শনিবার, মার্চ ২৩

ভূমিকম্প পরিবার

ডি অমিতাভ

সন্ধেবেলা মদ খেতে বসার পরে জীবনটা বদলে গেল। আমার একার জীবন নয়, দুনিয়াটাই বদলে গেল। সন্ধেবেলা যখন ফাঁকা মাঠে তিন বন্ধু বিয়ার খেতে বসেছিলাম, তখন একদম স্বাভাবিক চারিদিক। পাখিরা ফিরে যাচ্ছিল বাসায়। রাতপাখিরা অবশ্য তখনও বের হয়নি। তারা আরও একটু পরে বের হবে। দিনের আলো নিভে যাচ্ছে ধীরে ধীরে।

একটু পরেই চাঁদ উঠলো। সামনেই পূর্ণিমা। আজ মহাবীর জয়ন্তী। তিনজনেরই অফিস ছুটি। রানা ম্যানেজমেন্টেই চাকরি করে। আইআইএম জোকা। ওই ডেকেছিল আমাদের। কেরলের খ্রিষ্টান। হঠাৎ করে দেশ থেকে গ্রামতুতো একটা ফ্যামিলি এসেছে কোলকাতায়। পোর্ট ট্রাস্টের রিক্রুটমেন্ট টেস্ট দিতে। ফলে আমাকে আর সতীশকে নিয়ে ম্যানেজমেন্টের পূর্বদিকের সবথেকে বড় ফুটবল মাঠটায় বসেছে। সতীশ বিহারী। তার অঙ্কুরোদ্গম, লতাপাতা ছড়ানো সব কোলকাতায়। আমরা তিনজনেই প্রায় বাল্যবন্ধু। জোকা ম্যানেজমেন্টের কেন্দ্রীয় বিদ্যালয়ে পড়া থেকে বন্ধুত্ব। সে বহুদিন আগের কথা। এখন বিয়ে করে সবাই বাবা। কিন্তু সময় মেপে বন্ধুত্বে শ্যাওলা পড়েনি।

সন্ধেটা নামল একটা গান হয়ে। ফাঁকা মাঠে, চাঁদের উদয়, ঠাণ্ডা বিয়ার, সঙ্গে পুরোনো দুই বন্ধু। একেবারে গজল। সতীশ গাইছিলও বড়ে গুলাম আলির “আওয়ারগি”। “এ দিল এ পাগল দিল মেরা কিউ বুঝ গ্যায়া আওয়ারগি / এহ্‌ দাস্তমে এক শহর থা ও কেয়্যা হুয়া আওয়ারগি ……….।” তখনই একবার মাটিটা নড়ে উঠল। আমি ভাবলাম তিন বোতল বিয়ার শেষ করলে মাটি প্রত্যেকবারই নড়ে। তিন জনেই মাঠের ঘাসে পা ছড়িয়ে পিছনে হাত রেখে হেলে বসে বিয়ার খাচ্ছি। ভাবলাম দক্ষিণা বাতাস বেশী বেশী মদ ঢালছে নেশার হৃৎপিণ্ডে। আমাকে উঠতে হবে। রানা পা বাড়ালেই বাড়ি ঢুকে যাবে। সতীশের ড্রাইভার সহ গাড়ি আছে। যাবেও সামান্য দূরত্ব। তারাতলা মিন্টের কোয়াটার্স। আমাকে ফিরতে হবে অনেকটা পথ। কুড়ি কিলোমিটার উজিয়ে আমার গ্রাম। পৈত্রিক বাড়ি। একান্নবর্তী সংসার। বাইক চালিয়ে যেতে হবে। আর এক বোতল শেষ করেই উঠবো।

ঠিক তখনই মাটি নড়ে উঠলো সপাটে। অনেকগুলো বোমা একসঙ্গে ফাটলে যেমন আওয়াজ হয় তেমন একটা আওয়াজ হলো। মনে হ’লো পৃথিবীর কক্ষপথে ঢুকে পড়েছে অন্য কোন গ্রহ। মারাত্মক একটা মুখোমুখি সংঘর্ষ মনে হলো। আমি বসে ছিলাম। উঠে দাঁড়াতে গিয়ে ছিটকে পড়লাম মাটিতে। পাশে থাকা বিয়ারের বোতলগুলো বাস্ট করলো। মুখের মধ্যে অনেকগুলো কাঁচ ফুটে গেল। সেগুলো টেনে ছাড়াতে পারলাম না। এটুকুই মনে আছে।

