বৃহস্পতিবার, এপ্রিল ২৫

তারা কোন পথে যে চলে! প্রাণ হাতে নিয়ে রোজ স্কুলে যায় যারা…

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

পড়াশোনার জন্য দূরদূরান্তে চলে যেতে হয় অনেককেই। অনেকের আবার দূরে গিয়ে ফেরা হয় না। কখনও আবার এমনও শোনা যায়, এই পড়াশোনার জন্যই দুর্গম থেকে দুর্গমতর এলাকায় পাড়ি দিয়েছেন কেউ। কিন্তু জানেন কি, পড়াশোনার জন্য রোজই চরম দুর্গম পথ পেরিয়ে স্কুলে যেতে হয় অসংখ্য শিশুকে! কখনও দীর্ঘ বন্ধুর পথ পেরিয়ে, কখনও বা দুস্তর পাহাড়, নদী, বন পেরিয়ে চলে তাদের স্কুলশিক্ষা।

ইউনেস্কোর একটি রিপোর্ট বলছে, বিশ্বের প্রায় ছ’কোটি শিশু কোনও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যায় না। কারণ, সেখানে যাওয়ার জন্য তাদের প্রাণের ঝুঁকি নিতে হয়। এ ছাড়া প্রত্যন্ত এলাকায় যাতায়াত ব্যবস্থার অভাবে, রাস্তার দুর্গমতার জন্য অনেকেই পড়াশোনা মাঝপথেই ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। নির্দিষ্ট সময়ের আগেই শিক্ষার আলো নিভে যায় তাদের জীবনে।

কিন্তু এ সব প্রতিকূলতা পেরিয়ে, বাধা অগ্রাহ্য করে, কার্যত জীবনের ঝুঁকি নিয়েও অনেক শিশু স্কুলে যায়। কোনও নিরাপত্তা ছাড়াই রোজ পেরোয় ভয়ঙ্কর, দুর্গম পথ। এমনই কিছু স্কুলের পথ রয়েছে সারা বিশ্ব জুড়েই।

চেরাপুঞ্জি, ভারত

পৃথিবীর বিপজ্জনক সেতুর তালিকায় অন্যতম হল, মেঘালয়ের চেরাপুঞ্জিতে অবস্থিত গাছের শিকড় দিয়ে তৈরি ঝুলন্ত সেতু। এবং এটি তৈরি হয়েছে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক ভাবে। স্থানীয় বাসিন্দারা গাছের শিকড়কে এমন ভাবে বাড়তে দিয়েছেন, যা নির্দিষ্ট দিকে বেঁকে ব্রিজের মতো তৈরি করে ফেলে। এক একটা ব্রিজ লম্বায় প্রায় ৩০ মাইলও হয়। এই ব্রিজগুলো জীবন্ত সেতু নামে পরিচিত। কিছু কিছু সেতু প্রায় ১০০ বছরেরও পুরনো। এত দুর্গম ব্রিজের মাধ্যমে নতুন ব্রিজ তৈরির উপকরণও সেখানে পাঠানো সম্ভব হয় না। তাই শিকড়ের তৈরি এই ব্রিজই পার হয়ে প্রতিদিন ছোট ছেলেমেয়েদের স্কুলে যেতে হয়। সাধারণ অবস্থাতেই এই শিকড়ের উপর দিয়ে হাঁটা বেশ ঝুঁকির। এ ছাড়া মেঘালয় বিশ্বের অন্যতম বৃষ্টিপাতের এলাকা হিসেবেও পরিচিত। ফলে সেতুগুলো প্রায়ই পিছল থাকে, যা পার করা বাচ্চাদের জন্য আরও বেশি বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। যদিও কিছু পর্যটক এই ব্রিজ দেখতেই চেরাপুঞ্জি যান। কিন্তু দুয়েকটি বিশেষ সেতুর উপরে পর্যটকদের এক দিনের জন্য যাওয়া হয়তো বিনোদনের, কিন্তু সারা বছরই এরকম সেতু দিয়ে পারাপার করা বাচ্চাদের জন্য মোটেই সহজ নয়।

