নবরাত্রি

0

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    অভিষেক সেনগুপ্ত

    ভরি দুনিয়া মে জি নেহি লগতা / জানে কিস চিজ কী কমি হ্যায় অভি…

    খুব গভীর থেকে উঠে আসছে থোকা থোকা যন্ত্রণা। এক প্রবল জলোচ্ছ্বাস যেন। ড্রইংরুমের চার দেওয়ালে সুরের মায়াজাল বুনে চলেছে গুলাম আলির ভরাট গলা। সাউন্ড সিস্টেমে লো টিউনে বাজছে গজল। দরদী গলা ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে আমাকে। খড়কুটোর মতো।

    ঝিমধরা বৃষ্টি পড়ছে বাইরে। বোধহয় ঝড়ও উঠেছে। সেপ্টেম্বরের শেষেও মনসুন সেলিব্রেশন চলছে দিল্লির। ব্যালকনির দিক থেকে ঠান্ডা বাতাস পাক খেতে খেতে ঢুকে পড়ছে ড্রইংরুমে। এলোমেলো ঝাঁপিয়ে পড়ছে ডাইনিং টেবল, সোফাসেট, আমার উপর। বাইশতলার এই ফ্ল্যাটটা দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন মনে হয়। দক্ষিণ-পূর্ব খোলা। সকালের প্রথম সূর্যের কুসুম আলো বেডরুমে ঢুকে ভিজিয়ে দেয় আমাকে। আবছা পর্দার মতো রাত কাছে এসে, গা ঘেঁষে বসে।

    হুইস্কির গ্লাসটা হাতে নিয়ে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ালাম। ফ্ল্যাটের সমস্ত আলো অফ। এই সময়টা আলো জ্বালি না। অন্ধকার বড় টানে। মিশমিশে কালো ছায়ায় লুকিয়ে ফেলা যায় নিজেকে। এই দিল্লি শহর, বাইশতলার এই ফ্ল্যাট, সবুজঘেরা গ্রেটার কৈলাশ, ঝমঝম করে একের পর এক চলে যাওয়া মেট্রো— সব দেখতে পাই চোখের সামনে। শুধু আমার অস্তিত্ব নেই! ব্যালকনিতে দাঁড়ালে দূর থেকে মুঠো মুঠো আলোকরশ্মি এসে ভিজিয়ে দেয়। আমার আবছায়া শরীর থেকে চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়তে থাকে অনন্ত যন্ত্রণারাশি।

    গুলাম আলি গাইছেন, ‘ইয়াদোঁ কে বে-নিশান জাজিরোঁ সে / তেরি আওয়াজ আ রহি হ্যায় অভি!’ স্মৃতির কোনও জনশূন্য দ্বীপ থেকে ভেসে আসছে তোমার ডাক! সত্যিই কি ফিরে আসে হারিয়ে যাওয়া কোনও ডাক?

    আশেপাশে কোথাও পিয়ানো বাজছে। মিঠে সুর। ঝঙ্কার আছে। খেয়াল পড়ল, আমারই ফ্ল্যাটের ডোরবেল! এতক্ষণ আমাকে সব ভুলিয়ে রেখেছিলেন গুলাম আলি। আরও একবার অস্থির বেজে উঠল ডোরবেলটা। অর্ডার এসে গেছে হয়তো! দরজা খুলে দেখলাম করিডরে আলো জ্বলছে না। খানিক দূরে আবছা একটি শরীর। একটি মেয়ের। হাত বাড়িয়ে ড্রইংরুমের আলো জ্বালতে হুড়মুড় করে সারা দুনিয়া ঝাঁপিয়ে পড়ল ওয়ানরুম ফ্ল্যাটে!

    ‘মিস্টার সেনাপতি?’ এক পা এগিয়ে এসে প্রশ্ন করল মেয়েটি।

    চমকে গেলাম। হাতের হুইস্কির গ্লাসটা কেঁপে উঠল। ও এখানে কেন? তবে কি… ? অজান্তে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল।

    ‘আর ইউ বিক্রম সেনাপতি?’ অধৈর্য শোনাল মেয়েটির গলা। বেশ কিছুক্ষণ বোধহয় কলিং বেল বাজাচ্ছিল। সামান্য বিরক্তও হয়েছে।

    একপাশে সরে দাঁড়িয়ে বললাম, ‘প্লিজ গেট ইন।’

    পিঙ্ক কালারের পালাজো। সাদা কুর্তি। কাঁধে ইটালিয়ান লেদারের কালো ব্যাগ। কানে সিলভার প্রিন্টের ঝোলা দুল। ডান কব্জিতে রাগা। এরকম রিস্টওয়াচ পরলে আর গয়নার দরকার পড়ে না। চমৎকার কালার কনট্রাস্ট মেয়েটিকে আরও সুন্দরী করে তুলেছে। নির্মেদ শরীর। অভাবনীয় নমনীয়তা। বেশ লম্বা। বোধহয় পাঞ্জাবি।