জ্ঞান ফিরল একদম নতুন পৃথিবীতে। বলা ভালো প্রাগৈতিহাসিক একটা পৃথিবীতে আমি একা। প্রথমে ভাবলাম আমি দু:স্বপ্ন দেখছি। মুখের মধ্যে ফুটে থাকা বিয়ারবোতলের কাঁচগুলো যন্ত্রণা দিতে শুরু করেছে মস্তিষ্কের কোষে কোষে। হাত দিয়ে যতটা পারলাম টেনে ছাড়ালাম। বুঝলাম স্বপ্ন নয়। কিন্তু ঘুমের আগের পৃথিবীটা গেল কোথায় ! উত্তর দিকের কোয়াটার্স আর দক্ষিণ দিকের অফিসবাড়ি গুলো গেল কোথায়। সব উবে গেল নাকি ! তার বদলে ঢিপির মতো কিছু দেখা যাচ্ছে। চাঁদ উঠেছে অনেক ওপরে। চাঁদের আলোয় বোঝার চেষ্টা করছি কী হয়েছে। ভূমিকম্প এত মারাত্মক হতে পারে জানা ছিল না। ফুটবলমাঠের আশেপাশের একটা গাছও খাড়া নেই। ভেঙ্গে তালগোল পাকিয়ে গেছে। গাছগুলোর পাতাও কেমন নেতানো লাগছে এইটুকু সময়ে। সময়ের কথা খেয়াল হতে ঘড়ির দিকে তাকালাম। আমার দামি সুইস ঘড়ি থেমে আছে পৌনে সাতটায়। এখন তাহলে কটা বাজে ? বুকপকেটে পড়ে আছে মোবাইলটা। হাতে নিয়ে দেখলাম এগারোটা একুশ।

সাড়ে চারঘন্টায় জানা পৃথিবীটা একদম অচেনা হয়ে গেল ! মোবাইলটার লক খুলে প্রথমেই বউকে ফোন করতে গেলাম। খেয়াল করিনি টাওয়ার নেই। কানে চেপে ধরতে বুঝলাম মৃত সন্তানের মতো মোবাইলটা জড়িয়ে রেখে লাভ নেই। ফেলে দিতে গিয়েও প্যান্টের পকেটে তুচ্ছ আধুলির মত রেখে দিলাম স্মার্ট ফোনটা। অনেক টাকা দিয়ে কিনেছিলাম কিনা ! এতক্ষণে মনে পড়ল রানা ম্যাথ্যু আর সতীশ সিং এর কথা। মনে মনে চমকে উঠলাম। ওদের পুরো নামে কোনদিন ডাকিনি, এমন কী ভাবিওনি। সেই আলাপপর্বের প্রথম দিকে ওভাবে পুরো নামে ওদের ভাবতাম। মনের মধ্যে কু ডাকছে। তবে কি ওরাও পৃথিবীর সঙ্গে ধ্বংস হয়ে গেল ।

বাড়ি যেতে হবে। বউ মেয়ে মায়ের জন্য মন কেমন করে উঠলো। ওরা কী করছে ! আমাদের পৈতৃক পুরানো বাড়ি। এতক্ষণে কী হয়েছে কে জানে। সন্ধেবেলা মেয়েকে নিয়ে বউএর পড়াতে যাওয়ার কথা ছিল। রাস্তায় থাকলে ফাঁকা

জায়গায় বেঁচে যেতে পারে। কিন্তু মা ? মা তো ওই সময় ঠাকুরঘরে থাকে। বাড়ির বাকি লোকেদের কী হলো কে জানে। তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়ালাম। মাথাটা একটু ঘুরে গেল। বিয়ারের শেষ টংকার। এখনও ছিল নেশাটা ? আগের পৃথিবীর শেষ পাপ মনে হলো। জুতোটা খুঁজতে লাগলাম। কিছুক্ষণ খুঁজে মনে হলো পৃথিবীটাই হারিয়ে গেলে জুতো খুঁজে লাভ কী। খালি পায়েই হাঁটা শুরু করলাম।