জ়াঁসকার, ভারত

হিমালয়ের কোলে বয়ে চলেছে বিশাল জ়াঁসকার নদী। সে নদীর পাড়েই গ্রাম তাদের। শীতকালে নদী আর নদী থাকে না, জমে হয়ে যায় বরফের মরুভূমি। শুধু নদী কেন, গোটা লাদাখই মুড়ে যায় বরফে। বন্ধ থাকে স্কুল। আর শীতের শেষে স্কুল খুললে সে বরফজমা নদী পেরিয়েই গ্রামের বাচ্চাদের যেতে হয় স্কুলে। দীর্ঘ কয়েক দিনের পথ পেরিয়ে লাদাখের শহর লে-তে পৌঁছয় তারা। ফের শুরু হয় বোর্ডিং জীবন। তাপমাত্রা শূন্যের চেয়ে চল্লিশ ডিগ্রি নীচে। সেই অবস্থাতেই বরফ ভেঙে ভেঙে তিন তিনটে উপত্যকা পেরোয় তারা স্কুলে যাওয়ার জন্য। পথ নেই। নেই কোনও আশ্রয়ও। বরফের গুহা খুঁজে অথবা তাঁবু টাঙিয়ে রাত্রিবাস করতে হয় জমে যাওয়া জ়াঁসকার নদীর ওপরেই। ভয় আছে ধস নামার, ভয় আছে বরফ ভেঙে নদীতে তলিয়ে যাওয়ার। নিরাপত্তা বলতে কিছুই নেই। তবু চলছে স্কুলযাত্রা।

লেবাক, ইন্দোনেশিয়া

ইন্দোনেশিয়ার লেবাক এলাকার বাসিন্দারা সাইবেরাং নদীর গতিপথের কারণে মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন। তাই সেখানকার স্কুলপড়ুয়া ছোট ছেলেমেয়েরা স্কুলে যাওয়ার জন্য রোজই অতিক্রম করে সংকীর্ণ, অমজবুত, ঝুলন্ত এক কাঠের সেতু। নদীর উপরে অবস্থিত ব্যবহারের অনুপযোগী এই সেতুটিই তাদের স্কুলে যাওয়ার একমাত্র পথ। অন্য পথও আছে। কিন্তু সে পথে তাদের অনেকটা দূরত্ব পায়ে হেঁটে অতিক্রম করতে হয় বলে, জীবনের ঝুঁকি নিয়েই কোনও রকমে ঝুলে ঝুলে ওই সেতু পার হয়ে তারা স্কুলে যায়। নদীর প্রবল গতি এবং সেতুর দৈর্ঘ্যের কারণে সেটা সারানোও সহজ হয় না প্রশাসনের পক্ষে।