    ‘ম্যায় পুনম সিং।’ হেসে হিন্দিতে বলল মেয়েটি।

    আমার উল্টোদিকের সোফাতে বসেছে মেয়েটি। ব্ল্যাক রিবন দিয়ে চুলটা টপনট করা। কয়েক মুঠো ছড়িয়ে রয়েছে কপালে, কানের পাশে। থুতনিতে একটা ছোট্ট বাদামি তিল। টানা চোখ, তীক্ষ্ণ নাক, কাটা মুখ, থুতনির ওই তিলটা— আমার ভীষণ চেনা। শুধু নামটা নতুন।

    আমি বিক্রম সেনাপতি। কলকাতার ছেলে। অম্বেডকর ইন্সিটিটিউট থেকে ইলেক্ট্রিকল ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করার পর নিজের শহরে ফিরিনি। এই শহরের ইতিহাসে গভীর দীর্ঘশ্বাস আছে। অপ্রাপ্তি যেন লেপ্টে থাকে আজও। সবাই বোধহয় বোঝে না। দিল্লি আমায় আর ফিরতে দেয়নি। পাতিপুকুর লেনের দেড়শো বছরের পুরোনো পৈত্রিক বাড়িতে এখনও টিকে রয়েছে বাবা-মা। শরিকি ঝামেলায় জর্জরিত হয়ে। ওসব আর ফিরে দেখতে চাই না। এই বারোবছরে কলকাতার থেকে বেশি আপন হয়ে গেছে দিল্লি।

    নয়ডার ওয়েভ সিটি সেন্টারের চিফ ইলেক্ট্রিকল ইঞ্জিনিয়ান আমি। এটা ভারতবর্ষের সবচেয়ে বড় মল। দশটা ফ্লোরে বিদেশি ব্র্যান্ডের হাজারেরও বেশি আউটলেট। ওপরের সাতটা ফ্লোরে ছোট-বড় দুশো কোম্পানির হেড অফিস। সারাদিন মলের বৈদ্যুতিক সরবরাহ ঠিক রাখাই আমাদের প্রধান কাজ। প্যারালাল জেনারেটর সিস্টেমকে চাঙ্গা রাখতে হয়। যাতে লাইন গেলে বা ট্রিপ করলে সঙ্গে সঙ্গে রেসপন্স করে। সোলার প্যানেল বসানোর কাজও শুরু হয়েছে।

    সকাল সাতটা থেকে সন্ধে সাতটা পর্যন্ত ওয়েভ মলের চার্জে থাকি। ওখান থেকে বেরোনোর পর একটা মুখ তীব্রভাবে টানে। রোজ। সন্ধে হলেই ছুটি তাকে দেখতে। আমার উল্টোদিকে বসে থাকা এইরকম একটা মুখ, হুবহু এইরকম দেখতে একটি মেয়ে এভাবেই টানত একসময়। নেশার মতো।

    ‘ফ্ল্যাটটা কেমন লাগছে আপনার?’

    পুনমের প্রশ্নে ফিরলাম বাইশতলার ফ্ল্যাটে। মেয়েটা উশখুশ করছে। স্বাভাবিক। উল্টোদিকে কেউ যদি নীরব থাকে, অস্বস্তি হয়।

    বদরপুর থেকে জি-কে ওয়ানে এসেছি একমাস। সারা দিল্লিতে ডিএস গ্রুপের অসংখ্য ফ্ল্যাট ও অফিস। তাদের রিপ্রেজেন্টেটিভ অর্চনা কমপ্লেক্সের এই বাইশতলার ফ্ল্যাটটা দেখাতেই পছন্দ হয়ে গেছিল। এখান থেকে পুরো দিল্লি শহরটা দেখা যায়— কুতুবমিনার, লালকিলা, ইন্ডিয়া গেট। প্রথম প্রথম শহরটাকে রূক্ষ আর কঠিন মনে হত। এখন হৃদস্পন্দন টের পাই। কয়েকশো বছর ধরে যমুনার পলির মতো দীর্ঘশ্বাস জমেছে দিল্লির বুকে। অনুভব করতে পারি।

    সংক্ষেপে পুনমকে জবাব দিলাম, ‘ভালো।’

    এই ধরনের মেয়েরা শুরুতেই ব্যক্তিগত প্রশ্ন করে না। ক্লায়েন্টকে কয়েক ঘণ্টার সেরা সার্ভিস প্রোভাইড করাই এদের কাজ। বদলে প্রাপ্য অর্থ পায়। বছর দুয়েক এইরকম মেয়েদের দেখছি। পুনম শুরু থেকে বড্ড আন্তরিক হওয়া চেষ্টা করছে। বিরক্তি হলাম। মুখে প্রকাশ করলাম না।

    ‘সরি, আপকা ফোন নাম্বার নেহি থা। শুধু অ্যাড্রেসটা ছিল। তাই আসার আগে জানাতে পারিনি।’ একটু থেমে মিষ্টি করে হেসে পুনম ফের বলল, ‘আপনাকে ডিসটার্ব করলাম না তো?’