ঘন্টাখানেক বা তারও বেশি হাঁটলাম। জ্ঞানশূন্য হয়ে হাঁটার মতো। বাড়ি যেতে হবে যে করেই হোক। খালি পায়ে কেটে যাচ্ছে ছড়ে যাচ্ছে। ধ্বংসস্তূপের উপর দিয়ে হাঁটছি। একটা বাড়িও আস্ত নেই। একটা গাছ খাড়া হয়ে নেই। এই প্রথম একটা উপমা মনে ধরল, কোলকাতা কংক্রিটের জঙ্গল। যখন আস্ত ছিল সাজানো গোছানো ছিল। জঙ্গল কখনও সৃজন করা যায় না। এই প্রথম শহরটাকে ইঁট কাঠ লোহার জঙ্গল লাগছে। উঁচুনীচু চড়াই উৎরাই ভাঙছি। খালি পায়ে সেই ছোট বেলায় হেঁটেছি। তার পর বড়জোর কেয়ারি করা মেক্সিকান ঘাসের বাগানে হেঁটেছি দু-চারবার। সে পায়ে আরাম লেগেছে তুলতুলতার। আর এখন যেন আমি ধ্বংসের বাগানে নগ্ন অশ্ব হ্রেষা তুলে ঘুরে বেড়াচ্ছি যন্ত্রণায়। খালি পায়ে কাঁটা ও কাটার যন্ত্রণা, বাড়ি ফেরার যন্ত্রণা, ধ্বংস দেখার যন্ত্রণা।

নিজের শব্দ ছাড়া আর কিচ্ছু শুনতে পাচ্ছি না এখন। পাতালপুরীর মত নিঃশব্দ লাগছে শহরটা। আর মাঝে মাঝে ভয়ার্ত পাখির দল উড়তে উড়তে মিলিয়ে যাচ্ছে বদলে যাওয়া দিগন্তে। খেয়াল করলাম কলকাতায় এই প্রথম দিগন্ত দেখতে পাচ্ছি। দিগন্ত থেকে মুখ তুলে দেখি চাঁদ আকাশে। পুব দিকে চাঁদ উঠেছিল আজ। বাড়ি ফিরলে চাঁদ বামহাতে থাকার কথা। কিন্তু এখন চাঁদ আমার ডানদিক থেকে ছায়া ফেলছে বামদিকে। তারমানে আমি কি উল্টোদিকে চলে এলাম !

পকেট হাতড়ে স্মার্ট ফোনটা বের করি। অচল মুদ্রা কিন্তু স্বর্ণ মুদ্রার মতো কাজে দেয় ফোনটা। অ্যাপসে কম্পাস আছে। সেটা খুলতে গিয়ে সময়টা দেখি একটা পাঁচ। কম্পাসের কাঁটা দেখায় আমার নাক’বরাবর। হায় আমি বাড়ি ফেরার বদলে শহর কলকাতার পাঁজরে ঢুকে গেছি। কিন্তু কতটা ভেতরে বুঝতে পারছি না। চেনা শহরের কিছুই অখন্ড নেই। মোবাইলটায় ইন্টারন্যাশনাল রেডিও ছিল ! টিউন করি বি.বি.সি নিউজ। যাহ্‌ না শুনলেই ভালো হতো। ভূমিকম্পে কলকাতা ধ্বংস হয়ে গেছে মহেঞ্জদড়ো হরপ্পার থেকেও বেশি। আর সুন্দরবন সহ দক্ষিণ চব্বিশ পরগণা সুনামিতে জলের তলায়। এক কোটি মানুষ মারা গেছে ধারণা করা হচ্ছে। কোলকাতায় এখনও উদ্ধারকার্য শুরু করা যায়নি।

এই প্রথম আমার কঙ্কনার কথা মনে পড়ল। বউ হারিয়ে যেতে প্রেমিকার কথা মনে পড়ল। যদি ওকে বাঁচানো যায়। আমার অফিস কলিগ। কুচকুচে কষ্টিপাথরের মত রঙ। কিন্তু অসম্ভব যৌন আবেদন শরীরে প্রতি কোনায়। হাঁটলে পিছন দিকে মাঝ সমুদ্রের ঢেউ ওঠে। বিবাহিতা। এক সন্তানের জননী কিন্তু কোথাও জন্মদাগ নেই। হয়তো মসৃণ পাথরে দাগ রাখা যায়নি বলে আমি খুঁজেও পাইনি।