রিও নেগরো, কলম্বিয়া

যেন কোনও সিনেমার দৃশ্য! আকাশপথে ঝুলন্ত দড়ির সাহায্যে নদীর এক পাশ অন্য পাশে পৌঁছচ্ছে ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েরা! এ যেন রীতিমতো অ্যাডভেঞ্চার! কলম্বিয়ায় রাজধানী বোগোটা থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার ভেতরে অবস্থিত একটি অরণ্য এলাকায় বসবাসকারী কয়েকটি পরিবারের বাচ্চারা এভাবেই স্কুলে যায় রোজ! রিও নেগরো নদীর দু’প্রান্ত যুক্ত করা হয়েছে একটি স্টিলের কেবল দিয়ে। প্রবহমান নদীর প্রায় ৪০০ মিটার উঁচুতে ঝুলন্ত এই কেবলটি প্রায় ৮০০ মিটার লম্বা। তাতেই ঝুলে ঝুলে নদী পেরোয় বাচ্চারা। সম্প্রতি ক্রিস্টোফার নামের এক ফোটোগ্রাফারের তোলা একটি ছবিতে ধরা পড়ে ওই কেবল দিয়ে একটি বাচ্চার স্কুলে যাওয়ার দৃশ্য। ছবিটিতে দেখা যায়, একটি ৬-৭ বছরের মেয়ে পুলির সাহায্যে এগিয়ে যাচ্ছে কেবল বেয়ে। তার এক হাতে রয়েছে গাছের ডাল দিয়ে তৈরি একটা খাঁজ, যা দিয়ে গতিবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে সে। কারণ ওই কেবলে এক দিক থেকে অন্য দিকে যাওয়ার সময়ে গতিবেগ হয় ঘণ্টায় প্রায় ৫০ কিলোমিটার, যাতে বড়রাও ভয় পেয়ে যাবেন! তবে এখানেই শেষ নয়। ওই ছবিতে মেয়েটির অন্য হাতে একটি বস্তা ছিল। যার ভেতরে ছিল তার ছোট ভাই।

ঝাং জিওয়ান, দক্ষিণ চীন

সরু বাঁশের মই বেয়ে প্রায় হাজার মিটার উঁচু একটি পাহাড় তাদের পেরোতে হয় রোজ স্কুলে পৌঁছাতে। অন্য ঘুরপথ ধরলে হাঁটতে হয় ঘণ্টা চারেক। তাই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মই বেয়ে ওঠাটাই তাদের কাছে সহজ মনে হয়, যদিও এই ক্লাইম্বিংয়ে নিরাপত্তার কোনও ব্যবস্থাই নেই তাদের জন্য। দক্ষিণ চীনের ঝাং জিওয়ানে এ ভাবেই প্রতিদিন স্কুলে যায় সেখানকার বাচ্চারা। মা-বাবারা বাচ্চাদের যাওয়া-আসা নিয়ে চিন্তিত থাকেন সব সময়ে। একটু এদিক ওদিক হলেই পা পিছলে একদম খাদে পড়ার আশঙ্কা তাদের সন্তানদের! তার পরেও, নিরাপত্তাহীন ভাবে ভয়ঙ্কর পথে পাহাড় চড়েই চলছে তাদের পড়াশোনা।

পিলি, চীন

এ পথ এমনই, যা রোজ যাতায়াত করা অসম্ভব। তাই চিনের পিলি এলাকায় গ্রামের সব বাচ্চাই থাকে বোর্ডিংয়ে। আর গ্রাম থেকে সেই বোর্ডিংয়ে যেতে বাচ্চাদের পাড়ি দিতে হয় ১২৫ মাইল দীর্ঘ ভয়ঙ্কর পথ! অধিকাংশই উঁচু পাহাড়ে বরফ কেটে বানানো সরু সরু পথ। কিছু পথে রয়েছে বরফশীতল নদী, কোথাও বা ভাঙা কাঠের ব্রিজ। পাহাড়ঘেরা পথ অতিক্রম করার সময়ে ওই পথেই ঝুলছে ৬৫০ ফুট উঁচু সেতু। বিপদসঙ্কুল এ পথে নেই কোনও রকম নিরাপত্তা। এত দীর্ঘ পথ অতিক্রমে তাদের সময় লেগে যায় দু’দিন করে। পথেই বসে ব্যাগ থেকে বার করে খাবার খায় তারা, দল বেঁধে রাত কাটায় পথেই। সেই পথেই জীবন বাজি রেখে এগিয়ে চলে গ্রামের ৬ থেকে ১৫ বছর বয়সি ৮০টি বাচ্চা।

