মঙ্গলবার, নভেম্বর ১২

বাড়ির সঙ্গে স্বপ্নেও ফাটল! বৌবাজারে শ্রুতির সংশয়ের সঙ্গে মিশে গেছে এক রত্তির কান্না

দ্য ওয়াল ব্যুরো: পাতাল রেল হচ্ছে। ঘরের কাছে পাতাল রেল জীবনটাই বদলে দেবে এক দিন। আর পাঁচ জনের সঙ্গে এমন স্বপ্ন দেখেছিল শ্রুতিও। তবে পাতাল রেল প্রাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে অন্য এক আকাশ ছোঁয়া স্বপ্নও আছে সাধারণ মেয়ে শ্রুতির।

শ্রুতি চৌরাসিয়া। বৌবাজারের বাড়ি ছেড়ে এখন ধর্মতলার হোটেলের বাসিন্দা। তাদের বাড়িতে ফাটল দেখা দিয়েছে। যে কোনও দিন ভেঙে পড়তে পারে। একই সঙ্গে ফাটল ধরেছে সদ্য-তরুণী শ্রুতির স্বপ্নেও। কিন্তু সেই স্বপ্নকে চৌচির হতে দিতে চায় না শ্রুতি। তাই তো এ দিন সকাল থেকেই হা-পিত্যেশ করে, ছেড়ে আসা ঘরের সামনে ইতিউতি ঘুরে বেড়াচ্ছে। চাকরির পরীক্ষাটা যে দিতেই হবে। নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের ছবিটা বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেখেছে যে! কিন্তু হবে কি? ঘরে আটকে থাকা বই-খাতা আর পাওয়া যাবে কি? মুঠো মুঠো অনিশ্চয়তা নিয়ে অপেক্ষা ভাঙাচোরা দুর্গা পিথুরি লেনের সামনে।

এমন অনেক শ্রুতিরই দেখা মিলবে, ক’দিন আগেও প্রাণ চঞ্চলতায় ভরপুর থাকা ওই পাড়াটায়। নিম্ন-মধ্যবিত্ত ঘরের শ্রুতির চোখে অবশ্য জল নেই। কেবল একরাশ আতঙ্ক ছড়িয়ে আছে সারাটা মুখে। খাতা-বই না বার করতে না পারলে কী হবে? আবার কেনার তো ক্ষমতা নেই। তবে কি আর ইউপিএসসি পরীক্ষায় বসা হবে না? চাকরিটা যে বড্ড দরকার।

বোন, মা, ভাইয়ের সঙ্গে শ্রুতি।

শুধুই কি নিজের কথা ভাবছে শ্রুতি! তা তো নয়। ভাই হর্ষ, বোন পায়েল এখন ক্লাস টেনে পড়ে। সামনেই জীবনের প্রথম বড় পরীক্ষা। ওদের কী হবে? সেই চিন্তাটাও যে ঘিরে রেখেছে। চিন্তা করে যে কিছু হবে না সেটা বুঝতে পারছে বুদ্ধিদীপ্ত তরুণী। কিন্তু কিছুতেই মানতে পারছে না মন। সেখানে শুধুই সংশয়।

আর চাঁদনি চকের এমব্যাসি হোটেলের তিন নম্বর ঘরের ওই পুঁচকে মেয়েটার তো সেটা বোঝার মতোও বয়স হয়নি। কেন চেনা বাড়ি ছেড়ে এমন হঠাৎ করে অচেনা হোটেল চলে আসতে হল, সেটাই বুঝতে পারেনি এক রত্তি মুন্নি। ভাত খেতেও ভালো লাগছে না ঠাম্মার হাতে। স্কুলে যাওয়ার বায়নায় সারাটা দিন ঘ্যান ঘ্যান করে চলেছে।

নাতনির কথা বলছিলেন ইন্দ্রজিৎ সেন। সারা দিন অপেক্ষা করেছেন ফেলে আসা বাড়ির বাইরে। টুকিটাকি জরুরি কাগজপত্র নিয়ে বেরোতে পেরেছিলেন রবিবার। কিন্তু ওইটুকুই। টেবিলে সাজানো পড়ে থেকেছে খাবার। মা, স্ত্রাী, ছেলে, বৌমা, নাতনি– সকলকে নিয়ে বেরিয়ে আসতে হয়েছে দশ মিনিটের নোটিসে। তার পর থেকে সঙ্গী শুধু অনিশ্চয়তা আর দুশ্চিন্তা।

বিপন্ন বৌবাজরের ছবি যেন টুকরো, টুকরো দুঃস্বপ্নের কোলাজ। সর্বত্র অনিশ্চয়তা আর মন খারাপের মিছিল। বয়স্ক ইন্দ্রজিতবাবু থেকে সদ্য তরুণী শ্রুতি কিংবা এক রত্তি মুন্নির কান্নাই যেন টিপ টিপ বৃষ্টিতে দিনভর ভেজাল বিধ্বস্ত বৌবাজারকে।

  •  
  •   
  •   
  •   
  •   
  •   

Comments are closed.