সব ভালোবাসার একটা ভবিষ্যৎ থাকে। শরীর দিয়ে শুরু হওয়া আমাদের ছক ভাঙা সম্পর্কের বিন্যাসে কোন ভবিষৎগন্ধী লেখা জোকা ছিল না। যতদিন পারা যায় লুকিয়ে শরীরবাস। তারপর কখন যে সেটাই ভালোবাসা হয়ে গেল ! এখন আমার জন্যে শেষ সিংহাসন পেতে রেখেছি তার কাছে নিজেই। সেও মেনে নিয়েছে আমার সন্তান, স্ত্রী সংসার; আমিও। রোজ অফিসে দেখা হয়। লুকিয়ে চুরিয়ে কথা হয়। আর না হলে দুঃখ হয়। দুঃখটা উভয়ত, কঙ্কনা বারবার আমায় বুঝিয়েছে।

প্রচণ্ড গরম লাগছে। একটানা হাঁটছি। সারা শরীর গরমে চিড়বিড় করছে। ঘামে আটকে গেছে ধুলো। চ্যাট চ্যাট করছে হাতের তালু দুটো। একটু জল পেলে ভালো হতো। পিপাসাও পাচ্ছে। কোলকাতায় তো অনেক জলাশয় ছিল। কোথায় গেল ! গলা শুখিয়ে আসছে। রাস্তাগুলো সব কোথায় গেল! এতক্ষণে একটা রাস্তাও দেখতে পাইনি। আর সোজা হয়ে হাঁটতে পারছি না। অন্ধের মতো ছুঁয়ে ছুঁয়ে চার পায়ে হাঁটছি। শরীরে আর শক্তি নেই। এই একটা স্তূপ বেয়ে উঠলাম আবার গড়িয়ে গড়িয়ে নামছি। আমি ঠিক কোথায় ? নিজেই জানি না। সভ্যতার কোন চিহ্নই নেই। রাস্তা, রাস্তা নাম, লাল-সবুজ আলোর উৎকণ্ঠা; কিছু নেই। রোড, স্ট্রীট, অ্যাভ্যেন্যু, সরণী নাম নেওয়া চওড়া রাস্তাগুলো ভূমিকম্প গিলে নিলো, না ধ্বংসস্তূপের নিচে ব্যস্ততা সরিয়ে আরামে শুয়ে আছে। অত অত গাড়ি। বাস, ট্যাক্সি, মিনিবাস বা অত সব দামি গাড়ি সব চাপা পড়ে গেল ! গত মাসে বস্‌ একটা বি.এম.ডবলু কিনলো আর সেই উপলক্ষে পার্টিতে কঙ্কনাকে এক ফাঁকে কোণের দিকে জড়িয়ে চুমু খেলাম। সেই গাড়িটাও কি ধ্বংস হয়ে গেল।

একটা হিব্রু হরফের হলফনামার মতো ধ্বংসস্তূপ দিয়ে নামছি কোনক্রমে। মনে হলো কোন রেসিডেন্সিয়াল কমপ্লেক্স ছিল। চিৎ হয়ে পড়ে আছে পাশাপাশি অনেকগুলো কিংকং এর মৃত দেহের মতো। হ্যাঁ ঠিকই ধরেছি। এটা রেসিডেন্সিয়াল কমপ্লেক্সই। নেমপ্লেটে শৌখিন নাম লেখা। বিশাল আগ্রওয়াল। চাঁদের আলোয় ধুলো ঝেড়ে চকচকে ধাতুটায়

ঠিকানা খোঁজার চেষ্টা করি। তাহলেই বুঝতে পারবো কোথায় আছি। না কোনো ঠিকানা নেই। হাত বুলিয়ে বোঝার চেষ্টা করি অন্য কিছু লেখা আছে কি না। আর একটু এগোলে একটা ডাকবাক্স। আমি হাতে তুলে নাড়াচাড়া করি। না এতেও কোন খুশির চিঠি নেই যাতে থেকে ঠিকানা বুঝে নিজের অবস্থান ঠিক করবো। আমাকে যেতে হবে বত্রিশের এক নকুলেশ্বর ভট্টাচার্য লেন। ভবানীপুর। তিনতলা পুরানো বাড়ি। সাবেকী শরিকানা বাড়ি। কাস্টিং লোহার রেলিং বাঁধানো কাঠের সিঁড়ির দোতালায়। যেখানে কঙ্কনা থাকে স্বামী সন্তান নিয়ে। কিন্তু পৌঁছে যদি দেখি ওদের বাড়ি ঠিক আছে। সব ঠিক আছে ! আমি কী বলবো ?