ম্যানিলা, ফিলিপাইন

বাড়ি থেকে স্কুলে যাওয়ার একমাত্র পথের মাঝে পড়ে একটি নদী। কিন্তু সেই নদী পার করার জন্য নেই ব্রিজ বা নৌকা। তাই ফিলিপাইনের ম্যানিলায় স্কুলে যাওয়ার জন্য নদী পেরোনোর উপায় হিসেবে টায়ারকে বেছে নিয়েছে বাচ্চারা। প্রচন্ড বর্ষায় সেই নদীপথ তুমুল রূপ ধারণ করে। কখও বা বন্ধও হয়ে যায়। জল থেকে বই-খাতা বাঁচাতে পলিথিনে মুড়ে নেয় বাচ্চারা। যে কোনও সময়েই দুর্ঘটনা ঘটে যায়। তাই এতটা কঠিন পরিস্থিতির মুখে গ্রামাঞ্চলের বেশির ভাগ ছেলেমেয়েকেই মাঝপথেই ছেড়ে দিতে হয় স্কুল। ইউনিসেফের রেকর্ড অনুযায়ী, ফিলিপাইনে মাত্র ৬২ শতাংশ পড়ুয়া স্কুলজীবন পুরোপুরি শেষ করতে পারে।

মিনহ হোয়া, ভিয়েতনাম

প্রায় ১৫ মিটার চওড়া ও ২০ মিটার গভীর নদী সাঁতার কেটে পার করতে হয় রোজ। না, এটা কিন্তু কোনও সাঁতার শেখার স্কুলের ঘটনা নয়। ভিয়েতনামে মিনহ হোয়া নামের একটি গ্রামের বাচ্চাদের এটা রোজকার কাজ স্কুলে যাওয়ার জন্য। এ ভাবেই নদী পেরিয়েই তাদের যেতে হয় স্কুলে। আর এটা যেন খুব সাধারণ ব্যাপার তাদের কাছে! স্কুলের ব্যাগে বইয়ের সঙ্গে ইউনিফর্মও পলিথিনে মুড়ে নেয় তারা। তার পরে সাঁতরে পার হয় বিশাল নদী। পাড়ে উঠে ভেজা জামা পাল্টে ব্যাগের শুকনো ইউনিফর্ম পরে তারা স্কুলে যায়। পলিথিনে মোড়া ব্যাগগুলোর ভেতরেই থাকে হাওয়া ভরা কিছু বল। ফলে সেই ব্যাগই তাদের ভাসিয়ে রাখে।

কিলাংক্যাপ, ইন্দোনেশিয়া

গ্রাম থেকে বাইরে যাতায়াতের একমাত্র পথ চিহেরাং নদীর উপরে ব্রিজটি ভেঙে গিয়েছে। তার পর থেকে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে একটি বাঁশের পাটাতনের সাহায্যেই নদী পার হয় ইন্দোনেশিয়ার কিলাংক্যাপ গ্রামের বাচ্চারা। এ ভাবেই রোজ স্কুলে যাওয়ার জন্য ঝুঁকি নিতে হয় তাদের। ২০১৩ সালে ব্রিজটি ভেঙে গেলে সরকারের উদাসীনতায় মেরামত হয়নি সেটি। তাই তার পর থেকে বাঁশের এই টালমাটাল ভেলাই তাদের যানবাহন।

তাদের পড়াশোনার জেদের কাছে হার মেনেছে হাজার প্রতিকূলতা, ফিকে হয়ে গেছে নিরাপত্তার প্রশ্ন। ভয়ঙ্কর এই সব রাস্তাই তাদের নিয়ে যায় শিক্ষার আলোয় উজ্জ্বল গন্তব্যে। তাই তাদের কাছে এটাই স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। সব সময় দুর্ঘটনার আতঙ্ক, জীবন বিপর্যয়ের আশঙ্কা নিয়েই তারা রোজ পাড়ি দেয় স্কুলের পথ।

খুদে সাহসিরা যেন মনে করিয়ে দেয়, বিশ্বের কোনও কোনও প্রান্তে পড়াশোনা সত্যিই এক কঠিন সাধনার বিষয়।

Shares

Comments are closed.