    আমি হাসলাম। ক্লায়েন্টদের পার্সোনাল ইনফো গোপনই রাখে এজেন্সিগুলো। তিনটে ধাপে তারা অর্ডার পৌঁছে দেয়। এমনভাবে ব্যাপারটা চালায়, যেন কোনও বিপণন সংস্থা অনলাইনে কেনা জিনিস পৌঁছে দিচ্ছে ক্রেতার কাছে! অর্ডার পাঠানোর নির্ধারিত সময়ের ঘণ্টাখানেক আগে প্রথম মেসেজ আসে— ‘ইওর অর্ডার হ্যাজবিন ডেসপ্যাচড!’ তখন ‘ওয়াই’ লিখে পাঠাতে হয়। মানে ইয়েস। দ্বিতীয় মেসেজটা আসে আধঘণ্টা আগে, ‘আওয়ার রিপ্রেজেন্টেটিভ উইল মিট ইউ শর্টলি!’ তখন ‘কে’ লিখে পাঠাতে হয়। মানে, ওকে! পনেরো মিনিট আগে তৃতীয় বা শেষ মেসেজটা, ‘আর ইউ রেডি টু রিসিভ ইওর অর্ডার?’ তখন আবার ‘ওয়াই’ লিখে পাঠাতে হয়। কোনও মেসেজের উত্তর পাঁচ মিনিটের মধ্যে না পেলে অর্ডার ক্যানসেল! প্রতিবারই নতুন নম্বর থেকে মেসেজ পাঠানো হয়। যাতে গোপনীয় রাখা যায় পুরো প্রসেসটা। যারা এতে অভ্যস্ত তারা এসব জানে। আজ অবশ্য আমি নিজে অর্ডার প্লেস করেনি। অনুভব করেছে। তাই পুনমের আসার সময় জানা ছিল না।

    পুনমের কথার উত্তরে বললাম, ‘নেহি। আপ কুছ লোগি? চা-কফি, না ঠান্ডা পানীয়?’

    পুনম প্রচ্ছন্নভাবে এড়িয়ে গেল। আমি তবু ফ্রিজ থেকে ফ্রুট বিয়ার এনে দিলাম। ও ইতস্তত করে চুমুক দিল।

    পুনমের দিকে তাকিয়ে থাকতে পারছি না। এক অদ্ভুত ছটা রয়েছে ওর রূপে। স্নিগ্ধ কিন্তু তীব্র। ড্রইংরুমের নীল এলইডি আলো ওর লালচে গালে পিছলে কোটি-কোটি কণায় ভেঙে যাচ্ছে। ছিটকে পড়ছে সারা ঘরময়। উজ্জ্বল হয়ে যাচ্ছে প্রায় অন্ধকার ঘরটা। মনে মনে বললাম, ‘এই পেশায় কেন পুনম?’

    রোজ সন্ধেয় নয়ডার সিটি সেন্টার থেকে মেট্রো ধরি। মাণ্ডি হাউসে চেঞ্জ করে কৈলাশ কলোনি। রোজ সোয়া ঘণ্টার জার্নি। যন্ত্রের মতো মেট্রোর ভিড় ঠেলতে ঠেলতে বাড়ি ফিরি। দিল্লি জুড়ে তখন ঝলমল করে আলোর চাঁদমালা। অসহ্য লাগে। মেট্রোর ভিড় বরং স্বস্তি দেয়। নিজেকে লুকিয়ে ফেলা যায় অসংখ্য‌ মানুষের শব্দতরঙ্গে। মেট্রোর ভিড়ে প্রায়ই একটি কিশোর তাকিয়ে থাকে আমার দিকে। মুচকি হাসে। মুখটা খুব চেনা। ছেলেবেলায় ওইরকম দেখতে ছিল আমাকে। যে সায়ক্রায়াটিস্টের কাছে যাই, তিনি বলেছেন, ভিড়ের মধ্যে হঠাৎ-হঠাৎ নিজেকে দেখাটা নাকি এক ধরনের ইলিউশন! এটা নাকি বাড়তেও পারে। বাড়লেই বা কী! আমার কিছু পাওয়ারও নেই, হারানোরও নেই।

    দিনতিনেক আগে মেট্রোতে প্রথম দেখি পুনমকে। সেক্টর সিক্সটিন থেকে উঠেছিল। এখানকার মেট্রোর প্রথম কামরা মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত। পরের কামরাতে উঠি। নেমেই এস্ক্যালিটর পাওয়া যায় বলে। সেদিন ভিড়ের ঠেলায় পিছোতে পিছোতে কোণঠাসা হয়ে গিয়েছিলাম। কোনওরকমে নিজেকে ফিট করেই দেখতে পেলাম একটি মেয়েকে। খুব চেনা একটা মেয়ে। সেই একইরকম মুখ, চোখ, নাক, এমনকি থুতনির বাদামি তিলটাও! ওটাও কি ইলিউশন? কানে ইয়ারপ্লাগ গুঁজে গান শুনছে। দু’চোখ বোজা। যেন মেট্রোতে নেই! মাণ্ডি হাউসে নামার সময় লক্ষ্য করেছিলাম, বসেই রয়েছে মেয়েটি।

    ‘আপনার সারনেম শুনে বাঙালি মনে হচ্ছে। কলকাতাতেই বাড়ি?’