– ওঁয়াও !

চমকে উঠে ডানদিকে ফিরে তাকাই। একটা শিশু হামাগুড়ি দিয়ে নিজের মনেই এগিয়ে চলেছে। আরে সামনেই একটা নদী না ! গঙ্গা ? কিন্তু গঙ্গা তো অনেক চওড়া। এটাতো অনেক নরম নদী। পরিষ্কার জলে দুপাড় জুড়ে জোয়ার ভাঁটার জলদাগ। তবে কি আদিগঙ্গা ? সুনামির জলে স্ফটিক স্বচ্ছ ! আরে আরে শিশুটা জলের দিকে নেমে যাচ্ছে। আমি শরীরে সব শক্তি একত্রিত করে সোজা হয়ে দাঁড়াই। ইট, কাঠ মাড়িয়ে দৌড় লাগাই শিশুটার  দিকে। এই মৃত শহরে একমাত্র জীবন্ত প্রাণ, শিশুটাকে জল ছেটানো সবজির মতো টাটকা লাগে। এই শিশু ভেসে যাবে জলে। যেতে দেওয়া যায়?

নতুন নদীটা পার হতে পারলেই যেন এই বীভৎস মৃত্যুর স্বপ্নপুরী থেকে বেরিয়ে যেতে পারবো। মনে মনে আর একটা হিসাব করলাম, আদি গঙ্গা পার হলে তবেই না ভবানীপুর ছিল ? ছিল ! কয়েক ঘণ্টায় আমিও শহরটাকে অতীত করে দিলাম। বাঙ্গালীর প্রিয় শহর, ভারতের সংস্কৃতিক রাজধানী এখন এই মুহূর্তে অতীত ! আসলে ভূমিকম্পের পরে শহরের ভূগোলও যেন বদলে গেছে। আদিগঙ্গা খাল থেকে নদী হয়ে গেছে। সাঁতরে পার হওয়া যাবে তো ? সঙ্গে আবার শিশুটা আছে। আশার কথা আদিগঙ্গার ওই পাড়ে অনেকটা জায়গা জুড়ে কোন ধ্বংসস্তূপ দেখা যাচ্ছে না। ধুলোবালির স্তূপ দেখতে দেখতে ক্লান্ত। স্বাভাবিক একটা জায়গা দেখতে পেয়ে মনের সজীবতা ফিরে আসে।

জামা খুলে শিশুটাকে পিঠের সঙ্গে বেঁধে নিই। ফুলের মতো শিশুটা সবে কথা বলতে শিখেছে। মানুষের সংস্পর্শে এসে আবার ফিরে পেয়েছে তার নতুন আনন্দভাষা। আউ আউ করে কিছু বলছে আমাকে। কাঁদছে না খিদে পেয়েছে ? আমার কিছু করার নেই। খিদে আমারও পেয়েছে। ঠিক করি আদিগঙ্গায় নেমে পেট ভরে পরিষ্কার জল খেয়ে নেবো। কিন্তু আদিগঙ্গার পুরোনো রূপ ভেবে আঁতকে উঠি।

নদীতে নেমে জল খাওয়া আর হলো না, প্রচণ্ড নোনা সমুদ্রের জল ! পেট না ভরলেও শরীরে জল পেয়ে তাজা হয়ে উঠি। বেশ স্নিগ্ধ লাগছে। স্থির সমুদ্রজলে সাঁতার কাটতে ভালোও লাগছে। ভেসে থাকতে কষ্ট হচ্ছে না। পিঠের শিশুটাও জল পেয়ে হাত পা ছিটিয়ে জল মাখছে। বাথটবে স্নান করা জীবনে এতো জল তাকে নতুন আনন্দে হাসাচ্ছে। তবে আমার পায়ের পাতা আর হাতের ছোড়ে যাওয়া জায়গাগুলো হাউহাউ করে জ্বালা করছে নোনা জলের সংস্পর্শে। তবু শিশুটার হাসি আমায় নতুন করে শক্তি যোগাচ্ছে।

