করোনা নির্ণয়ে নমুনা সংগ্রহের জন্য কিয়স্ক বসানোয় বাধা পেয়ে অবসাদে আত্মঘাতী স্বাস্থ্যকর্মী

রাজ্য সরকারের নির্দেশ মেনে করোনা কিয়স্ক বসানোর কাজ করতে গিয়ে বারবার তাঁকে বাধার মুখে পড়তে হয় বলে সুইসাইড নোটে উল্লেখ করেছেন ওই স্বাস্থ্যকর্মী। তিন পাতার সুইসাইড নোট লিখে অফিস কর্মীদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপেও পোস্ট করেন।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    দ্য ওয়াল ব্যুরো, জলপাইগুড়ি: তিন পাতার সুইসাইড নোট লিখে অফিস কর্মীদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে পোস্ট করে আত্মঘাতী হলেন ঘুঘুডাঙা প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের হেলথ সুপারভাইজার দেবাশিস চক্রবর্তী(৫৯)। রাজ্য সরকারের নির্দেশ মেনে করোনা কিয়স্ক বসানোর কাজ করতে গিয়ে বারবার তাঁকে বাধার মুখে পড়তে হয় বলে সুইসাইড নোটে উল্লেখ করেছেন ওই স্বাস্থ্যকর্মী। এবং শুধু গ্রামবাসীরা নয়, ওই স্বাস্থ্যকেন্দ্রের এক চিকিৎসকের কাছ থেকেও বাধা আসছিল বলে উল্লেখ করেছেন তিনি। এই ঘটনায় তীব্র চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে জলপাইগুড়িতে। ঘটনার উচ্চপর্যায়ের তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন জলপাইগুড়ি জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক।

    পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, জলপাইগুড়ির পান্ডাপাড়ার বাসিন্দা দেবাশিসবাবু জলপাইগুড়ির ঘুঘুডাঙা প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্রের হেলথ সুপারভাইজার পদে কর্তব্যরত ছিলেন। বুধবার সকালে তিনি তিন পাতার একটি সুইসাইড নোট লিখে অফিসকর্মীদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে পোস্ট করেন। এরপরেই কীটনাশক খেয়ে বাড়ির কুয়োতে ঝাঁপ দেন। বাড়ির লোকজনের চিৎকার শুনে ছুটে আসেন পড়শিরা। তাঁরা দেবাশিসবাবুকে উদ্ধার করে জলপাইগুড়ি সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে নিয়ে যান। দিনভর চিকিৎসার পর রাতে মারা যান তিনি। বৃহস্পতিবার দুপুরে ময়নাতদন্তের পর তাঁর মৃতদেহ পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয়। বাড়িতে তাঁর স্ত্রী-কন্যা ও বৃদ্ধা মা রয়েছেন।

    সুইসাইড নোট থেকে জানা গেছে, করোনা কিয়স্ক তৈরি করতে গিয়ে গ্রামবাসীদের বাধার মুখে পড়েছিলেন ওই স্বাস্থ্যকর্মী। সহকর্মীদের কাছ থেকেও সহযোগিতা পাননি। তাঁর আত্মহত্যার ঘটনায় তীব্র চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে জেলার স্বাস্থ্য দফতরে। ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত চেয়ে এদিন জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিককে স্মারকলিপি দেয় জলপাইগুড়ি জেলা স্বাস্থ্য দফতরের কর্মীরা। এরপরেই ঘটনায় উচ্চপর্যায়ের তদন্তের নির্দেশ দেন তিনি।