    পুনম প্রশ্ন করেছে। আমি বললাম, ‘কলকাতারই ছেলে। অনেক বছর এখানে আছি। বলতে পারেন, এই শহরটাই আমার ঠিকানা।’

    ‘আপনার বাড়ি কোথায়?’ জানি এরা নাম-ঠিকানা মিথ্যেই বলে। তবু জানতে ইচ্ছে করল।

    ‘শাদীপুরে থাকি।’ সাবলীল উত্তর দিল পুনম। অবাক হলাম। মিথ্যেও এমন চমৎকার বলা যায়! এত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে!

    ‘নয়ডার সেক্টর সিক্সটিনে অফিস। সোজা ওখান থেকে আসছি।’ ফের বলল পুনম।

    পুনমের দিকে চোখ মেলে তাকালাম। ভীষণ স্মার্ট। শরীরী আত্মবিশ্বাসে কোনও উগ্রতা নেই। বয়স তিরিশের নীচে। রুচিশীল পোশাক। মনখারাপের আকাশটা কালো হয়ে উঠছে আমার বুকে। জীবনের প্রতিটা পাতা হুড়মুড় করে উল্টে দিচ্ছে কোনও এক দমকা হাওয়া।

    মেট্রোতে প্রথমদিন পুনমকে দেখে স্তব্ধ হয়ে গেছিলাম। তলিয়ে যাচ্ছিলাম পাঁচবছর আগের এক চোরাবালিতে। যে ঘটনা মানসিকভাবে পঙ্গু করে দিয়েছিল আমাকে! ভেঙেচুরে দিয়েছিল আমার মেরুদণ্ড, বিশ্বাস, স্বপ্ন। পুনমকে দেখতে একদম রঞ্জিনীর মতো!

    রঞ্জিনী আমার পাঁচবছর আগের এক ব্যর্থতা। তখন ধীরে ধীরে পায়েরতলায় জমি পাচ্ছি দিল্লিতে। কেন্দ্রীয় সরকারের কয়েকটা প্রজেক্টে কাজ করছি। হঠাৎই একদিন মা ফোন করে বলল, ‘একটা ভালো মেয়ে দেখেছি। তোর পছন্দ হলে বিয়ে দিয়ে দেব।’

    বিয়েতে আপত্তি ছিল না। তিনটে চাকরির অফার রয়েছে। যে কোনও একটা নিয়েও নেব। স্যালারি ভালো। আমি কলকাতায় চলে গেলাম। রঞ্জিনীকে দেখে ভালো লেগে গেল। অসম্ভব সুন্দরী। পড়াশোনাতে ভালো। গান জানে। ঘরোয়া। স্ত্রী হিসেবে যে কেউ কামনা করবে ওকে। বাবা-মাকে ‘হ্যাঁ’, বলে দিলাম।

    ডিসেম্বরের শেষে বিয়ের দিন ঠিক হয়ে গেল। বিয়ে করে রঞ্জিনীকে বাড়ি নিয়ে এলাম। কালরাত্রি পার করে ফুলসজ্জা। অষ্টমঙ্গলা কাটিয়ে রঞ্জিনীকে নিয়ে দিল্লি ফিরব। ফুলসজ্জার রাতে ঘরে ঢুকে দেখলাম, রঞ্জিনী ঘুমিয়ে পড়েছে। তিনদিনের ক্লান্তি। প্রচুর ধকল গেছে। ঘুমিয়ে পড়া স্বাভাবিক। বিছানায় গিয়ে রঞ্জিনীকে স্পর্শ করে চমকে উঠেছিলাম। এত ঠান্ডা কেন ওর গা? বেডসাইড ল্যাম্পটা জ্বালিয়ে দেখি, ওর ঠোঁটের কোণ বেয়ে গড়াচ্ছে তাজা রক্ত। হাসপাতালে ছুটেছিলাম। ডাক্তার মৃত ঘোষণা করেছিলেন রঞ্জিনীকে। বিষ খেয়েছিল মেয়েটা।

    ওই ঘটনার পর ঝড় বয়ে গিয়েছিল জীবনে। শ্বশুরবাড়িতে পা রাখার তিনদিনের মাথায় কেউ আত্মহত্যা করলে সমাজ, আইন তাদেরকেই অপরাধী বেছে নেয়। এমন তাজা দাম্পত্য জীবনে বোধহয় আরও বেশি করে হয়। কেউ বলল, পণের বলি হল মেয়েটা। কেউ বলল, নরম মেয়েটা শ্বশুরবাড়ির অত্যাচার নিতে পারল না। আমি কী বলেছিলাম, কেউ শুনতে চাইল না। থানা-পুলিশে কেটে গেল একটা মাস। আমি রাগ করিনি। এমন তো হবেই। সত্যিই তো, ফুলের মতো মেয়ে কোনও মেয়ে বিয়ের দেড়দিনের মাথায় আত্মহত্যা করলে দোষ তো শ্বশুরবাড়িরই হয়। স্বামীর কতটা হয়? রঞ্জিনীর ওপর আমার প্রচন্ড অভিমান হয়েছিল। ও কি একবার বলতে পারত না, অন্য একটা ছেলেকে ভালোবাসে? একবার যদি বলত!

