানা প্রতিকূল অবস্থার মোকাবিলা করতে হয়। মাঝে মাঝে মন খারাপ হওয়া বিচিত্র নয়। মন খারাপটা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে না থাকলেই একরকম রোগ দাঁড়িয়ে যায়। অন্যান্য রোগে যেমন ডাক্তারের কাছে যেতে হয়, এক্ষেত্রেও তাই।

    বর্তমানে উচ্চবিত্ত ও উচ্চ মধ্যবিত্ত সমাজে এই নিয়ে জানাশোনা বেড়েছে। কিন্তু মনের রোগ যে পরিমাণে বেড়েছে, সেই তুলনায় সচেতনতার হার খুব কম। বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক প্রচার হওয়া দরকার। সরকার এ ব্যাপারে বড় ভূমিকা নিতে পারে।

    সুশান্ত সিং রাজপুত যদি সময়মতো মনোবিদের শরণাপন্ন হতেন, তাহলে হয়তো আত্মঘাতী হতেন না। আর কোনও সম্ভাবনাময় তরুণ যাতে এভাবে হারিয়ে না যায়, সেজন্য আমাদের সতর্ক হওয়া উচিত।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More