‘বাঘমানুষের উপাখ্যান’, যে মর্মস্পর্শী লোকগাথা আজও বলে চলেছে নাগাপাহাড়ের সুমি উপজাতি

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    রূপাঞ্জন গোস্বামী

    ভারতের অন্যতম সুন্দর রাজ্য নাগাল্যান্ড। ঘন সবুজে মোড়া পাহাড়গুলির বাঁকে বাঁকে দলবেঁধে ঘুরে বেড়ায় দুধ সাদা মেঘের দল। পাহাড়গুলির বুকের গভীরে লুকিয়ে থাকা রঙচঙে ছবির মতো গ্রামগুলির মানুষরা প্রকৃতির মতোই সরল ও খেয়ালি। সময়কে তারা বেঁধে রেখে দিয়েছে সুপ্রাচীন লোকসংস্কৃতির অনির্বাণ মশাল জ্বালিয়ে।

    রূপসী নাগাল্যান্ডের জুনহেবোতো জেলায় বাস করে সুমি বা সেমে উপজাতি। বিংশ শতাব্দীতে খ্রিস্টান হওয়ার আগে এরা ছিল প্রকৃতির পূজারী। খ্রিস্টান হয়ে সুমি নাগারা স্বাদ পেয়েছিল আধুনিকতার। বেরিয়ে এসেছিল বিভিন্ন কুসংস্কার ও নরমুণ্ডশিকারী’র অপবাদ থেকে।

    উৎসবের সময় নৃত্যরত সুমি উপজাতি

    সুমি নাগারা আজও বিশ্বাস করেন, তাঁদের পূর্বপুরুষদের মধ্যে কেউ কেউ অলৌকিক ক্ষমতা নিয়ে জন্মাতেন। সেই অলৌকিক ক্ষমতা পরিবারের একজনের থেকে অন্যজনের শরীরে প্রবেশ করত। কেউ যদি অলৌকিক ক্ষমতার প্রভাব থেকে নিজেকে মুক্ত করতে চাইতেন, তাঁকে একটি বিশেষ ডিম কাঁচা খেতে হতো। সেই ডিম, যেটি সময় পেরিয়ে গেলেও ফুটত না।

    আচার ব্যবহার বেশভূষায় আধুনিক হলেও সুমি নাগারা তাঁদের কিছু চিরাচরিত বিশ্বাস ও লোকগাথাকে দূরে সরিয়ে দেননি। আজও কিছু মর্মস্পর্শী লোকগাথা ঘুরে ফেরে পাহাড় থেকে পাহাড়ে। প্রবীণরা এই লোকগাথাগুলি শুনিয়ে যান নবীন প্রজন্মকে। অবাক হয়ে শোনে নবীন প্রজন্ম। ফিরে যায় সেই দিনগুলিতে।

    সেরকমই একটি  লোকগাথা টাইগার-ম্যান’ বা ‘বাঘমানুষ’। এটি এমন একটি লোকগাথা, যেটি বংশপরম্পরায় বলে চলেছে সুমি উপজাতি। বয়স্ক লোকেরা এই লোকগাথাটি বলেননি এবং সুমি শিশুরা শোনেনি এটা কল্পনাই করা যায় না। সুমি উপজাতির বয়স্ক কোনও মানুষ লোকগাথাটি বলার আগে শিশুদের বাধ্যতামূলকভাবে বলবেন, “এটা কোনও কল্পিত কাহিনি নয় একেবারেই সত্যকাহিনি।”

     হুটোভি আয়ামি

    কয়েকশো বছর আগের কথা। জুনহেবোতো জেলার এক পাহাড়ের আড়ালে লুকিয়ে থাকা ছোট্ট একটি সুমি গ্রামে এক বন্ধুর সঙ্গে বাস করতেন এক ব্যক্তি। নাম তাঁর হুটোভি আয়ামি। খুবই সাধারণ মানুষ, কিন্তু তাঁর সাধারণ চেহারার আড়ালে ছিল  একটি বীভৎস সত্ত্বা।

    হুটোভি যখন ঘুমোতেন তাঁর আত্মা একটি বাঘের রুপ ধরত। বাঘের রুপ ধরে দূর দূর পাহাড়ে ঘুরে বেড়াত। এমন সব জায়গায়, যেখানে পৌঁছানোর কথা হুটোভি কল্পনাই করতে পারতেন না। হুটোভির ঘুম ভাঙার আগেই হুটোভির শরীরে ঢুকে পড়ত বাঘরূপী আত্মা।

    খিদে পেলে বাঘরূপী হুটোভি পাহাড়ে ছড়িয়ে থাকা বিভিন্ন গ্রামে ঢুকে গরু ছাগল শিকার করত রাতের অন্ধকারে। ভোরের আগে বাঘরূপী আত্মাটি ফিরে আসত মানুষরূপী হুটোভির শরীরে।  হুটোভির ঘুম ভাঙলে তিনি ও তাঁর বন্ধু দেখতেন হুটোভি মুখে ও শরীরে পশুর রক্ত ও লোম লেগে রয়েছে।

    হুটোভির বন্ধু জানতেন সব। কিন্তু কীভাবে হুটোভি আত্মার দুটি রূপ পেয়েছিল, সেই কাহিনি হুটোভি তাঁকে বলেননি। হয়তো হুটোভি নিজেই জানতেন না।