    ‘দিল্লিতে বোধহয় এবার আর বৃষ্টি থামবে না!’

    পুনমের কথায় ঘোর ভাঙল। বুঝলাম, শূন্য দৃষ্টিতে এতক্ষণ ওর দিকেই তাকিয়ে ছিলাম। অস্বস্তি হওয়ায় প্রশ্ন করেছে।

    ‘তাই তো মনে হচ্ছে!’ দীর্ঘশ্বাস চেপে বললাম পুনমকে।

    বাইরে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি পড়ছে। ব্যালকনি থেকে একঝলক হাওয়া এসে পুনমের চুল ঘেঁটে দিল। আজও ওকে সেক্টর সিক্সটিন থেকে মেট্রোতে উঠতে দেখেছি। ও নিশ্চয় কৈলাশ কলোনিতে না নেমে নেহরু প্লেসে নেমেছে। তাই দেরি হয়েছে আসতে।

    ‘বাইশতলার ব্যালকনি থেকে পুরো দিল্লিটাই দেখা যায়, তাই না স্যর?’

    দিল্লিতে জুনিয়ররা ‘স্যর’ বলে সিনিয়রদের। এত বছরেও আমার এই অভ্যেসটা হয়নি। হুইস্কির গ্লাসটা তুলে নিয়ে পুনমকে বললাম, ‘অন্ধকারে মিশে গেলে সব দেখা যায়।’

    পুনমের ভ্রু কুঁচকে গেছে। একটু সময় নিয়ে বলল, ‘ভুল বলেননি, স্যর!’

    গত দু’বছরে অনেক মেয়ের সঙ্গে সময় কাটিয়েছি। তাদের কারও মুখে এমন কথা শুনে অবাক হতাম। বুঝতে পারতাম, এরা শিক্ষিত। এই মেয়েদের সানিধ্য ভালো লাগে। ঘণ্টা তিনেকের জন্য এরা সব ভুলিয়ে দেয়। আমার অতীত, বর্তমান। চল্লিশের গা ছুঁয়ে দাঁড়ানো আমাকে এক রাতের ঘুম উপহার দিয়ে যায়।

    ‘কিন্তু অন্ধকার কি সব কিছু মুছে দিতে পারে?’

    যেন বহু দূর থেকে ভেসে এল পুনমের গলা। আনমনা দেখাচ্ছে মেয়েটাকে। ওরও কি কোনও যন্ত্রণা আছে? আমার মতো! পুনম আসার আগে ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম এই কথাগুলোই।

    রঞ্জিনীকে হারানোর পর কাজে ডুবে থাকতাম। একটা ব্যর্থ গল্প কতদিন আর টানব! কিন্তু জীবন থেকে সব কিছু মুছে ফেলা যায় না। আমার ভেতর আর বাইরের সিস্টেমটা ক্র্যাশ করে গেছিল। রাতে বিছানায় শুলেই ভেসে উঠত রঞ্জিনীর চন্দন পরা মুখটা। ঠোঁটের কোণ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে রক্ত! রাতের পর রাত ঘুমোতে পারতাম না। ক্রমশ আর একটা বিচ্ছিন্ন আমি জন্ম নিচ্ছিল আমার মধ্যে।

    অনুভব বোধহয় আমার ভিতরের বিধ্বস্ত আমিটাকে চিনে ফেলেছিল কোনওভাবে। ও আমার সঙ্গে ওয়েভ মলেই চাকরি করে। সেকেন্ড সিফটের চিফ ইলেক্ট্রিকল ইঞ্জিনিয়ার। সিটি সেন্টারকে দিনরাত আলোকোজ্জ্বল রাখার জন্য দুটো সিফটে বারোজনের একটা টিম কাজ করে। নাইট সিফটের চার্জে থাকে অনুভব সায়গল।

    অনুভব আমার থেকে পাঁচ-সাত বছরের ছোট। চন্ডীগড়ের ছেলেটা হাসিখুশি। দিলদার। আমাদের সম্পর্ক দাদা-ভাইয়ের মতো। কিন্তু কখনওই নিজের সীমা অতিক্রম করে না। না বলতেই অনেক কিছু বুঝে নেয় ছেলেটা।

    অনুভব একদিন নিচু গলায় পাঞ্জাবিতে বলেছিল, ‘ইক গল্ করুঁ স্যর?’

    সেকেন্ড সিফটের জন্য রিপোর্ট লিখছিলাম। পুরো বিল্ডিংটা আটটা সেক্টরে ভাগ। কোন সেক্টরের কী অবস্থা, রিপোর্ট দিয়ে যেতে হয় পরের সিফটের ডিউটি ম্যানেজারকে। আমি চোখ তুলে তাকাতে অনুভব বলল, ‘আপনি বিয়ে করছেন না কেন?’