নদীটা যতটা চওড়া হবে ভেবেছিলাম, তার থেকে অনেকটাই চওড়া। পাড়ে উঠে অবিন্যস্ত ঘাসের উপর শুয়ে পড়ি। শিশুটাও কেমন এলিয়ে পড়েছে। নোনা জল খেয়ে ফেললো কি ? ওর জামা প্যান্ট খুলে আমার পাশে শুইয়ে নিই বুকের ভিতর। ও আমার বুকের ভিতর গুটিশুটি মেরে শুয়ে পড়ে। খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখি চাঁদ কোথায় লুকিয়ে পড়েছে। কটা বাজে ? মোবাইলটার কথা মনে পড়তে বুঝতে পারি ওটাকে ফেলে দেবার সময় হয়েছে। সাঁতারের সময় জল ঢুকে গেছে সমস্ত অ্যাপসে শুধু পৃথিবী নামক অ্যাপস্‌টা ভাঙ্গা, কুঁজো হয়ে স্লো চলছে আমার সামনে। পকেট থেকে বের করে আদিগঙ্গায় ছুঁড়ে ফেলে দিই আরামপ্রিয় সভ্যতার শেষ চিহ্ন।

শিশুটাকে কোলে নিয়ে উঠে পড়তে গিয়ে বুঝতে পারি এটা ক্রেমেটরিয়াম। আমাদের পাশেই কবরে শুয়ে কেউ কেউ। সমাধিফলকের শ্যাওলায় অস্পষ্ট হয়ে আছে তাদের নাম। তবে কি পার্কস্ট্রীট ? যেখানেই হোক বের হতে হবে। সমাধিক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে বাঁচার কথা ভাবা যায় না। সমতলক্ষেত্র পেয়ে হুড়মুড়িয়ে হাঁটতে শুরু করি। হোঁচট খাই একটা নরম কিছুতে। একটা শবদেহ। আর একটা, আরও একটা। ওফ্‌ অনেক শবদেহ পড়ে আছে এদিক  ওদিক কালো রক্ত মেখে। সান্ধভ্রমণে কি এসেছিল এরা ?

কিছুটা সমতলে যাওয়ার পর কঙ্কালমুন্ডু আর দুই হাড়ের কাটাচিহ্ন যুক্ত শহরে আবার ঢুকে পড়লাম। কোন দিকে যাব ? কোন দিকে কঙ্কণা থাকে ? কোথায় তাকে পাবো ? এসব ভাবতে ভাবতে হাঁটছি। ভোর হতে কত বাকি ! কতক্ষণ আর এই শিশুটাকে নিয়ে কংক্রিটের জঞ্জালে ঘুরে বেড়াবো ! একটা স্তূপের উপর কোলের মধ্যে শিশুটাকে নিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবছি। হঠাৎ করে আবার কেঁপে উঠলো জঞ্জালটা। দুলে উঠলো ঘুমন্ত মৃত্যুপুরীটা আবার। গড়িয়ে গড়িয়ে পড়তে

লাগলাম আবার। পায়ের উপর খুব বড় একটা পাথর এসে পড়লো। তবু শিশুটাকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে ,হড়কে নামছি। হঠাৎ করে বুকের মধ্যে কেঁদে উঠলো শিশুটা। ঘুম থেকে জেগে ওঠার কান্না বুঝতে পারি। আমার মেয়েটাও এভাবেই কাঁদতো। চোখ দিয়ে জল এসে গেল এবার।