    করোনা মোকাবিলায় আরও বেশি করে লালারস সংগ্রহের লক্ষ্যে জলপাইগুড়ি জেলা স্বাস্থ্য দফতর সম্প্রতি কয়েকটি প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে করোনা কিয়স্ক বসানোর সিদ্ধান্ত নেয়। তার মধ্যে ছিল ঘুঘুডাঙা প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্রও। সরকারি নির্দেশ অনুযায়ী দেবাশিসবাবু ওই এলাকায় কিয়স্ক বসানোর তোড়জোড় শুরু করতেই এলাকাবাসীর একাংশ এবং তাঁরই ডিপার্টমেন্টের কিছু লোকের ক্রমাগত বাধার মুখে পড়তে থাকেন বলে অভিযোগ। সুইসাইড নোটে তিনি উল্লেখ করেন ঐ স্বাস্থ্যকেন্দ্রের চিকিৎসক স্থানীয়দের সঙ্গে মিলে তাঁকে ক্রমাগত চাপের মুখে রাখেন। সেই চাপ সহ্য করতে না পেরেই অন্তিম পথ বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছেন।

    দেবাশিসবাবুর ভাই জয়ন্তকুমার চক্রবর্তী বলেন, ‘‘আমার দাদা সুইসাইড নোট লিখে অফিস কর্মীদের হোয়াটস অ্যাপ গ্রুপে পোষ্ট করেন। তাতে লেখা আছে অফিসের কয়েকজন কর্মী ও গ্রামবাসীরা মিলে যাতে ঘুঘুডাঙায় করোনা কিয়স্ক তৈরি না হয় তার জন্য দাদার উপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করেছিল। সহ্য করতে না পেরেই আত্মঘাতী হয়েছেন তিনি। আমরা ঘটনার তদন্ত দাবি করছি।’’

    দীপেন ঘোষ নামে এক স্বাস্থ্যকর্মী বলেন, ‘‘ঘুঘুডাঙা স্বাস্থ্য কেন্দ্রের মেডিক্যাল অফিসারের মদতে স্থানীয় বাসিন্দারা করোনা কিয়স্ক তৈরিতে বাধা দেয়। এবং দেবাশিস চক্রবর্তীর উপর ক্রমাগত মানসিক চাপ দেয়। তাকে অপমান করে। তিনি আত্মঘাতী হন। আমরা আজ মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিকের কাছে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত দাবি করলাম।’’

    জলপাইগুড়ি জেলা মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক ডাক্তার রমেন্দ্র নাথ প্রামাণিক বলেন, ‘‘আমাদের এক কর্মীর অস্বাভাবিক মৃত্যুর তদন্তের দাবি নিয়ে কর্মীরা এসেছিলেন। দেবাশিস চক্রবর্তী তাঁর সুইসাইড নোটে আমাদের ডিপার্টমেন্টের লোকের নাম উল্লেখ করে গেছেন। আমি এই ঘটনার উচ্চ পর্যায়ের তদন্তের নির্দেশ দিয়েছি।’’

    এই ঘটনায় জলপাইগুড়ির পুলিশ সুপার অভিষেক মোদী বলেন, ‘‘ওই পরিবারের পক্ষ থেকে এখনও কোনও লিখিত অভিযোগ জমা পড়েনি। পুলিশ এই ঘটনায় একটি সুইসাইড নোট উদ্ধার করেছে। অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা রুজু করে ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে।’’

    দু’দিন আগেই উত্তরবঙ্গে করোনা বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিক ডাক্তার সুশান্ত রায় অভিযোগ করেছিলেন, হাটে-বাজারে আসা মানুষদের লালারস সংগ্রহের পরিমাণ বাড়ানোর জন্য যখন বিভিন্ন জায়গায় কিওস্ক বসানোর চেষ্টা চলছে, তখন অদ্ভুতভাবে দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের একাংশ এই কাজে বাধা দিচ্ছেন। স্বাস্থ্য আধিকারিকের এই অভিযোগের সারবত্তাই যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন আত্মঘাতী স্বাস্থ্যকর্মী। এ দিন সুশান্তবাবু বলেন, ‘‘রোগ ছড়ানোর জন্য নয়, কিয়স্ক বসানো হচ্ছে রোগ নির্ণয়ের জন্য, এটা মানুষকে বুঝতে হবে।’’

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More