    রঞ্জিনীর অতীত দিল্লির কেউ জানে না। কীই বা বলার আছে। আমার কোনও বন্ধুও নেই। তবে এমন ব্যক্তিগত প্রশ্ন  কেউ কেউ করে বসে। অনেকদিন পর অনুভব আমার ভেতরটা নাড়িয়ে দিল। সংক্ষেপে বললাম, ‘ওসবে নেই! অনেক হ্যাপা।’

    অনুভব কী বুঝেছিল, কে জানে! বলেছিল, ‘বিয়ে করলেই যে সঙ্গী পাওয়া যায়, তা নয়। আমার চেনা একটা এজেন্সি আছে। ওরা আপনার পছন্দ মতো সঙ্গী পাঠাবে। শরীর আর মনের যত্ন নিতে পারবে সে। পে করলে ঝামেলা শেষ।’

    এসকর্ট এজেন্সির কথা আমিও জানি।তততত তবে তাদের ক্লায়েন্ট হওয়ার কথা ভাবিনি। উটকো ঝামেলা কে চায়! তাছাড়া মেয়েরা অনেকটা এসেন্সের মতো। কারও ফ্ল্যাটে কোনও মেয়ে ঢুকলে গন্ধ ঠিক ছড়িয়ে পড়ে। তাছাড়া সিকিউরিটি গার্ড থাকে সব বিল্ডিংয়ে। অনুভবের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলাম। শরীর সামলানো যায়। মন নয়। আমি হয়তো ধীরে ধীরে পাগল হয়ে যাচ্ছি।

    লোদি কলোনি ছেড়ে বদরপুরের কণিষ্ক টাওয়ারে ভাড়া গেছি তখন। ষোলোটা ফ্ল্যাট রয়েছে বিল্ডিংয়ে। কেউ কারও খোঁজ রাখে না। একদিন অনুভবকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘ফালতু ঝামেলায় পড়ব না তো?’

    অনুভব হেসে বলেছিল, ‘নেহি। সিকিউরিটি গার্ডকে শুধু দেখে নিন। বাকি মেরে উপর ছোড় দো!’

    গত দু’বছরে আমার আস্তানায় অনেক মেয়ে এসেছে। শুধু শরীরের টানে কলগার্ল ডাকি না। বিছানা উপলক্ষ্য মাত্র। আমার অচেনা বন্ধু দরকার। যার সামনে আমার মনের দরজাটা হাট করে খুলে ফেলা যায়। সব জেনেও যে ভুলে যাবে আমার গল্প। অনুভবকে বলেছিলাম, এসকর্ট এজেন্সিটাকে বলিস, যাকে পাঠানো হবে, সে যেন আমার বয়সের কাছাকাছি হয়।

    ‘ছুটির দিনগুলো কী করেন?’ পুনমের গলা ভেসে এল।

    ‘বাড়িতেই থাকি।’ হুইস্কিতে গলা ভিজিয়ে উত্তর দিলাম।

    এক-এক রাতে এই ওয়ান রুম ফ্ল্যাটটাকে মথুরা রোডের পুরানা কিলা মনে হয়। যেদিকে তাকাই ধংস্বস্তুপ। মনে হয়, আমি একটা গভীর কুয়োর মধ্যে পড়ে আছি। পিছল দেওয়াল ধরে ওঠার চেষ্টা করি। পড়ে যাই! আবার চেষ্টা করি। কেন এমন হয়, জানি না! বছর পাঁচেক আগে রোগটা ধরা পড়েছিল। একজন সাইক্রায়াটিস্টের কাছে গিয়েছিলাম। তিনি বলেছিলেন, আমার ইনসোম্নিয়া আছে। ঘুমহীনতা! রাতের পর রাত জেগে থাকি। সেখান থেকে ডিপ্রেশন। সর্বক্ষণ মনখারাপে বাস। শুরুর দিকে এতটা ডিপ্রেসড থাকতাম না। যতদিন যাচ্ছে, একাকীত্ব একটু একটু করে খেয়ে ফেলছে আমাকে। চোখের তলায় গাঢ় হচ্ছে কালচে বাদামি দাগ। কয়েকটা সিটিংয়ের পর ওই মনোবিদ পরামর্শ দিয়েছিলেন, ‘বিয়ে করে নিন। আপনার একজন সঙ্গী দরকার।’

    বৃষ্টির আওয়াজ ছাপিয়ে দূর থেকে ভজন ভেসে আসছে। মহালয়া, প্রতিপদ পেরিয়ে নবরাত্রি শুরু হয়েছে। দশেরা পর্যন্ত চলবে। কলকাতার পুজো অনেক বছর দেখিনি। ওখানে নাকি এখন মহালয়া থেকেই পুজো শুরু হয়ে যায়! দিল্লিতেও দুর্গাপুজো হইহই করে হয়। চিত্তরঞ্জন পার্ক, সাকেত, বদরপুরে অনেক পুজো হয়। আগে দশেরার দিন জাম-এ-মসজিদের খানিক দূরের রামলীলা ময়দানে যেতাম। রাবণবধ দেখতে। সেও অনেক বছর যাওয়া হয় না।

    উৎসবের দিনগুলোয় ডিপ্রেশন আরও বেড়ে যায়। আজ অফিস থেকে বেরোনোর সময় অনুভব বলেছিল, ‘আপ ঘরমে হি হো না?’ এটা কোড ল্যাঙ্গুয়েজ। ও জানে, আমার কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়েছিলাম।

