বুধবার, নভেম্বর ১৩

ব্লগ: দিল্লির চিঠি/ উল্টোপাল্টা কথা -২

শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

স্পেনের কবি আন্তোনিও কোলিনাস-এর সঙ্গে আড্ডা। সেই কবে ২০০৭ সালে আলাপ হয়েছিল মাদ্রিদে। মাঝের বছরগুলো ইমেইল, দেখা হওয়া স্পেন গেলে — এইসব ছাড়িয়ে ২০১৪ সালে ওঁর দিল্লি আসা আমার জন্য বিরাট পাওয়া। মাঝের বছরগুলোতে “আমার খেলা যখন ছিল তোমার সনে”। আবিষ্কার করে নেওয়া আন্তোনিও কোলিনাসকে। মার্চ মাস। প্রকৃত বাসন্তী ভূবন। আমি আর আন্তোনিও লোদি বাগানে। আমার আড্ডার প্রধান বিষয় কবিতার ইতিহাস চর্চা। আর সেই সূত্রেই ঢুকে পড়ছিল কবিতার স্থাপত্যে তার বিষয় ও বিষয়হীনতা। বিষয় ছুঁয়ে যাওয়া বা একেবারেই মুক্ত কবিতা। আর সেই সূত্রেই উঠে আসে নতুন ও পুরনো দুনিয়ার লেখা। অর্থাৎ আমেরিকা মহাদেশ ও বাকি দেশের কাব্যনির্মাণ। আন্তোনিও মার্কিন দেশের ল্যাঙ্গুয়েজ পোয়েটদের বন্ধু হলেও তাঁর নিজের কবিতা বেশ ইউরোপীয়। এখানেই জমে উঠছিল কথা, আমাদের কবিতা কি মার্কিন দেশের মত হতে পারে? আন্তোনিও বলছিলেন স্প্যানিশভাষী আমেরিকার কথা। কীভাবে সেখানে কবিতা নতুন দুনিয়ার হলেও পুরনো দুনিয়াকে আত্মায় নিয়েছে। কিন্তু মার্কিন দেশে কবিতা একেবারেই অন্যরকম। হয়তবা কানাডাতেও। আমি বলছিলাম জনগ্রাহ্যতার কথা। আসলে পুরনো দুনিয়ায় কবি এখনও একজন জনগ্রাহ্য মানুষ। হয়ত সেই কারণেই ভাষাগত ঝুঁকি নেবার চেষ্টা কম। উল্টোদিকে মার্কিন দেশে কবিতা পড়েন শুধু সাহিত্যের ছাত্র বা ক্রিয়েটিভ রাইটিং-এর ছাত্রছাত্রীরা। আন্তোনিও বলেন হয়ত সেই কারণেই ওইসব দেশে ওরা ভাষাকে নিয়ে অন্যস্তরে পৌঁছতে পেরেছে। যদিও অনুকারী কবি বা দলবদ্ধ স্কুল নির্ভর কবিতাচর্চা ওদের ক্ষতিও করেছে। কিন্তু এটা ঘটনা যে ওঁদের কবিতা ইউরোপের কবিতা ধারণাকে ধাক্কা মেরেছে। আমি বললাম উদাহরণ নোবেল পুরস্কার! আন্তোনিও হাসলেন। আমি আরও বললাম সাহিত্যে নোবেল ও ইউরোপীয় ভাষায় লেখার জন্য। ২০১৮ পর্যন্ত মোট ৬ জন লেখক অ-ইউরোপীয় ভাষায় লিখে নোবেল পেয়েছেন। কিন্তু কোনও মার্কিন কবি কোনওদিন নোবেল পুরস্কার পাননি। অথচ গদ্যকাররা পেয়েছেন। এবার আন্তোনিও উচ্চৈঃস্বরে হাসলে। তারপর গম্ভীর হয়ে বললেন সাদাদের প্রভুত্ব সহজে যাবার নয়। পরে বব ডিলান নোবেল পাবার পর ইমেইল এ লিখলেন “দেখলে তো ইউরোপীয় আকাদেমিয়া কবিতা বলতে কী বোঝে!”

সেদিনের সেই লোদি বাগানের আড্ডা সাহিত্য-রাজনীতির বাইরে বেরিয়ে গেলেও আন্তোনিওর একটা প্রশ্ন আমাকে ভাবিয়ে চলেছে এখনও। ভারতবর্ষে কবিতা কী হচ্ছে এখন। যদিও তিনি এদেশের ভাষা-বৈচিত্র্য সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। (আমাদের কানে অবিশ্বাস্য ঠেকলেও বাস্তবে খুব কম সাদা-মানুষ ভারতীয় ভাষাদের অস্তিত্ব সম্পর্কে জানেন, যেমনটাবা আমরা জানিনা ইউরোপীয় ভাষার বাইরে)। আমি সেদিন অনেক ভেবে বলেছিলাম, ভারতবর্ষের অনেক ভাষাতেই কবিতা এখনও সামাজিক ইস্যুভিত্তিক। যদিও তার পাঠক নেই, আছে শ্রোতা। সমস্ত দেশের মতই সামাজিক সেই বিষয়টি গুরুত্ব হারালে কবিতাটিও মুছে যায়। কিন্তু বাংলাভাষার ক্ষেত্রটা একটু আলাদা। আমি খানিকটা বোঝালাম।

আর সেই বোঝানো থেকেই আমার নিজের কাছে কিছু প্রশ্ন পাক খেতে লাগল। আমাদের ভাষারও তো একটা নতুন ভূখণ্ড হয়েছে। বাংলাদেশ।  সেখানে তৈরি হচ্ছে কবিতার নতুন ভাষা। সেখানে মুছে যাচ্ছে আমাদের পুরনো দুনিয়ার মানদণ্ডগুলো। এবং অনেক সময়ই আমরা পশ্চিমবঙ্গে সেই ভাষাকে মেনে নিচ্ছি না। যেভাবে হয়তো বা ইউরোপীয় আকাদেমিয়া মেনে নেয় না আমেরিকাকে।

এইসব এলোমেলো প্রশ্ন, উল্টোপাল্টা কথা আমাকে ঘিরে ফেলে।

(শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, জন্ম ১৯৭৮, কলকাতা। প্রকাশিত কবিতার বই ৪টি। বৌদ্ধলেখমালা ও অন্যান্য শ্রমণ কাব্যগ্রন্থের জন্য সাহিত্য আকাদেমির যুব পুরস্কার, পেয়েছেন মল্লিকা সেনগুপ্ত পুরস্কারও। স্পেনে পেয়েছেন আন্তোনিও মাচাদো কবিতাবৃত্তি, পোয়েতাস দে ওত্রোস মুন্দোস সম্মাননা। স্পেনে দুটি কবিতার বই প্রকাশ পেয়েছে। ডাক পেয়েছেন মেদেইয়িন আন্তর্জাতিক কবিতা উৎসব ও এক্সপোয়েসিয়া, জয়পুর লিটেরারি মিট সহ বেশ কিছু আন্তর্জাতিক সাহিত্য উৎসবে।)

Leave A Reply