টিভি-স্মার্টফোন নেই,বীরভূমের গ্রামে শিক্ষকের পাঠ রেকর্ড করে মাইক বাজিয়ে শোনানো হচ্ছে পড়ুয়াদের

লকডাউনের জেরে দীর্ঘদিন ধরে স্কুলে তালা। তাই পড়াশোনার পাঠ একেবারে শিকেয় উঠেছে প্রত্যন্ত গ্রামীণ এলাকার খুদে পড়ুয়ারদের। বিষয়টি একদিকে যেমন ভাবাচ্ছে স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের, তেমনই উদ্বিগ্ন জেলা প্রশাসনও। শেষমেশ পরীক্ষামূলকভাবে শুরু করা হয় শ্রুতিপঠন।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    দ্য ওয়াল ব্যুরো: অনেক কষ্টে স্কুলমুখী করা হয়েছিল তাদের। দীর্ঘ লকডাউনে স্কুল বন্ধ। বাড়ির বাইরে পা রাখার জো নেই। তা হলে কি ছেলেপুলেগুলো পড়াশুনা করবে না?

    কিন্তু ওই যে কথায় বলে, ইচ্ছে থাকলে উপায় হয়। ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনা করানোর প্রকৃত আগ্রহ যদি দিদিমণি-মাস্টারমশাইদের থাকে, তবে কে আটকায় তাঁদের! শ্রুতির পথ বেছে নিলেন তাঁরা। শিক্ষকদের পাঠ রেকর্ড করে মাইকে বাজানো হচ্ছে।

    সিউড়ির ১ নম্বর ব্লকের প্রত্যন্ত আদিবাসী গ্রামগুলিতে মানুষের অনটন লেগেই থাকে। বহু বাড়িতে টিভিই নেই, স্মার্টফোন তো দূরের কথা। তার পর ইন্টারনেট। সুতরাং অনলাইনে পড়াশোনার সুযোগ নেই। তাই মাস্টারমশাইদের ভয়েজ রেকর্ড করে মাইকে তা বাজিয়ে শোনানো হচ্ছে পড়ুয়াদের। ভাগ করে দেওয়া হয়েছে সময়। কখনও বেজে উঠবে প্রথম শ্রেণির বাংলার পাঠ, আর কখনও বা বেজে উঠবে দ্বিতীয় শ্রেণির ইতিহাসের পাঠ। সময় বুঝে তা শুনে নিয়ে বাড়িতে বসেই পড়াশোনা করো এবার।

    লকডাউনের জেরে দীর্ঘদিন ধরে স্কুলে তালা। তাই পড়াশোনার পাঠ একেবারে শিকেয় উঠেছে প্রত্যন্ত গ্রামীণ এলাকার খুদে পড়ুয়ারদের। বিষয়টি একদিকে যেমন ভাবাচ্ছে স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের, তেমনই উদ্বিগ্ন জেলা প্রশাসনও। দিন সাতেক আগে সিউড়ি সদর সার্কেলের বিদ্যালয় পরিদর্শক, স্থানীয় দু’টি স্কুলের শিক্ষক, গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান ও শিক্ষক সংগঠনের প্রতিনিধিদের নিয়ে বৈঠক করেন সিউড়ি (১) ব্লকের বিডিও শিবাশিস সরকার। পঢ়াশোনার সঙ্গে যাতে একেবারে সম্পর্কচ্যুত না হয় পড়ুয়ারা তা নিয়ে চলে আলোচনা। শেষমেশ পরীক্ষামূলকভাবে শুরু করা হয় শ্রুতিপঠন।

    এখন সিউড়ি (১) ব্লকের গজালপুর ও নগরী গ্রামে বাঁধা হয়েছে মাইক। সকালে নির্দিষ্ট সময় অন্তর কখনও মাস্টারমশাইয়ের গলায় বাংলা পড়ানো শুনতে পাচ্ছে পড়ুয়ারা। কখনও দিদিমনি পড়াচ্ছেন ইতিহাস বা ভূগোল। পুরোটাই সংশ্লিষ্ট দিদিমনি বা মাস্টারমশাইয়ের ভয়েজ রেকর্ড করে এনে বাজিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

    লকডাউনে স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকায় অনলাইনে ক্লাস নেওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে বিভিন্ন স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে।  টিভির মাধ্যমেও মাস্টারমশাইদের সঙ্গে পড়ুয়াদের যোগাযোগ রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু তাতো উঁচু ক্লাসের ছাত্রছাত্রীদের জন্য। প্রত্যন্ত গ্রামের প্রাথমিকের পড়ুয়াদের তো আর এভাবে পড়ানো সম্ভব নয়। তাই নতুন ভাবনা। জানালেন শিবাশিসবাবু। তিনি বলেন, ‘‘আপাতত নগরী গ্রামের উদয়ন পাঠশালা ও গজালপুর নিম্ন বুনিয়াদি স্কুলের শিশুদের এভাবে পড়ানোর ব্যবস্থা হয়েছে। আমরা যদি দেখি এই পরিকল্পনা সার্থক হয়েছে, তবে অন্য জায়গাতেও একই পথে এগোনো যাবে।’’

    উদয়ন পাঠশালার প্রধানশিক্ষক দেবদাস সাহা বলেন, ‘‘আমাদের এই অঞ্চলটা পুরোপুরি আদিবাসী অধ্যুসিত। দারিদ্রসীমার নীচে অধিকাংশ মানুষের বাস। দারিদ্রের কারণেই হোক, আর চল নেই বলেই হোক, স্কুলে আসে না অধিকাংশ শিশু। আমরা একরকম জোর করে তাদের ধরে নিয়ে আসি। এই দীর্ঘ লকডাউনে এই অভ্যেস চলে যাওয়ায় আবার তাদের স্কুলে ফেরাতে পারব কি না তাই নিয়ে যথেষ্ট আশঙ্কায় ছিলাম। নতুন ব্যবস্থায় দিনের নির্দিষ্ট সময়ে দিদিমনি-মাস্টারমশাইদের মুখে পড়া শুনলেও সেই অভ্যেসটা থেকে যেতে পারে। তাই এই চেষ্টা।’’

    গুরুর মুখে শুনে জ্ঞানলাভ ভারতের চিরন্তন ঐতিহ্য। এভাবেই জন্ম হয়েছিল বেদের। তাই বেদের আরেক নাম শ্রুতি। পরিস্থিতির প্রয়োজনে সেই সুপ্রাচীন পদ্ধতিই ফিরিয়ে আনা হল। সার্থকতার হিসেব মেলাবে ভবিষ্যত।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More