    পুনমের দিকে তাকালাম। ড্রইংরুমের নিভু আলোয় অপরূপ সুন্দরী লাগছে। ব্যক্তিত্বময়। হুবহু রঞ্জিনীর মতো। যমজ বোন যেন! কয়েকদিন মেট্রোতে ওকে দেখে একটা অস্থিরতা তৈরি হয়েছে আমার ভেতরে। ভালোলাগাটা বোধহয় ভালোবাসায় বদলে যাচ্ছে। সেটাই এখন জ্বালাচ্ছে, পোড়াচ্ছে। খুঁড়ে ফেলছে ভেতরটা। কষ্ট হচ্ছে প্রচন্ড। রঞ্জিনীর স্মৃতি বয়ে আনা মেয়েটা কলগার্ল! পুনমের বদলে অন্য কেউ এলে ভালো হত!

    ‘কতদিন চাকরি করছেন?’ তেতো মনে প্রশ্ন করলাম পুনমকে।

    ‘আগে একটা কল সেন্টারে কাজ করতাম। রাতের সিফটে সমস্যা হত। প্যারেন্টস ম্‌না কর রহে থে। ছোড় দিয়া। এই চাকরিতে মাসখানেক জয়েন করেছি। এটা ভালো। নিজেকে সময় দিতে পারছি।’

    ভালো বলেছে, নিজেকে সময় দিতে পারছে! ক্লায়েন্টদের জন্য আলাদা সময় তো দিতেই হবে! রাতগুলো কলগার্লদের কাছে খুব ইম্পর্ট্যান্ট হয়!

    পোশাক দেখে আজকাল কারও ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড বোঝা যায় না। পুনমের মতো মেয়েরা হয়তো ভালো পরিবারের। অর্থের টানে আসে এই পেশায়। এটাই স্বভাব হয়ে যায় একসময়। এক বিছানা থেকে আর এক বিছানায় বদলে যায় এদের চাহিদা, স্বপ্ন।

    আমার ফ্ল্যাটে যখন কোনও মেয়ে আসে, সহজভাবে মিশি। দু’জনে মিলে খাওয়াদাওয়া করি। অনেক রাত পর্যন্ত গল্প করি ব্যালকনিতে বসে। আস্তে আস্তে কেটে যায় একাকীত্বের ঘন মেঘটা। খুশহাল মন একসময় ঘুম পাড়িয়ে দেয়। আজও সে ইচ্ছে ছিল। কিন্তু পুনমকে নিতে পারছি না। ওর সঙ্গে সময় কাটাতে ইচ্ছে করছে না। ওকে তাড়াতাড়ি বিদেয় করতে হবে!

    খাবার অর্ডার করাই ছিল। জিজ্ঞেস করলাম, ‘ডিনার করবেন?’

    পুনম দ্রুত মাথা নেড়ে বলল, ‘নেহরু প্লেসে নেমে ভেজ মোমো খেয়েছি। এখন খিদে নেই।’

    পুনম ঘড়িতে টাইম দেখে বলল, ‘স্যর, আমার দেরি হচ্ছে। আপনি পেমেন্ট করে দিলে…’

    অনেকসময় এরা আগাম পেমেন্ট চায়। বেডরুম থেকে ওয়ালেটটা এনে পাঁচহাজার টাকা দিলাম পুনমকে। টাকাটা গুনে ও বলল, ‘স্যর, আরও পনেরো হাজার?’

    বলে কী মেয়েটা? আরও পনেরো হাজার! আমি তো এতদিন এই টাকাই দিয়ে এসেছি। চারগুণ টাকা চাইছে মেয়েটা! একটা নৈতিক ব্যাপার এরা মেনে চলে। প্রাপ্য টাকার বেশি কখনও চায় না। এসকর্ট এজেন্সিটার সঙ্গে একদফা কথা বলা উচিত। তবে কি পুনম হাইফাই কলগার্ল? এদের অনেকরকম রেট থাকে। বড়লোক ক্লায়েন্টদের জন্য সেটা অনেক বেশি। পুনমের মতো সুন্দরী মেয়েটার রেট তাহলে আরও বেশি! তাহলে পুনমকে পাঠাল কেন? প্রচন্ড রাগ হচ্ছে অনুভবের ওপর। মেয়েটা গেলেই একটা হেস্তনেস্ত করতে হবে।

    পুনম ফের বলল, ‘আপনাকে কুড়ি হাজার টাকার কথা বলা হয়নি আগে?’

    ওর সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে হল না। পুনমকে যত দেখছি রঞ্জিনীকে মনে পড়ছে। ক্ষতবিক্ষত হচ্ছি। জীবন আমাকে কোথায় নিয়ে যে দাঁড় করাবে, কে জানে! দ্রুত পায়ে বেডরুমে গিয়ে কাবার্ডের লকার থেকে আরও পনেরোহাজার নিয়ে এলাম। বিরক্তি নিয়ে তুলে দিলাম ওর হাতে। আর কিছুক্ষণ দেখব। যদি ও বসে থাকে, নিজে মুখেই বলব, আজ এসো!