দুলুনিটা থামতে থামতে আমরাও নেমে এসেছি ধ্বংসস্থূপ থেকে। সামনেই অনেকটা ফাঁকা মাঠ। ময়দান কি ? সামনের ভেঙে পড়া গাছপালা সরিয়ে বুঝলাম ময়দানই। শিশুটাকে কোল থেকে নামালাম। আমার বাঁ পায়ে অসহ্য যন্ত্রণা শুরু হয়েছে। আর পৌঁছাতে পারবো কি ! কোথায় বা যাব ? কোথাও যাওয়ার অবশিষ্ট আছে কি ? শিশুটা কোল থেকে নেমেই হিসু করে ছরছর করে। ওই ঝরে পড়া জলটুকুই যেন জীবনের লক্ষণ! বাকি সব মৃত। স্থবির। অচল। আমি হাঁটু গেড়ে বসে হিসু করাটা দেখতে থাকি।

আমার সব গেছে। মা, বউ, সন্তান। শুধু আমার কেন সবারই গেছে। পৃথিবীই ধ্বংস হয়ে গেছে মনে হয়। আমি আর কোথাও যাব না। এই ঘাসে শুয়ে পড়বো। ঘুমাবো আমৃত্যু। আমার খুব যন্ত্রণা হচ্ছে। আমি আর পারছিনা সহ্য করতে। আমি মুমূর্ষু। কিন্তু হিসু করা হয়ে যেতেই শিশুটা খোলা মাঠে হাঁটতে শুরু করে। ওরও কি মায়ের কথা মনে পড়লো ?

আমি উঠে হাত ধরি। যন্ত্রণায় খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতে থাকি। ডানহাতে শিশুটার বামহাত। পৃথিবীর শেষ পিতাপুত্রের মতো হাঁটছি হাঁটছি হাঁটছি। অনন্তকাল হাঁটার পর একটা রাস্তা পাই। রাস্তায় অসংখ্য গাড়ি। গাড়িতে কাঁঠালে মাছির মতো মৃত্যু। মৃতদেহের স্থিরচিত্র সহ্য করতে পারি না। আরও এগিয়ে যাই। একটা দুধসাদা প্রসাদের ধ্বংসস্থলের পাশে একটা বাগান মতো। আঁধারে চোখ বসিয়ে চিনতে পারি ভিক্টোরিয়া। পাড়বাঁধানো পুকুরে টইটই জল। জলের পাশে চিত হয়ে পড়ে আছে একটা কালো মৃত দেহ। এগিয়ে গেলাম। আরে মুখটা একদম কঙ্কনার মতো না? ভবানীপুর থেকে ভিক্টোরিয়া খুব দূরে নয়। কঙ্কনাই কি?

এগিয়ে যাই জলের দিকে। পুকুর থেকে গণ্ডূষ ভরে জল পান করি। তারপর কঙ্কণার পাশে শুয়ে পড়ি শিশুটাকে দুজনের মধ্যে নিয়ে। ভূমিকম্পের ধ্বংসের মাঝে আমাদের নতুন এক পরিবার। নতুন সূর্যোদয়ের অপেক্ষায় ঘুমিয়ে পড়ি। শুধু কঙ্কনার ডানা দুটোর জন্যে আমাদের দুজনের ঘুমোতে একটু অসুবিধা হচ্ছে এই যা ।

 লেখকের পড়াশুনো রামকৃষ্ণ মিশন ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। মনেপ্রাণে প্রকৃতিপ্রেমিক লেখকের বাকি শিক্ষা জীবন থেকে। করাতকল, রঙের ব্যবসা, মিশ্রখামারে পশুপালন, মুন্নার ( কেরালা)এ চন্দনগাছ কাটার কন্ট্রাক্ট, রোড কন্ট্রাক্টরি, বিভিন্ন বহুজাতিক সংস্থায় সেলস এর পদস্থ চাকরি – নানারকম পেশায় থাকার পর এখন সরকারি বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন।

নয়ের দশকে কবিতা পাক্ষিক ও অন্যান্য পত্রিকায় নিয়মিত কবিতা লিখতেন। তারপর পেশার কারণে সাময়িক বিচ্ছেদ। ফিরে এলেন গল্প ও উপন্যাস নিয়ে। বিভিন্ন দৈনিকে ও সাময়িক পত্রে নিয়মিত লেখেন তিনি। তার দুটি উপন্যাস ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হয়েছে উত্তরের সারাদিন ও মানভূম সংবাদে। অভিযান পাবলিশার্স থেকে সদ্য বেরিয়েছে লেখকের গল্পের বই ” নতুন গল্প ২৫ “।

 

Shares

Leave A Reply