    বাঘটি অনেক সময় এত দূরে চলে যেত যে ফিরতে দেরি হতো। ঘুম থেকে উঠে হুটোভি তাঁর দৈনন্দিন কাজ কর্ম শুরু করলেও হুটোভির বাঘরূপটি তখনও বনেবাদাড়ে ঘুরে বেড়াত। তখন হুটোভিকে মানুষ নয় পাথরের পুতুলের মতো নিষ্প্রাণ লাগত। হুটোভিকে সেই সময় আগলে রাখতেন বন্ধুটি।

    বাঘটির জন্য প্রচুর ক্ষতি হচ্ছিল গ্রামগুলির। গ্রামবাসীরা দেখতেন রাতের আঁধারে বিদ্যুতের গতি নিয়ে এক বাঘ গ্রামে ঢোকে এবং বিদ্যুতের গতিতে গরু ছাগল মুখে তুলে নিয়ে পালায়। বাঘের অত্যাচারে নাগা পাহাড়ের গ্রামগুলিতে গরু ছাগল শেষ হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিল। বিভিন্ন গ্রামের মানুষরা জোটবদ্ধ হলেন। বাঘরূপী হুটোভি গ্রামবাসীদের এই অভিসন্ধি জানতে পারেনি।

    এক রাতে পাহাড়ের পর পাহাড় টপকে বনজঙ্গল সরিয়ে উল্কাগতিতে বাঘটি ঢুকেছিল একটি গ্রামে। গ্রামবাসীরা প্রস্তুত ছিলেন। শুরু হয়েছিল তির, বল্লম ও পাথর বৃষ্টি। মশাল জ্বালিয়ে তির  ছুঁড়তে ছুঁড়তে বাঘটির পিছনে তাড়া করেছিল গ্রামবাসীরা।

    গুরুতর আহত হয়েছিল বাঘরূপী হুটোভি। বাড়িতে ফেরার চেষ্টা করেও ফিরতে পারেনি। গভীর জঙ্গলে দুদিন অচেতন হয়ে পড়ে ছিল। মানুষরূপী হুটোভিও ওই দুদিন সাংঘাতিক অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে রইলেন।

    বাঘরূপী হুটোভি সেরে উঠছিল। বিছানায় উঠে বসেছিল মানুষরূপী হুটোভিও। কিন্তু একদিন বিকেলে একজন সুমি শিকারি কয়েকজন সঙ্গীকে নিয়ে গভীর জঙ্গলে ঢুকেছিলেন শিকার করতে। এক ঝর্নার ধারে তিনি অসুস্থ বাঘটিকে দেখতে পান। বুঝতে পারেন এই সেই বাঘ, যে নাগা পাহাড়ে ত্রাস সৃষ্টি করেছে।

    শিকারি বাঘটিকে দেখলেও বাঘরূপী হুটোভি শিকারিকে দেখতে পায়নি। শিকারি আরেকটু এগিয়ে বাঘটিকে গুলি করেন। গুলি লাগে গিয়ে বাঘটির পাকস্থলীতে। বাঘটি সেখানেই মারা যায়। বাঘরূপী হুটোভি মারা গেলেও মানুষরুপী হুটোভি মুমূর্ষু অবস্থায় তখনও বেঁচে ছিলেন।

    নাগাপাহাড়ে ভোর আসছিল। মৃত্যুশীতল ভোর। গ্রামের বাইরে থেকে ভেসে আসছিল উল্লাসধ্বনি। মানুষরূপী হুটোভি বন্ধুকে জিজ্ঞেস করেছিলেন কীসের আওয়াজ। বন্ধু ফিরে এসে বলেছিলেন, ওই গ্রামেরই এক শিকারি শিকার থেকে ফিরে এসেছে, সঙ্গে সেই ত্রাস সৃষ্টি করা বাঘটির মৃতদেহ নিয়ে। শিকারী নিজে বাঘটিকে হত্যা করেছে। তাই গ্রামবাসীরা আজ উৎসবের মেজাজে আছে।

    হুটোভির মুখটা ম্লান হয়ে উঠেছিল। হুটোভি বুঝতে পেরেছিলেন নিহত বাঘটি তাঁরই বাঘরূপী আত্মা। বন্ধুকে হুটোভি বলেছিলেন তাঁর ঘুম পাচ্ছে, তিনি এবার ঘুমোবেন। শরীর এলিয়ে পড়েছিল বিছানার ওপর। বন্ধু বোঝেননি সেটাই ছিল হুটোভির শেষ ঘুম।

    সেদিন বিকেলে, গ্রামবাসীরা হুটোভির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার জন্য প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। তাঁরা ঠিক করেছিলেন বাঘের চামড়াটা হুটোভির কফিনের ওপর রাখবেন তাঁদের ভালোবাসার নিদর্শন হিসেবে। কারণ হুটোভি খুবই পরোপকারী ও ভালোমানুষ ছিলেন। কিন্তু গ্রামবাসীরা ভাবতে পারেননি এমন দুটি  জিনিস তাঁরা কবর দিচ্ছেন, যে দুটি ছিল একই আত্মার ভিন্ন দুটি আধার।

    ঝাপসা চোখে দূর থেকে বন্ধুর সমাধি দেখছিলেন হুটোভির সেই বন্ধু। প্রিয় বন্ধু হুটোভির অভিশপ্ত আত্মা এবার বাঘের কবল থেকে মুক্তি পেয়ে নাগাপাহাড়ের আনাচে-কানাচে ঘুরে বেড়াবে। ছোট্ট বেলার হুটোভির মতো। সেই আশায় কান্না চাপতে থাকা বন্ধুর ঠোঁটে ফুটে উঠেছিল একচিলতে প্রশান্তির হাসি।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More