    পুনম টাকাটা গুনে ওর ব্যাগে রেখে বলল, ‘কোম্পানি ই-বিল পাঠিয়ে দেবে আপনাকে।’

    ই-বিল? এসকর্ট এজেন্সিগুলো কি এখন খুল্লামখুল্লা বিজনেস করছে নাকি যে, ইমেলে বিল পাঠাবে!

    আমার বিরক্তি দেখেই বোধহয় উঠে দাঁড়াল পুনম। বলল, ‘আজ চলি স্যর। কোনও প্রবলেম হলে  জানাবেন।’

    কার্ড হোল্ডার থেকে একটা ভিজিটিং কার্ড বের করে টেবলে রেখে দরজাটা টেনে বেরিয়ে গেল পুনম।

    বাইশতলার ফ্ল্যাটটাতে আমি একা। উল্টোদিকের সোফাতে একটু আগেও বসেছিল পুনম। ওর ফেলে যাওয়া গন্ধ পাচ্ছি। পুনম কলগার্ল! মেনে নিতে পারছি না। দুনিয়াটা এমন হয়ে যাচ্ছে কেন? এতদিন ধরে এত মেয়ের সঙ্গে রাত কাটিয়েছি, কখনও এতটা বিস্বাদ লাগেনি।

    হুইস্কির খালি গ্লাসটাকে টেবলে রাখতে গিয়ে পুনমের ভিজিটিং কার্ডটা চোখে পড়ল। একটা কলগার্ল তার কার্ড দিয়ে বলেছে, দরকার পড়লে যেন তাকে ফোন করি! হেসে ফেললাম। বেশ প্রফেশনাল!

    কার্ডটা তুলে নিলাম। সোনালি অক্ষরে লেখা, পুনম সিং। তলায় লেখা, রেন্ট ম্যানেজার, ডিএস গ্রুপ। আর তার ফোন নাম্বার। থমকে গেলাম। হঠাৎ সব কিছু যেন গুলিয়ে যাচ্ছে। কেমন বোধহীন মনে হচ্ছে নিজেকে। ডিএস গ্রুপের ফ্ল্যাটেই তো থাকি আমি!

    টুংটুং করে বেজে উঠল মোবাইলটা। নোটিফিকেশন অ্যালার্ট। ইনবক্সে একটা মেল ঢুকল। মেলটা সঙ্গে সঙ্গে খুলে ফেললাম। ইনভয়েসের সঙ্গে ডিএস গ্রুপের প্রাপ্তিস্বীকারের চিঠি,

    ডিয়ার মি সেনাপতি,

    উই আর প্লিজড টু ইনফর্ম ইউ দ্যাট, আওয়ার রেন্ট ম্যানেজার পুনম সিং হ্যাজ রিসিভড ইওর ফ্ল্যাট রেন্ট রুপিজ টোয়েন্টি থাউজেন্ট।

    শূন্য গ্লাসটাতে খানিকটা হুইস্কি ঢাললাম। সামান্য জল মিশিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। চালিয়ে দিলাম সাউন্ড সিস্টেমটা। ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ালাম। দিল্লির আকাশে এখন শুকনো পাতা ওড়াচ্ছে বৃষ্টিভেজা ঝড়। বিন্দুবিন্দু জলকণা উড়ে বেড়াচ্ছে। ঠান্ডা হাওয়া এলোমেলো করে দিচ্ছে আমার এই দাঁড়িয়ে থাকা। পুনমের কথা ভাবা। সব ছাপিয়ে আবার গেয়ে উঠলেন গুলাম আলি— শহর কি বে-চিরাগ গলিয়োঁ মে, জিন্দেগি তুঝকো ঢুন্ডতি হ্যায় অভি!

    অন্ধকারে ডুবে যাওয়া এই দিল্লি শহরে আমার হারিয়ে জীবন কি সতিই ফিরে পাব? একজোড়া শান্ত, স্নিগ্ধ চোখ ভেসে উঠল মনের পর্দায়। রঞ্জিনি, নাকি পুনমের?

    পুনমকে একটা ফোন করব? অভদ্র ব্যবহারের জন্য ক্ষমা চাওয়া উচিত ওর কাছে। বাঁহাতে ওর রেখে যাওয়া ভিজিটিং কার্ডটা। ডানহাতের বুড়ো আঙুলের ফিঙ্গারপ্রিন্ট দিয়ে অন করলাম মোবাইল। পুনমের নাম্বারটা… নাইন… এইট… একরাশ দস্যু বাতাস আচমকা ঝাঁপিয়ে পড়ল আমার ওপর। উড়ে গেল পুনমের ভিজিটিং কার্ড। বাইশতলার ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আমি আরও একবার দেখতে লাগলাম আমার হারিয়ে যাওয়া!

    অভিষেক সেনগুপ্তর জন্ম বর্ধমানে। কলেজে পড়ার সময় থেকে কলকাতায় বসবাস। পেশায় ক্রীড়াসাংবাদিক।  ইদানীং সাংবাদিকতার পাশাপাশি লেখালিখিও চালাচ্ছেন। বেশ কিছু পত্রপত্রিকায় গল্প বেরিয়েছে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Leave A Reply

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More